২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলার সময়ই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর বোমাবর্ষণ করে। ওমানের মধ্যস্থতাকারীরা বলেছে, সেই আলোচনা একটি চুক্তির কাছাকাছি ছিল। ট্রাম্প চেয়েছিলেন তার প্রস্তাব ইরান মেনে নিক, ইরান চেয়েছে উভয় পক্ষের গ্রহণযোগ্য একটি চুক্তি হোক; যাতে সঙ্ঘাত না হয়।
প্রথম আঘাতের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ইরান চুক্তি থেকে সরে গেছে এবং তার দেশ ও ইসরাইল সমন্বিত হামলা চালাচ্ছে; যাতে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠন করতে না পারে। তিনি বলেন, ‘মার্কিন সামরিক বাহিনী একটি বিশাল ও চলমান অভিযান গ্রহণ করছে যাতে এই অত্যন্ত দুষ্ট, উগ্র স্বৈরশাসন আমেরিকা ও আমাদের মূল জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থে হুমকি সৃষ্টি করতে না পারে।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ অন্তত ৪০ জন ইরানি কর্মকর্তা নিহত হন।
ট্রাম্পের লক্ষ্য কী, সেগুলো অর্জনযোগ্য কি-না এবং ইরান ও তার জনগণের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে এমন সব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এই যুদ্ধে উঠে এসেছে।
রাজনৈতিক বিজ্ঞানী, লেখক এবং ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের প্রফেসর ইমেরিটাস উইলিয়াম কুয়ান্ট জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুর উৎসাহে এটি সম্পূর্ণরূপে ট্রাম্পের যুদ্ধ। এবারের মরণপণ যুদ্ধটি কংগ্রেসে কোনো খোলামেলা বিতর্ক হয়নি, মিডিয়ায় বাস্তব আলোচনা খুবই কম ছিল এবং ট্রাম্প তার দীর্ঘ স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ইরান সঙ্কট সম্পর্কে আমেরিকান জনগণের কাছে মাত্র তিন মিনিট কথা বলেছেন। সেই বিষয়গুলো কি?
সংক্ষেপে, তার বলা বিষয়গুলোর তালিকা এরকম : ইরানের জন্য কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নয়। শাসনব্যবস্থা উৎখাত করা। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি অর্জন করা অসম্ভবই নয়, বরং আমেরিকার জাতীয় স্বার্থবিরোধীও।
যেভাবে ইরানের সাথে এমন আলোচনা করা হয়েছিল এবং যা অগ্রগতি বলে মনে হচ্ছিল, সে রকম পরিস্থিতিতে এই আক্রমণ সম্পূর্ণ অনাবশ্যক ছিল। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ট্রাম্প হয়তো হিসাব করে দেখেছেন, এটি আসন্ন মধ্যমেয়াদি নির্বাচনে তার জন্য সহায়ক হবে। সেটিও ভুল হিসাব। মাদুরোকে তুলে নেয়া, গ্রিনল্যান্ড আক্রমণ, নোবেল পুরস্কারের জন্য অস্থিরচিত্ত হওয়া, এপস্টেইন ফাইল— ইত্যাদি শুধু আমেরিকাতেই নয়, বিশ্বব্যাপী তার ইমেজে ভাটার টান ধরায়।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কৌরোশ জিয়াবারি মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে এই আগ্রাসী যুদ্ধটি হিসাবের ভুল। আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে এই আক্রমণ বিশ্বব্যাপী প্রমাণ করছে, কে আইন ভাঙে তার ওপর নির্ভর করে দায়বদ্ধতা। যুদ্ধ এখনই শেষ হলেও আক্রমণকারী প্রতিটি পক্ষকে দায়ভার নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানি জনগণকে চার দশকের কঠোর নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে শ্বাসরুদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। কথায় বলে ইতিহাস বসে থাকে না। সময়ই সেরা বাস্তবতা। গাজায় ইসরাইল যা করেছে সে একই জিনিস এবার তারা প্রত্যক্ষ করছে। গাজাবাসী উত্তর থেকে দক্ষিণে, আবার দক্ষিণ থেকে উত্তরে বাস্তুত্যাগী হয়েছে। মিসর-ইসরাইল রাফা ক্রসিং বন্ধ রেখে এক মরণ খাঁচায় তাদের ঘুরিয়েছে, এখন সেই একই পথপরিক্রমা ইসরাইলি ও সেটেলারদের তাড়া করছে।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো পল সেলাম বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চূড়ান্ত লক্ষ্য পরিবর্তনশীল হতে পারে। তিনি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনকে আনুষ্ঠানিক লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেছেন; কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রমাণিত হলে, তিনি সেই লক্ষ্যকে যুদ্ধবিরতি ও পরে একটি চুক্তিতে নামিয়ে আনতে চেষ্টা করবেন।
জার্মান মার্শাল ফান্ডের সিনিয়র ভিজিটিং ফেলো এবং হেগ সেন্টারের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতি বিভাগের সিনিয়র ফেলো গ্রেস ওয়ারম্যানবোল এক নিবন্ধে বলেছেন, চলমান আলোচনার কুয়াশার মধ্যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানকে আঘাত করেছে, যা মার্কিন কূটনীতির বিশ্বাসযোগ্যতায় আরেকটি আঘাত।
বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ বিশ্বাস করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক আক্রমণ জাতিসঙ্ঘের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনের নিয়মাবলির স্পষ্ট লঙ্ঘন। ২০২৫-২৬ সালে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক হামলাকে কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব, বলপ্রয়োগে নিষেধাজ্ঞা এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার মূল নীতিরও লঙ্ঘন। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, আক্রমণ এমন সময়ে ঘটেছে, যখন আলোচনাগুলো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করছিল। এই বিবৃতি ইঙ্গিত করে, ওয়াশিংটন কূটনীতিকে ধ্বংস করেছে। অনেক দেশ এখন বিশ্বাস করে, আলোচনাগুলো প্রকৃত সমঝোতার পথ হিসেবে পরিচালিত হয়নি; বরং একটি কৌশলগত উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
সামরিক আক্রমণের ফলে ইরানের সরকার পতন একটি সরল বিষয় নয়। যদি ধরে নিই, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে সফল হলো, তবুও তারা পরাজিত পক্ষই হবে। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে প্রথমবারের মতো, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তু আক্রমণের মুখে পড়েছে— এটি মার্কিন মর্যাদার জন্য এমন এক প্রত্যাঘাত যা অতীতের সব ঘটনাকে ছাড়িয়ে গেছে।
ইসরাইল ও ইরান ইতোমধ্যেই অস্তিত্বগত সংঘর্ষের স্তরে প্রবেশ করেছে। ইরান কঠোর সামরিক আঘাত সহ্য করেছে, যখন ইসরাইল তার ভূখণ্ডে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সবচেয়ে তীব্র সামরিক আক্রমণের মুখোমুখি হয়েছে। ইরানের ভারী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইসরাইলের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর ভঙ্গুরতা প্রকাশ করেছে।
ইরানের নেতার হত্যার পর, ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে সংবিধান অনুযায়ী একটি তিন সদস্যের নেতৃত্ব পরিষদ গঠিত হয়েছিল এবং পরবর্তী ইরানি নেতা অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস দ্বারা নিয়োগ করা হয়েছে, তিনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আল-উজমা সৈয়দ মুজতবা খামেনি। তিনি ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রকে তিন দফা কঠিন দাবি দিয়েছেন। ১. যুক্তরাষ্ট্রকে ৩০ দিনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণ প্রত্যাহার; ২. ইরানের ওপর আরোপিত সব ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার; ৩. ইরানের ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান।
আগামী ১০ এপ্রিলের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এসব দাবি পূরণ না করলে ইরান হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ করবে, নিরাপত্তার স্বার্থে চীন ও রাশিয়ার সাথে যৌথ সামরিক ও কৌশলগত ব্যবস্থা নেবে এবং দেশ দু’টি ইরানি এলাকায় সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে এবং পারমাণবিক সমতা অর্জনসহ পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।
দ্বিতীয়বার মার্কিন ও ইসরাইলি সামরিক আক্রমণের সাথে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছে। প্রথমত, ইরানের নেতাকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার একটি লাল রেখা অতিক্রম করেছে। যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যে, তাদের উদ্দেশ্য ইরানি সরকারের পতন; অতএব, ইরানের প্রতিক্রিয়া তাদের অস্তিত্বের প্রতিরক্ষায় রূপ নিয়েছে। তেল পরিবহন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্ব আজ আতঙ্কিত। যুক্তরাষ্ট্র তার মজুত থেকে তেল উত্তোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আরো বিপর্যয় এড়াতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি গ্রহণ করতে ব্যর্থ হলে পরবর্তী বিশ্বযুদ্ধ রোধ করা সম্ভব নাও হতে পারে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ও গ্রন্থকার


