২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রদান করা সংবিধানের ১১৬ নং অনুচ্ছেদসংক্রান্ত হাইকোর্ট বিভাগের দীর্ঘপ্রতীক্ষিত রায়টি সাত মাসের বেশি সময় পর অবশেষে ২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল জনসমক্ষে এসেছে। বর্তমানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের অধীনে এ রায়ের এমন বিলম্বিত প্রকাশ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। যদি রায়টি বাস্তবায়িত হয়, তবে নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, ছুটি ও শৃঙ্খলার ওপর সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে। এর ফলে বিচার বিভাগের ওপর আইন মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘদিনের যে প্রশাসনিক আধিপত্য ছিল, তা মূলত বহুলাংশে সঙ্কুচিত হয়ে আসবে। অভিজ্ঞতা বলে, বিচার বিভাগের ওপর আইন মন্ত্রণালয়ের এ প্রভাব বিচারিক স্বাধীনতায় সবসময় শুভ ফল বয়ে আনেনি। আমরা অতীতে দেখেছি, কিভাবে আইন মন্ত্রণালয় অবস্থানগত ক্ষমতার অপব্যবহার করে অধস্তন বিচার বিভাগকে নিজেদের নির্দেশনা অনুযায়ী রায় বা আদেশ প্রদানে বাধ্য করেছে। এমন নজিরও রয়েছে যেখানে আইনমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে এবং নির্দিষ্ট বিচারপ্রার্থীর পক্ষে রায় প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তদুপরি রাজনীতিবিদ বা রাজনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে আইন মন্ত্রণালয় প্রায় সবসময় ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে এবং বিরোধীদের বিপক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করত। এটি সম্ভব হয়েছিল মূলত বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি এবং ছুটির ওপর মন্ত্রণালয়ের একক নিয়ন্ত্রণ থাকায়। যেসব বিচারক মন্ত্রণালয়ের অনৈতিক প্রশাসনিক নির্দেশনা মানতে অস্বীকার করতেন, তাদের প্রায়ই প্রতিফল হিসেবে প্রত্যন্ত বা দুর্গম এলাকায় বদলি করা হতো কিংবা তাদের পদোন্নতি আটকে দেয়া হতো। বাস্তবতা হলো, ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করা যেকোনো মন্ত্রণালয়ের জন্য কঠিন; আইন মন্ত্রণালয়ও এর ব্যতিক্রম নয়। সাম্প্রতিক সময়ে সংসদীয় বিতর্কগুলোও এমন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বর্তমান সরকার বিচার বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়ার বিষয়ে কিছুটা অনীহা পোষণ করছে। এ প্রেক্ষাপটে সংবিধানের ১১৬ নং অনুচ্ছেদের ওপর হাইকোর্ট বিভাগের যুগান্তকারী রায়টি পর্যালোচনা এবারের নিবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য।
সংবিধানের ১১৬ নং অনুচ্ছেদের বর্তমান অবস্থানকে (যা পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছিল) চ্যালেঞ্জ করে ২০২৪ সালে আইনজীবীদের পক্ষ থেকে একটি রিট আবেদন করা হয়। এ আইনি লড়াইয়ের মূল লক্ষ্য ছিল ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে বর্ণিত বিচার বিভাগের সেই হারানো ক্ষমতা ও অভিভাবকত্ব আবার ফিরিয়ে আনা। মূল সংবিধানে ১১৬ অনুচ্ছেদটি যেভাবে ছিল, তা হলো- ‘বিচার-কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনে রত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল-নির্ধারণ, পদোন্নতিদান ও ছুটি মঞ্জুরীসহ) ও শৃঙ্খলাবিধান সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকিবে।’ মূল সংবিধানের বিধানটি নিশ্চিত করেছিল যে, নিম্ন আদালত যেন নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকে। কিন্তু ১৯৭৫ সালে এ অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তনের সময় শেখ মুজিবুর রহমান বিচারব্যবস্থার ওপর শাসন বিভাগের কর্তৃত্ব আরোপের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। সে লক্ষ্যে সংবিধানে আমূল পরিবর্তন আনেন। এভাবে তিনি সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নেন। ফলে বাকশালের অধীনে ১১৬ নং অনুচ্ছেদটি সংশোধিত হয়ে দাঁড়ায়, ‘বিচার-কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনে রত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল-নির্ধারণ, পদোন্নতিদান ও ছুটি মঞ্জুরীসহ) ও শৃঙ্খলাবিধান রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত থাকিবে।’ পরবর্তীতে দৃশ্যপট পরিবর্তিত হয় যখন জিয়াউর রহমান শাসনভার গ্রহণ করেন। ১৯৭৯ সালে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ১১৬ নং অনুচ্ছেদকে নতুন রূপ দেন। এ সংশোধনীর ফলে অনুচ্ছেদটির ভাষ্য দাঁড়ায়, ‘বিচার-কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনে রত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল-নির্ধারণ, পদোন্নতিদান ও ছুটি মঞ্জুরীসহ) ও শৃঙ্খলাবিধান রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত থাকিবে এবং সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তাহা প্রযুক্ত হইবে।’ জিয়াউর রহমানের এ পরিবর্তনের ফলে সুপ্রিম কোর্টের সাথে ‘পরামর্শ’ করার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। এতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও, নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে নির্বাহী প্রশাসনের হাতে কুক্ষিগত ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরবর্তী প্রতিটি উত্তরসূরি সরকার; তা সে বিএনপি হোক বা আওয়ামী লীগ- নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ১১৬ অনুচ্ছেদের অপব্যবহার করে নিম্ন আদালতকে কুক্ষিগত করে রেখেছিল। পঞ্চম সংশোধনীর সেই কাঠামোটি ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর আবরণে বজায় রাখা হয়, যা বিচারিক স্বাধীনতার পথকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে অবরুদ্ধ করেছিল। অবশেষে ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বিভাগ মূল ১১৬ অনুচ্ছেদটি পুনর্বহাল করার মাধ্যমে পূর্ববর্তী কয়েক দশকের প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তন ঘটায়। এ রায়ের মাধ্যমে নিম্ন আদালতের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও অভিভাবকত্ব আবার সুপ্রিম কোর্টের হাতে ফিরে আসে।
বিচার বিভাগীয় সংস্কারের এক প্রবল গণজোয়ারের মুখে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে আইনজীবীদের একটি অংশ এই রিট আবেদন দাখিল করেন। গত দেড় দশকের আওয়ামী দুঃশাসনে বিচার বিভাগ যেভাবে রাজনীতির শিকলে বন্দী ছিল, তা থেকে মুক্তি পেতে মূল ১১৬ অনুচ্ছেদের পুনরুদ্ধার ছিল সময়ের দাবি। ধারণা করা হয়েছিল, এ ঐতিহাসিক সংস্কারকে বিএনপিসহ দেশের সব রাজনৈতিক শক্তি সানন্দে গ্রহণ করবে। দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো, এ আবেদনের কঠোর বিরোধিতা এসেছিল খোদ তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেলের পক্ষ থেকে। অন্তর্বর্তী সরকারের সেই সময়ের সেই প্রধান আইন কর্মকর্তা আজ বিএনপি সরকারের আইনমন্ত্রী। তার সেই সময়কার বিরোধিতা এবং বর্তমানের মন্ত্রিত্ব- এই দুইয়ের মেলবন্ধন বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে সরকারের বর্তমান অনীহার বহিঃপ্রকাশ। রিটটির বিরোধিতা করতে গিয়ে তাকে দেখে মনে হয়েছিল যে, তিনি সংস্কারপন্থী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তার চেয়ে বরং ভবিষ্যৎ কোনো রাজনৈতিক পদের উচ্চাভিলাষী আইনজীবী হিসেবে বেশি যুক্তি উপস্থাপন করছিলেন। যে অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, সেই সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তার অবস্থান ছিল বিস্ময়কর। তিনি আদালতে যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন যে, ১১৬ অনুচ্ছেদ সংবিধানের কোনো অপরিহার্য ভিত্তি বা মৌলিক কাঠামো নয়। এর অর্থ দাঁড়ায়- বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করে অতীতে যেসব সংশোধনী আনা হয়েছিল, তা তার দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ আইনসম্মত ছিল। বিএনপির তৎকালীন সেই আইনি অবস্থান যেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরবর্তী ক্ষমতার সমীকরণকে ইঙ্গিত দিচ্ছিল। ইতিহাসের পাঠ থেকে জানা যায়, কোনো রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় গিয়ে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আগ্রহী হয় না। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণকারী বিএনপি সরকারও এর ব্যতিক্রম ছিল না; তারাও চেয়েছিল নিম্ন আদালতের চাবিকাঠি যেন নির্বাহী বিভাগের হাতে থাকে। তবে তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল (যিনি বর্তমানে আইনমন্ত্রী) প্রদত্ত যুক্তিগুলো হাইকোর্ট বিভাগ খারিজ করে দেন। সেই সাথে ১৯৭২ সালের মূল ১১৬ নং অনুচ্ছেদটি পুনর্বহাল করেন। ফলে ১৯৭৫ সালের পর এই প্রথম নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, ছুটি ও শৃঙ্খলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার একচ্ছত্র ক্ষমতা কেবল সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত হলো।
সরকার ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে, এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করবে। সে উদ্দেশ্যে সংবিধানের ১০৩(২)(ক) অনুচ্ছেদের অধীনে একটি সার্টিফিকেটের আবেদন করেছে। এমন একটি সার্টিফিকেট পাওয়া গেলে ‘লিভ টু আপিল’ ছাড়াই সরাসরি আপিল করা সম্ভব হয়; যা সাধারণত তখনই প্রদান করা হয়; যখন সংবিধানের ব্যাখ্যার বিষয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন জড়িত থাকে। যেমনটি করা হয়েছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিলের মামলায়। তবে হাইকোর্ট বিভাগ ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর রায়ে সংবিধানের ব্যাখ্যাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করলেও, সেই প্রশ্নটি আসলে কী- তা নির্দিষ্ট করে দেননি। এমনকি রায়ের ভেতরে বা আলাদাভাবে কোনো সার্টিফিকেটও প্রদান করা হয়নি। আইনত আদালতের এটিও উল্লেখ করার প্রয়োজন ছিল যে, কেন এমন একটি সারগর্ভ আইনি প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে, যা করা হয়নি। আইনি প্রশ্নটি সুনির্দিষ্টভাবে প্রণয়ন না করে আদালত কেবল একটি সার্টিফিকেট ইস্যু করতে পারেন না। ত্রুটিটি সম্ভবত সরকারের পক্ষ থেকে ঘটেছে; কারণ সার্টিফিকেট চাওয়ার সময় তারা কোনো সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছিল, সম্ভবত একেবারে শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে আবেদনটি করায় এমনটি ঘটেছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি আপিল করার আর কোনো সুযোগ নেই; বরং তাদের এখন ‘সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল’ দায়েরের মাধ্যমে আদালতের অনুমতি প্রার্থনা করতে হবে। সুতরাং বর্তমানে ১৯৭২ সালের মূল ১১৬ নং অনুচ্ছেদটি কার্যকর থাকছে এবং নিম্ন আদালত নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি



