দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাষ্ট্রবিজ্ঞানে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের পদকে সবচেয়ে ক্ষমতাধর এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। সম্প্রতি ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্দেশে ক্ষীপ্র হামলা চালিয়ে আটক করে নিউ ইয়র্কের একটি কারাগারে এনে বন্দী করে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় বিশ্বব্যাপী তীব্র ক্ষোভ ও সেই সাথে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে একটি সার্বভৌম দেশের রাষ্ট্রপতিকে কিভাবে আটক করে নিয়ে এলেন?
আসলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কি সত্যি বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি? এ কথা সত্য যে, মার্কিন সংবিধান দেশটির প্রেসিডেন্টকে অনেক ক্ষমতা দিয়েছে; কিন্তু তা সীমাহীন নয়। বরং দেশটির সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি বৈশ্বিক রাজনীতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত করেছে। তিনি একাধারে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান। অধিকন্তু তিনি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে অগ্রসর প্রতিরক্ষাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক। বিশ্বের সর্বাধিক স্থানে রয়েছে পরমাণু শক্তির অধিকারী যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি। দেশটির প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের পূর্বানুমতিই ছাড়া জরুরি প্রয়োজনে যেকোনো দেশে সামরিক আক্রমণ বা হস্তক্ষেপ করতে পারেন।
পঞ্চাশটি অঙ্গরাজ্য নিয়ে গঠিত ৩৫ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি দীর্ঘ দিন ধরে এক নম্বরে রয়েছে। যদিও ইতঃপূর্বে জাপান এবং সাম্প্রতিককালে চীনের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রকে প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে। সুতরাং শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব অর্থনীতিতে বিশাল প্রভাব প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা করেছে। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির পতনের পরে বিশ্বে এখন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী অর্থনীতির দাপট চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাণিজ্য শুল্ক আরোপ, সুদের হার ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর, অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ ইত্যাদি ক্ষেত্রে ক্ষমতা প্রয়োগ ও প্রভাব খাটিয়ে থাকেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বিভিন্ন দেশের ওপর বাণিজ্য শুল্ক বাড়িয়ে চমক দেখিয়েছেন, যা এখনো চলমান। এটা নিয়ে তিনি রাজনৈতিক দরকষাকষিও করছেন। বস্তুত মার্কিন বাণিজ্যনীতি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে।
প্রতিরক্ষা ও সামরিক শক্তির ক্ষেত্রে নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন (ন্যাটো) বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোট। ইউরোপের প্রধান দেশগুলো ন্যাটোর সদস্য। মুসলিম বিশ্বের একমাত্র দেশ তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য। ন্যাটোর নেতৃত্বে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্য দিকে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্ববাণিজ্য সংস্থায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাব। ওই সব সংস্থাগুলোতে আর্থিক অবদান তাদেরই বেশি। এসব সংস্থার ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ইতিবাচক বা নেতিবাচক নীতিকৌশল বিশ্ব-অর্থনীতি ও রাজনীতিতে বিরাট প্রভাব ফেলে।
বিভিন্ন দেশের সরকার পরিবর্তনের পর বা নতুন রাষ্ট্র গঠিত হলে তার স্বীকৃতিজ্ঞাপনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা বা অনিচ্ছার প্রতিফলন ঘটে। তিনি চাইলে কোনো রাষ্ট্র বা সরকারকে স্বীকৃতি দিতে পারেন বা নাও দিতে পারেন। তা বহু দেশের পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের ওপর অর্থনৈতিক বা বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। তা সংশ্লিষ্ট দেশ বা প্রতিষ্ঠানকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করে, তেমনি বিশ্ববাণিজ্যেও তা তীব্রভাবে প্রভাব ফেলে। ইরান ও রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশের ওপর আরোপিত বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ওই রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতিকে ভীষণ চাপে ফেলেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের অভিপ্রায়ে বিশ্বের গণমাধ্যমগুলো প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে বৈশ্বিক জনমত গঠনে বিরাট ভূমিকা পালন করে। যেমন ইরাকে রসায়নিক অস্ত্র রয়েছে বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নিরন্তর যুদ্ধের নামে ‘ইসলামোফোবিয়া’ তৈরিতে মার্কিন ও বিশ্ব গণমাধ্যমের অপপ্রচারের কাহিনী সবার জানা। এর মধ্য দিয়ে পাশ্চাত্য সংস্কৃৃতির আগ্রাসন ও প্রভাব সম্প্রসারিত হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি কাজটি আরো সহজ করে দিয়েছে। দেশটি বিশ্বব্যাপী বহু অপকর্মের নাটের গুরু হওয়া সত্তে¡ও গণতন্ত্র, নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে নিজের ইমেজ পরিচ্ছন্ন ও নেতৃস্থানীয় করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশাল ক্ষমতার ফিরিস্তি দেয়ার পর এবারে আমরা তার ও তার দেশের আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের ইতিহাস একটু খতিয়ে দেখি।
ঊনবিংশ শতাব্দীজুড়ে নেটিভ আমেরিকান তথা সেই জনপদের আদিবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাদের বিশাল ভূখণ্ড দখল এবং লাখো মানুষ হত্যা করা হয়। এমনকি এখনো ওই জনগোষ্ঠীর যে প্রজন্ম টিকে আছে; তারাও নানাভাবে মার্কিন সমাজে কোণঠাসা। যুক্তরাষ্ট্র ১৮৪৬ থেকে ১৮৪৮ সালে মেক্সিকোর বিরুদ্ধে দুই বছরব্যাপী যুদ্ধ চালিয়ে ক্যালিফোর্নিয়া ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল মেক্সিকান ভূখণ্ড দখল করে নেয়। দেশটি ১৮৯৮ সালে স্প্যানিসদের বিরুদ্ধে কিউবায় আগ্রাসন চালায়। একইভাবে পুয়ের্তোরিকো, গুয়াম ও ফিলিপাইন নিয়ন্ত্রণে নেয়। ১৮৯৯-১৯০২ সাল পর্যন্ত ফিলিপাইনের স্বাধীনতাযুদ্ধ প্রতিহত করার চেষ্টা করে। বিশ শতকের শুরু থেকে মধ্য পর্যন্ত ল্যাটিন আমেরিকার হন্ডুরাস, নিকারাগুয়া, হাইতি ও কিউবায় মার্কিন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার নামে সামরিক অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে দেশগুলো অস্থিতিশীল করে রাখতে দায়ী ছিল যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৫ সালে ইউরোপীয় মিত্রশক্তির সাথে গাঁটছড়া বেঁধে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিজেকে জড়িত করে। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাশাকিতে আণবিক বোমা ফেলে মানবতাবিরোধী ধ্বংসযজ্ঞে লিপ্ত হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত কোল্ডওয়ার বা ঠাণ্ডা লড়াইয়ের নামে চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব প্রতিহত করার অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র কোরিয়ায় আগ্রাসন চালায়। ফলে কোরিয়া দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। দেশটি ১৯৫৫-৭৫ সাল পর্যন্ত ভিয়েতনামে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ প্রতিহত করার নামে বিশ বছরব্যাপী যুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়। এ যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক ভিয়েতনামি নিহত হয়। বিশাল ক্ষতি ও প্রাণহানির পর যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। সামরিক আগ্রাসনের পাশাপাশি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র সহায়তায় ১৯৫৩ সালে ইরানে, ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালায়, ১৯৭৩ সালে চিলিতে নির্বাচিত সরকার উৎখাত করা হয়। দেশটি ১৯৮০-এর দশকে এল সালভেদর, নিকারাগুয়া ও আরো কয়েকটি দেশে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সহযোগিতা করে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিবেশী ইরাক যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে ওয়াশিংটন সর্বাত্মক সাহায্য করে বাগদাদকে। পক্ষান্তরে, ১৯৯১ সালে ইরাক কুয়েত দখল করলে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ১৯৯৯ সালে ন্যাটোর নেতৃত্বে যুগো¯øাভিয়ার বিরুদ্ধে বোমা হামলায় যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব দেয়।
নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারে বিমান হামলার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নিরন্তর যুদ্ধের’ নামে ২০০১ সাল থেকে ২১ বছর ধরে আফগানিস্তানে তালেবানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে অবশেষে পরাজয় বরণ করে। ২০০৩ সালে ইরাকে রসায়নিক অস্ত্র থাকার অজুহাতে সে দেশে সামরিক আগ্রাসন চালায় ওয়াশিংটন এবং ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে আটক করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে। একই কায়দায় ২০১১ সালে লিবিয়ায় সামরিক হামলা চালায়। প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফিকে হত্যা করে। সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের সময়ে বাশার আল আসাদ সরকারকে উৎখাতে সামরিক আগ্রাসন চালায়। মার্কিন সামরিক ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে ইসরাইল বছরের পর বছর ফিলিস্তিনে আগ্রাসন ও নির্মম গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তির প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রণ, ভূখণ্ড দখল, অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার উৎখাত ও অর্থনৈতিক স্বার্থে দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। এর সর্বশেষ সংযোজন ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আটক করে আনার ঘটনা। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলছেন, এখন থেকে ভেনিজুয়েলার তেলসম্পদের ওপর তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে। ভেনিজুয়েলায় বিশ্বের অপরিশোধিত তেলের সর্বাধিক মজুদ রয়েছে। শুধু ভেনিজুয়েলা নয়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর তেলসম্পদের ওপরেও রয়েছে মার্কিন শ্যেনদৃষ্টি। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশগুলোতে তেলের সরবরাহ নির্বিঘœ রাখা ও এর বাজারদর নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে তারা প্রাধান্য দেয়। দুর্বল দেশগুলোকে কূটনৈতিকভাবে বাগে রাখা এবং তা সম্ভব না হলে সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও লুণ্ঠন করা হচ্ছে মার্কিন কৌশল। যেমন সৌদি আরবকে কূটনৈতিক ও গোপন সমঝোতার মাধ্যমে রাজতন্ত্রকে নিরাপত্তা দেয়ার বিনিময়ে মার্কিন মিত্র হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। একইভাবে ওমান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত মার্কিন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এমনকি এসব দেশ ইসরাইলের সাথে কোনো বিবাদ এড়িয়ে চলে।
ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়াকে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি বলে সেখানে সামরিক আগ্রাসন চালানো হয়। ইরানকে কুপোকাত করতে নানাবিধ অবরোধ আরোপসহ দুর্বল করে রাখা হয়েছে। ভেনিজুয়েলার প্রতি মার্কিন আগ্রাসনের আরেকটি কারণ, দেশটির তেলের ওপর রাশিয়া ও চীনের বাণিজ্য সুযোগ বন্ধ করা। এর মাধ্যমে অন্যতম বৃহৎ আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় মার্কিন প্রতিদ্ব›দ্বী রাশিয়া ও চীনকে মোকাবেলা করা হচ্ছে। বিশ্বে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক গতিপ্রবাহ টেকসই রাখা, সমরাস্ত্র ও অন্যান্য শিল্প সচল রাখা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার কাজ অব্যাহত রেখেছে। সে জন্য দেশটি নীতিনৈতিকতা ও আন্তর্জাতিক আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে যা তা করে যাচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র তথা দেশটির প্রেসিডেন্টের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের কি কোনো আন্তর্জাতিক আইন-কানুন নেই? আগ্রাসী রাষ্ট্রগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর লিগ অব নেশনস গঠিত হয়েছিল; কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে তার ব্যর্থতা প্রমাণিত হয়। এরপর ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতিসঙ্ঘ। অনেক আশার কথা শুনিয়ে এটি যাত্রা শুরু করলেও পাঁচটি দেশের ভেটো ক্ষমতা থাকায় সংস্থাটি কার্যকারিতা হারিয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণের কথা ধরা যাক। দেশটি ২০০৩ সালে নিরাপত্তা পরিষদের কোনো প্রকার অনুমোদন ছাড়া ইরাকে সামরিক হস্তক্ষেপ করে। অথচ ইরাক যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো নিরাপত্তা হুমকি সৃষ্টি করেনি। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন জাতিসঙ্ঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে। ইরাকের বিরুদ্ধে কথিত রাসায়নিক অস্ত্র উৎপাদনের অভিযোগ পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। তখন জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব কফি আনান বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইরাকে হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণ বেআইনি। আশির দশকে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসঙ্ঘ সনদ লঙ্ঘন করে নিকারাগুয়ার কন্ট্রা বিদ্রোহীদের পক্ষে সামরিক অভিযান চালায়। বিষয়টি নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে মামলা হলে ১৯৮৬ সালে কোর্ট তার রায়ে যুক্তরাষ্ট্রকে দোষী সাব্যস্ত করে। কোর্ট সামরিক হস্তক্ষেপকে বেআইনি, সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন ও যুদ্ধাপরাধী বিদ্রোহীদের পক্ষাবলম্বন বলে অভিমত দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ওই রায়কে পাত্তা দেয়নি। দেশটি ওই আন্তর্জাতিক আদালতের জাতিসঙ্ঘ সনদ অনুস্বাক্ষর করেনি। এ ছাড়াও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে তারা পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সোমালিয়া, সিরিয়া, ইরান ও ইয়েমেনে ড্রোন হামলা চালিয়ে দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব উপর্যুপরি লঙ্ঘন করেছে। এসব হামলায় বহু মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হন। অনেকের স্মৃতিতে আছে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের নামে বিভিন্ন দেশ থেকে মুসলিমদের ধরে এনে আবু গারিব কারাগার ও গুয়ান্তানামো বে কারাগারে বহু মানুষকে নিপীড়ন ও নির্যাতন করা হয়। এরূপ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশটি জেনেভা কনভেনশন, ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস ও নির্যাতনবিরোধী জাতিসঙ্ঘ কনভেনশন লঙ্ঘন করে। অথচ দেশটি এসব কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী। বিভিন্ন সময়ে ইরান, ইরাক, ভেনিজুয়েলা, কিউবা প্রভৃতি দেশের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে খাদ্য, ওষুধ ও জরুরি সরবরাহ বন্ধ করে শিশুসহ অনেকের জীবন বিপন্ন করে তোলে যা জাতিসঙ্ঘ ঘোষিত মানবাধিকার সনদ লঙ্ঘনের শামিল। ইসরাইলের সব অপরাধের বিরুদ্ধে যখনই জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে কোনো প্রস্তাব উত্থাপিত হয়, তখনই যুক্তরাষ্ট্র তাতে ভেটো দেয়। ফলে জাতিসঙ্ঘের কোনো প্রস্তাব বা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। এর ফলে প্যালেস্টাইন সমস্যার সমাধান হচ্ছে না যুগ যুগ ধরে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সমগ্র দুনিয়া দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল : যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী ব্লক এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক ব্লক। সমগ্র ইউরোপও দ্বিধাবিভক্ত ছিল। সামরিক ক্ষেত্রে ছিল মার্কিন নেতৃত্বে ন্যাটো এবং সোভিয়েত নেতৃত্বে ওয়ারশ প্যাক্ট। কিন্তু সময়ের আবর্তনে আশির দশকে সমাজতান্ত্রিক ব্লকের পতন ঘটে। ওয়ারশ প্যাক্টও বিলুপ্ত হয়ে যায়। ফলে পুঁজিবাদী আমেরিকার নেতৃত্বে বিশ্ব একক বলয়ে আবর্তিত হচ্ছে। মাঝখানে জোটনিরপেক্ষ দেশগুলোর সম্মেলন নামে একটি সংস্থার উন্মেষ ঘটলেও তা টিকেনি। মুসলিম দেশগুলোর উদ্যোগে ওআইসি গঠিত হয়ে কিছুকাল তৎপর থাকলেও তাও মার্কিন কূটনীতির বিপরীতে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। আরব লিগ, আসিয়ান বা আফ্রিকান ইউনিয়নও স্বকীয় অবস্থানে নিজেদের সংহত করতে পারেনি। ফলে এখন বিশ্ব দেখতে পাচ্ছে মার্কিন নেতৃত্বে পুঁজিবাদের দাপট। জাতিসঙ্ঘ তার হাতের মুঠোয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো আরো চারটি দেশ ভেটো ক্ষমতার অধিকারী হলেও আমেরিকাকে সংযত করতে পারছে না। চীন অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বড় প্রতিদ্ব›দ্বী হিসেবে আবিভর্ূত হলেও বিশ্বকে শাসন করার শক্তি কতটা অর্জন করতে পারবে তা বলা মুশকিল। তার মানে, বিশ্ব এখন চলছে এক অনিশ্চিত গন্তব্যে।
লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব



