সমালোচক শত্রু নয়

গত ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ফল পর্যন্ত দেশ চালিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষুদ্রঋণ এবং সামাজিক ব্যবসার প্রচার ও প্রসারে বিশ্বের বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। তার কাজের পরিধি শতাধিক উন্নয়নশীল দেশ এবং ৪৬টি দেশে ‘থ্রি-জিরো’ ক্লাবের নেটওয়ার্ক পর্যন্ত বিস্তৃত।

মুহাম্মদ ইউনূসের প্রবর্তিত ‘থ্রি-জিরো ক্লাব’ হলো একটি বৈশ্বিক তরুণ উদ্যোগ, যার লক্ষ্য তিনটি ‘শূন্য’ অর্জনের মাধ্যমে পৃথিবীকে বাসযোগ্য করা—

১. শূন্য দারিদ্র্য (দারিদ্র্যের অবসান);

২. শূন্য বেকারত্ব (উদ্যোক্তা তৈরি) এবং;

৩. শূন্য নেট কার্বন নিঃসরণ (পরিবেশ রক্ষা)।

এসবের মাধ্যমে ড. ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত ও অনুন্নত দেশে কাজ করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেয়ার পরও সুইজারল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, চীন, থাইল্যান্ড, কাতার, জাপান ইত্যাদি দেশ সফর করেছেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অর্ধ শতাধিক বছর অতিক্রম করার পরও বাংলাদেশ বর্তমানে অমিত সম্ভাবনার এক দ্রুত বর্ধনশীল দেশ, যা জনসংখ্যার সুবিধা (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড), সাহসী তরুণ প্রজন্ম এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা এ দেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করবে।

বাংলাদেশ একটি ‘ডিমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনসংখ্যাগত সুবিধার মধ্যে আছে, যেখানে কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠীর আধিক্য দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বে ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতে, বাংলাদেশ এখন শুধু সঙ্কট উত্তরণের গল্প নয়; বরং মেধা ও পরিশ্রমের ওপর ভিত্তি করে একটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর দেশ। সঠিক শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং সুশাসনের মাধ্যমে এ সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দেয়া সম্ভব।

জন্মের পর থেকে বাংলাদেশে স্থিতিশীল পরিবেশ তেমন একটা বিরাজ করেনি। ১৯৯১-২০০৬ কোনো দল পরপর দুবার ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেনি, অর্থাৎ— প্রতিবার ক্ষমতাসীন দল পরাজিত হয়েছে। ১৯৯৬ সালের মার্চে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সাংবিধানিকভাবে প্রবর্তন করা হয়েছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা। ক্ষমতায় থাকতে আওয়ামী লীগ বুঝতে পেরেছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচরের ফল কি হতে পারে। তাই ২০১১ সালের ১০ মে আদালতের রায়ের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অবৈধ ঘোষণা করে বাতিল করা হয়। পরে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের মাধ্যমে ব্যবস্থাটি আনুষ্ঠানিক বিলুপ্ত করা হয়। বিলুপ্তির পর ক্ষমতাসীন দল আর পরাজিত হয়নি। পরিণতিতে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়।

৮ মে ২০২৫ রাতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্যের ব্যানারে সারা দেশে আন্দোলন শুরু হয়। ১০ মে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। তবে এবারের নির্বাচনী প্রচারে অনেক জায়গায় শোনা গেছে বিএনপির সাথে আওয়ামী লীগের একটি সখ্য গড়ে উঠেছে। যেমন— ‘তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে আওয়ামী লীগকে রাজনীতির সুযোগ দেবেন’ শিরোনামে দেশ রূপান্তর পত্রিকায় ৩০ জানুয়ারি একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়।

ওই সংবাদে উল্লেখ করা হয়, ‘তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে পুনরায় আওয়ামী লীগকে রাজনীতির সুযোগ দেবেন। যেহেতু এবার আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই, আপনারা ধানের শীষকে ভোট দেবেন।’ নির্বাচনী পথসভায় আওয়ামী লীগের উদ্দেশে যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসনে বিএনপির প্রার্থী রশীদ আহমাদের এ বক্তব্য ভাইরাল হয়। বিএনপির এই প্রার্থী হিন্দু অধ্যুষিত উপজেলার ভবদহ এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় এমন বক্তব্য দিলে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনার ঝড় তোলে। এই খবরের পরপর, ‘আওয়ামী লীগের ধানমন্ডি অফিসের ফটকে শেখ মুজিবের ছবি রেখে স্লোগান’ শিরোনামে আমার দেশ পত্রিকায় ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সচিত্র সংবাদে প্রকাশ— ‘আওয়ামী লীগের সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ের ফটকের সামনে জাতীয় পতাকা ও শেখ মুজিবের ছবি রেখে স্লোগান দিয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুব মহিলা লীগের কয়েকজন নেত্রী। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সংগঠনের ১০-১২ জন নেতাকর্মীকে ধানমন্ডি ৩/এ সড়কের ৫১ নম্বর বাড়িটির সামনে দেখা যায়।’ আরো কয়েকটি খবর, ‘ফিরছে নিষিদ্ধ জঙ্গি আওয়ামী নেতাকর্মীরা, খুলনায় দলীয় কার্যালয়ে প্রবেশ। প্রায় দেড় বছর বন্ধ থাকার পর খুলনা মহানগর ও জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে প্রবেশ করেছেন দলটির কয়েকজন নেতাকর্মী।’

প্রথম আলোর শিরোনাম, বিএনপির ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছাড়া আওয়ামী লীগ কার্যালয় খোলার সাহস পেতো না —নাহিদ’ এ শিরোনামে উল্লেখ রয়েছে, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার পেছনে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ‘গ্রিন সিগন্যাল’ (সবুজ সঙ্কেত) রয়েছে বলে মনে করছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বিএনপির কাছ থেকে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছাড়া আওয়ামী লীগ এটি করার সুযোগ বা সাহস পেত না।’

যতদূর জানা যায়, নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে এসব কথা ব্যবহার করে থাকলেও প্রকৃত পক্ষে আওয়ামী লীগ বিএনপির বন্ধু নয়, কোনো কালে বন্ধু ছিল না।

নির্বাচনী ফলে এবার জামায়াত জোট শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ১১ দলীয় জোটকে দমানোর উদ্দেশে যদি আওয়ামী লীগকে মিত্রের আসনে বসানো হয়, তা বুমেরাং হবে। কারণ, ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানব কিন্তু নিজের স্রষ্টাকেও রেহাই দেয়নি। একটি কল্যাণকর রাষ্ট্রের জন্য একটি শক্তিশালী বিরোধী দল আবশ্যক। শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাবে দেশ লুটপাটের রাজ্যে পরিণত হওয়াসহ সরকার হয় স্বৈর। বিগত সরকারের গৃহপালিত বিরোধী দলের কারণে সরকার স্বৈর হয়েছিল। শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্রের সুফল নিশ্চিত করা কঠিন। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি উন্নত এবং গণতান্ত্রিক দেশে একটি শক্তিশালী, দায়িত্বশীল ও কার্যকরী বিরোধী দলের উপস্থিতি বিদ্যমান, যা সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকারকে গঠনমূলক সমালোচনা ও জবাবদিহিতার মুখোমুখি করে। এই শক্তিশালী বিরোধী দল সাধারণত জনগণের স্বার্থরক্ষা করে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে, যা উন্নত গণতন্ত্রের একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

সরকার যেন অগণতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী না হয়ে ওঠে, তা নিশ্চিত করতে বিরোধী দল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সরকার যেন জনস্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত না নিতে পারে, সেজন্য বিরোধী দল সঠিক সমালোচনা করে দিকনির্দেশনা দেয়। শক্তিশালী বিরোধী দল গণতন্ত্রকে টেকসই ও মজবুত করে। জনগণের জন্য বিকল্প রাজনৈতিক কর্মসূচি ও নীতি তুলে ধরে। উন্নত বিশ্বে বিরোধী দলের এ সক্রিয় উপস্থিতি সরকারকে যেকোনো অন্যায় সুবিধা প্রদান বা অনিয়ম করা থেকে বিরত রাখে। তাই প্রতিশোধ স্পৃহা, অর্থ, ক্ষমতা ও পদের লোভে যারা ভুল পরামর্শ দেন, তারা কখনো সরকারের বান্ধব হওয়ার যোগ্য নয়।

লেখক : আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক

[email protected]