প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় দরকার আনুপাতিক বনায়ন

বৃক্ষ তার সুবিশাল শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে তপ্ত ধরিত্রী শীতল করে| বন্যা, খরা, ঝড় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বৃক্ষরাজি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে| আবহাওয়া ও জলবায়ুকে নাতিশীতোষ্ণ রাখে| মাটিকে উর্বর করে তোলে| গ্রিন হাউজ প্রতিক্রিয়া রোধ করে পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তোলে| আমাদের জীবনযাপনে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী— আসবাবপত্র, জ্বালানি কাঠ, গৃহ নির্মাণে যে বিপুল কাঠের প্রয়োজন হয়, তা আসে এ বৃক্ষরাজি থেকে| বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল ও জীবনরক্ষাকারী ভেষজ বিভিন্ন ওষুধের মূল্যবান উপাদান আমরা বৃক্ষরাজি থেকে পাই

মানুষসহ স্থলে বসবাস করা সব প্রাণী অক্সিজেন গ্রহণ করে ও কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে। অন্য দিকে বৃক্ষরাজি, তরুলতা ও উদ্ভিদ দিনের বেলা কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে ও অক্সিজেন ত্যাগ করে। এ ছাড়া রাতে এর বিপরীত অক্সিজেন গ্রহণ করে ও কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়ে। একজন মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে বাতাসে স্বাভাবিকভাবে ২১ শতাংশ অক্সিজেন প্রয়োজন। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে স্বাভাবিকভাবে ২১ শতাংশ অক্সিজেন, ৭৮ শতাংশ নাইট্রোজেন এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ অন্যান্য গ্যাস ১ শতাংশ থাকে। বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা ১৯ দশমিক ৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে তা মানবদেহে ক্ষতিকর হিসেবে দেখা দেয়। মানুষের শরীর সচল রাখতে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ ২১ শতাংশ অপরিহার্য।

প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও সুস্থ পরিবেশ রক্ষায় একটি দেশের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা অপরিহার্য। বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি হিসাব অনুযায়ী ১৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ বনভূমি রয়েছে। বিশ্বব্যাপী কৃষিজমি সম্প্রসারণে বনভূমি কমছে যা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে।

দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানো ছাড়াও বৃক্ষরাজি, তরুলতা ও উদ্ভিদ প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক পরিবেশকে বহুলাংশে প্রভাবিত করে। বৃক্ষরাজি, তরুলতা ও উদ্ভিদ বৃষ্টিপাতে সাহায্য করে এবং বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি হতে প্রাণিকুলকে রক্ষা করে।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বনভূমির গুরুত্ব অপরিসীম। বনভূমিতে গাছ থাকলে নিরাপদ থাকবে পরিবেশ। অক্সিজেন বৃদ্ধির পাশাপাশি সবুজ বন পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। মানুষের জন্য বৃক্ষ, বিশুদ্ধ বাতাস, নানা রকম ফল ও উপকরণ সরবরাহ করে। বন শুধু আমাদের অক্সিজেন সরবরাহ করে না, মানুষ, প্রাণী, পোকামাকড়, বন্যপ্রাণীকে আশ্রয় দেয়। সেই সাথে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে ও আর্দ্রতার ভারসাম্য রক্ষা করে। পৃথিবীতে জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে, অক্সিজেন সরবরাহ করতে, পর্যটনশিল্প বিকাশে ও শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ করতে বনভূমির ভূমিকা অপরিসীম। তা ছাড়া দারিদ্র্যবিমোচনে ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

একটি বনে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ গাছ থাকে। একজন মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসে বছরে ৭৪০ কেজি অক্সিজেন প্রয়োজন। গড়ে একটি গাছ বছরে ১০০ কেজি পর্যন্ত অক্সিজেন দেয়। ফলে মানুষের বেঁচে থাকা আর পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষায় কাজ করছে বনাঞ্চল।

বৃক্ষরাজি মানুষের এত উপকারে আসা সত্ত্বেও নির্বিচারে তার নিধন চলছে। মানুষের কুঠারের আঘাতে বন দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত শহরায়ন, শিল্পায়ন, আসবাবপত্র তৈরি, শিল্পের কাঁচামাল তৈরি, জ্বলানি কাঠের সরবরাহ ইত্যাদি অজুুহাতে বনভূমি উজাড় হচ্ছে। গাছ কমে যাওয়ায় প্রকৃতির ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়ছে।

বিশ্বের অর্ধেকের বেশি বনভূমি পাঁচটি দেশ যথাÑ রাশিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে অবস্থিত। ইউরোপের দেশগুলোতে বনভূমির পরিমাণ গড়ে প্রায় ৩৯ শতাংশ। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ বনভূমি ফিনল্যান্ডে ৭৪ শতাংশ এবং এর পরের অবস্থান সুইডেনের ৬৯ শতাংশ। যুক্তরাজ্যে বনভূমির পরিমাণ ১৩ শতাংশ। ইউরোপের সবচেয়ে কম বনভূমির পরিমাণ আয়ারল্যান্ডে ১১ শতাংশ।

আমাদের সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভুটানে বনভূমির পরিমাণ সর্বোচ্চ ৭২ শতাংশ। এর পরে রয়েছে শ্রীলঙ্কা ও নেপাল যথাক্রমে ৩২ শতাংশ ও ২৬ শতাংশ। পাকিস্তানে বনভূমির পরিমাণ ৫ শতাংশ, মালদ্বীপে ৩ শতাংশ আর আফগানিস্তানে ২ শতাংশের নিচে। বাংলাদেশের বিষয়ে আগে উল্লেখ করা হয়েছেÑ বনভূমির পরিমাণ ১৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ দেশ ভৌগোলিক কারণে শুষ্ক ও মরুভূমি বেষ্টিত হওয়ায় বনাঞ্চলের পরিমাণ খুব কম। মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশে বনভূমির পরিমাণ ২ শতাংশের নিচে, যা পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় উদ্বেগজনক। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনের মতো দেশগুলোতে প্রাকৃতিকভাবে বনভূমির পরিমাণ খুব নগণ্য। লেবানন বা তুরস্কের মতো কিছু দেশে বনভূমির হার কিছুটা বেশি হলেও সামগ্রিকভাবে মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম স্বল্প বনভূমি অঞ্চল। মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ বর্তমানে মরুকরণ রোধ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কৃত্রিম বনায়ন ও সবুজায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করছে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে যেসব দেশে বনভূমির পরিমাণ ২৫ শতাংশের নিচে, সে সব দেশ বনভূমি বৃদ্ধিতে কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে। এ সব দেশে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন ও সচেতন নাগরিক বৃক্ষায়নে এগিয়ে এসেছে। এই দেশগুলোর মানুষের উপলব্ধিতে এসেছে, নিজ প্রয়োজনে মানুষ গাছের কাছে ঋণী। কাজেই একটি গাছ কাটার আগে ফলদ, বনজ ও ঔষধি তিনটি গাছ লাগিয়ে তা রক্ষণাবেক্ষণে সাধারণ মানুষদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

আমাদের দেশে কিছুসংখ্যক দুর্নীতিপরায়ণ চোরাকারবারি কাঠ কেটে অবাধে চোরাইপথে বিক্রি করে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। চোরাই কাঠের অধিকাংশ অবৈধভাবে বসানো স’ মিলগুলোতে জড়ো করে তা করাতকলের মাধ্যমে সাইজ করে সড়ক ও নদীপথ দিয়ে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে বিক্রি করছে। প্রতিদিন নতুন নতুন স’ মিল গড়ে উঠছে, যদিও সরকারের স’ মিল লাইসেন্স বিধিমালা-১৯৯৮ এর ৮(১) ধারায় সুস্পষ্টরূপে উল্লেখ রয়েছেÑ সংরক্ষিত, রক্ষিত, অর্পিত ও অন্য যেকোনো ধরনের সরকারি বনভূমির সীমানার ১০ কিলোমিটারের মধ্যে পৌর এলাকা ছাড়া কোনো স’ মিল স্থাপন ও পরিচালনা করা যাবে না।

উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশে তিন ধরনের বনভূমি রয়েছে। এর প্রথম ধরণটি হলো ক্রান্তীয় চিরহরিৎ ও পত্র-পতনশীল বনভূমি। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের বিস্তৃত এলাকাজুড়ে রয়েছে এ বনভূমি। চাপালিশ, গর্জন, গামারি, জারুল, কড়ই প্রভৃতি হলো এ বনভূমির প্রধান বৃক্ষ। দ্বিতীয় ধরনটি হলো শালবন। ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও টাঙ্গাইলের মধুপুরে এ বনভূমি অবস্থিত। এ ছাড়া রংপুর ও দিনাজপুরেও সামান্য পরিমাণে এ ধরনের বনভূমি রয়েছে। এ বনাঞ্চলের প্রধান বৃক্ষ শাল। তা ছাড়া ছাতিন, কড়ই ও হিজলও রয়েছে। তৃতীয় ধরনটি হলো ম্যানগ্রোভ বনভূমি। বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলা খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় এ বনভূমি অবস্থিত। বনভূমিটি সুন্দরবন নামে খ্যাত, যা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনভূমি। এ বনভূমির প্রধান বৃক্ষ হলো সুন্দরী।

আমাদের জীবন ও জীবিকার জন্য বৃক্ষরাজি, তরুলতা ও উদ্ভিদের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। বৃক্ষরাজি, তরুলতা ও উদ্ভিদের সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের অস্তিত্বের সম্পর্ক। বৃক্ষরাজি, তরুলতা ও উদ্ভিদ সব প্রাণীর খাদ্যের জোগান দেয়। বিশাল প্রাণিজগৎ বাঁচিয়ে রাখতে অক্সিজেন দেয়। এ ছাড়া প্রাণিজগৎকে বিপন্নকারী কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। বৃক্ষ তার সুবিশাল শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে তপ্ত ধরিত্রী শীতল করে। বন্যা, খরা, ঝড় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বৃক্ষরাজি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে। আবহাওয়া ও জলবায়ুকে নাতিশীতোষ্ণ রাখে। মাটিকে উর্বর করে তোলে। গ্রিন হাউজ প্রতিক্রিয়া রোধ করে পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তোলে। আমাদের জীবনযাপনে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীÑ আসবাবপত্র, জ্বালানি কাঠ, গৃহ নির্মাণে যে বিপুল কাঠের প্রয়োজন হয়, তা আসে এ বৃক্ষরাজি থেকে। বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল ও জীবনরক্ষাকারী ভেষজ বিভিন্ন ওষুধের মূল্যবান উপাদান আমরা বৃক্ষরাজি থেকে পাই।

দেশের অর্থনৈতিক ও অন্যান্য চাহিদা পূরণে বনভূমি ও বনজসম্পদের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের দেশে প্রয়োজনের তুলনায় বনভূমির পরিমাণ কম। অবাধে বৃক্ষ নিধনের ফলে আমাদের বনভূমি প্রতিনিয়ত সঙ্কোচিত হচ্ছে। কিন্তু আমাদের অর্থনৈতিক ও অন্যান্য প্রয়োজনে এ বনভূমি ও বনজসম্পদের সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ প্রয়োজন। নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন রোধ করতে হবে। মূল্যবান বৃক্ষগুলো সরকারি অনুমতি ছাড়া নিধন নিষিদ্ধ করতে হবে। আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বৃক্ষরোপণের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। শুধু সরকারের ওপর চেয়ে না থেকে সামাজিক ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে বৃক্ষায়নের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে আশা করা যায়, আমরা যে আনুপাতিক বনায়নে পিছিয়ে রয়েছি, তা থেকে উত্তরণে ধীরে ধীরে সফলতার পথে এগিয়ে যেতে পারব।

লেখক : সাবেক জজ এবং সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

[email protected]