খাদ্যনিরাপত্তায় সমন্বিত কৌশল

আগামী দশকগুলোতে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা নির্ভর করবে এই সমন্বিত রেজিলিয়েন্স কাঠামোর ওপর। জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানি অনিশ্চয়তার মধ্যে কৃষিকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে একটি ঝুঁকি পুরো ব্যবস্থাকে অচল না করে। এই প্রক্রিয়ায় তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে। যন্ত্রসেবা, সৌরসেচ, সংরক্ষণ, তথ্যসেবা ও বাজার সংযোগ- এসব খাতে গ্রামীণ সেবা অর্থনীতি গড়ে উঠতে পারে। এতে কৃষি খাত আরো আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই হবে। বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এমন একটি কৃষি ব্যবস্থার ওপর, যা প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকতে পারে

ড. মো: আনোয়ার হোসেন
বাংলাদেশের কৃষি আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে উৎপাদনের প্রশ্ন শুধু বীজ, সার, সেচ বা জমি প্রস্তুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন একই সাথে জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ুজনিত বন্যাঝুঁকি, বাজারের অস্থিরতা, কৃষি শ্রমের সঙ্কট, সংরক্ষণ সক্ষমতা এবং তথ্যভিত্তিক দ্রুত সিদ্ধান্তের প্রশ্ন। একদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, অন্যদিকে আগাম বন্যা, অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও নদীভাঙন- সব মিলিয়ে দেশের খাদ্য উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নতুন চাপের মুখে। এই চাপ সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় ধান উৎপাদনে, বিশেষ করে বোরো মৌসুমে, যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি।

কৃষি উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বলতে আমরা সাধারণত একটি মৌসুমে ভালো ফলনকে বুঝি। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় বিষয়টি অনেক বিস্তৃত। ধারাবাহিকতা মানে হলো- এক মৌসুমের বিপর্যয় যেন পরের মৌসুমকে দুর্বল না করে, জ্বালানি ব্যয় যেন কৃষকের সেচ পরিকল্পনা ভেঙে না দেয়, বন্যা যেন ধান কাটার আগ মুহূর্তে সব পরিশ্রম ডুবিয়ে না দেয়, আর বাজারের চাপ যেন কৃষককে লোকসানে বিক্রি করতে বাধ্য না করে। এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে না পারলে খাদ্যনিরাপত্তা শুধু উৎপাদন ঘাটতির কারণে নয়; বরং উৎপাদনব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার কারণেও হুমকিতে পড়ে।

বাংলাদেশের কৃষক দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে উৎপাদন ধরে রেখেছে। কিন্তু বর্তমান ঝুঁকির ধরন ভিন্ন। আগে বন্যা ছিল মৌসুমি দুর্যোগ, এখন তা অনেক ক্ষেত্রে ফসল পাকার আগ মুহূর্তে আগাম আঘাত হানে। আগে জ্বালানি ছিল ব্যয়ের একটি উপাদান, এখন তা উৎপাদনের প্রতিটি সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু। ডিজেলের দাম বাড়লে সেচব্যয় বাড়ে, সেচে দেরি হলে ধানের পরিপক্বতা পিছিয়ে যায়, আর পরিপক্বতা পিছিয়ে গেলে ধান কাটার সময় আগাম বন্যার ঝুঁঁকি বাড়ে। অর্থাৎ- একটি বিপর্যয় দ্রুত পুরো উৎপাদনব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ে।

এই বাস্তবতায় বিচ্ছিন্ন প্রকল্পভিত্তিক সমাধান কার্যকর হবে না। শুধু যন্ত্র দিলে হবে না, সেচে ভর্তুকি দিলেও হবে না, আবহাওয়া বার্তা পাঠালেও হবে না। প্রয়োজন একটি সমন্বিত রেজিলিয়েন্স মডেল, যেখানে ফসল কাটা, জ্বালানি, সংরক্ষণ, তথ্যসেবা, বাজার এবং গ্রামীণসেবা অর্থনীতি- সব কিছু একটা সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে কাজ করবে। এ ধরনের ব্যবস্থা ছাড়া ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা স্থিতিশীল রাখা কঠিন হবে।

প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ হলো সময়মতো ধান কাটা। হাওর, নিম্নাঞ্চল, নদীবিধৌত এলাকা এবং উপকূলের বহু অঞ্চলে ধান কাটার সময়সীমা খুব সীমিত। কয়েক দিনের বিলম্বই আগাম বন্যা বা জলাবদ্ধতায় পুরো ফসল নষ্ট করে দিতে পারে। এ অবস্থায় যান্ত্রিক ধান কাটা এখন শুধু আধুনিকতা নয়, জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার অবকাঠামো। কম্বাইন্ড হারভেস্টার, রিপার, ক্ষুদ্র ধান কাটার যন্ত্র, মাঠ পর্যায়ের দ্রুত পরিবহন সহায়তা- সব মিলিয়ে একটি দ্রুত ফসল সংগ্রহব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

তবে শুধু যন্ত্র কৃষকের হাতে দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না। যন্ত্রের প্রস্তুতি, দক্ষ চালক, মেরামতসুবিধা, খুচরা যন্ত্রাংশ, সময়মতো ঝুঁকিপ্রবণ এলাকায় যন্ত্র পাঠানো এবং জেলা থেকে জেলায় দ্রুত স্থানান্তর- এসব সমন্বয় না থাকলে যন্ত্র কার্যকর হয় না। দেশে বহু উদাহরণ আছে, যেখানে যন্ত্র ছিল; কিন্তু অপারেটর ছিল না; কোথাও অপারেটর ছিল কিন্তু জ্বালানি পাওয়া যায়নি। কোথাও যন্ত্র ছিল কিন্তু সময়মতো পৌঁছতে পারেনি। ফলে একটি জাতীয় যন্ত্র ব্যবস্থাপনা কাঠামো এখন জরুরি।

এই প্রেক্ষাপটে ইউনিয়নভিত্তিক যন্ত্রসেবা কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে ভাড়াভিত্তিক যন্ত্রসেবা চালু হলে কৃষক দ্রুত সেবা পাবেন, একই সাথে গ্রামে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলে মৌসুমের আগেই ঝুঁকিপ্রবণ ইউনিয়নে যন্ত্র স্থাপন করা গেলে আগাম বন্যার আগে অল্প সময়ে বিপুল ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হবে। এর সাথে নৌপরিবহন, মাঠভিত্তিক অস্থায়ী মাড়াই কেন্দ্র এবং দ্রুত শুকানোর সেবা যুক্ত করা গেলে ফসলহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যাবে।

দ্বিতীয় বড় প্রশ্ন হলো জ্বালানি। বাংলাদেশের সেচব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে ডিজেলনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি বোরো ধানের উৎপাদন খরচ বাড়ায়। এর প্রভাব শুধু কৃষকের লাভে সীমাবদ্ধ থাকে না; খাদ্যমূল্য, বাজার স্থিতিশীলতা এবং সরকারি ভর্তুকি কাঠামোতেও পড়ে। তাই কৃষিতে বিকল্প জ্বালানি এখন বিলাসিতা নয়; বরং প্রয়োজনীয়তা।

গুচ্ছভিত্তিক সৌরসেচ একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। ২০-৩০ জন কৃষক মিলে একটি সৌরপাম্প ব্যবহার করলে খরচ কমে, সেচের সময়সূচি নির্ভরযোগ্য হয় এবং ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমে। এর ফলে কৃষক আগে ভাগে সেচ পরিকল্পনা করতে পারেন এবং ফলনের ওঠানামাও কমে। বরেন্দ্র অঞ্চলে এই মডেল বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে। পাশাপাশি জমি সমতলকরণ, পর্যায়ক্রমিক সেচ এবং মাটির আর্দ্রতা অনুযায়ী পানি প্রয়োগ- এসব পদ্ধতি জ্বালানি ও পানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করে।

উপকূলীয় অঞ্চলে বাস্তবতা ভিন্ন। সেখানে লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা এবং ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা বড় সমস্যা। তাই সৌরচালিত ক্ষুদ্র পাম্প, খালভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা এবং লবণাক্ততাসহিষ্ণুু ফসলের সমন্বিত ব্যবহার প্রয়োজন। অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা ছাড়া জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা শক্তিশালী করা সম্ভব নয়।

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো ফসল-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা। দেশে উৎপাদনের পর কৃষক প্রায়ই দ্রুত বিক্রি করতে বাধ্য হন। কারণ নিরাপদ সংরক্ষণ ও শুকানোর সুবিধা সীমিত। ফলে ফসলের মান নষ্ট হয়, কৃষক কম দামে বিক্রি করেন এবং পরবর্তী মৌসুমে বিনিয়োগের সক্ষমতা কমে যায়। এই সমস্যা খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।

হাওর ও বন্যাপ্রবণ এলাকায় উঁচু প্ল্যাটফর্ম, মোবাইল ড্রায়ার এবং সৌরশক্তিচালিত শুকানোর ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। উপকূলে শীতল সংরক্ষণ এবং বরেন্দ্রে ক্ষুদ্র গুদাম কৃষককে সময় নিয়ে বিক্রির সুযোগ দেয়। এতে বাজারে চাপ কমে, কৃষক ভালো দাম পান এবং দামের অস্থিরতা কমে।

চতুর্থ স্তর হলো তথ্য ও পূর্বাভাস। সময়োপযোগী তথ্য না পেলে কৃষক সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তাই মোবাইলভিত্তিক বার্তা, ভয়েস কল, স্থানীয় ভাষার অ্যাপ এবং কৃষি সম্প্রসারণের সাথে সমন্বিত তথ্যসেবা প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পূর্বাভাস যুক্ত হলে এই সেবা আরো শক্তিশালী হবে।

বাংলাদেশে মোবাইল ব্যবহারের বিস্তার এই ক্ষেত্রে বড় সুযোগ তৈরি করেছে। ফসলভিত্তিক পরামর্শ, আবহাওয়া সতর্কতা, বাজারদর এবং যন্ত্র বুকিং একসাথে দেয়া গেলে কৃষিব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।

খাদ্যনিরাপত্তার সাথে শহুরে অর্থনীতির সম্পর্কও গভীর। কৃষিতে সামান্য বিঘ্নও বাজারে বড় প্রভাব ফেলে। তাই কৃষিতে বিনিয়োগকে শুধু উন্নয়ন নয়, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিনিয়োগ হিসেবেও দেখা উচিত।

আগামী দশকগুলোতে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা নির্ভর করবে এই সমন্বিত রেজিলিয়েন্স কাঠামোর ওপর। জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানি অনিশ্চয়তার মধ্যে কৃষিকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে একটি ঝুঁকি পুরো ব্যবস্থাকে অচল না করে।

এই প্রক্রিয়ায় তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে। যন্ত্রসেবা, সৌরসেচ, সংরক্ষণ, তথ্যসেবা ও বাজার সংযোগ- এসব খাতে গ্রামীণ সেবা অর্থনীতি গড়ে উঠতে পারে। এতে কৃষি খাত আরো আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই হবে।

বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এমন একটি কৃষিব্যবস্থার ওপর, যা প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকতে পারে। যে কৃষি জ্বালানি সঙ্কটেও সেচ চালাতে পারে, আগাম বন্যার আগেই ফসল ঘরে তুলতে পারে, সংরক্ষণ করতে পারে। সেই সাথে কৃষককে পরবর্তী মৌসুমে বিনিয়োগের সক্ষমতা দেয়- সেই কৃষিই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় জাতীয় নিরাপত্তা।

লেখক : প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালক, এলএসটিডি প্রকল্প, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর