মীর লুৎফুল কবীর সা’দী
একটি ভিডিও ক্লিপ আমাকে থমকে দিয়েছিল। কোনো নাটকীয় দৃশ্য নয়, কেবল পাঁচজন সাধারণ পরিচ্ছন্নতাকর্মী আর একজন জাতীয় নেতার মুখোমুখি সাক্ষাৎ। সেই নেতা শুধু কথা বলেননি, তিনি যেন তাদের সামনে নত হয়েছিলেন। নিজের হাতে তাদের হাত ধুয়ে দিয়েছিলেন, ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়েছিলেন এবং একান্ত আন্তরিকতায় তাদের হাতে খাবার তুলে দিয়েছিলেন। সেই মুহূর্তে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের চোখে বিস্ময়, কণ্ঠে করুণ বেদনা, ‘আমাদের তো কেউ মানুষ মনে করে না’!
এই একটি বাক্য আমার হৃদয়ের গভীরে আঘাত করেছিল। এটি কোনো সাধারণ অভিযোগ নয়, এটি যেন শতাব্দীর অবহেলার আর্তনাদ। এটি শুধু ব্যক্তিগত কষ্টের প্রকাশ নয়, এটি আমাদের সামাজিক বিবেকের দগদগে ক্ষত। এই বাক্যের ভেতরে আছে শ্রমজীবী মানুষের অদৃশ্য বোবা কান্না, অস্বীকৃত অস্তিত্ব এবং নিঃশব্দ অপমানের ইতিহাস। যেন সমাজের অন্ধকার গহ্বর থেকে উঠে আসা প্রশ্ন আমরা কি সত্যিই মানুষকে ‘মানুষ’ হিসেবে দেখি?
আমরা প্রতিদিন পরিষ্কার রাস্তা দেখি, সুন্দর ফুটপাথ দেখি, ঝকঝকে শহর দেখি; কিন্তু খুব কমই ভাবি, কার ঘামে এই সৌন্দর্য সম্ভব হলো? আমরা সেতু, মেট্রোরেল, উড়ালসড়ক নিয়ে গর্ব করি; কিন্তু যাদের হাতে এগুলো নির্মিত, তাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা কতটুকু? আমরা উন্নয়নের গল্প বলি; কিন্তু সেই উন্নয়নের পেছনে থাকা নীরব মানুষগুলোকে প্রায়শই ভুলে যাই।
সেই ভিডিওর দৃশ্যটি নিছক মানবিক সৌজন্য ছিল না। এটি ছিল নীরব নৈতিক বিপ্লব। যখন একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি নিচে নেমে সাধারণ মানুষের পাশে এসে দাঁড়ান, তখন তিনি দয়া করেন না, তিনি যেন সমতা ঘোষণা করেন। তিনি যেন বলেন, ‘তোমাদের শ্রমেই এই সমাজ বেঁচে আছে। তোমরা অবহেলিত নও, তোমরাও মর্যাদাবান।’ তার আচরণে ছিল না রাজনীতির কূটকৌশল, ছিল নৈতিকতার গভীরতা। ছিল না লোক দেখানো প্রচারণা, ছিল হৃদয়ের সততা।
এই ঘটনা আমাকে ভাবিয়েছে, আমাদের সমাজ আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? আমরা কি প্রযুক্তিতে এগিয়েছি; কিন্তু মানবিকতায় পিছিয়ে গেছি? আমরা কি অর্থনীতিতে শক্তিশালী; কিন্তু নৈতিকতায় দুর্বল? আমরা কি আধুনিক কিন্তু হৃদয়ে প্রাচীন? পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সেই বাক্য— ‘আমাদের তো কেউ মানুষ মনে করে না’ শুধু তাদের ব্যক্তিগত দুঃখ নয়, এটি আমাদের সামাজিক কাঠামোর গভীর সঙ্কট। এটি দেখিয়ে দেয়, আমরা এখনো মানুষকে তার কাজ দিয়ে নয়, তার সামাজিক মর্যাদা দিয়ে বিচার করি। ধনী হলে সম্মান, দরিদ্র হলে অবহেলা; ক্ষমতাবান হলে তোষামোদ, শ্রমিক হলে উপেক্ষা। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হলো— এই সমাজ কৃষকের ঘামে বাঁচে, শ্রমিকের হাতে দাঁড়ায়, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পরিশ্রমে সুস্থ থাকে। অথচ আমরা তাদের প্রাপ্য মর্যাদা দিতে ব্যর্থ। আমরা তাদেরকে ‘অপরিহার্য’ মনে করি; কিন্তু ‘সম্মানিত’ করার কথা ভুলেও বলি না। আমরা তাদের প্রয়োজন বুঝি; কিন্তু তাদের ‘মানুষ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চাই না।
ইসলাম এই বৈষম্যকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে। আল্লাহ বলেন— ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে পরহেজগার।’ (সূরা আল-হুজুরাত-১৩) অর্থাৎ— মর্যাদা আসে সম্পদে নয়, নৈতিকতায়; পদে নয়, চরিত্রে; ক্ষমতায় নয়, তাকওয়ায়। রাসূলুল্লøাহ সা: কখনো সাধারণ মানুষ থেকে দূরে ছিলেন না। তিনি গরিবের পাশে বসতেন, এতিমের মাথায় হাত রাখতেন, শ্রমিকের সাথে খাবার ভাগ করতেন। এক সাহাবি যখন নিজেকে তুচ্ছ ভাবলেন, রাসূল সা: তাকে বললেন, ‘তুমি আল্লাহর কাছে তুচ্ছ নও’। এই একটি বাক্যেই মানবিক সমতার পূর্ণ দর্শন নিহিত।
তবু আমাদের সমাজে আজ ভিন্ন চিত্র। আমরা পেশার আভিজাত্যে বিভক্ত। ডাক্তারকে সম্মান করি; কিন্তু পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে নয়। ইঞ্জিনিয়ারকে শ্রদ্ধা করি; কিন্তু নির্মাণশ্রমিককে অবহেলা করি। অফিসারকে তোষামোদ করি; কিন্তু দারোয়ানকে উপেক্ষা করি। অথচ ইসলাম শেখায় প্রতিটি হালাল শ্রমই সম্মানিত। আমরা উন্নয়নের মোহে এমনভাবে ডুবে গেছি যে, মানবিক উন্নয়ন ভুলে গেছি। আমরা বড় বড় ভবন বানাচ্ছি; কিন্তু ভেতরের মানুষগুলো ভেঙে যাচ্ছে। আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ চাই; কিন্তু হৃদয়ের বাংলাদেশ গড়তে চাই না। আমরা স্মার্ট শহর চাই; কিন্তু সহানুভূতিশীল সমাজ চাই না। এখন প্রশ্ন হলো— মানবিক বাংলাদেশ কি আমাদের প্রয়োজন? কীভাবে এটি গড়ে উঠবে?
মানবিক মানুষ হয়ে ওঠার প্রথম ভিত্তিই হলো পরিবার। পরিবারই শিশুর প্রথম বিদ্যালয়। যে শিশু দেখে তার মা প্রতিবেশীকে সাহায্য করছেন, সে সহমর্মিতা শেখে। যে শিশু দেখে তার বাবা সততার সাথে জীবনযাপন করছেন, সে ন্যায়পরায়ণতা শেখে। তাই মানবিক বাংলাদেশ গড়তে হলে পরিবার থেকেই মানবিকতার চর্চা শুরু করতে হবে। দ্বিতীয় ভিত্তি হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যদি শুধু প্রতিযোগিতা শেখায়; কিন্তু সহানুভূতি না শেখায়, তবে আমরা দক্ষ কর্মী হয়তো বানাতে পারব, মানবিক মানুষ বানাতে পারব না। আমাদের পাঠ্যপুস্তকে শুধু গণিত-ইংরেজি নয়, নৈতিকতা, সহমর্মিতা, মানবিক মূল্যবোধের বিষয়গুলোও থাকতে হবে। রাসূল সা: বলেছেন, ‘আমি প্রেরিত হয়েছি উত্তম চরিত্র পূর্ণতা দানের জন্য।’ তাই শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত উত্তম চরিত্র গঠন।
মানবিক মূল্যবোধ তৈরির তৃতীয় ভিত্তি হচ্ছে আত্মসমালোচনা। প্রতিদিন নিজেকে নিজে প্রশ্ন করতে হবে, আমি কি কাউকে কষ্ট দিয়েছি? আমি কি অহঙ্কার করেছি? আমি কি কোনো শ্রমজীবী মানুষকে অবহেলা করেছি? এই ক্রমাগত আত্মজিজ্ঞাসা মানুষকে পরিশুদ্ধ করে, মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটায়।
মানবিক মূল্যবোধ তৈরির চতুর্থ ভিত্তি হচ্ছে নম্রতা। নম্রতা ছাড়া মানবিকতা হয় না। যে সমাজে অহঙ্কার, সেখানে বিনয় নেই, যে সমাজে হিংসা, সেখানে সহানুভূতি নেই। যে সমাজে পরশ্রীকাতরতা সেখানে ভালোবাসা নেই। যে সমাজে বিভেদ, সেখানে সম্প্রীতি নেই। আমাদের এমন বাংলাদেশ দরকার, যেখানে মানুষ মানুষকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, ভাই হিসেবে দেখবে। মানবিক বাংলাদেশ মানে শুধু উন্নত সড়ক নয়, উন্নত হৃদয়। শুধু শক্তিশালী অর্থনীতি নয়, শক্তিশালী নৈতিকতা। শুধু আধুনিক প্রযুক্তি নয়, প্রকৃত মানবিকতা। শুধু রাষ্ট্রের ক্ষমতা নয়, সমাজের সহানুভূতি। এই পরিবর্তন ওপর থেকে নয়, ভেতর থেকে শুরু হবে। কোনো সরকার একা মানবিক বাংলাদেশ গড়তে পারবে না, যদি আমরা নিজেরা মানবিক না হই।
ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ আল্লাহর সর্বোত্তম সৃষ্টি, কোনো মানুষ ছোট নয়। স্বল্প হতে পারে তার সম্পদ; কিন্তু তার মর্যাদা নয়। রাসূল সা: যখন পথের ধুলো মাখা মানুষকে সালাম দিতেন, তখন তিনি শেখাতেন মানুষের মর্যাদা পোশাকে নয়, অন্তরে। আমাদের সমাজে যদি সত্যিকারের ইসলামী মূল্যবোধ থাকত তবে কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মী বলতে পারতেন না, ‘আমাদের কেউ মানুষ মনে করে না’।
আজ বাংলাদেশের প্রয়োজন কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, নৈতিক বিপ্লব। ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, চরিত্রের পরিবর্তন। স্লোগানের পরিবর্তন নয়, মানসিকতার পরিবর্তন। এই বিপ্লব শুরু হবে ঘরে সহমর্মিতা দিয়ে। স্কুলে নৈতিক শিক্ষা দিয়ে। অফিসে ন্যায়বিচার দিয়ে। রাস্তায় সম্মান দিয়ে। হৃদয়ে ভালোবাসা দিয়ে।
আমাদের অঙ্গীকার হোক একটাই— বাংলাদেশ মানবিক হবে। বাংলাদেশ তখনি মানবিক হবে, যখন আমরা প্রত্যেকে মানবিক হবো। মানবিক বাংলাদেশ কোনো রাজনৈতিক প্রকল্প নয়; এটি একটি নৈতিক স্বপ্ন, একটি আধ্যাত্মিক যাত্রা, একটি মানবিক অঙ্গীকার। আসুন এই অঙ্গীকার পূরণে আমরা একসাথে এগিয়ে যাই, কোটি প্রাণের স্বপ্ন পূরণের প্রত্যাশায়।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও গবেষক



