সুদমুক্ত বিশ্ব অর্থনীতি

এখন প্রয়োজন একটি বৈশ্বিক সংলাপ, যেখানে নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, উদ্যোক্তা এবং সাধারণ মানুষ একসাথে আলোচনা করবে; কিভাবে আর্থিক ব্যবস্থা আবারো উৎপাদন, মর্যাদা এবং মানবকল্যাণের সহায়ক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়। শুধু তখনই পৃথিবী এগিয়ে যেতে পারবে শান্তি, সমৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের পথে; যদি বিশ্ব একযোগে এগোয়

মেজর (অব:) মো: আখতারুজ্জামান
মেজর (অব:) মো: আখতারুজ্জামান |নয়া দিগন্ত

সময়ের পেক্ষাপটে বৈশ্বিক আর্থিক-ব্যবস্থা নিয়ে নতুনভাবে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, যেখানে বিশ্বকে বাস্তব মূল্যভিত্তিক অর্থনীতির পথে এগিয়ে যেতে হবে। আজকের বিশ্ব অর্থনীতি এক বৈপরীত্যে এসে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতি এক বিস্ময়কর বৈপরীত্যে দাঁড়িয়ে আছে। মানবসভ্যতা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, উৎপাদন সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক সংযোগে অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে এমন জ্ঞান ও সম্পদ আছে, যা দিয়ে কোটি কোটি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা, অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। তবু আমরা সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক অস্থিরতা, বৈষম্য বৃদ্ধি, আর্থিক সঙ্কট এবং সামাজিক অনিশ্চয়তার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করি। এ বাস্তবতায় একটি মৌলিক প্রশ্ন নতুনভাবে আলোচনার দাবি রাখে, তা হলো বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার প্রকৃত ভূমিকা কী?

গত কয়েক শতকে অর্থনীতি পরিচালনার সহায়ক একটি যন্ত্র হিসেবে থাকা অর্থব্যবস্থা ধীরে ধীরে এমন এক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যা জাতীয় নীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবাহকে প্রভাবিত করতে সক্ষম।

অনেক ক্ষেত্রে মনে হয়, আর্থিক ব্যবস্থার প্রভাব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে– তা কখনো রাষ্ট্রের ক্ষমতার সাথেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এ পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে– আধুনিক আর্থ-ব্যবস্থা কি তার মূল উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছে? যেখানে কাজ ছিল বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করা।

অর্থের প্রকৃতি যা হলো আস্থার একটি উপকরণ, তাই অর্থ কোনো পণ্য নয়। অর্থ নিজে কোনো সম্পদ নয়। এটি মূলত একটি সামাজিক আস্থার উপকরণ, যা সমাজের সম্মতিতে এবং রাষ্ট্রের কর্তৃত্বে চালু হয়। অর্থের প্রধান কাজ বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে কাজ করা, যাতে পণ্য ও সেবা সহজে আদান-প্রদান করা যায়। একটি মুদ্রা বা কাগুজে নোট যদি কোনো বাক্সে, সিন্দুকে বা ব্যাংকের ভল্টে পড়ে থাকে, তবে তা নিজে কিছু উৎপাদন করে না। এটি ফসল ফলায় না, রাস্তা তৈরি করে না, বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না, শিল্প গড়ে তোলে না কিংবা কোনো সেবা প্রদান করে না। বাস্তব সম্পদ সৃষ্টি হয় তখন, যখন মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা, উদ্যোগ এবং শ্রম প্রাকৃতিক সম্পদকে রূপান্তর করে উৎপাদনে পরিণত করে। যেখানে ছাপানো নোট বা মুদ্রার কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকে না। যখন অর্থ কৃষি, শিল্প, প্রযুক্তি বা অবকাঠামোয় বিনিয়োগ হয়, তখন তা বাস্তব মূল্য সৃষ্টির অংশ হয়ে ওঠে। সেখানে ঝুঁকি, পরিশ্রম ও উদ্ভাবন একত্রে নতুন সম্পদ তৈরি করে। কিন্তু যখন অর্থ কেবল নির্ধারিত সুদের বিনিময়ে ধার দিয়ে আয় করে, তখন একটি ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি হয়। তখন মুনাফা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে নয়; বরং শুধু পুঁজির মালিকানায় অর্জিত হয়, যা আজকে বিশ্ব অর্থনীতিকে শোষণের হাতিয়ারে রূপান্তরিত করেছে।

আর্থিক ক্ষমতার বিস্তার সময়ের সাথে সাথে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এমন অনেক আর্থিক-কার্যক্রমে দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে, যা অনেক সময় বাস্তব উৎপাদন কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়। বিশ্বজুড়ে বিপুল আর্থিক সম্পদ সীমান্ত অতিক্রম করে ঘুরে বেড়ায় এবং বিভিন্ন জটিল আর্থিক যন্ত্র ও বাজার ক্রমে অর্থনীতির বড় অংশ দখল করে নিচ্ছে। এ ধরনের ব্যবস্থায় অনেকসময় দেখা যায়, বাস্তব উৎপাদনের অংশ না হয়েও অর্থ নিজে আরো অর্থ উৎপাদন করছে, যা সরাসরি বিশ্ববাজারের মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রাস্ফীতিতে স্বক্রিয় ভূমিকা রাখে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী একটি উদ্বেগ তৈরি হয়, আর্থিক পুঁজি কখনো এমন কঠিন ও ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে, যা অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ, বিনিয়োগের প্রবাহ এবং নীতিনির্ধারণী পরিবেশ প্রভাবিত করে। এ পরিস্থিতির ফল হতে পারে– অতিরিক্ত ঋণের বোঝা, জল্পনামূলক বুদবুদ বা স্পেকুলেশন, সম্পদের ঘনত্ব বাড়ানো এবং এমন আর্থিক সঙ্কট, যা পুরো জাতিকে প্রভাবিত করতে পারে। এ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সুদভিত্তিক ঋণব্যবস্থা ও তার নৈতিক প্রশ্ন। অনেক আর্থিক কাঠামোতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সফল বা ব্যর্থ হোক, তা বিবেচনায় না নিয়ে পুঁজি প্রদানকারী নির্ধারিত হারে লাভ পায়। ফলে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অহেতুক ও অনৈতিক উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। ঝুঁকির ভারসাম্যে একটি বৈষম্য তৈরি করে। উৎপাদনকারী, উদ্যোক্তা ও শ্রমজীবী মানুষ বাস্তব ঝুঁকি বহন করে; কিন্তু পুঁজির মালিক তেমন কোনো ঝুঁকি না নিয়ে নির্ধারিত আয় পেয়ে যায়। পুঁজির মালিক নিশ্চিত কোনো ঝুঁকি নিয়ে অর্থ বা পুঁজি খাটায় না। এ কাঠামো কখনো এমন একটি অর্থনীতির জন্ম দেয়, যেখানে ঋণ অর্থনৈতিক জীবনের মূল বা আবশ্যিক উপাদানে পরিণত হয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান এবং এমনকি রাষ্ট্রও এমন ঋণচক্রে আটকে যেতে পারে, যেখানে অর্থনৈতিক উৎপাদনের বড় অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়। এ বাস্তবতা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে, সুদবিহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অংশীদারত্ব, ঝুঁকি ভাগাভাগি এবং বাস্তব উৎপাদনভিত্তিক বিনিয়োগের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত। তাই একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির দিকে আর্থিক ব্যবস্থা নিয়ে যাওয়ার কল্পনা করা মানে, অর্থ বা বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা নয়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন বয়ানে পুঁজি প্রয়োজন; যেখানে অবকাঠামো নির্মাণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন, কৃষি সম্প্রসারণ এবং শিল্পায়নে বিনিয়োগ অপরিহার্য। কিন্তু সেই পুঁজি হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ ও অনুৎপাদনশীল সব ধরনের ব্যয় পরিহার করে। তখন প্রয়োজন হবে এমন একটি কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে অর্থব্যবস্থা উৎপাদনের সহায়ক শক্তি হবে, যেখানে পুঁজি স্বাধীন মুনাফার উৎস হবে না। তাই আজকের বিশ্ব অর্থনীতির বাস্থবতায় একটি সুস্থ অর্থনৈতিক কাঠামোতে গুরুত্ব দেয়া যেতে পারে। যেখানে, বাস্তব উৎপাদনের সাথে যুক্ত হবে বিনিয়োগ, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীর মধ্যে ঝুঁকি ভাগাভাগি। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নমুখী আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে। সেই সাথে জল্পনামূলক অতিরিক্ত কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। এমন একটি বিশ্ব অর্থব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যেখানে সম্পদের মূল উৎস হবে মানবমেধা, শ্রম ও উদ্যোগ।

একটি ভারসাম্যপূর্ণ আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে নেতৃত্বের মান এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির ওপর। যেখানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেখানে আর্থিক ব্যবস্থা সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে পরিচালনা করা সম্ভব; কিন্তু যদি আর্থিক ক্ষমতা অতিরিক্তভাবে কেন্দ্রীভূত হয়ে যায়, তাহলে অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার অনেকসময় দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক কল্যাণের পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি আর্থিক লাভের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজন দায়িত্বশীল নীতিনির্ধারণ, আন্তর্জাতিক সংলাপ এবং এমন একটি সর্বজনীন বিশ্ব নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি, যাতে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি থাকে ন্যায়, উৎপাদন এবং যৌথ সমৃদ্ধি।

এই আলোচনার উদ্দেশ্য আধুনিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে অস্বীকার করা নয়; বরং এ প্রশ্ন তোলা– কিভাবে আর্থিক ব্যবস্থা বাস্তব অর্থনীতিকে আরো ভালোভাবে সহায়তা করতে পারে। অর্থ সৃষ্টি হয়েছিল মানুষের মধ্যে আস্থার ভিত্তিতে। এর উদ্দেশ্য ছিল বিনিময় সহজ করা, বিনিয়োগকে সহায়তা করা এবং উৎপাদনকে গতিশীল করা। যদি কোনো সময় আর্থিক ব্যবস্থা এই মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়, তবে সমাজের অধিকার ও দায়িত্ব উভয়ই রয়েছে তা পুনর্বিবেচনা করার। ভবিষ্যতের বৈশ্বিক শান্তি ও সমৃদ্ধি নির্ভর করবে কেবল প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নয়; বরং অনেক বেশি নির্ভর করবে কিভাবে মানবজাতি আগামী দিনের সম্পদ সৃষ্টি ও বণ্টন-ব্যবস্থা পরিচালনা করে তার ওপর।

এখন প্রয়োজন একটি বৈশ্বিক সংলাপ– যেখানে নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, উদ্যোক্তা এবং সাধারণ মানুষ একসাথে আলোচনা করবে কিভাবে আর্থিক ব্যবস্থা আবারো উৎপাদন, মর্যাদা এবং মানবকল্যাণের সহায়ক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়। শুধু তখনই পৃথিবী এগিয়ে যেতে পারবে শান্তি, সমৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের পথে; যদি বিশ্ব একযোগে এগোয়।

আজকে বিশ্বকে বাজার অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে অনুৎপাদনশীল ব্যয় বন্ধ করে চাহিদা পূরণে সক্ষম উৎপাদনীল বাজার অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পুঁজির মুনাফার পরিবর্তে পুঁজিকে দ্রব্য ও সেবায় মূল্য সংযোজনের নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে, যা হবে আগামী প্রজন্মের অর্থনীতির মূল কাঠামো।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য
[email protected]