সবুজে মোড়ানো গোপন খনি পার্বত্য চট্টগ্রাম

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির কোনো পেরিফেরি বা প্রান্তিক অঞ্চল নয়; এটি উন্নয়নের এক অপ্রতিরোধ্য পাওয়ার হাউজ।

মো: সহিদুল ইসলাম সুমন

শহুরে নাগরিক যান্ত্রিকতার ধুলোবালি ঝেড়ে ফেলে আমরা যখন মেঘের রাজ্য সাজেক কিংবা নীলগিরির চূড়ায় দাঁড়িয়ে নিভৃত পাহাড়ের প্রেমে পড়ি, তখন অবচেতন মনে আমরা এক বিশাল ও গভীর অর্থনৈতিক বাস্তবতা এড়িয়ে যাই। আমাদের কাছে পাহাড় মানে শুধু ঝরনা আর জুম পাহাড়ের বাঁশি; কিন্তু একজন অর্থনীতিবিদের চশমা দিয়ে দেখলে এই তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি আর বান্দরবান আসলে বাংলাদেশের এক বিশাল এবং প্রাণবন্ত ‘ইকোনমিক ফোরট্রেস’। ‘ইকোনমিক ফোরট্রেস’ বা অর্থনৈতিক দুর্গ বলতে এমন এক অভেদ্য এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ অঞ্চল বোঝায়, যা একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য সুরক্ষাকবচ এবং শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে। এটি হলো এমন এক এলাকা যা দেশের মূল অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি উন্নয়নের নতুন নতুন রসদ সরবরাহ করে টিকে থাকার সাহস জোগায়।

এক দশকে এই পাহাড়ের বুক চিরে যে নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে, তা আমাদের জাতীয় জিডিপিতে যে অক্সিজেন সরবরাহ করছে, সে খবর হয়তো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ড্রয়িংরুমের আলোচনায় সেভাবে আসে না। পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন আর শুধু পর্যটনের চটকদার পোস্টার নয়; এটি বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, অপ্রচলিত রফতানিপণ্য আর ভূ-কৌশলগত সংযোগের এক জাদুকরী কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। ভাবলে অবাক লাগে, দেশের মোট আয়তনের প্রায় ১০ ভাগের ১ ভাগ অঞ্চলটি কিভাবে অবহেলা আর অশান্তির মেঘ সরিয়ে আজ জাতীয় অর্থনীতির এক প্রধান সারথি হয়ে উঠল। সত্যি বলতে কী, সমতলের কৃষি যখন রাসায়নিক সার আর জমির স্বল্পতায় ধুঁকছে, তখন আমাদের পাহাড়গুলো হয়ে উঠেছে ‘গ্রিন গোল্ড’ বা সবুজ স্বর্ণের খনি।

পাহাড়ের অর্থনীতির কথা বলতে গেলে প্রথমে যে বিষয়টি মাথায় আসে, তা হলো এখানকার কৃষিতে রূপান্তর। একটা সময় ছিল যখন ‘জুম চাষ’ ছিল পাহাড়ের মানুষের টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন; কিন্তু এখন সেই আদিম পদ্ধতির খোলস ছেড়ে পাহাড় ঢুকে পড়েছে উচ্চমূল্যের উদ্যান কৃষির এক বিশাল বাজারে। আপনি যদি বান্দরবানের রুমা বা থানচির পাহাড়ি ঢালগুলোতে যান, তবে দেখবেন সেখানে এখন আর শুধু ধান বা তিল ফলছে না; সেখানে ডালপালা মেলেছে কফি আর কাজু বাদামের মতো দামি সব ফসল। গত কয়েক বছরে বান্দরবান আর খাগড়াছড়ি থেকে যে পরিমাণ আম, মাল্টা আর ড্রাগন বাজারে আসছে, তা আমাদের আমদানিনির্ভর ফলের বাজারে সজোরে এক ধাক্কা দিয়েছে। আমরা তো বলতে চাই, স্বাদের দিক থেকে বান্দরবানের আম এখন রাজশাহীর আমকেও টেক্কা দেয়ার ক্ষমতা রাখে। এটি কেবল কয়েকটি ফলের বাগান নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষি-অর্থনীতির এক বিশাল ডাইভারসিফিকেশন। কাজু বাদাম আর কফির যে বৈশ্বিক বাজার, সেখানে বাংলাদেশ এখন দাঁত ফোটাতে শুরু করেছে কেবল এই পাহাড়ের উর্বরতায়। হাজার কোটি টাকার যে প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এখানে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা আমাদের রফতানি ঝুড়িতে পোশাকশিল্পের বাইরে এক শক্তিশালী স্তম্ভ যোগ করতে পারে।

তবে পাহাড়ের এ উন্নয়নের আড়ালে এক দীর্ঘশ্বাসও লুকিয়ে আছে। ষাটের দশকে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সময় যে বিশাল জনপদ তলিয়ে গিয়েছিল, তা ছিল আমাদের জাতীয় উন্নয়নে পাহাড়ের এক চরম ত্যাগ। কর্ণফুলী হ্রদ আজ আমাদের মাছ দেয়, বিদ্যুৎ দেয়, পর্যটনের সুযোগ দেয়; কিন্তু এর বিনিময়ে যে ৫৪ হাজার একর উর্বর কৃষিজমি হারিয়ে গিয়েছিল, তা ছিল পাহাড়ের অর্থনীতির এক অপূরণীয় ক্ষতি। আজ যখন আমরা কাপ্তাই হ্রদ থেকে বছরে ১০-১২ হাজার টন মাছ আহরণ করি, তখন আমাদের মনে রাখা উচিত এ মাছের রুপালি ঝিলিক ওই ত্যাগের ফসল। এই হ্রদ এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় স্বাদু পানির মাছের আধার, যা দেশের মানুষের প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি হাজার হাজার জেলের অন্নসংস্থান করছে। এটি কেবল মাছের খনি নয়; এটি একটি বিশাল জলপথ যা পাহাড়ের দুর্গম এলাকাগুলোর সাথে সমতলের সংযোগ রক্ষা করে ব্যবসার খরচ কমিয়ে দিচ্ছে বহুলাংশে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন খাতকে আমরা বলি ‘ইনভিজিবল এক্সপোর্ট’। ইনভিজিবল এক্সপোর্ট বা অদৃশ্য রফতানি হলো অর্থনীতির এমন এক চমৎকার ধারণা, যেখানে কোনো পণ্য দৃশ্যত দেশের সীমান্ত পার হয়ে বিদেশে যায় না, অথচ সেই পণ্যের মাধ্যমে দেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। সাধারণত আমরা রফতানি বলতে বুঝি, জাহাজ বোঝাই করে তৈরী পোশাক বা মাছ বিদেশে পাঠানো; কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন খাতে ঘটে এক উল্টো ঘটনা- এখানে পণ্য ক্রেতার কাছে যায় না; বরং ক্রেতা (পর্যটক) নিজে পণ্যের (পাহাড়ের সৌন্দর্য ও সেবা) কাছে চলে আসে। এটি হলো দেশের মাটি ও মানুষের সেবা বিক্রি করে বিদেশের টাকা আয় করার এক কৌশলী পদ্ধতি, যেখানে সীমানার কাঁটাতার কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।

সাজেক ভ্যালি কিংবা বগা লেকে যখন হাজারো পর্যটক ছুটে আসেন, তখন সেখানে স্থানীয় অর্থনীতির যে চাকা ঘোরে, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান কি আমাদের কাছে আছে? এই পর্যটন কেবল হোটেল-রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের পকেট ভরছে না; বরং এটি প্রান্তিক স্থানীয় পরিবারগুলোর জন্য বিকল্প আয়ের রাস্তা খুলে দিয়েছে। পাহাড়ি তাঁতশিল্পের কাপড়, বাঁশ আর বেতের তৈরি শৌখিন আসবাবপত্র এখন শহরের ড্রয়িংরুমের শোভা বাড়াচ্ছে। পর্যটনে যে বিশাল পরিবহনব্যবস্থা আর গাইড সার্ভিস তৈরি হয়েছে, তা পাহাড়ের বেকার যুবকদের রাজপথের উত্তাপ থেকে সরিয়ে সৃজনশীল কর্মসংস্থানে ব্যস্ত রাখছে। তবে একজন পরিবেশবাদী লেখক হিসেবে আমার মনে একটা খুঁতখুঁতানি থেকেই যায়; পর্যটনের এ প্লাবনে যেন পাহাড়ের অকৃত্রিম সৌন্দর্য আর সংস্কৃতি হারিয়ে না যায়। পাহাড়ের অর্থনীতি যদি পাহাড়ের মানুষকে পাশ কাটিয়ে চলে, তবে সেই উন্নয়ন টেকসই হবে না। আমাদের দরকার ‘কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম’ যেখানে ডলার আর টাকার ভাগ স্থানীয় মানুষগুলোও সমভাবে পাবে।

পাহাড়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষ করে থানচি-আলীকদম সড়ক কিংবা রুমা-বান্দরবান সংযোগ সড়কগুলো আমাদের জন্য এক অভাবনীয় সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। যে পাহাড়ি লেবু বা আদা আগে পরিবহনের অভাবে পাহাড়ের ঢালে পচে যেত, তা এখন ট্রাক ভরে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঢাকার কাওরান বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে। এ সংযোগে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমছে আর কৃষকের পকেটে সরাসরি টাকা যাচ্ছে। এই সড়কগুলো ভবিষ্যতে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত আর মিয়ানমারের সাথে আঞ্চলিক বাণিজ্যের মূল করিডোর হয়ে উঠতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরের এ পশ্চাৎভূমি বা ‘হিন্টারল্যান্ড’ হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের যে কৌশলগত গুরুত্ব, তা আমাদের নীল অর্থনীতির সাথে পাহাড়ের সবুজ অর্থনীতিকে এক সুতোয় গেঁথে দিচ্ছে। পাহাড়ি জনপদ যদি শক্তিশালী না হয়, তবে আমাদের কানেক্টিভিটি হাব হওয়ার স্বপ্ন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

রাবার আর সেগুন কাঠের যে বিশাল বাগানগুলো আমরা পাহাড়জুড়ে দেখি, সেগুলো আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে কাঁচামাল সরবরাহের এক প্রধান উৎস। যদিও রাবার চাষ নিয়ে পরিবেশগত কিছু বিতর্ক আছে, তবু আমাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদার বেশির ভাগ আজ পাহাড় থেকে আসছে। জুতাশিল্প থেকে শুরু করে গাড়ির টায়ার- সবখানে পাহাড়ের ঘাম আর নির্যাস মিশে আছে। পাহাড়ের কাঠ দিয়ে তৈরি ফার্নিচার-শিল্প আজ বিশ্বের দরবারে প্রশংসিত হচ্ছে। কিন্তু আমরা মনে করি, পাহাড়ের আসল সম্পদ এর জৈববৈচিত্র্য। বনজসম্পদ উজাড় না করে যদি ভেষজ ওষুধ বা হার্বাল মেডিসিনের দিকে মনোযোগ দিই, তবে পাহাড় হতে পারে বিশ্বের অন্যতম ‘ফার্মাসিউটিক্যাল হাব’। পাহাড়ের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে বিরল সব গাছপালা, যা দিয়ে হাজার কোটি টাকার জীবনদায়ী ওষুধ তৈরি সম্ভব। পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলো ভূ-রাজনীতি আর ভূমি-বিরোধ। বাস্তবতা হলো- জমির মালিকানা নিশ্চিত না হলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আসে না। পাহাড়ের ভূমি সমস্যা সমাধান করা গেলে সেখানে বড় বড় কৃষি-প্রসেসিং জোন গড়ে তোলা সম্ভব।

স্থানীয় বাঙালি ও ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে যে আস্থার সঙ্কট, তা দূর করতে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির বিকল্প নেই। পাহাড়ের মানুষ যখন দেখবেন যে উন্নয়নের ফল তাদের ঘরেও পৌঁছাচ্ছে, তখন বিবাদের জায়গা দখল করবে সমৃদ্ধি। পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর থেকে পাহাড়ে যে স্থিতিশীলতা এসেছে, তার সুফল আমরা আজ ভোগ করছি। কিন্তু এই স্থিতিশীলতাকে আরো টেকসই করতে হলে আমাদের পাহাড়ের মানুষের শিক্ষা আর কারিগরি দক্ষতায় আরো বিনিয়োগ করতে হবে। তারা যদি শুধু অদক্ষ শ্রমিক হয়ে থাকেন, তবে উন্নয়নের সুফল অন্যরা লুটে নিয়ে যাবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম আমাদের দেশের ফুসফুস। এ বিশাল বনভূমি আমাদের কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখছে। এই ইকোসিস্টেম সার্ভিস বা পরিবেশগত সেবা যদি আমরা টাকায় রূপান্তর করি, তবে তার অঙ্ক হবে আকাশচুম্বী। তাই পাহাড়ের অর্থনীতি নিয়ে ভাবার সময় আমাদের ‘গ্রিন অ্যাকাউন্টিং’ বা সবুজ হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। পাহাড়ের গাছ কেটে দালান তুলে যে জিডিপি বাড়ছে, তার চেয়ে পাহাড় বাঁচিয়ে রেখে যে টেকসই জীবন পাওয়া যাচ্ছে, তার মূল্য অনেক বেশি। পাহাড়ের ঝরনা যদি শুকিয়ে যায়, তবে আমাদের কাপ্তাই হ্রদও একদিন মরে যাবে, যার প্রভাব পড়বে পুরো দেশের বিদ্যুৎ আর মৎস্য খাতে। তাই পাহাড়ের উন্নয়ন হতে হবে পাহাড়ের প্রকৃতিকে সাথে নিয়ে।

পরিশেষে বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির কোনো পেরিফেরি বা প্রান্তিক অঞ্চল নয়; এটি উন্নয়নের এক অপ্রতিরোধ্য পাওয়ার হাউজ। পাহাড়ের অর্থনীতি কোনো দয়ার দান নয়; বরং এটি এক অধিকারের গল্প। তাই পাহাড় নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা হতে হবে আরো গভীর, আরো মমতাময়ী এবং আরো বেশি বিজ্ঞানসম্মত। পাহাড় হাসলে হাসবে বাংলাদেশ। পাহাড় সমৃদ্ধ হলে আমাদের স্বাধীনতার অর্থনৈতিক লক্ষ্যগুলো পূর্ণতা পাবে। এই পাহাড়ি জনপদকে আগলে রাখা হোক আমাদের আগামীর উন্নয়ন দর্শনের মূল চালিকাশক্তি।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক ও সদস্য, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ