বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম ভোট কোন দিকে

এবারের মুসলিম ভোট কোনো দলের একচেটিয়া নয়। তার ওপর তৃণমূলের সাসপেন্ডেড বিধায়ক মুর্শিদাবাদের আম-জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির এবং ভারতের বাগ্মীপ্রবর সংসদ সদস্য আইমিমের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আসাদুদ্দিন ওয়েসির জোট মমতাকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। হুমায়ুন নিজে মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে জিতলেও এই দুই দলের জোট যে ভোটটা কাটবে তা কিন্তু তৃণমূলকে ভরাডুবি করবে। তাই মুসলিম ভোট এবারের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে একচেটিয়া সম্পদ নয়।

ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার গত ১৫ মার্চ বিকেলে দিল্লি থেকে ভারতের পাঁচ রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচনের দিন ঘোষণা করেছেন। রাজ্যগুলো হলো— পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, আসাম, তামিলনাড়ু ও পদুচেরি। প্রথম চারটি রাজ্য রাজ্যপাল শাসিত প্রদেশ বা অঙ্গরাজ্য। শেষের পদুচেরি হলো কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। কিন্তু এই পাঁচ রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচন। কেননা এ রাজ্যের সংখ্যালঘু মুসলিম ভোট একটা ম্যাজিক ফিগার। শুধু ম্যাজিক ফিগারই নয়, মোট কথা ডিসাইডিং ফ্যাক্টর।

যদিও এ রাজ্যের মুসলিম ভোট লিখিতভাবে সরকারি হিসাবে দেখানো হয় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। কিন্তু বেসরকারি হিসাবে সেটা ৩৫ শতাংশ বলে মনে করছেন বাঘা বাঘা সমীক্ষকরা। এমনকি রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণাও এটি। এই ভোটটা যেদিকে একচেটিয়া যাবে, পশ্চিমবঙ্গের তখত-উ-তাউস বা সিংহাসন তাদের দখলেই যাবে।

২০১১ সাল থেকে এই মুসলিম ভোটের প্রায় পুরোটাই মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল দলের দিকে একচেটিয়া চলে গিয়েছিল। ফলে মমতা ব্যানার্জির ক্ষমতা ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। শুধু ২০১১ সাল থেকেই বা বলব কেন, এই ভোট বামফ্রন্ট যে হারাচ্ছে আর তৃণমূলের দিকে চলে যাচ্ছে তা বোঝা গিয়েছিল ২০০৮ সালের পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত নির্বাচন (স্থানীয় সরকার প্রশাসন), ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলন, কলকাতার পার্কসার্কাস এলাকার তিলজলা লেনের কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার রিজওয়ানুর রহমানের রহস্যমৃত্যু, আর সর্বোপরি সাচার কমিটির রিপোর্টে পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম আর্থিক করুণ অবস্থা ও চাকরি-বাকরিতে মুসলিমদের বেহাল অবস্থা মুসলিম ভোটকে বাম-বিমুখ করে তৃণমূলমুখী করেছে। কিন্তু এখন কি সেই সংখ্যালঘু মুসলিম ভোট তৃণমূলের আছে? একটু ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে।

আমাদের স্মরণ থাকতে পারে ১৯৭৭ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সাতবার সিপিআই(এম) নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকারকে ভোট দিয়েছিল সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়, আদিবাসী, দলিত, তফসিলি জাতি ও উপজাতি সম্প্রদায় এবং মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়। শিল্প ও কলকারখানা করার নামে জমি অধিগ্রহণে জমি হারানোর আতঙ্ক বিশেষ করে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম, সাচার কমিটির রিপোর্টে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতে মুসলিমদের করুণ চিত্র, কলকাতার পার্কসার্কাস এলাকার তিলজলা লেনের কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার রিজওয়ানুর রহমানের রহস্যমৃত্যু মুসলিম-আদিবাসী-দলিত- তফসিলি জাতি-উপজাতিসহ প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভোট একেবারে বামফ্রন্ট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। বামফ্রন্টের মূল স্লোগান, ‘কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ’ জনমনে গ্রহণযোগ্য হতে পারেনি। স্বাভাবিক কারণে মানুষ বামফ্রন্টের বিকল্প হিসেবে তৃণমূলকেই বেছে নেয়। বিশেষ করে ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোট একটা ম্যাজিক ফিগারে পরিণত হয়। এই ম্যাজিক ভোট ব্যাংকটা তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জির কাছে কার্যত তুরুপের তাসে পরিণত হয়েছিল। তারপরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট বিজেপিকে তৃণমূল ডেকে নিয়ে আসার ফল হলো ভয়াবহ। ২০১১ সালে ক্ষমতা খুইয়েও বামফ্রন্টের ভোট ছিল ৪৩ শতাংশ। ক্রমশ বামভোট রামে গিয়ে তা বামদের পক্ষে থাকল আর মাত্র ৫ শতাংশ। শিয়রে বিজেপি। এই আতঙ্কে মুসলিম ভোট পুরোপুরি তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জির দিকে ঢলেছিল কেবল বিজেপিকে আটকানোর জন্য।

২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মুসলিমরা কেবল বিজেপিকে আটকাতে তৃণমূলকে অন্ধের মতো ভোট দিয়েছে। কিন্তু তৃণমূল ক্ষমতায় এলে আমরা কী দেখলাম? ২০১১ সালের মে মাসে রাজভবনে মমতা ব্যানার্জি ও তার মন্ত্রিসভা শপথ নেয়ার পর নব-মন্ত্রিসভার একটা ছোট সভা হয়েছিল রাইটার্স বিল্ডিংয়ে। বৈঠক শেষে সে সময় মন্ত্রিসভার সেকেন্ড ইন কমান্ড পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, উন্নয়ন হিসেবে আমরা তিনটি ক্ষেত্রকে গুরুত্ব দেবো। মুসলিমদের উন্নয়নের বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে। যার নেতৃত্বে সাচার কমিটি তৈরি হয়েছে সেই বিচারপতি রাজেন্দ্র সিং সাচারকে নিয়ে এসে তার পরামর্শেই একটি রোডম্যাপ করা হবে। এই রোডম্যাপ অনুসারে সাচার কমিটির সুপারিশ কার্যকর করব। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল বিচারপতি রাজেন্দ্র সিং দু’-দুবার কলকাতায় এসে ফিরে গেলেন। কিন্তু তিনি মমতা ব্যানার্জির কোনো সহযোগিতা পাননি। সাচার কমিটির সুপারিশ কার্যকর করা তো দূরের কথা, মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ভেবে নিলেন, মুসলিম উন্নয়ন মানেই কলকাতার রেড রোডে খিলাফত কমিটি আয়োজিত ঈদের নামাজে ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সাথে নিয়ে গিয়ে ভোট ব্যাংক তৈরি করা ও গলাফাটানো, মুসলিম উন্নয়ন মানেই কলকাতার পার্কসার্কাস ময়দানে রমজান মাসে ইফতার পার্টি করা, মুসলিম উন্নয়ন মানে কিছু আরবি শব্দ উচ্চারণ করে তাদের ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে ভোটব্যাংককে কাজে লাগিয়ে নেয়া। মমতা ব্যানার্জি ভেবেই ফেললেন, পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের তিনিই একমাত্র মসিহা। কিন্তু বাস্তবে তার এই মানসিকতাই বিজেপির হাতে অস্ত্র তুলে দিতে সহায়কের কাজ করেছে।

বাম জমানায় ২০০৫ সালের নভেম্বর মাসে সাচার রিপোর্ট বের হওয়ার পরপরই আরো একটি রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছিল। সেটি হলো বিচারপতি রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশনের রিপোর্ট। তাতে মুসলিমরা ১০ শতাংশ চাকরির সুবিধাতে ছিল। কিন্তু ২০১১ সালের পর সেই সুযোগটাও কার্যত হাতছাড়া হলো বিজেপিকে মামলা করার সুযোগ করে দিয়ে। একেবারে আইনি জটিলতা এমনভাবে তৈরি হলো যেখানে তৃণমূল সরকার ভালো আইনজীবীকে দিয়ে আদালতে মুভ করতেও ব্যর্থ। ভারতের অন্যান্য রাজ্যে মুসলিমরা সেই সুযোগ পেয়েছে।

তারপরও ওয়াকফ সংশোধনী আইন কার্যকর নিয়ে মুর্শিদাবাদ ও মালদহে যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হলো মালদহ ও মুর্শিদাবাদে তার দায় একদিকে যেমন বিজেপির, অন্যদিকে সেই দায় তৃণমূল এড়াতে পারে কি? শাসক চাইলেই দাঙ্গা হবে। না হলে হবে না। জ্যোতি বসুর কথাটাই বাস্তবে রূপ পেয়ে গেল।

দাঙ্গায় নিরীহ হিন্দু-মুসলিমের প্রাণ গেছে। মমতা ব্যানার্জি ওই বছর ৬ মে বললেন, ওয়াকফ নিয়ে কিছু করতে গেলে দিল্লিতে গিয়ে করুন। পশ্চিমবঙ্গে কিছু করলে আমিই হবো আপনাদের শত্রু। মমতা ব্যানার্জির এই হুমকিও নিদান মুসলিমদের দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। মুসলিমরা এখন উপলব্ধি করছেন, মমতা ব্যানার্জি বিজেপির থেকেও বড়ুয়া বিজেপি। আর এস এসের থেকেও বড় আরএসএস। তার উপর মুসলিমদের মমতার প্রতি যে বিশ্বাস বা নির্ভরতা তা ভেঙে চুরমার। যখন মুসলিমরা দেখতে পান, মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কোষাগার থেকে ক্লাবগুলোকে পুজোর জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেন। সরকারি অর্থে দীঘাতে জগন্নাথ মন্দির তৈরি করেন। কলকাতার রাজারহাট নিউটাউনে দুর্গাঙ্গন বা শিলিগুড়িতে আইটি পার্কের জায়গা অধিগ্রহণ করে জয়কালী মন্দির তৈরির নিদান দেন। অন্যদিকে সরকারি মাদরাসার সংখ্যা একটাও বাড়েনি। মাদরাসা শিক্ষা করুণ জায়গায় অবস্থান করছে। আর এসব কারণে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম ভোট কি আর একচেটিয়া তৃণমূলের দিকে থাকবে?

আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে, ২০১১ সালে ক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ার পর বামফ্রন্টের ভোট ছিল ৪৩ শতাংশ। কিন্তু তৃণমূলের অফিস দখল ও অত্যাচার সিপিআই(এম) তথা বামফ্রন্টের বামভোট চলে যায় রামের দিকে। তখন মুসলিম ভোট রামকে ঠেকাতে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছে। আর তৃণমূল মুসলিমদের রক্তে রাঙানো বিজেপি নেতাকে নিজের দলে এনে তাকে উচ্চপদে বসিয়েছে। যেমন আসানসোলের বিজেপির এককালের সংসদ সদস্য বাবুল সুপ্রিয় তৃণমূলে শুধু আসেননি, তাকে কলকাতার বালিগঞ্জে জিতিয়ে মন্ত্রী পর্যন্ত করেছেন। সেই বাবুল সুপ্রিয় এখন তৃণমূলের রাজ্যসভার সংসদ সদস্য। পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের কাছে আরো প্রশ্ন, আজকে পশ্চিমবঙ্গের ওয়াকফ সম্পত্তি কাদের দখলে? কারা ভোগ করছেন? মালদহ-মুর্শিদাবাদ ও কলকাতার ওয়াকফ সম্পত্তি কারা দখল করেছে? জবাব একটাই যে, তা হলো রাজ্যটির শাসক দল।

তাই এবারের মুসলিম ভোট কোনো দলের একচেটিয়া নয়। তার ওপর তৃণমূলের সাসপেন্ডেড বিধায়ক মুর্শিদাবাদের আম-জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির এবং ভারতের বাগ্মীপ্রবর সংসদ সদস্য আইমিমের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আসাদুদ্দিন ওয়েসির জোট মমতাকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। হুমায়ুন নিজে মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে জিতলেও এই দুই দলের জোট যে ভোটটা কাটবে তা কিন্তু তৃণমূলকে ভরাডুবি করবে। তাই মুসলিম ভোট এবারের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে একচেটিয়া সম্পদ নয়।

লেখক : কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক