চীনের সীমিত বৈশ্বিক প্রভাব

সাঈদ বারী
বৈশ্বিক অর্থনীতির এক অপরিহার্য শক্তি হিসেবে চীন আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। বিশ্বের শিল্প উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার মেরুদণ্ড এবং প্রযুক্তি ও অবকাঠামো বিনিয়োগে এক প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে চীন গত চার দশকে নজিরবিহীন সাফল্য দেখিয়েছে। তবু অর্থনৈতিক উত্থানের এই বিস্ময়কর গল্পের বিপরীতে বিশ্ব রাজনীতিতে তার ভূমিকা এখনো সীমিত, সংশয়মিশ্রিত এবং অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিরক্ষামূলক। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, অর্থনীতিতে এত দ্রুত এগিয়ে থেকেও বিশ্ব রাজনীতিতে চীন কেন তুলনামূলক সংযত। এই প্রশ্নের উত্তর সরল নয়; বরং ইতিহাস, রাজনৈতিক কাঠামো, কূটনৈতিক সংস্কৃতি, মূল্যবোধের সঙ্ঘাত এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার মনস্তত্ত্বের বহুস্তরীয় বাস্তবতার ভেতরেই এর ব্যাখ্যা নিহিত।

চীনের অর্থনৈতিক উত্থান মূলত রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদ ও বাজার অর্থনীতির এক বিশেষ সমন্বয়ের ফল। কম উৎপাদন ব্যয়, বিপুল শ্রমশক্তির দক্ষ ব্যবহার, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং অবকাঠামো খাতে ব্যাপক রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তাকে দ্রুত এগিয়ে দিয়েছে; কিন্তু অর্থনৈতিক শক্তি নিজে নিজে রাজনৈতিক নেতৃত্বে রূপান্তরিত হয় না। বৈশ্বিক রাজনীতিতে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, আদর্শিক আকর্ষণ, বিশ্বাসযোগ্য জোট এবং দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক, যে ক্ষেত্রগুলোতে চীনের সীমাবদ্ধতা স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে অনেক দেশ চীনের ওপর নির্ভরশীল হলেও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে পুরোপুরি আস্থার জায়গায় বসাতে অনেকেই দ্বিধাগ্রস্ত।

এই সীমাবদ্ধতার পেছনে প্রথম বড় কারণ চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা। একদলীয় শাসন কাঠামো, মতপ্রকাশের ওপর নিয়ন্ত্রণ, মানবাধিকার প্রসঙ্গে কঠোর অবস্থান এবং রাষ্ট্রকেন্দ্রিক শাসনধারা পশ্চিমা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সাথে মৌলিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে যখন চীন বৈশ্বিক রাজনীতিতে বৃহত্তর ভূমিকা দাবি করে, তখন অনেক দেশ তা সহজে গ্রহণ করতে পারে না। বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব মানে শুধু শক্তি প্রদর্শন নয়; বরং এমন এক আস্থার পরিবেশ তৈরি করা যেখানে অন্যরা স্বেচ্ছায় অনুসরণ করতে আগ্রহী হয়। এই নৈতিক গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রেই চীন এখনো কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি।

দ্বিতীয়ত, ইতিহাসগত অভিজ্ঞতা চীনের কৌশলগত আচরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। দীর্ঘ ঔপনিবেশিক অপমান, বিদেশী শক্তির আগ্রাসন এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার স্মৃতি রাষ্ট্রচিন্তায় গভীর ছাপ ফেলেছে। এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা তাকে সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার হস্তক্ষেপ না করার নীতিতে অনড় করে তুলেছে। ফলে আন্তর্জাতিক সঙ্কট ও সঙ্ঘাতে চীন অনেক সময় সংযত ভূমিকা নেয়, যেখানে বিশ্ব রাজনীতিতে নেতৃত্বের প্রত্যাশা থাকে অধিক সক্রিয়তার। এই সংযত কূটনৈতিক মনোভাব তাকে দায়িত্বশীল বৈশ্বিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথে কিছুটা পিছিয়ে রাখে।

তৃতীয়ত, চীনের কূটনৈতিক কৌশল অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারে অধিক মনোযোগী, রাজনৈতিক আস্থা গঠনে তুলনামূলক কম সক্রিয়। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ-এর মাধ্যমে বহু দেশে অবকাঠামো, যোগাযোগ এবং জ্বালানি খাতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে চীন। কিন্তু এই প্রকল্প ঘিরে ঋণনির্ভরতা, স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ বিভিন্ন দেশে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ফলে অর্থনৈতিক উপস্থিতি বাড়লেও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা সব ক্ষেত্রে সমানভাবে বৃদ্ধি পায়নি। অনেক দেশ চীনের বিনিয়োগকে প্রয়োজনীয় বলে মেনে নেয়; কিন্তু একই সাথে রাজনৈতিকভাবে সতর্ক দূরত্ব বজায় রাখে।

চতুর্থত, বৈশ্বিক রাজনীতিতে চীনের অগ্রযাত্রার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হলো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নেতৃত্ব ছিল মূলত যুক্তরাষ্ট্রের হাতে, যার নিয়ম, প্রতিষ্ঠান এবং মানদণ্ডে পশ্চিমা উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রাধান্য রয়েছে। চীন এই ব্যবস্থার অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী হলেও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রে ছিল না। এখন যখন চীন নিজস্ব প্রভাব বাড়াতে চায়, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা একে বিদ্যমান ব্যবস্থার জন্য সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখে। ফলে চীনের রাজনৈতিক উত্থান নানা ধরনের কৌশলগত প্রতিরোধের মুখে পড়ে।

পঞ্চমত, সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিও চীনের রাজনৈতিক ভাবমর্যাদাতে দ্বিমুখী প্রভাব ফেলেছে। দক্ষিণ চীন সাগর, তাইওয়ান, হংকং ও সীমান্ত বিরোধে চীনের দৃঢ় অবস্থান প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। শক্তি প্রদর্শনের এই কৌশল স্বল্পমেয়াদে কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আস্থার সঙ্কট তৈরি করে। বিশ্ব রাজনীতিতে প্রকৃত নেতৃত্ব মানে শুধু শক্তিশালী হওয়া নয়; বরং অন্যদের নিরাপত্তা ও স্বার্থের প্রতি সংবেদনশীলতা দেখানো, যা এখন বৈশ্বিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।

ষষ্ঠত, নরম শক্তির ক্ষেত্রেও চীন এখনো কাঙ্ক্ষিত প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ হলিউড, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি উদ্ভাবন, গণমাধ্যম এবং জীবনধারার মাধ্যমে বৈশ্বিক কল্পনায় এক আকর্ষণীয় উপস্থিতি তৈরি করেছে। চীন কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটসহ নানা সাংস্কৃতিক উদ্যোগ গ্রহণ করলেও অনেক দেশে তা রাষ্ট্রীয় প্রচারণা হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে সাংস্কৃতিক আকর্ষণ বা আদর্শিক অনুপ্রেরণার ক্ষেত্রে চীন এখনো সীমিত প্রভাবের মধ্যেই রয়েছে। এই নরম শক্তির ঘাটতি বিশ্ব রাজনীতিতে তার প্রভাব বিস্তারের পথে একটি বড় প্রতিবন্ধক।

চীনের অর্থনৈতিক সাফল্য নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। তবে রাজনীতি কেবল অর্থনীতির সম্প্রসারণ নয়; বরং আস্থা, মূল্যবোধ, ইতিহাস ও পারস্পরিক গ্রহণযোগ্যতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক জটিল ক্ষেত্র। চীন এখন সেই রূপান্তরের এক সংবেদনশীল পর্যায়ে অবস্থান করছে। অর্থনীতিতে তার দ্রুত অগ্রযাত্রা বিশ্বকে বিস্মিত করেছে; কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তাকে এখনো আস্থার ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। যদি চীন সত্যিকার অর্থে বৈশ্বিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায়, তবে তাকে কেবল অর্থনৈতিক প্রভাব নয়, বিশ্বাসযোগ্যতা, নৈতিক অবস্থান এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বের পথেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়েও বিশ্ব রাজনীতিতে সে দীর্ঘদিন এক ধরনের দূরত্ব ও সংশয়ের পরিসরে অবস্থান করবে।

লেখক : প্রকাশক ও কলাম লেখক