অধ্যাদেশ বিতর্ক : সংস্কারের ভবিষ্যৎ

‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর ওপর আইন মন্ত্রণালয়ের আনা সংশোধনী প্রস্তাবটি একটি গভীরতর সঙ্কটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে অধ্যাদেশের ৭ নম্বর ধারাটি ছেঁটে ফেলার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসনের জন্য এক চরম অশনিসঙ্কেত। এই ধারাই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়কে নিম্ন আদালতের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের প্রকৃত আইনি শক্তি প্রদান করেছিল। এটা পরিবর্তনের মাধ্যমে আইন মন্ত্রণালয় সুকৌশলে বিচারালয়ের ওপর নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, যা নিম্ন আদালতের বিচারিক স্বাধীনতাকে বহুলাংশে অর্থহীন করে তুলবে

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন। সংসদীয় অনুমোদন ছাড়াই কার্যকর হওয়া এই আইনগুলো ছিল মূলত একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা। বিএনপি মনে করে, এগুলোর স্থায়িত্ব ছিল নিছক সাময়িক, একটি নির্বাচিত সংসদের অনুমোদনের ওপর যা নির্ভরশীল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সেই সংসদীয় পর্যালোচনার সময়টি এখন সমাগত।

২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর, ১২ মার্চ ২০২৬ তারিখে সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হয়। সংবিধানের ৯৩(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রতিটি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করতে হবে এবং অনুমোদিত না হলে ৩০ দিনের মধ্যে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। বাস্তব অর্থে, আগামী ১২ এপ্রিল পর্যন্ত সংসদ সময় পাচ্ছে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য যে, এই ১৩৩টি আইনের মধ্যে তারা কোনগুলো রাখবে, আর কোনগুলোকে কেবল নিষ্ক্রিয়তার মাধ্যমে তামাদি হওয়ার পথে ঠেলে দেবে। আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক অবস্থান থেকে এটি স্পষ্ট যে, জনবান্ধব হিসেবে পরিচিত বেশ কিছু অধ্যাদেশ নতুন সরকার বহাল নাও রাখতে পারে। যার মধ্যে রয়েছে ‘শ্রমিক স্বার্থ রক্ষা ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’ এবং ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’। এই ধরনের আইনগুলো তামাদি হতে দেয়ার এই স্পষ্ট অভিপ্রায় একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে : নতুন সরকার কি তবে আইনি সুরক্ষাকবচগুলো ভেঙে ফেলতে চাইছে? এটি কি তবে সেই পুরনো দমনমূলক আইনি কাঠামো পুনর্নির্মাণেরই পূর্বাভাস, যার ছায়াতলে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ব্যবহার করে সাধারণ নাগরিকদের ওপর অবর্ণনীয় নিপীড়ন চালানো হয়েছিল? এই নিবন্ধে আমি বিশ্লেষণ করব, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংসদ নিয়ন্ত্রণ করা সত্ত্বেও বিএনপি যদি এই অধ্যাদেশগুলো বহাল না রাখে, তবে আসলে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

প্রথমেই যে বিষয়টি আমাদের অনুধাবন করা প্রয়োজন তা হলো, এই অধ্যাদেশগুলোকে সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদের অধীনে জারি করা কেবল সাধারণ কোনো রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো যে প্রেক্ষাপটে প্রণীত হয়েছিল, তা মোটেও সাধারণ ছিল না। তৎকালীন সংসদ কোনো প্রচলিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় ভেঙে দেয়া হয়নি; বরং গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তা কার্যত ভেঙে পড়েছিল। এ সময়ে বিদায়ী সরকারের সদস্যরা হয় দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন অথবা আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন। সেই বিশেষ পরিস্থিতিতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কোনো প্রথাগত আইনি সূত্র থেকে নয়; বরং সরাসরি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে। সাংবিধানিক পরিভাষায় এটি জনগণের সেই ‘গাঠনিক ক্ষমতা’, যা একটি সফল বিপ্লবোত্তর রাষ্ট্রকে নতুন করে সাজানোর অবারিত ও আদি অধিকার দান করে। একটি জাতির রাজনৈতিক ও আইনি খোলনলচে বদলে দেয়ার এই চূড়ান্ত ক্ষমতাটিই ছিল এই সরকারের মূল ভিত্তি।

প্রচলিত সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে এমন অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। এটি গঠিত হয়েছিল সরাসরি গণ-আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে। একটি ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করা এবং যে সাংবিধানিক শৃঙ্খলা তার নৈতিক ভিত্তি হারিয়েছিল, তাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা বা সংস্কারের এক সুকঠিন দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল এই সরকারকে। ফলে এই বিশেষ সময়ে জারি হওয়া অধ্যাদেশগুলো কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার সাময়িক কোনো বন্দোবস্ত বা তাৎক্ষণিক আইনি সমাধান মাত্র ছিল না। এগুলো ছিল স্বৈরাচারী শাসনের পুনরুত্থান ঠেকানো এবং বিগত বছরগুলোর অপশাসনের ক্ষত সারিয়ে তোলার এক বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। এই পদক্ষেপগুলোর লক্ষ্য ছিল আইনি সুরক্ষাকবচ শক্তিশালী করা, প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা এবং গত কয়েক বছরে ক্ষতিগ্রস্তদের কিছুটা হলেও প্রতিকার দেয়া। সেই কারণেই এগুলোকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। বস্তুতপক্ষে, এই অধ্যাদেশগুলো ছিল একটি ‘অসাধারণ সাংবিধানিক মুহূর্তের’ ফসল। এগুলো বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায় এবং একই সাথে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পুনর্বাসন ও সহায়তা প্রদান করা সম্ভব হয়।

ভবিষ্যতের যেকোনো সরকারের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯’ বাতিল করে তার পরিবর্তে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ প্রবর্তন করে। ২০০৯ সালের আইনটি মানবাধিকার কমিশনকে দুর্বল এবং সরকারের ওপর নির্ভরশীল করে রাখার কারণে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল। এর বিপরীতে, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশটিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য হলো এই প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা ও কর্তৃত্বকে আরো শক্তিশালী করা।

মানবাধিকার কমিশনকে একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে গড়ে তোলার পথে ২০২৫ সালের অধ্যাদেশটি যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে, তা হলো এর শীর্ষ পদের নিয়োগ পদ্ধতি। বিগত ২০০৯ সালের আইনে এই স্পর্শকাতর প্রক্রিয়াটি নির্বাহী বিভাগের একচ্ছত্র আধিপত্যের অধীনে ছিল, যা কমিশনের নিরপেক্ষতাকে শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে রাখত। কমিশন গঠনের গুরুদায়িত্ব ছিল যে বাছাই কমিটির হাতে, তার বিন্যাসই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। স্পিকারের সভাপতিত্বে গঠিত সেই পর্ষদে আইন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশাপাশি রাখা হয়েছিল সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্যকে। এর বাইরে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের উপস্থিতি কমিটির ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রভাবকে আরো নিরঙ্কুশ করেছিল। বাছাই কমিটিতে স্পিকার, দু’জন মন্ত্রী এবং সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্যের উপস্থিতির অর্থ হলো, ক্ষমতাসীন দলের হাতে সেখানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা। এর ফলে কমিশনের স্বাধীনতা বজায় রাখা কিংবা কোনো নিরপেক্ষ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ সেখানে ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ।

তবে, অন্তর্বর্তী সরকারের ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে একটি অধিকতর স্বাধীন বাছাই কমিটির বিধান রাখা হয়েছে। এই নতুন কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি। অন্যান্য সদস্যের মধ্যে থাকবেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) মনোনীত একজন নারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত একজন মানবাধিকার কর্মী বা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি (অথবা তার মনোনীত একজন সাংবাদিক), ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত সম্প্রদায়ের একজন প্রতিনিধি এবং সরকারি ও বিরোধী দল থেকে একজন করে মোট দু’জন সংসদ সদস্য। বাছাই কমিটিতে বিচারক, শিক্ষাবিদ, সুশীল সমাজ, সাংবাদিক এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের স্থান দেয়ার মধ্য দিয়ে নির্বাহী বিভাগের একচ্ছত্র প্রভাব খর্ব করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক পথ তৈরি হয়েছে। এই বৈচিত্র্যময় প্রতিনিধিত্ব কেবল নিয়োগের ক্ষেত্রেই নয়; বরং পুরো ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও পেশাদার স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এক রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, নতুন ক্ষমতাসীন জোটের কর্মকাণ্ডে মানবাধিকার কমিশনকে সত্যিকারের স্বায়ত্তশাসন দেয়ার কোনো সদিচ্ছা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। সরকারের নীতিগত অবস্থান থেকে এটি স্পষ্ট যে, তারা ২০২৫ সালের এই সংস্কারমূলক অধ্যাদেশটিকে স্থায়ী আইনি ভিত্তি দেয়ার পরিবর্তে এর মেয়াদ শেষ হতে দিয়ে একে অকার্যকর করে দেয়ার পথেই হাঁটছে। আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দেয়া যুক্তিগুলো এখানে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। একটি কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে যে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের আওতায় রাখা হয়নি। অন্যটি হলো, এই অধ্যাদেশটি দেশের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলাবাহিনীর কাজের পরিধি ও দায়বদ্ধতার সাথে সম্পৃক্ত। এসব যুক্তি বিচার করলে বর্তমান সরকারের গতিপ্রকৃতি বুঝতে আর কোনো অস্পষ্টতা থাকে না। একটি শক্তিশালী ও স্বায়ত্তশাসিত মানবাধিকার কমিশন গঠন, তাদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় নেই।

বিশেষ করে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য কোনো স্বাধীন তদারকি সংস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারের একধরনের অনীহা ও অস্বস্তি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে। বরং এর পরিবর্তে, সরকার এমন একটি কমিশনকেই প্রাধান্য দিচ্ছে যা মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ঠিক এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মানবাধিকার কমিশনকে দুর্বল করে ফেলেছিল এবং গত ১৫ বছরের ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর পথ প্রশস্ত করেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে বিচার করলে, আইন মন্ত্রণালয়ের বর্তমান এ অবস্থান একটি গভীর উদ্বেগের বিষয়।

সরকার ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’ আইনটিও বহাল রাখতে ইচ্ছুক নয়। আইন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই আইনটি বাতিল করার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এর সাথে সরকারের শৃঙ্খলাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায় সম্পৃক্ত। এই ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, সরকারের আসল উদ্দেশ্য হলো নিরাপত্তাবাহিনীকে গুমের মতো অপরাধের তদন্ত এবং সম্ভাব্য জবাবদিহিতা থেকে আড়াল করে ‘দায়মুক্তির সংস্কৃতি’ বজায় রাখা। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক, কারণ এই অধ্যাদেশটি কেবল গুমের তদন্ত বা শাস্তির জন্যই নয়, বরং গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্যও তৈরি করা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা একটি ভয়াবহ মানবাধিকার সঙ্কটের আইনি প্রতিকার। সরকারের এই পিছুটান আরো বেশি উদ্বেগজনক এই কারণে যে, এই অধ্যাদেশটি ছিল ‘গুম থেকে সব ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক কনভেনশন’-এর প্রতি বাংলাদেশের যে অঙ্গীকার, তার একটি বাস্তব প্রতিফলন। এটি বাতিল করা মানে হলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের দেয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসা। বাংলাদেশ যেহেতু এই আন্তর্জাতিক কনভেনশনের একটি পক্ষভুক্ত রাষ্ট্র, তাই এর প্রতিটি বিধানকে দেশের অভ্যন্তরীণ আইনে কার্যকর করা আমাদের জন্য একটি আইনি বাধ্যবাধকতা। ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’-কে এভাবে বাতিল বা তামাদি হতে দেয়ার মাধ্যমে সরকার মূলত আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে থাকা তার নিজের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার ঝুঁকিতে পড়ছে।

সর্বোপরি, ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর ওপর আইন মন্ত্রণালয়ের আনা সংশোধনী প্রস্তাবটি একটি গভীরতর সঙ্কটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে অধ্যাদেশের ৭ নম্বর ধারাটি ছেঁটে ফেলার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসনের জন্য এক চরম অশনিসঙ্কেত। এই ধারাই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়কে নিম্ন আদালতের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের প্রকৃত আইনি শক্তি প্রদান করেছিল। এটা পরিবর্তনের মাধ্যমে আইন মন্ত্রণালয় সুকৌশলে বিচারালয়ের ওপর নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, যা নিম্ন আদালতের বিচারিক স্বাধীনতাকে বহুলাংশে অর্থহীন করে তুলবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশগুলোর বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় যে দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছে, তা গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, রাষ্ট্র হয়তো আবারো সেই পুরনো নিয়ন্ত্রণকামী মানসিকতার আবর্তে আটকা পড়ছে। আমরা কি তবে একটি স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে কেবল আরেকটি নিয়ন্ত্রণকামী কাঠামোর দিকেই ধাবিত হচ্ছি? আমরা আশা করি, আমাদের সংসদ সদস্যবৃন্দ এই নেতিবাচক প্রস্তাবগুলো প্রত্যাখ্যান করবেন এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’ ও ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ বহাল রাখবেন। একই সাথে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যাতে কোনোভাবেই খর্ব না হয়, তা নিশ্চিত করাও তাদের পবিত্র দায়িত্ব।

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি