রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভেতরে কাজ না করলে প্রচলিত ধারার রাজনীতির প্রকৃত চেহারা এবং এর গভীর ক্ষতচিহ্ন বোঝা প্রায় অসম্ভব। কর্মজীবনের একটি সময় প্রেষণে কর্মরত থাকাকালীন এমন এক অবস্থানে ছিলাম, যেখান থেকে ‘জনসেবার’ মুখোশে রাজনীতির অন্ধকার রূপটি দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। যা দেখেছি তা কেবল সাধারণ ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং এক ধরনের পদ্ধতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অন্তর্ঘাত।
শীর্ষ নেতারা যখন অন্য রাজনৈতিক দলের সাথে আদর্শিক বা কৌশলগত লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকে, তখন মাঠপর্যায়ে বা সংসদ সদস্যরা (এমপি) চলেন ব্যক্তিগত আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টায়। এখানে এমপিদের প্রধান লক্ষ্য প্রতিপক্ষ দল নয়, বরং নিজের দলের ভেতরকার সম্ভাব্য যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্মূল কিংবা দমিয়ে রাখা।
বিস্ময়ের সাথে দেখেছি, কিভাবে ব্যক্তিগত ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে বানোয়াট তথ্য (ফেব্রিকেটেড ইনফরমেশন) তৈরি করা হয়। সেই সাথে তা প্রয়োগ করে নিজ দলের মেধাবী ও সৎ নেতাদের সামনে এগোনোর পথ রুদ্ধ করা হয়। এসব লোক কূটকৌশলে নিশ্চিত করেন, যেন কোনো ‘যোগ্য’ বা ‘পেশাদার’ ব্যক্তি রাজনীতির মূল স্রোতে আসতে না পারেন। তারা জানেন, যদি কোনো মেধাবী ব্যক্তি একবার নেতৃত্বে চলে আসেন, তবে তাদের এই সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো হুরমুড় করে ভেঙে পড়বে। এটি মূলত এক ধরনের ‘মেধাশূন্য করার রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া’, যেখানে হীনম্মন্যতায় ভোগা একদল ব্যক্তি মেধার কণ্ঠরোধ করতে চান।
ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি এবং ‘ক্ষুধার্ত পশু’র মনস্তত্ত্ব
সাম্প্রতিক সময়ে কিছু লোকের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করলে ‘ক্ষুধার্ত পশু’র উপমাটি আজ আর কেবল রূপকার্থে মনে হয় না। এই সর্বগ্রাসী লালসার পেছনে একটি গভীর ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সৃষ্ট ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরসহ বিভিন্ন সময়ে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ আমাদের জাতির অবচেতন মনে এক অভাবনীয় ক্ষুধা ও চরম নিরাপত্তাহীনতা গেঁথে দিয়েছে। যুগ যুগান্তরের অভাব আমাদের মজ্জাগত হয়ে ওই সব ব্যক্তির অন্তরে এমন এক তাড়না ঢুকিয়ে দিয়েছে; যা ‘হাপুস-হুপুস’ করে চেটেপুটে খাওয়ার বাজে অভ্যাস গড়ে তুলেছে।
দুর্ভাগ্যবশত, আজকের অনেক রাজনীতিবিদের মধ্যেও সেই আদিম আচরণের প্রতিফলন দেখা যায়। গ্রামীণ প্রবাদে যেমন বলা হয়, ‘ক্ষুধার্ত শিশুটি যেমন বাটির সবটুকু খিচুড়ি হাপুস-হুপুস করে খেয়ে ফেলে’, আমাদের দেশের অনেক রাজনীতিবিদও ঠিক সেভাবে রাষ্ট্রের শেষ সম্পদটুকু গোগ্রাসে গেলার চেষ্টা করেন। তারা এমন বেপরোয়া লুটতরাজ করেন, যেন বহু বছরের অভুক্ত। এখনই সব শেষ হয়ে যাবে। যেহেতু তাদের অনেকের কোনো পেশাদার ভিত্তি নেই, কারিগরি জ্ঞান বা বৈধ আয়ের উৎস নেই, তাই তাদের কাছে রাজনীতি বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় বা জীবিকা হয়ে উঠেছে। তাদের কাছে ক্ষমতা হারানো মানে আক্ষরিক অর্থে আর্থ-সামাজিকভাবে অসহায় হয়ে পড়া। এই মনস্তত্ত্ব তাদের দুর্নীতিকে দানবীয় ও অমানবিক রূপ দিয়েছে।
সুবিধাবাদী সংস্কৃতি এবং বুদ্ধিজীবীদের নীরবতা
এ দেশের রাজনীতিতে বর্তমানে প্রকট ‘সুবিধাবাদী’ (অপোরচুনিস্ট) এক সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে। এর কারণে সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চা আজ মৃতপ্রায়। মহান দার্শনিক সক্রেটিস বলেছিলেন, ‘সততাই একমাত্র সহজ সরল পথ, বাকি সব গোলকধাঁধা’। অথচ আমাদের সমাজের কথিত বুদ্ধিজীবীরা আজ সেই সহজ-সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছেন।
একজন প্রকৃত বুদ্ধিজীবী কখনো নিজের সুবিধার জন্য সত্য গোপন করতে পারেন না। বুদ্ধিজীবীর কাজ হলো সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরা এবং পরিবর্তনের পক্ষে উচ্চকণ্ঠ হওয়া। কিন্তু আমাদের বর্তমান বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা অত্যন্ত হতাশাজনক। আমরা দেখছি যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রোভিসি, যারা একটি জাতির সবচেয়ে মেধাবী এবং নৈতিক অভিভাবক হওয়ার কথা, তারাও আজ সত্য বলতে ভয় পান। পদ-পদবি আর ব্যক্তিগত সুবিধার মোহে ক্ষমতার কাছে এমনভাবে নতজানু হয়ে থাকেন, তাদের মেরুদণ্ড খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। যখন শীর্ষ মেধাবীরা এভাবে নীরব থাকেন, তখন পুরো সমাজ সৃজনশীলতা ও মননশীলতা থেকে দ্রুত পতনের দিকে ধাবিত হয়। আমরা আজ এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছি যেখানে চিন্তার স্বাধীনতা মাফিয়াচক্রের পদপিষ্টে ক্ষতবিক্ষত।
দুর্নীতির মাকড়সার জাল : প্রশাসন থেকে দুদক
দেশে দুর্নীতির কাঠামোটি আজ এমন এক মাকড়সার জাল বিস্তার করেছে, যেখানে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সবাই এর অংশীদার। আমলারাও এমন একটি ব্যবস্থায় জড়িয়ে পড়েছেন; যেখানে দুর্নীতি যেন পদোন্নতি বা টিকে থাকার অলিখিত শর্ত। যখন রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তিভূমি তৈরি হয় কালো টাকায়, তখন সেই কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়া অলীক কল্পনা মাত্র। রাজনীতি আজ তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত শুধু অর্থ উপার্জনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। কিভাবে একজন রাজনীতিবিদ দুর্নীতিমুক্ত হবেন, যখন তাকে দল পরিচালনা করতে হয় কালো টাকা আর পেশিশক্তির জোরে? এই পচনশীল কাঠামো আমাদের জাতীয় চরিত্রকেও কলুষিত করছে। বিশেষ করে, দুর্নীতি দমন কমিশন অনেক ক্ষেত্রে নিজে তৃণমূলে দুর্নীতিগ্রস্ত, এমন পরিস্থিতিতে শীর্ষ কর্মকর্তারা কীভাবে দুর্নীতি দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবেন?
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন : ভোটারের শেষ লড়াই ও দায়বদ্ধতা
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য এক মহাবিপদ সঙ্কেত অথবা এক অনন্য মুক্তি। জনশ্রুতি রয়েছে, এবারের নির্বাচনেও কোনো কোনো রাজনৈতিক দল বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন বিক্রি করেছে। যখন একজন প্রার্থী বিপুল টাকা খরচ করে মনোনয়ন কেনেন, তখন তিনি জনগণের প্রতিনিধি নন, বরং একজন ‘বিনিয়োগকারী’ হিসেবে সংসদে যান। তার প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে জনগণের ট্যাক্সের টাকা লুটে নিজের বিনিয়োগ লাভসমেত ষোল আনা উসুল করা।
এই দুষ্টুচক্র ভাঙার দায়িত্ব এবার সাধারণ ভোটারের কাঁধে গিয়ে বর্তেছে। ভোটার হিসেবে আমাদের ভোটটি কেবল একটি সিল নয়, বরং আমাদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আমানত। সঙ্গত কারণে এবার নির্বাচনে আমরা যারা সাধারণ ভোটার তাদের নির্দিষ্ট কিছু ভূমিকা পালন করতে হবে :
ক. ঋণখেলাপি ও অতীত রেকর্ড যাচাই : যে প্রার্থী জনগণের বা ব্যাংকের টাকা মেরে দিয়েছেন (লোন ডিফল্টার), তাকে সরাসরি বর্জন করতে হবে। তারা রাষ্ট্রীয় সম্পদের রক্ষক নন, বরং ভক্ষক।
খ. পেশাদারিত্বকে প্রাধান্য দেয়া : এমন প্রার্থীকে বেছে নিতে হবে যার একটি স্বচ্ছ ও সৎ পেশাদার ক্যারিয়ার আছে। যার নিজস্ব জীবিকা আছে, যিনি রাষ্ট্রীয় তহবিল তছরুপ করবেন না।
গ. দলীয় অন্ধত্ব ত্যাগ : আমরা যদি এবার যোগ্য ও সৎ প্রার্থীকে বেছে নিই, তবে পরবর্তী সময়ে দলগুলো ভালো প্রার্থী দিতে বাধ্য হবে। অন্যথায়, আমরা কেবল এই মাফিয়াচক্রের দাসে পরিণত হবো।
পরিবর্তনের রূপরেখা : পেশিশক্তির বদলে মেধাশক্তি
আমরা যদি এই ‘পেশিশক্তির’ রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারি, তবে সামগ্রিক অধঃপতন কেউ ঠেকাতে পারবেন না। পরিবর্তনের জন্য আমাদের নিচের বিষয়গুলো নিশ্চিত করা দরকার :
১. বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ গঠন : এমন নেতাদের উৎসাহিত করা, যারা সৃজনশীল এবং যাদের মধ্যে ‘বুদ্ধিবৃত্তিক সততা’ আছে।
২. বানোয়াট তথ্যের রাজনীতি বন্ধ করা : এনএসআই বা অন্য নিরাপত্তা সংস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দমনে ব্যবহারের সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে হবে। গোয়েন্দা সংস্থা হওয়া উচিত দেশের নিরাপত্তার ঢাল, কোনো ব্যক্তি-বিশেষের ক্ষমতা রক্ষার হাতিয়ার নয়।
৩. সৃজনশীলতার বিকাশ : রাজনীতিতে মেধার অনুপ্রবেশ ঘটানো, যাতে দেশ আবার উদ্ভাবন ও মননশীলতায় ফিরতে পারে। মনে রাখতে হবে, গণচরিত্রের উন্নয়ন না হলে কোনো আইনি সংস্কার টেকসই হয় না।
শেষ কথা
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন যে দুষ্টচক্রে আবর্তিত হচ্ছে, তা দেশের অস্তিত্বকে বিপন্ন করছে। আমাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলছে, দুর্নীতিগ্রস্ত নেতৃত্ব কখনো নিজে থেকে দেশপ্রেমিক হয়ে উঠবে না; এদের গণসচেতনতা আর ভোটের শক্তি দিয়ে রুখে দিতে হবে। আমাদের এমন এক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সচেষ্ট হতে হবে; যেখানে ‘সুযোগসন্ধানী’ নন, বরং ‘দেশপ্রেমিক পেশাজীবীরা’ দেশ পরিচালনার সুযোগ পান। মাফিয়াদের ঝেটিয়ে বিদায় করে মেধাবীদের বরণ করে নেয়ার সময় এখনই। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আমাদের মতো সাধারণ ভোটারের সঠিক সিদ্ধান্তই পারে এই হাপুস-হুপুস খাওয়ার সংস্কৃতি থেকে প্রিয় বাংলাদেশকে মুক্ত করতে।
লেখক : সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান ও উপ-উপাচার্য, বিইউপি



