সমস্ত জল্পনা আর আশঙ্কাকে পেছনে ফেলে ২০২৬ সালের প্রতিশ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টামণ্ডলী এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকেই আন্তরিক অভিনন্দন। ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও বয়স নির্বিশেষে যারা এই নতুন যাত্রার মূল কারিগর অর্থাৎ— ভোটার, তাদেরকেও অভিনন্দন। নির্বাচনী লড়াইয়ে যারা জয়ী হয়েছেন, যারা জয়ী হতে পারেননি— তাদের সবাইকে অনাগত ভবিষ্যতের উষ্ণ শুভেচ্ছা। সর্বোপরি মহান আল্লাহর কাছে শোকরিয়া, নির্বিঘ্নে এই বিশাল কর্মকাণ্ডকে সফলতা দানের জন্য। বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীসহ সব বাহিনী এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের জন্য দেশবাসীর কতৃজ্ঞতাভাজন হয়েছেন নিঃসন্দেহে।
নির্বাচনে পেশিশক্তির প্রদর্শনী, অর্থের ছড়াছড়ি, প্রতারণামূলক প্রচারণা, বিরুদ্ধ প্রার্থীর চরিত্র হননের ঘটনা, প্রশাসন ও ক্ষেত্রবিশেষে নির্বাচন কমিশনের নির্লিপ্ততা সত্ত্বেও মোটামুটিভাবে একটি সফল নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে; নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এটি একটি মাইলফলক। জাতীয় ঐক্য, সংহতি ও একক জাতিসত্তা নির্মাণে জয়ী ও বিজিতদের সম্মিলিত চেষ্টার দিকে বিপুল প্রত্যাশায় তাকিয়ে গোটা জাতি। দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐকমত্য সৃষ্টির মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেয়ার যে সুযোগ এই নির্বাচনের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে; তার বাস্তব রূপ দেয়া এখন জাতীয় আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ ‘হ্যাঁ’ ভোটে বিজয়ী হওয়ার পর। জুলাই বিপ্লবের ফসল নতুন সরকার। ইতিহাস বদলে দেয়া এই বিপ্লবের চেতনার আলোকে রাষ্ট্রসংস্কারের গুরুদায়িত্ব স্বাভাবিকভাবেই বর্তেছে নতুন সরকারের ওপর।
নতুন সরকারের কাছে জাতির প্রত্যাশা হচ্ছে— সুশাসন ও আইনের প্রাধিকার। আইন চলবে তার নিজস্ব গতিতে। বিচার বিভাগ কাজ করবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে। সরকারের জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের বেপরোয়া আচরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সবচেয়ে জরুরি। এটি করতে না পারলে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা। পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের খুনি ও লুটেরাদের ত্বরান্বিত বিচারের প্রত্যাশায় জাতি। পতিত সরকারের অংশীজনদের রাজনীতিতে পুনর্বাসনের বার্তা শুনতে জাতি প্রস্তুত নয়। এর চাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ সরকারের সামনে রয়েছে। রমজানে বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণ, সিন্ডিকেট ভাঙা, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনা প্রাথমিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। প্রয়োজন দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগের সুস্থ পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে কর্মসংস্থান। লাখ লাখ বেকারের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে এ দায় থেকে মুক্ত হওয়া নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ। ফ্যামিলি কার্ড বা বেকার ভাতা দিয়ে অনুগৃহীত করা যায়— স্বাবলম্বী করা যায় না। স্বাবলম্বন অর্থনীতিতে সৃষ্টি করে প্রাণপ্রবাহ। জিডিপিকে অগ্রগামী করে। অনুগৃহীতরা অর্থনৈতিক দায়। দেশপ্রেম, নৈতিকতা, কর্মসৃজন সমন্বিত শিক্ষানীতির মাধ্যমে বেকার তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং ব্রেইন ড্রেন মনোভাবের পরিবর্তনের পদক্ষেপ দেশকে নতুন সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ করবে। সদিচ্ছা সহযোগিতা এবং দেশপ্রেমের আলোয় দেশের সামাজিক অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটিয়ে নতুন চেতনার আবেশে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নেয়ার উদাহরণ ৪০০ বছর ধরে শোষিত ও শাসিত উপনিবেশ বুরকিনা ফাঁসোর রাষ্ট্রপতি ইবরাহিম ট্রাওরে। বাংলাদেশ বর্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন যাত্রা শুরুর জন্য এ ধরনের নেতৃত্বের প্রত্যাশায়।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা ব্যবসায়-বান্ধব নীতির মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন ধারার সূচনা। শেয়ারবাজার সংস্কারের আলোয় গতিশীলতা ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায়। অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিতই শুধু নয়, টিকে থাকার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার গতি সঞ্চার সরকারের একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
মোট কথা, ব্যাপক সাংবিধানিক সংস্কারের প্রত্যাশায় ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে জাতির ম্যান্ডেট বাস্তবায়নের গুরুভার নতুন সরকার কিভাবে বাস্তবায়িত করবে, তা দেখার প্রত্যাশায় জাতি অধীর অপেক্ষমাণ। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জাতীয় অবস্থানকে পরিশীলিত ও দৃঢ়তার সাথে নতুন অবয়বে পরিচিত করার চ্যালেঞ্জ নতুন সরকারের ওপর স্বাভাবিকভাবেই এসে পড়েছে। সব মিলিয়ে নতুন সরকারের কাছে জাতীর প্রত্যাশা সীমাহীন। রাষ্ট্রীয় সীমিত সম্পদের সীমাবদ্ধতায় এ জন্য প্রয়োজন সরকার ও বিরোধী দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। সরকারের একক চেষ্টায় জাতির এই প্রত্যাশা বাস্তবায়ন অত্যন্ত দুরূহ।
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ



