প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারে দায়িত্ব পালনের সুযোগ আমার জীবনের এক বিশেষ অধ্যায়। এ সময়ের অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও বাস্তবতার সাথে প্রত্যক্ষ পরিচয় আমাকে সমৃদ্ধ করেছে। রাষ্ট্রপরিচালনার নানা দিক ঘনিষ্ঠভাবে দেখার সুযোগ পেয়েছি। এটি আমার জীবনের মূল্যবান অর্জন। সারা জীবন স্মৃতিপটে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
দায়িত্ব গ্রহণের আগে প্রফেসর ইউনূসের সাথে আমার পরিচয় ছিল না। কখনো সরাসরি সাক্ষাৎ বা আলাপের সুযোগও হয়নি। অথচ আমাদের কর্মজীবনের প্রেক্ষাপটে একটি দূরবর্তী সংযোগ অবশ্যই ছিল। আমি যখন ১৯৭৬-৭৭ শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র, তখন তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। কিন্তু তখনও আমাদের মধ্যে পরিচয় বা যোগাযোগ হয়নি।
এমন অবস্থায় তিনি আমাকে কিভাবে, কোন বিবেচনায় উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন, তা পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। পরে জেনেছি, আমাকে উপদেষ্টা হিসেবে মনোনয়নে কয়েকটি রাজনৈতিক ও সামাজিক মহল থেকে সুপারিশ ছিল। বিশেষত ইসলামী আন্দোলন, জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও খেলাফত আন্দোলনসহ বিভিন্ন মহল থেকে ইতিবাচক মতামত ব্যক্ত করা হয়েছিল বলে শুনেছি। এছাড়া জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধারা এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও সমর্থন ছিল। আরো কারো সুপারিশ থাকতে পারে, যা হয়তো আমার জানা নেই।
তবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ক্ষমতা দেয়ার প্রকৃত মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালা। মানুষের চোখে নানা কারণ, প্রক্রিয়া ও সুপারিশ দৃশ্যমান থাকলেও শেষ পর্যন্ত সব কিছুই তাঁর ইচ্ছার অধীন।
প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের ধরন ছিল অত্যন্ত মানবিক, সহজ ও অনাড়ম্বর। উপদেষ্টা পরিষদের সাথে তার আচরণে সব সময়ই আন্তরিকতা ও সৌহার্দ্যরে ছাপ থাকতো। দু-একজন সিনিয়র সদস্য ছাড়া তিনি প্রায় সবাইকে ‘তুমি বলে সম্বোধন করতেন। এতে তার আন্তরিকতা, স্নেহ এবং সহকর্মীদের সাথে দূরত্বহীন সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রবণতা স্পষ্ট হতো। এই সম্বোধনের মধ্য দিয়েই তিনি একটি পারিবারিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ কর্মপরিবেশ তৈরি করতে পেরেছিলেন।
উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের সাথে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। তিনি সবার সাথে হোয়াটসঅ্যাপে সংযুক্ত ছিলেন এবং প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো দ্রুত সেখানে আদান-প্রদান হতো। কোনো উপদেষ্টা পরামর্শ বা নির্দেশনা চাইলে তিনি সাধারণত খুব অল্প সময়ের মধ্যেই উত্তর দিতেন। কখনো প্রয়োজন হলে সরাসরি ফোন করেও বিষয়টি ব্যাখ্যা করে দিতেন বা প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতেন। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া যেমন দ্রুত হতো, তেমনি কাজের গতিও বজায় থাকত।

তার নেতৃত্বের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল শালীনতা ও সংযম। সহকর্মী কিংবা কোনো সরকারি কর্মকর্তার সাথে তিনি কখনো ধমকের সুরে বা কঠোর কমান্ডিং টোনে কথা বলতেন না; বরং সব সময় বিনয়ী ও হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে আলোচনা করতেন। তার এই আচরণ উপদেষ্টাদের মধ্যেও স্বস্তিকর ও ইতিবাচক কর্মস্পৃহা সৃষ্টি করত। তিনি নিজেও সবসময় হাসিখুশি থাকতেন এবং নানা প্রসঙ্গ তুলে পরিবেশ প্রাণবন্ত রাখার চেষ্টা করতেন, যাতে দায়িত্বের চাপের মধ্যেও সবাই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে পারেন।
এই আন্তরিক ও প্রাণবন্ত পরিবেশের প্রভাব উপদেষ্টা পরিষদের নিয়মিত সভাগুলোতেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হতো। প্রতি সপ্তাহের ক্যাবিনেট মিটিংগুলো কেবল আনুষ্ঠানিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকত না; বরং সেখানে প্রাণচাঞ্চল্য ও উচ্ছ্বাসের এক স্বতঃস্ফূর্ত আবহ তৈরি হতো। তিনি সময়-সচেতন ছিলেন। কখনো দীর্ঘ বক্তব্য দিতেন না এবং উপদেষ্টাদেরও সংক্ষিপ্ত ও মূল বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে উৎসাহ দিতেন। আলোচনা কার্যকর ও ফলপ্রসূ রাখার জন্য তিনি প্রায়ই ‘টু দ্য পয়েন্ট’ বক্তব্য রাখার নির্দেশনা দিতেন। সব মিলিয়ে তার নেতৃত্বে উপদেষ্টা পরিষদের কাজের পরিবেশ ছিল সহযোগিতা, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে সমৃদ্ধ।
২৩ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের সময় একটি বিষয় খুব স্পষ্ট ছিল, এটি কোনো একক রাজনৈতিক ধারা, মতাদর্শ বা সামাজিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী পরিষদ নয়; বরং সমাজের বিভিন্ন বলয়, চিন্তাধারা ও পেশাগত পরিমণ্ডল থেকে আগত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে এটি গঠিত হয়। উপদেষ্টাদের কেউ ছিলেন বামধারার চিন্তায় প্রভাবিত, কেউ সেক্যুলার, কেউ ইসলামী, আবার কেউ নারীবাদী চিন্তার ধারক। পেশাগত দিক থেকেও বৈচিত্র্য ছিল— কেউ আইনজীবী, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ পেশাজীবী সংগঠনের সাথে যুক্ত, কেউ এনজিও ফিল্ডে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন, কেউ অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা, আবার কেউ ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। অর্থাৎ, রাষ্ট্র ও সমাজের বহুমাত্রিক বাস্তবতার প্রতিফলনই যেন এই পরিষদের গঠনে প্রতিফলিত হয়েছিল।
এই মতাদর্শিক ও পেশাগত বৈচিত্র্য অনেকের কাছে প্রথমে বিস্ময়ের কারণ হতে পারে। কারণ সাধারণত ধারণা করা হয়, ভিন্ন আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ একসাথে কাজ করতে গেলে মতবিরোধ বা দ্বন্দ্ব তীব্র হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে উপদেষ্টা পরিষদের অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন। আমরা পরস্পরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতা বজায় রেখেছি, কেউ কারো মতাদর্শ বা ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে অবজ্ঞা করিনি; বরং ভিন্নমতকে সম্মান জানিয়ে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমন্বিত অবস্থানে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
পরিষদের বৈঠকেও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হতো। কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দিলে তা ব্যক্তিগত বিরোধে রূপ নেয়নি; বরং যুক্তি, অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের আলোকে আলোচনা হয়েছে। এভাবে গণতান্ত্রিক চর্চার একটি ইতিবাচক পরিবেশ গড়ে উঠেছিল।
ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও উপদেষ্টাদের মধ্যে ছিল এক ধরনের পারিবারিক উষ্ণতা। আমরা একে অপরকে আনুষ্ঠানিক সম্বোধনের পরিবর্তে ‘ভাই’ বা ‘আপা’ বলে ডাকতাম। এই সম্বোধনের মধ্য দিয়ে একটি আন্তরিক সম্পর্কের বন্ধন তৈরি হয়েছিল, যা আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের গণ্ডি অতিক্রম করে মানবিকতার জায়গায় পৌঁছেছিল।
এই পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও বিশ্বাসের পরিবেশই উপদেষ্টা পরিষদের কাজকে সহজ ও ফলপ্রসূ করে তুলেছিল। ভিন্ন মতাদর্শ সত্ত্বেও আমরা সবাই উপলব্ধি করেছি, আমাদের লক্ষ্য একটিই, রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণে দায়িত্ব পালন। সেই অভিন্ন লক্ষ্যই আমাদেরকে টিম হিসেবে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছে।
দেড় বছর সময় খুব দীর্ঘ নয়; কিন্তু এই সময়ের অভিজ্ঞতা আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। মতাদর্শের বৈচিত্র্য সত্ত্বেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা এবং টিম স্পিরিট থাকলে একটি দল কতটা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে, উপদেষ্টা পরিষদের অভিজ্ঞতা তারই বাস্তব উদাহরণ। ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে এই সময়ের স্মৃতি কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা নয়; বরং এটি সহমর্মিতা, সহাবস্থান ও সম্মিলিত দায়িত্ববোধের এক মূল্যবান অধ্যায়।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে হস্তান্তরের বিষয়ে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। তার দৃষ্টিতে অন্তর্বর্তী সরকারের মূল দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আরো শক্তিশালী হয় এবং রাষ্ট্রে আর কোনো নতুন স্বৈরশাসকের জন্ম হতে না পারে।
এই লক্ষ্য সামনে রেখেই তিনি রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ নেন। বেশ কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এসব কমিশন পর্যায়ক্রমে প্রতিবেদন জমা দেয়। কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়নের কাজও শুরু হয়।
প্রফেসর ইউনূসের ব্যক্তিগত ইচ্ছা ছিল, সংস্কারের প্রধান ধাপগুলো সম্পন্ন করে ২০২৬ সালের শেষের দিকে নির্বাচন আয়োজন করা, যাতে একটি অধিকতর শক্তিশালী ও স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক পরিবেশের মধ্যে নতুন সরকার দায়িত্ব নিতে পারে; কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা সব সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয় না। রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষত বিএনপির অব্যাহত চাপ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তিনি ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচনের ঘোষণা দেন।
একান্ত আলাপচারিতায় আমি তাকে একবার প্রশ্ন করেছিলাম, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের অধীনে কোনো সম্মানজনক রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণে তিনি আগ্রহী কি-না। তিনি খুব স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে জবাব দেন, কোনো সরকারেই তিনি আর দায়িত্ব পালন করতে চান না।
তার এই বক্তব্যে ক্ষমতার প্রতি অনাসক্তি এবং ব্যক্তিগত সততার একটি স্বচ্ছ প্রতিফলন ফুটে ওঠে। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বকে তিনি কখনো ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে দেখেননি; বরং এটিকে তিনি একটি সাময়িক দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রকে একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে দেয়া।
একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল, ড. ইউনূস সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনমতের প্রতি গুরুত্ব দিতেন এবং এমন পদক্ষেপ নিতে চাইতেন না, যাতে অপ্রয়োজনীয় সামাজিক উত্তেজনা বা জন-অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। নারী সংস্কার কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে দেশের আলেম-ওলামা ও বিভিন্ন ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে আপত্তি জানায়। বিষয়টি দ্রুত জনপরিসরে আলোচনার জন্ম দেয় এবং বিভিন্ন স্থানে মিছিল-মিটিং শুরু হয়।
এমন প্রেক্ষাপটে একদিন মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে আমি নারী সংস্কার কমিটির প্রতিবেদনের বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করার প্রয়োজনীয়তার কথা উত্থাপন করি। আমার যুক্তি ছিল, বিষয়টি নিয়ে জনমনে সৃষ্ট উৎকণ্ঠা দূর করার জন্য সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করা দরকার। জবাবে প্রধান উপদেষ্টা অত্যন্ত শান্ত ও স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘কমিশন তো মাত্র তাদের রিপোর্ট জমা দিয়েছে। তাদের সুপারিশগুলো আমরা এখনো গ্রহণ করিনি। সুতরাং এ মুহূর্তে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করার মতো কোনো বিষয়ও তৈরি হয়নি।’
এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি মূলত বোঝাতে চেয়েছিলেন, কোনো কমিশনের সুপারিশ সরকার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তা সরকারি নীতিতে পরিণত হয় না। একই সাথে তিনি ইঙ্গিত দেন, সরকার বিষয়টি বিবেচনা-পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে এবং তাড়াহুড়া করে এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে না, যা সমাজে অযথা উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। এ ঘটনা থেকে তার নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়। তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরস্থির, প্রক্রিয়াভিত্তিক এবং জনমতের প্রতি সংবেদনশীল ছিলেন। তাই তার সময়ে এমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি, যা সরাসরি জনমতকে উপেক্ষা করে নেয়া হয়েছে।
যমুনা ও সচিবালয় ঘেরাও : বাস্তবতা ও প্রেক্ষাপট
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রায় ১৮ মাসের শাসনামলে রাজধানীর প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয় এবং প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনা ঘিরে একাধিকবার বিক্ষোভ, অবস্থান কর্মসূচি ও ঘেরাওয়ের ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী সংগঠন, পেশাজীবী গোষ্ঠী, এমনকি সরকারি চাকরিজীবীদেরও কেউ কেউ দাবি আদায়ে এ ধরনের কর্মসূচি পালন করেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় এসব স্থান আন্দোলনকারীদের কাছে প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। তারা মনে করেন, এখানে অবস্থান নিলে দাবি দ্রুত সরকারের নজরে আসবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে।
তবে অস্বীকারের উপায় নেই, কিছু কর্মসূচি ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত। অনেক সময় আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক স্বার্থ বা কোনো পক্ষের ইন্ধন থাকার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।
অন্যদিকে সরকারও পরিস্থিতি মোকাবেলায় কখনো কঠোর, কখনো নমনীয় কৌশল গ্রহণ করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক ক্ষেত্রে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান বা অন্যান্য নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে। আবার অনেক ক্ষেত্রেই সরকার সংলাপের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের সাথে সমঝোতায় পৌঁছেছে এবং কিছু দাবি-দাওয়া মেনে নিয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যমুনা বা সচিবালয় ঘেরাওয়ের ঘটনাগুলো ছিল সেই সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক গতিশীলতারই প্রতিফলন। গণতান্ত্রিক সমাজে দাবি-দাওয়া প্রকাশের অধিকার যেমন স্বীকৃত, তেমনি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বও সরকারের ওপর বর্তায়। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে।
লেখক : অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা



