২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ২১২ আসন পেয়েছে। অন্য দিকে জামায়াত জোট, যারা বাংলাদেশে একটি বিকল্প রাজনীতির কথা বলেন, পেয়েছে প্রায় ৭৭টি আসন। সংখ্যাগতভাবে ফলাফল স্পষ্ট; কিন্তু রাজনৈতিক বিতর্ক থেমে নেই। জামায়াত জোট নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে। তারা দাবি করছে, বিভিন্ন জায়গায় ভোটকেন্দ্র থেকে তাদের এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে, অনেক স্থানে প্রশাসনিক পক্ষপাত হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ হয়েছে। বর্তমান আমিরের ভাষ্যমতে, ‘আমাদের কায়দা করে হারানো হয়েছে, বহু জায়গায় জোর করে এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে, আমাদের কর্মীরা রক্তের বিনিময়ে ভোট চাইতে যায়নি, তাই তারা কেন্দ্র ছেড়ে চলে এসেছে।’ নায়েবে আমির মন্তব্য করেন, ‘৫০টির বেশি আসনে আমাদের জোর করে হারানো হয়েছে’ অন্য কিছু নেতা এটিকে ‘সমঝোতার নির্বাচন’ও বলেছেন। অভিযোগগুলো গুরুতর। কিন্তু এখানেই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠে আসে যে এই সম্ভাবনাগুলো কি নির্বাচনের আগে অনুমান করা যায়নি?
কারণ, নির্বাচনের আগের মাসগুলোতে তো এ ধরনের অনিয়মের অনেক ইঙ্গিত দৃশ্যমান ছিল। এমনকি প্রশাসনের একটি অংশের ওপর পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছিল। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক লিখেছিলেন, ক্ষমতার বলয়- যাকে অনেকে ‘ডিপ স্টেট’ বলে, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তি তথা বিএনপির দিকে ঝুঁকে আছে। মিডিয়ার বড় অংশ নির্বাচনের আগেই সম্ভাব্য নেতৃত্বকে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উপস্থাপন করছিল। এ ছাড়া মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে কিছু রিটার্নিং কর্মকর্তার বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। নির্বাচন কমিশনের আচরণ, নিরপেক্ষতার অভাব নিয়েও আলোচনা ছিল। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক সতর্ক করেছিলেন, ২০২৬-এর নির্বাচন প্রভাবিত হতে পারে। তখন কি এসব সঙ্কেত যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি জামায়াত জোটের কাছে?
একটি জাতীয় নির্বাচনে হাজার হাজার কেন্দ্রে এজেন্ট সুরক্ষা ও বিকল্পব্যবস্থা নিশ্চিত করা রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। সেটি কি যথেষ্ট ছিল? রাজনীতি কেবল নৈতিক অবস্থান নয়; এটি সম্ভাব্য ঝুঁকি অনুমান করে আগাম প্রস্তুতি নেয়ার শিল্প। যদি ধারণা থেকে থাকে যে প্রশাসন ও প্রভাবশালী বলয় প্রতিপক্ষের দিকে ঝুঁকে আছে, তাহলে নির্বাচনে অংশ নেয়ার পর নিরপেক্ষতার জন্য লড়াই করা প্রয়োজন ছিল। নির্বাচন কমিশনের কাঠামো, পর্যবেক্ষক উপস্থিতি, আন্তর্জাতিক নজরদারি, মিডিয়া ভারসাম্য— এসব বিষয়ে শক্ত অবস্থান নেয়া দরকার ছিল। জামায়াত জোটের নির্বাচন-পরবর্তী অভিযোগ ইঙ্গিত করে তাদের নির্বাচন ঝুঁকির বিশ্লেষণ হয়তো ছিল; কিন্তু তার সমানতালে কৌশল ছিল না।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরাজয়ের পর আত্মসমালোচনা করা দুর্বলতার নয় বরং সেটিই নতুন করে শক্তি অর্জনের লক্ষণ। বিকল্প রাজনীতির আসল সমস্যা হলো রাজনীতিক দূরদর্শিতার অভাব। এই রাজনীতিবিদরা বারবার ভুল করছেন, কারণ প্রায়শ তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রভাববলয় এবং তার নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ঠিকভাবে আঁচ করতে পারছেন না। ক্ষমতার কেন্দ্র কোথায়, সেটি কে নিয়ন্ত্রণ করছে, কোন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজনীতি পরিচালিত হচ্ছে, এসব বুনিয়াদি বিষয়ে মনোযোগ কম বলে তারা যথাযথ কৌশল নিতে পারছেন না। ফলে বারবার এই ভুল ঘটছে, জাতিকে তার খেসারত দিতে হচ্ছে।
হারানো সুযোগ ও কৌশলগত ঘাটতি
৫ আগস্টের পর দেশের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতা-কাঠামোর পুনর্গঠন। সরকার পরিবর্তন কোনো স্থায়ী পরিবর্তনের নিশ্চয়তা দেয় না। কারণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কেবল নির্বাচনী ফলাফলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; প্রশাসন, সামরিক নেতৃত্ব, আমলাতন্ত্র এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে প্রোথিত একটি জটিল কাঠামোর মাধ্যমে টিকে থাকে। প্রয়োজন ছিল দ্রুত, সুসংগঠিত এবং পরিকল্পিত পদক্ষেপ। যেমন, সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ে নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাস, সচিবালয়ের কাঠামোগত সংস্কার, প্রশাসনের ভেতরে দীর্ঘদিনের আনুগত্যভিত্তিক বলয় ভেঙে পেশাদার ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ ছিল পরিবর্তনের ন্যূনতম শর্ত।
এখানেই রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার প্রশ্নটি সামনে আসে। দৃশ্যমান ক্ষমতার পরিবর্তনে অধিক মনোযোগ দেয়া হলেও অদৃশ্য প্রভাববলয় ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ কাঠামো অক্ষত থেকে যায়। অথচ বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা অত্যন্ত সংবেদনশীল। দেশটি আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ফলে যেকোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন কেবল অভ্যন্তরীণ নয়, বাইরের স্বার্থের সাথেও সম্পর্কিত। বিশেষ করে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর দৃষ্টিকোণ থেকে এমন নতুন নেতৃত্বের উত্থান, যারা প্রচলিত কৌশলগত সমীকরণের বাইরে অবস্থান নিতে পারে- উদ্বেগের কারণ হওয়াই স্বাভাবিক।
প্রশ্ন হলো, এই সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার পূর্বাভাস নিয়ে কি বিকল্প রাজনীতির কাছে যথেষ্ট কৌশলগত প্রস্তুতি ছিল? গণ-আন্দোলনের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল তার চেতনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া। জুলাইয়ের আন্দোলনের মূল সুর ছিল সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নীতিগত স্বনির্ভরতা এবং প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক সংস্কার। এই লক্ষ্য অর্জনে দ্রুত ও দৃশ্যমান সংস্কার অপরিহার্য ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে দীর্ঘসূত্রতা, অসংখ্য আলোচনা-পর্যালোচনা এবং সময়ক্ষেপণ। রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, সময়ের সাথে জন-আবেগ স্তিমিত হয় এবং সংস্কারে বিলম্ব পুরনো কাঠামোকে সংহত হওয়ার সুযোগ দেয়, পুরনো প্রভাববলয় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পায়। ৫ আগস্ট ছিল একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। সেই মুহূর্তে প্রয়োজন ছিল দ্রুত, সুনির্দিষ্ট এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত। বিলম্ব ও অস্পষ্টতায় সেই সম্ভাবনা দুর্বল হয়েছে।
এখন করণীয় : আবেগ নয়, কৌশল
এটি প্রমাণিত যে পরাজয় বা আংশিক সাফল্যের পর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বাইরের আক্রমণ নয়, ভেতরের বিভাজন। সুতরাং জামায়াত জোটের সামনে এগোতে হলে কিছু মৌলিক বাস্তবতা মেনে নিয়ে সুসংগঠিত কৌশল গ্রহণ জরুরি। যেমন—
১. বিভাজনের ফাঁদে পা না দেয়া। প্রতিপক্ষের প্রথম কৌশল হয় জোটের মধ্যে বিভক্তি আনা। কখনো লোভনীয় প্রস্তাব, কখনো ভুল তথ্য, কখনো ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে উসকে দিয়ে এসবের মাধ্যমে একটি ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে দুর্বল করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া বার্তা ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করাও এখন পরিচিত কৌশল। সে জন্য বিকল্প ধারার রাজনীতিবিদদের দরকার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করা, গুজব প্রতিরোধে দ্রুত তথ্য-যাচাই ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
২. ঐক্যকে কৌশলগত শক্তিতে রূপ দেয়া। দেশ ও বিকল্প রাজনীতির লক্ষ্য যদি দীর্ঘমেয়াদি হয়, তবে ঐক্য আরো সুদৃঢ় করতে হবে। নির্বাচনী জোট এক জিনিস, কৌশলগত ঐক্য আরেক জিনিস। যে জোট কেবল আসন সমঝোতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে, তা সঙ্কটের সময় ভেঙে পড়ে। কিন্তু যে জোট অভিন্ন নীতিগত রূপরেখা, সাংগঠনিক সমন্বয় ও যৌথ কর্মপরিকল্পনার ওপর দাঁড়ায়, তা দীর্ঘস্থায়ী হয়। সে জন্য তাদের উচিত যৌথ নীতিপত্র প্রণয়ন, সমন্বিত রাজনৈতিক কর্মসূচি, পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে নেতৃত্ব কাঠামো নির্ধারণ করা।
৩. কার্যকর বিরোধী দল হিসেবে সংসদে দৃঢ়, তথ্যভিত্তিক ও গঠনমূলক ভূমিকা রাখা। একই সাথে রাজপথেও দেশ ও জনস্বার্থবিরোধী আইন, নীতিগত বিচ্যুতি বা প্রশাসনিক অনিয়মের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক ও শান্তিপূর্ণভাবে সক্রিয় থাকতে হবে। জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে ধারাবাহিকভাবে সোচ্চার থাকা জরুরি।
৪. ভোটারের সাথে নিবিড় সম্পর্ক ও আস্থার পুনর্গঠন। ভোট পাওয়া একদিনের ঘটনা; আস্থা তৈরি হয় দীর্ঘমেয়াদি সংযোগে। স্থানীয় পর্যায়ে সমস্যা সমাধানে অংশ না নিলে জনসমর্থন আবেগে সীমাবদ্ধ থাকে। তাই দরকার নিয়মিত জনসংলাপ, স্থানীয় ইস্যুতে সরাসরি সম্পৃক্ততা, তরুণ ভোটারদের জন্য নীতিনির্ভর রাজনৈতিক শিক্ষা কর্মসূচি। ভোটারদের বিশ্বাস করাতে হবে যে রাজনীতি কেবল ক্ষমতার জন্য নয়, নীতির জন্য।
৫. সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও দক্ষতা বৃদ্ধি। আধুনিক রাজনীতি কেবল জনপ্রিয়তার খেলা নয়; এটি সংগঠন, তথ্যব্যবস্থা এবং শৃঙ্খলার খেলা। ভোট সুরক্ষায় প্রশিক্ষিত এজেন্ট, আইনি সহায়তা টিম, তথ্য বিশ্লেষণ ইউনিট ছাড়া বড় নির্বাচন পরিচালনা কঠিন। অনেক সময় জনসমর্থন থাকলেও সাংগঠনিক দুর্বলতায় কাঙ্ক্ষিত ফল নিশ্চিত হয় না। দরকার কেন্দ্রভিত্তিক প্রশিক্ষিত নেটওয়ার্ক, আইনি প্রস্তুতি ও নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কাঠামো, ইতিবাচক ও নীতিনির্ভর রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার।
৬. ক্ষমতার বলয়ের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক নির্ধারণ। বাংলাদেশের বাস্তবতায় ক্ষমতার প্রভাববলয় অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান, তাই এই বলয়কে উপেক্ষা করে রাজনীতি করা কঠিন। তবে সমঝোতা ও আত্মসমর্পণের মধ্যে পার্থক্য আছে। অনেক রাজনৈতিক শক্তি সরাসরি সঙ্ঘাতে গিয়ে নিজেদের অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলেছে, আবার কেউ অযাচিত সমঝোতায় বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। উভয় ক্ষেত্রই ক্ষতিকর। করণীয় হলো শক্ত অবস্থান রেখে সংলাপের সক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জন্য ধাপে ধাপে কৌশল, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্বাসযোগ্য যোগাযোগ। ক্ষমতার বলয়ের সাথে সম্পর্কের নীতি ও কৌশল ঠিক করা।
সুতরাং, জামায়াত জোট বা বৃহত্তর বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি যদি ভবিষ্যতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে চায়, তবে তাদের আবেগনির্ভর প্রতিক্রিয়ার বদলে বাস্তবতার নিরিখে পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। সংগঠন, কৌশল ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতিকে এখন থেকেই অগ্রাধিকার দিলে সম্ভাবনাকে শক্তিতে রূপ দেয়া সম্ভব।
লেখক : একাডেমিক ডিরেক্টর, সেন্টার ফর গভার্ন্যান্স অ্যান্ড সিভিলাইজেশনাল স্টাডিজ



