ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক দর্শন

ইনসাফের অর্থনীতি কেবল আর্থিক সূচক, যেমন জিডিপি প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব বা মাথাপিছু আয় বাড়ানো নয়। ইনসাফের অর্থনীতির মানে হলো সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায়পরায়ণতা, সম্পদের সঠিক বণ্টন, দারিদ্র্য ও বৈষম্য হ্রাস এবং মানুষের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কুরআন এবং হাদিসে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের জীবনে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহ বলেন, ‘অর্থ ও সম্পদ বিতরণে ন্যায়পরায়ণ হও, যেন ধনী-দরিদ্রের মধ্যে ভারসাম্য থাকে’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত-৫৮)। নবী সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার সম্পদের মাধ্যমে দরিদ্রকে সাহায্য করে এবং অন্যের অধিকার অবহেলা করে না, তার রুজি বরকতযুক্ত হবে’

ড. মো: মিজানুর রহমান
ড. মো: মিজানুর রহমান |নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

বিশ্ব অর্থনীতি আজ গভীর নৈতিক ও কাঠামোগত সঙ্কটের মধ্য দিয়ে এগুচ্ছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি, উৎপাদন ক্ষমতার বিস্তার ও বৈশ্বিক বাজারের সংযুক্তি সত্ত্বেও দারিদ্র্য, বৈষম্য ও আর্থিক অনিশ্চয়তা না কমে আরো প্রকট হচ্ছে। মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে বিপুল সম্পদ এবং বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের জীবনে নিরাপত্তাহীনতা, এই বৈপরীত্য পুঁজিবাদী অর্থনীতির মৌলিক ব্যর্থতাকেই প্রকাশ করছে। অন্যদিকে, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে যে, কেবল রাষ্ট্রকেন্দ্রিক মালিকানা ও সমতার স্লোগান মানবিক চাহিদা, নৈতিকতা ও উৎপাদনশীলতার ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যর্থ। এই বাস্তবতার বিপরীতে মানুষের কল্যাণ, ন্যায় ও নৈতিকতা কেন্দ্রে রেখে বিকল্প অর্থনৈতিক দর্শন হচ্ছে ইনসাফের অর্থনীতি।

পৃথিবীতে ধীরে ধীরে ‘ইনসাফের অর্থনীতি’ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইনসাফের অর্থনীতি কোনো সাময়িক রাজনৈতিক স্লোগান বা কেবল ধর্মীয় আবেগনির্ভর ধারণা নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শনভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যার কেন্দ্রে রয়েছে ন্যায়, ভারসাম্য, দায়িত্ববোধ ও মানবিক কল্যাণ। এটি এমন ব্যবস্থা যেখানে সম্পদ উৎপাদন ও ভোগের স্বাধীনতা স্বীকৃত; কিন্তু সেই স্বাধীনতা শোষণ, প্রতারণা বা বৈষম্যের হাতিয়ার হতে পারে না। এখানে ব্যক্তি উদ্যোগ ও বাজারের কার্যকারিতা রয়েছে; কিন্তু সেই বাজার মানবিক সীমা অতিক্রম করতে পারে না।

ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শন মূলত ইনসাফের ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। কুরআন ও সুন্নাহ বারবার মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ, আর মানুষ কেবল তার আমানতদার। যখন সম্পদকে আমানত হিসেবে দেখা হয়, তখন তা কুক্ষিগত করার প্রবণতা দুর্বল হয়; যখন জবাবদিহির বিশ্বাস জাগ্রত থাকে, তখন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে নৈতিকতা প্রবেশ করে। ফলে অর্থনীতি কেবল মুনাফা ও প্রবৃদ্ধির অঙ্কে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এটি সমাজের দুর্বল অংশের অধিকার রক্ষার মাধ্যম হয়ে ওঠে। এই মৌলিক দর্শনেই নিহিত আছে অর্থনৈতিক ইনসাফের বীজ।

ইনসাফের অর্থনীতি কেবল আর্থিক সূচক, যেমন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব বা মাথাপিছু আয় বাড়ানো নয়। ইনসাফের অর্থনীতির মানে হলো সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায়পরায়ণতা, সম্পদের সঠিক বণ্টন, দারিদ্র্য ও বৈষম্য হ্রাস এবং মানুষের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কুরআন এবং হাদিসে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের জীবনে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহ বলেন, ‘অর্থ ও সম্পদ বিতরণে ন্যায়পরায়ণ হও, যেন ধনী-দরিদ্রের মধ্যে ভারসাম্য থাকে’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত-৫৮)। নবী সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার সম্পদের মাধ্যমে দরিদ্রকে সাহায্য করে এবং অন্যের অধিকার অবহেলা করে না, তার রুজি বরকতযুক্ত হবে।’

অর্থাৎ– ইনসাফের অর্থনীতি হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ব্যক্তিগত লাভের পাশাপাশি সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করা হয়, দুর্নীতি, অন্যায় মুনাফা ও শোষণ প্রতিরোধ করা হয় এবং মানুষের মৌলিক চাহিদা, যেমন– খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হয়। এটি একটি সমগ্রিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, যা শুধু সংখ্যাগত বৃদ্ধির বাইরে গিয়ে মানবিক ও নৈতিক ন্যায়পরায়ণতাকে কেন্দ্রে রাখে।

রাসূল সা:-এর সময়ে মদিনাভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ইতিহাসের প্রথম কার্যকর ইনসাফভিত্তিক অর্থনৈতিক মডেল ছিল। সেখানে বাজার ও বাণিজ্য ছিল, ব্যক্তিগত সম্পত্তির স্বীকৃতি ছিল; কিন্তু একই সাথে ছিল সুদ নিষিদ্ধকরণ, প্রতারণার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, জাকাতভিত্তিক পুনর্বণ্টন ব্যবস্থা এবং সামাজিক নিরাপত্তার বাস্তব প্রয়োগ। পরবর্তী সময়ে সাহাবায়ে কেরাম ও খোলাফায়ে রাশেদিন রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে এই অর্থনৈতিক দর্শন গ্রহণ করেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই ইনসাফভিত্তিক অর্থনীতির ফলেই একসময় রাষ্ট্রের কোষাগারে জাকাত প্রদানে এমন উৎসাহ জন্মেছিল যে, গ্রহীতাদের খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হতো।

আজকের বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাস্তবতায় এই ইতিহাস কোনো কল্পকাহিনী নয়। দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও কেন দারিদ্র্য থেকে যায়, প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কেন বৈষম্য বাড়ে, কেন ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের জন্য বোঝা হয়ে যায়, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামোর নৈতিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়। এ প্রেক্ষাপটে ইনসাফের অর্থনীতি কেবল ধর্মীয় আলোচনার বিষয় নয়; বরং নীতি-নির্ধারণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য কার্যকর বিকল্প মডেল হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।

ইনসাফের অর্থনীতির কথা বললে, ‘ইনসাফ’ শব্দটি কেবল আইনগত ন্যায় বা বাহ্যিক সমতা বোঝায় না; বরং এটি এমন এক সামগ্রিক ন্যায়বোধ, যেখানে শক্তিশালী ও দুর্বল, ধনী ও দরিদ্র, ব্যক্তি ও সমাজ– সবার অধিকার একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামোর মধ্যে সুরক্ষিত থাকে। ইসলামী পরিভাষায় ইনসাফ, আদল ও কিস্ত পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে এগুলো নির্দেশ করে এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে কেউ তার শক্তি বা পুঁজি ব্যবহার করে অন্যের অধিকার হরণ করতে পারে না।

কুরআনের দৃষ্টিতে অর্থনীতি কোনো স্বতন্ত্র, নৈতিকতা-বিচ্ছিন্ন ক্ষেত্র নয়। মানুষের বিশ্বাস, চরিত্র ও দায়িত্ববোধের সাথে অর্থনৈতিক আচরণ অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।

ইনসাফভিত্তিক অর্থনীতির আরেকটি মূল ভিত্তি হলো রিবা বা সুদ নিষিদ্ধকরণ। সুদভিত্তিক অর্থনীতি ঝুঁকিহীন আয় দেয়; কিন্তু শ্রম ও উৎপাদনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। জাকাত ইনসাফভিত্তিক অর্থনীতির কার্যকর পুনর্বণ্টনমূলক উপাদান, যা সম্পদকে সমাজের নির্দিষ্ট শ্রেণীর জন্য নিশ্চিত করে এবং দারিদ্র্য বিমোচনকে অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

রাসূল সা: বাজার নিষিদ্ধ করেননি, বরং নৈতিকতার আওতায় এনেছেন। মজুদদারি, প্রতারণা ও ওজনে কম দেয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তবে কৃত্রিম মূল্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাজারকে বিকৃত করেননি। এতে ভোক্তার অধিকার রক্ষা হয়েছে এবং উৎপাদক ও ব্যবসায়ীর উদ্যোগ সীমিত হয়নি। এই ভারসাম্যই ইনসাফের অর্থনীতির সৌন্দর্য, স্বাধীনতা আছে; কিন্তু সীমাহীন নয়, লাভ আছে; কিন্তু শোষণ নয়।

মদিনার রাষ্ট্রে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে গড়ে তোলা ভ্রাতৃত্ব কেবল সামাজিক উদ্যোগ ছিল না; বরং এটি সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাস। সম্পদ, বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের সুযোগ ভাগাভাগির মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত ও বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিকভাবে পুনর্বাসন করা হয়েছিল। আজকের ভাষায় এটিকে বলা যায় অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি, যা কাউকে পেছনে ফেলে রাখে না। সাহাবায়ে কেরাম ও খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামলেও এই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল।

হজরত উমর রা:-এর সময়ে ভূমি সংস্কার, বায়তুলমাল ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক নিরাপত্তার কাঠামো আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ধারণাকেও ছাড়িয়ে যায়। শিশু, বৃদ্ধ, অক্ষম এমনকি অমুসলিম নাগরিকদের জন্যও রাষ্ট্রের দায়িত্ব স্বীকার করা হয়েছিল। অর্থাৎ, ইনসাফের অর্থনীতি ধর্মীয় পরিচয়ের সীমারেখায় আবদ্ধ ছিল না; এটি মানবিক ন্যায়ের সর্বজনীন প্রকাশ ছিল। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট সত্য তুলে ধরে, ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শন আদতে ইনসাফভিত্তিক। এটি পুঁজিবাদের মতো কেবল প্রবৃদ্ধি চূড়ান্ত লক্ষ্য করে না, আবার সমাজতন্ত্রের মতো ব্যক্তিগত উদ্যোগকে দমনও করে না; বরং মানুষকে কেন্দ্রে রেখে অর্থনীতিকে পরিচালিত করতে চায়।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি অত্যন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক। এর জন্য প্রথমে আমাদের স্বীকার করতে হবে, দেশে ইনসাফের অভাব কেবল আয়-বিতরণের বৈষম্য বা দারিদ্র্যের মাত্রাতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং উৎপাদন ব্যবস্থার অপ্রতিসাম্য, সম্পদের প্রবেশাধিকার, সুযোগ ও ক্ষমতার অগোছালো বণ্টন এবং নীতিনির্ধারণের প্রক্রিয়াতেও গভীরভাবে উপস্থিত। গ্রামের সাধারণ কৃষক, ছোট ব্যবসায়ী, প্রান্তিক শ্রমজীবী এবং নারী-শিশু প্রায়ই এই অসাম্য ও অন্যায়ের মুখোমুখি হয়। শহরের মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তের তুলনায় তারা প্রায়ই ন্যায্য অর্থনৈতিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে।

অর্থনৈতিক বৈষম্যের সবচেয়ে বড় চিত্র দেখা যায় আয়-বিতরণে। বাংলাদেশের মোট আয় ও সম্পদের মধ্যে বড় অংশ কেন্দ্রীভূত ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর হাতে। এই বৈষম্য শুধু উপার্জনের ক্ষেত্রে নয়, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক সেবার সমান সুযোগের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান। একইভাবে, উৎপাদন ও ভোগের ক্ষেত্রে অসাম্য দৃঢ়ভাবে বিদ্যমান। উচ্চবিত্তের জন্য মূলধন, প্রযুক্তি ও বাজারে প্রবেশাধিকার সহজলভ্য, কিন্তু নিম্নবিত্তের জন্য এ সব প্রায় অসম্ভব। ফলে তারা শুধু আয়-উপার্জনের সুযোগে পিছিয়ে থাকছে না; বরং উৎপাদনের মাধ্যমে সমৃদ্ধি অর্জনের পথেও বাধাগ্রস্ত।

ভোগের ক্ষেত্রে বৈষম্য আরো স্পষ্ট। একই দেশীয় বাজারে খাদ্য, বিদ্যুৎ, পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করে বর্গভেদ। যারা ক্ষমতায় আছে, তারা উচ্চমূল্যের ভোগ্যপণ্যে সহজেই প্রবেশ করতে পারে, আর যারা ক্ষমতাহীন, তারা ন্যূনতম চাহিদা মেটাতেও সংগ্রাম করে। এ অবস্থায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠা মানে কেবল আয়ের সমতার দিকে মনোযোগ নয়; বরং উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থায় সমতার উদ্যোগ নেয়া।

উৎপাদনের ক্ষেত্রে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন ন্যায্য সম্পদ বণ্টন। কৃষিজমি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মূলধন, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। ছোট ও মধ্যবিত্ত কৃষক ও উদ্যোক্তাদের জন্য লোন, কৃষি ইনপুট, সেচ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা সহজলভ্য করতে হবে। শিল্পে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বাজারে প্রবেশাধিকার এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন ব্যবস্থায় বৈষম্য কমানো সম্ভব।

বণ্টনের ক্ষেত্রে ন্যায্য নীতি মানা জরুরি। কর ব্যবস্থা, সরকারি সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা জাল, ভর্তুকি ও বাজার নিয়ন্ত্রণ এমনভাবে ডিজাইন করতে হবে যাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা নিশ্চিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, ভর্তুকি ও সাবসিডি প্রায়ই বড় ব্যবসায়ীর কাছে যায়। যদি তা ন্যায্যভাবে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নির্ধারিত হয়, তখনই ইনসাফ প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

ভোগের ক্ষেত্রে ন্যায্যতা মানে কেবল দরিদ্রদের খাদ্য বা মৌলিক সেবার নিশ্চয়তা নয়; বরং তাদের ক্ষমতায়ন, বিকল্প নির্বাচনের সুযোগ এবং সমৃদ্ধিতে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা। অর্থাৎ, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা শুধু বিতরণের সাম্য নয়, এটি মানুষের ক্ষমতায়ন ও সমান অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিতকরণেও নিহিত।

অর্থনৈতিক ইনসাফ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো এমন এক ব্যবস্থা গঠন করা যেখানে উৎপাদন, বণ্টন ও ভোগের প্রতিটি স্তরে মানুষ সমান সুযোগ পায়, আর বৈষম্য হ্রাস পায়। এর জন্য শুধু নীতিমালা প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; সরকারি-বেসরকারি ও সামাজিক খাতের সমন্বিত উদ্যোগ, জনসচেতনতা এবং দক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো প্রয়োজন। বৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ কেবল আর্থিক স্থিতিশীলতা নয়, সামাজিক ও নৈতিক স্থিতিশীলতাও অর্জন করতে পারে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]