যে ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কার বাংলাদেশের দরকার
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা— উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য নিম্নোক্ত ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন—
আর্থিক খাত সংস্কার
ক. ব্যাংকিং খাত শক্তিশালীকরণ : খেলাপি ঋণ কমাতে কঠোর তদারকি ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি— বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণের (এনপিএল) হার ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বড় দুর্বলতা। এ জন্য ঋণ অনুমোদনে ঝুঁকি মূল্যায়ন (Risk Assessment) বাধ্যতামূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর করা, বড় ঋণগ্রহীতাদের তথ্য প্রকাশ ও ক্রেডিট ইনফরমেশন শেয়ারিং জোরদার, ঋণ পুনঃতফসিল নীতিতে কঠোরতা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রয়োগ, ঋণ আদায়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ও দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রভিশনিং ও ক্যাপিটাল পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সুশাসন নিশ্চিত করা— রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে প্রায়ই পরিচালনা পর্ষদে অদক্ষতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দুর্বল জবাবদিহিতার অভিযোগ থাকে। এ জন্য পরিচালনা পর্ষদে পেশাদার ও স্বতন্ত্র সদস্য নিয়োগ, কর্মক্ষমতার ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনা মূল্যায়ন, স্বচ্ছ অডিট ব্যবস্থা ও আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ, পরিচালনা ও মালিকানার পৃথকীকরণ, লোকসানি ব্যাংকের পুনর্গঠন বা একীভূতকরণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি স্বাধীনতা জোরদার করা— একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর নীতি স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে মুদ্রানীতিতে রাজনৈতিক চাপমুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ, গভর্নর ও নীতিনির্ধারকদের পেশাগত স্বায়ত্তশাসন, ব্যাংক তদারকি ও নিয়ন্ত্রণে কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ, মুদ্রানীতি প্রণয়নে তথ্যভিত্তিক ও স্বচ্ছ যোগাযোগ কৌশল, আর্থিক খাতে জবাবদিহিতা ও নিয়মিত স্ট্রেস টেস্ট প্রকাশ।
খ. পুঁজিবাজার উন্নয়ন : বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি— পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দক্ষতা ও স্বাধীনতা অপরিহার্য। এর জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা, বাজার কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং ও তথ্য গোপনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, ডিজিটাল নজরদারি ও রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থা উন্নত করা, তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন ও করপোরেট গভর্ন্যান্স মানদণ্ড কঠোরভাবে প্রয়োগ, বিনিয়োগকারী শিক্ষার বিস্তার ও সচেতনতা বৃদ্ধি।
দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণ— বাংলাদেশে বন্ড মার্কেট এখনো সীমিত ও অপরিণত। অথচ অবকাঠামো ও শিল্পায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের বড় উৎস হতে পারে বন্ড বাজার। এ জন্য সরকারি ট্রেজারি বন্ডের বাজার গভীর ও সক্রিয় করা, করপোরেট বন্ড ইস্যু সহজ ও প্রণোদনামূলক করা, ক্রেডিট রেটিং ব্যবস্থার মান উন্নয়ন, পেনশন ফান্ড, বীমা কোম্পানি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, ইসলামিক ফাইন্যান্সভিত্তিক সুকুক বন্ড সম্প্রসারণ।
রাজস্ব ও কর ব্যবস্থা সংস্কার
করজাল সম্প্রসারণ— বাংলাদেশে সম্ভাব্য করদাতার তুলনায় করদাতার সংখ্যা কম। এ জন্য টিআইএন নিবন্ধন বাধ্যতামূলক ও সহজীকরণ, অনানুষ্ঠানিক খাতকে ধাপে ধাপে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় আনা, সম্পদ, ভূমি ও ডিজিটাল লেনদেনের তথ্যভাণ্ডার সমন্বয়, স্থানীয় সরকার পর্যায়ে কর প্রশাসন সক্রিয়করণ করজাল বাড়লে করহার না বাড়িয়েও রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব হবে।
কর ফাঁকি রোধে ডিজিটাল ট্র্যাকিং— ডিজিটাল প্রযুক্তি কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন— ই-ফাইলিং ও ই-পেমেন্ট বাধ্যতামূলক করা, ভ্যাট ব্যবস্থায় ইএফডি (Electronic Fiscal Device) সম্প্রসারণ, ব্যাংক লেনদেন ও জাতীয় পরিচয়পত্র ডাটাবেসের সাথে কর তথ্য সংযুক্তকরণ, ডাটা অ্যানালিটিক্সের মাধ্যমে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তকরণ, এতে কর ফাঁকি ও রাজস্ব ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
সরাসরি করের অংশ বৃদ্ধি— বর্তমানে রাজস্ব আয়ের বড় অংশ আসে ভ্যাট ও শুল্কের মতো পরোক্ষ কর থেকে, যা তুলনামূলকভাবে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর বেশি চাপ সৃষ্টি করে। তাই আয়কর কাঠামো প্রগতিশীল করা, সম্পদ কর ও ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স কার্যকর করা, উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের কর— নিবন্ধন ও রিটার্ন নিশ্চিত করা, সরাসরি কর বাড়ালে আয় বৈষম্য কমাতে সহায়ক হবে।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আধুনিকায়ন— কর প্রশাসনের দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অপরিহার্য। এ জন্য সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ও ডিজিটাল ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, কর্মকর্তাদের পেশাগত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন, দুর্নীতি প্রতিরোধে অভ্যন্তরীণ অডিট ও জবাবদিহিতা, নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে পৃথক কাঠামো।
রফতানি ও শিল্প বৈচিত্র্য : আইটি, ফার্মাসিউটিক্যালস ও কৃষি-প্রক্রিয়াজাত পণ্য খাতে প্রণোদনা : আইটি ও ডিজিটাল সেবা খাত— সফটওয়্যার রফতানিতে কর প্রণোদনা ও স্টার্টআপ ফান্ড, হাই-টেক পার্ক ও আইটি প্রশিক্ষণ অবকাঠামো সম্প্রসারণ, বৈদেশিক বাজারে ব্র্যান্ডিং ও বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার।
ফার্মাসিউটিক্যালস খাত— আন্তর্জাতিক মান (WHO-GMP, USFDA) অর্জনে সহায়তা, গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) তহবিল গঠন, পেটেন্ট ও মেধাস্বত্ব সুরক্ষা শক্তিশালী করা কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্প— কোল্ড স্টোরেজ ও লজিস্টিক অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপদ খাদ্যমান নিশ্চিতকরণ, গ্রামীণ শিল্পায়নের সাথে রফতানি সংযোগ তৈরি।
এসএমই উন্নয়ন— ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) দেশের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির প্রধান চালিকাশক্তি। এ জন্য স্বল্পসুদে ঋণ ও সহজ অর্থায়ন, প্রযুক্তি আপগ্রেডেশন ও দক্ষতা উন্নয়ন, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, রফতানিমুখী ক্লাস্টার উন্নয়ন, এসএমই খাত শক্তিশালী হলে স্থানীয় শিল্পভিত্তি প্রসার হবে এবং রফতানি ঝুঁকি কমবে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল কার্যকর বাস্তবায়ন— বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল শিল্পায়ন ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ জন্য জমি অধিগ্রহণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন দ্রুত সম্পন্ন করা, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস নিশ্চিত করা, স্থিতিশীল নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সুরক্ষা, রফতানিমুখী ও উচ্চমূল্য সংযোজন শিল্পে অগ্রাধিকার।
কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ উন্নয়ন : কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষায় বিনিয়োগ— বর্তমানে সাধারণ শিক্ষার তুলনায় কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষায় অংশগ্রহণ কম। অথচ শিল্পায়ন ও আধুনিক অর্থনীতির জন্য দক্ষ টেকনিশিয়ান ও মিড-লেভেল স্কিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য টিভেট (TVET) প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ ও আধুনিক ল্যাব স্থাপন, শিল্প-প্রতিষ্ঠানের সাথে কারিকুলাম সমন্বয়, প্রশিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন, জেলা পর্যায়ে পলিটেকনিক ও টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার বৃদ্ধি, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে বিশেষ প্রণোদনা।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব উপযোগী দক্ষতা উন্নয়ন— বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে। তাই কোডিং, ডাটা অ্যানালিটিক্স, সাইবার সিকিউরিটি, রোবোটিক্সে প্রশিক্ষণ, বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবন তহবিল, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম ও ইনোভেশন হাব গড়ে তোলা, সরকারি সেবায় ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব।
প্রবাসী শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মী পাঠানো— বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় উৎস প্রবাসী আয়-রেমিট্যান্স। কিন্তু অধিকাংশ শ্রমিক অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ। এ জন্য বিদেশগামী কর্মীদের ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা, নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানে কূটনৈতিক উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা, প্রবাসীদের জন্য আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা জোরদার, দক্ষ কর্মী প্রেরণ করলে আয় বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের মানবসম্পদের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বাড়বে।
ভর্তুকি ও সামাজিক সুরক্ষা সংস্কার : অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি ধাপে ধাপে কমানো— বর্তমানে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও কিছু কৃষি খাতে উচ্চ ভর্তুকি দেয়া হয়। কিন্তু সব ভর্তুকি সমানভাবে কার্যকর নয়। এ জন্য সর্বজনীন ভর্তুকির পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি চালু করা, উচ্চ আয়ের গোষ্ঠীর জন্য ভর্তুকি সীমিত করা, জ্বালানি খাতে দক্ষতা ও অপচয় কমিয়ে ভর্তুকির চাপ হ্রাস, ভর্তুকির কার্যকারিতা মূল্যায়নে নিয়মিত অডিট, ধাপে ধাপে সংস্কার করলে বাজেট ঘাটতি কমবে এবং উন্নয়ন খাতে বেশি বিনিয়োগ সম্ভব হবে। দরিদ্রবান্ধব টার্গেটেড সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি— সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রকৃত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী।
এ জন্য জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কৌশল কার্যকর বাস্তবায়ন, একক উপকারভোগী ডাটাবেস তৈরি , প্রবীণ, প্রতিবন্ধী, বিধবা ও হতদরিদ্রদের অগ্রাধিকার, কর্মসংস্থান-ভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, এতে সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার হবে এবং বৈষম্য হ্রাস পাবে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভাতা বিতরণে স্বচ্ছতা— ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করলে দুর্নীতি ও ফাঁকফোকর কমানো সম্ভব। এ জন্য মোবাইল ব্যাংকিং ও সরাসরি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ভাতা প্রদান, জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সাথে উপকারভোগী তালিকা সংযুক্তকরণ, রিয়েল-টাইম মনিটরিং ও অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক নিরীক্ষা, ডিজিটাল স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে ভাতা সরাসরি উপকারভোগীর হাতে পৌঁছাবে এবং মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা কমবে।
জ্বালানি ও অবকাঠামো সংস্কার : আমদানিনির্ভর জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ধীরে ধীরে রূপান্তর— বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ আমদানিকৃত জ্বালানি (এলএনজি, তেল, কয়লা)-নির্ভর। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও মূল্য অস্থিরতা তৈরি হয়। এ জন্য সৌর ও বায়ু শক্তিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ছাদভিত্তিক সোলার বাধ্যতামূলক নীতি, শিল্প খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার প্রণোদনা, গ্রিড আধুনিকায়ন ও স্মার্ট মিটারিং, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি মিশ্রণ পরিকল্পনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ধাপে ধাপে রূপান্তর করলে জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত হবে।
বিদ্যুৎ খাতে চুক্তির স্বচ্ছতা বৃদ্ধি— বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্রয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি অনেক সময় উচ্চ ব্যয় ও দায় সৃষ্টি করে। এ জন্য সব বড় বিদ্যুৎ চুক্তি সংসদীয় ও জনসম্মুখে পর্যালোচনার আওতায় আনা, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র বাধ্যতামূলক করা, সক্ষমতা চার্জ কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন, স্বাধীন নিরীক্ষা ও বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করলে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক চাপ কমবে।
পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPR) কার্যকর বাস্তবায়ন : অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারি অর্থায়ন সীমিত হওয়ায় PPP একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। এ জন্য সুস্পষ্ট ঝুঁকি বণ্টন বিনিয়োগ সুরক্ষা ও নীতির ধারাবাহিকতা, প্রকল্প মূল্যায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, দক্ষ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ইউনিট গঠন, কার্যকর PPP বাস্তবায়ন হলে সড়ক, বন্দর, রেল ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নে গতি আসবে।
সুশাসন ও দুর্নীতি দমন : সরকারি বাজেট ও উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াতে উন্মুক্ত বাজেট প্রক্রিয়া, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বাধীন নিরীক্ষা ও তৃতীয় পক্ষ মূল্যায়ন, ই-প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ, সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে ব্যয় তদারকি জোরদার, ফলাফল-ভিত্তিক বাজেটিং চালু, এতে অপচয় কমবে এবং উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা বাড়বে।
ই-গভর্ন্যান্স সম্প্রসারণ— ডিজিটাল সেবা দুর্নীতি কমানো ও দক্ষতা বৃদ্ধির অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। এ জন্য সব সরকারি সেবা ধাপে ধাপে অনলাইনে রূপান্তর, নাগরিক সেবাকেন্দ্রে একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সরকারি ডাটাবেস সমন্বয় ও তথ্য নিরাপত্তা জোরদার, ডিজিটাল পরিচয় (এনআইডি) ভিত্তিক সেবা নিশ্চিত করা, ডিজিটাল রূপান্তর প্রশাসনে স্বচ্ছতা, দ্রুততা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।
নীতি-নির্ধারণে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ— কার্যকর নীতি প্রণয়নে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও বিশ্লেষণ অপরিহার্য। এ জন্য জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি, ডাটা অ্যানালিটিক্স ও গবেষণা ইউনিট গঠন, নীতি প্রণয়নের আগে প্রভাব মূল্যায়ন, উন্মুক্ত তথ্যভাণ্ডার চালু, তথ্যভিত্তিক নীতি গ্রহণ করলে ভুল সিদ্ধান্ত ও সম্পদ অপচয় কমবে।
বৈদেশিক নীতি ও বাণিজ্য কৌশল : আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ— বাংলাদেশের জন্য আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য সার্ক কাঠামোর মধ্যে বাণিজ্য সহযোগিতা পুনরুজ্জীবিত করা, বিমসটেকের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরীয় অর্থনৈতিক সংযোগ জোরদার, আসিয়ান দেশগুলোর সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সম্ভাবনা যাচাই, সীমান্ত অবকাঠামো ও বন্দর সংযোগ উন্নয়ন, আঞ্চলিক বাণিজ্যে সক্রিয় অংশগ্রহণ করলে রফতানি বাজার সম্প্রসারণ ও সরবরাহ শৃঙ্খল বৈচিত্র্য সম্ভব হবে।
এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী রফতানি প্রস্তুতি— বাংলাদেশ জাতিসঙ্ঘের তালিকা অনুযায়ী এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে। উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা ধীরে ধীরে কমবে, প্রতিযোগিতা বাড়বে, মেধাস্বত্ব ও বাণিজ্য মানদণ্ড কঠোর হবে।
তাই প্রয়োজন উচ্চমূল্য সংযোজন শিল্পে বিনিয়োগ, রফতানি পণ্যের মান ও সার্টিফিকেশন উন্নয়ন, দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন,বাণিজ্য কূটনীতি শক্তিশালী করা। এতে উত্তরণ-পরবর্তী ধাক্কা মোকাবেলা সহজ হবে।
বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা— উন্নয়ন প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও অতিরিক্ত ঋণ অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ জন্য ঋণ জিডিপি অনুপাত ও ঋণ পরিষেবা সক্ষমতা নিয়মিত মূল্যায়ন, স্বল্পসুদ ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ অগ্রাধিকার, প্রকল্পের অর্থনৈতিক লাভজনকতা যাচাই, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা, সতর্ক ঋণ ব্যবস্থাপনা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন সংগঠিত, কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার— শুধু সাময়িক স্থিতিশীলতা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা গড়ে তোলা।
লেখক : সিনিয়র ফেলো, এসআইপিজি, নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটি



