আসামে সাম্প্রতিক অস্থিরতা

আসামে স্থিতি আনার ব্যর্থতা উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে স্থায়ীভাবে সঙ্ঘাত এবং কৌশলগত নাজুক অঞ্চলে পরিণত করতে পারে।

২০২৫ এর ডিসেম্বরের শেষের দিকে, আসাম রাজ্যে চলমান অস্থিরতার মূল কেন্দ্রবিন্দু পশ্চিম কার্বি আংলং জেলা। সেখানে কার্বি উপজাতি গোষ্ঠীগুলোর জমি থেকে ‘অবৈধ দখলদারদের’ উচ্ছেদের দাবি নিয়ে তীব্র সঙ্ঘাত দানা বেঁধেছে। এই জমিগুলো ষষ্ঠ তফসিলের অধীনে সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত। এ নিয়ে আদিবাসী কার্বি সম্প্রদায় এবং বসতি স্থাপনকারীদের (প্রায়ই বিহারি বা কুকি হিসেবে চিহ্নিত) মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা জানায়, বহিরাগতদের বেশির ভাগই হিন্দিভাষী, তারা বিহার ও নেপাল থেকে এসেছে। সরকার এদের উচ্ছেদের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন করেনি। গ্রামের চারণভূমি সংরক্ষণ (ভিজিআর) এবং পেশাদার চারণ সংরক্ষণ কেন্দ্র (পিজিআর) থেকে কথিত অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের উচ্ছেদের দাবি আন্দোলনের বড় ইস্যু। বিক্ষোভে কার্বি আংলং স্বায়ত্তশাসিত কাউন্সিলের (কেএএসি) প্রধান নির্বাহী সদস্য তুলিরাম রংহাংয়ের বাড়িতে আগুন এবং রাজনৈতিক নেতাদের লক্ষ করে আক্রমণ চালানো হয়েছে। এতে ১৭০ জনেরও বেশি নিরাপত্তাকর্মী আহত হন। কারফিউ জারি এবং ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছে।

এই স্থানীয় জাতিগত সঙ্ঘাতের পাশাপাশি, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) রাজনৈতিক প্রভাবও অস্থিরতার আগুনে ঘি ঢেলেছে। ১১ ডিসেম্বর, ২০২৫ অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (এএএসইউ) এবং নর্থ ইস্ট স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন (এনইএসও) ‘কালো দিবস’ পালন করে। অসমীয়া জাতীয়তাবাদীরা অভিযোগ করেন, সিএএ ১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তির মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করেছে, কারণ এটি ১৯৭১ সালের পরে প্রবেশকারী অমুসলিম অভিবাসীদের নাগরিকত্ব দিয়েছে, যা অসমীয়া ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য হুমকি। উপরন্তু, সাংস্কৃতিক আইকন জুবিন গর্গের মৃত্যুর পর প্রতিবাদ এবং বাংলাদেশে কথিত সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রচারণা সামাজিক মেরুকরণ বাড়িয়েছে।

গত ২২ ডিসেম্বর ১৫ দিনের অনশন ধর্মঘটের পর পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়। অনশনকারীদের হাসপাতালে নেয়ার পর গুজব ছড়িয়ে পড়ে, তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, যার ফলে তাৎক্ষণিক সহিংসতার জন্ম দেয়। একটি জ্বলন্ত দোকানে আটকে পড়ে অন্তত দু’জন নিহত হন (একজন কার্বি বিক্ষোভকারী এবং একজন বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তি), ৬০ জনেরও বেশি পুলিশকর্মীসহ ৭০ জনেরও বেশি আহত হন। গুয়াহাটি হাইকোর্ট উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ করে দেয়।

রাজ্য সরকার রাতে কারফিউ জারি করে। সেনাবাহিনী, সিআরপিএফ ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে। ইন্টারনেট বন্ধ করে। ২৬ ডিসেম্বর, ২০২৫ গুয়াহাটির জনতা ভবনে রাজ্য সরকার, কেএএসি এবং প্রতিবাদীদের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যাতে কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে কার্বি কালচারাল সোসাইটি (কেসিএস) এবং কার্বি লামেত আমেইয়ের (কেএলএ) নেতারা জানান, অবৈধ বসতি উচ্ছেদের মূল দাবি অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬ দ্বিতীয় দফা আলোচনা হবে।

আসামে অস্থিরতার ভূ-রাজনৈতিক পরিণতি

আসাম ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বার। এই রাজ্যে অস্থিরতা পুরো অঞ্চলে গভীর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৫ সালের শেষের দিকে, জাতিগত ভূমি বিরোধ ছাড়াও বাংলাদেশের সাথে আন্তঃসীমান্ত উত্তেজনা মিলিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এই অস্থিতিশীলতা অব্যাহত থাকলে তা ভারতের কৌশলগত উচ্চাকাক্সক্ষাকে লাইনচ্যুত করতে পারে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপড়েন ঘটাতে পারে।

আসামে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরিণতি হলো ভারতের অ্যাক্ট ইস্ট নীতির সম্ভাব্য ব্যর্থতা। আসাম মূলত লজিস্টিক এবং অর্থনৈতিক কেন্দ্র যা ভারতের মূল ভূখণ্ডকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে সংযুক্ত করেছে। ত্রিপক্ষীয় মহাসড়ক এবং কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পের মতো অবকাঠামো প্রকল্পগুলো পণ্য ও কর্মী চলাচলের জন্য একটি স্থিতিশীল আসামের উপর নির্ভরশীল। ঘন ঘন অবরোধ, ইন্টারনেট বন্ধ ও সিভিল স্ট্রাইকের কারণে অব্যাহত অস্থিতিশীলতা বিদেশী বিনিয়োগে বাধা দিয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ প্রকল্পগুলো সমস্যাগ্রস্ত হয়েছে। এটি কেবল উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নই বাধাগ্রস্ত করছে না, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারে ভারতের ক্ষমতাও দুর্বল করছে।

অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং বিদ্রোহের পুনরুত্থান

ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর পুনরুত্থানের উর্বর ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক জঙ্গি সংগঠন শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও, উলফা-আইয়ের মতো কট্টরপন্থী দলগুলো এখনো সক্রিয় এবং নতুন সদস্য সংগ্রহ করতে ভূমি অধিকারের বিষয়ে জনগণের ক্ষোভকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি ভারত সরকার এই অঞ্চলে আবারো উল্লেøখযোগ্য পরিমাণে সামরিক ও আধাসামরিক শক্তি মোতায়েনে বাধ্য হয়েছে। অনেকে মনে করছেন, এই পদক্ষেপ স্থানীয় জনগণকে আরো বিচ্ছিন্ন করতে পারে। তার ওপর আসামের অস্থিতিশীলতা মনিপুর এবং নাগাল্যান্ডের মতো প্রতিবেশী রাজ্যে ছড়াতে পারে। জাতিগত ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের চেইন ইফেক্ট তৈরি হয়ে পুরো ‘সেভেন সিস্টার্স’ অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।

আসামের অস্থিরতা ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ককেও নাড়া দিতে পারে। সিএএ এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) ঘিরে বাগাড়ম্বর ইতোমধ্যে কূটনৈতিক দ্ব›দ্ব তৈরি করেছে। যদি অস্থিরতা সীমান্তের কাছে বড় আকারের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বা গণ উচ্ছেদে পরিণত হয়, তবে তা মানবিক সঙ্কট এবং অনিয়মিত অভিবাসন বৃদ্ধি করতে পারে। এটি বাংলাদেশ সরকারের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে। উপরন্তু, একটি প্রতিকূল বা অস্থিতিশীল সীমান্ত আন্তঃদেশীয় অপরাধী নেটওয়ার্ক এবং চরমপন্থীদের তৎপরতা চালানো সহজ করে তুলবে।

আসামে বর্তমান অস্থিরতা আদিবাসী গোষ্ঠী, বসতি স্থাপনকারী এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে গভীর বিভাজনকে তুলে ধরেছে। এই বিভাজন অঞ্চলটিকে বাহ্যিক হস্তক্ষেপ এবং অভ্যন্তরীণ নাশকতার জন্য আরো সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। ‘চিকেনস নেক’ করিডোর উত্তর-পূর্বকে ভারতের বাকি অংশের সাথে সংযুক্ত করার সঙ্কীর্ণ ভূমি। এটি একটি কৌশলগত দুর্বলতা হিসেবে রয়ে গেছে। এর আশপাশে অব্যাহত অস্থিরতা ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে তুলবে, যার ফলে সামরিকীকরণ বাড়বে এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চল জাতীয় মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে।

রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা : স্বাধীনতা এবং স্বায়ত্তশাসন

আসামের জনগণের রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা বৈচিত্র্যময়, সরাসরি বিচ্ছিন্নতা থেকে শুরু করে বৃহত্তর স্ব-শাসনের দাবি পর্যন্ত। সম্পূর্ণ স্বাধীন ‘সার্বভৌম অসম’ এর আহ্বান প্রাথমিকভাবে পরেশ বড়ুয়ার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব অসম-ইন্ডিপেন্ডেন্টের (উলফা-আই) সমর্থিত। উলফার মূলধারার অংশটি ২০২৩ সালের শেষের দিকে ভারত সরকারের সাথে শান্তি চুক্তি করলেও উলফা-আই সক্রিয় রয়েছে।

অসমীয়া জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ স্বাধীনতার জন্য সহিংস সংগ্রামের পরিবর্তে প্রাথমিকভাবে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন চায়। বোড়ো, কার্বি এবং ডিমাসাসহ আসামের অনেক বৈচিত্র্যময় উপজাতি সম্প্রদায়ের আকাক্সক্ষা স্বায়ত্তশাসন। তারা তাদের জাতিগত পরিচয়কে ‘মূল ভূখণ্ড’ তথা ভারতীয় প্রভাব এবং অভিবাসীদের সৃষ্ট হুমকি থেকে রক্ষা করতে চায়।

‘বাংলাদেশের সাথে মিশে যাও’

আসামের মানুষ ‘বাংলাদেশের সাথে মিশে যাওয়া’ বা প্রতিবেশী দেশের সাথে একীভূত হতে চায় এমন পরামর্শ স্থানীয় রাজনৈতিক আলোচনার বড় ভুল বোঝাবুঝি। এটি কোনো জনপ্রিয় আকাক্সক্ষা থেকে নয়, বরং রাষ্ট্রের জারি করা রাজনৈতিক সতর্কতা থেকে উদ্ভূত। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা সম্প্রতি দাবি করেছেন, যদি বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত অভিবাসীদের সংখ্যা আরো ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তাহলে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের কারণে আসাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। এই বিবৃতিটি একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার যা অবৈধ অভিবাসনের হুমকি বড় করে দেখাতে এবং কঠোর পদক্ষেপকে ন্যায্যতা দেয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। অসমীয়া অনুভূতির বাস্তবতা এই ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। বিদেশী-বিরোধী আন্দোলন চার দশকেরও বেশি সময় ধরে অসমীয়া রাজনীতির কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হয়ে উঠেছে, যা বাংলাদেশ থেকে কথিত অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে রাজ্যের পরিচয় রক্ষার সঙ্কল্প দেখিয়েছে। ফলস্বরূপ, অসমীয়াদের মধ্যে বাংলাদেশে যোগদানের কার্যত কোনো আন্দোলন বা ইচ্ছা নেই; বরং ‘বাংলাদেশের উপনিবেশে পরিণত হওয়ার’ ভয় আছে।

পরিশেষ

আসামের অস্থিরতা একটি জটিল এবং বহু স্তরযুক্ত ঘটনা, মূলত উপজাতি আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত ভয়। যখন একটি ছোট গোষ্ঠী স্বাধীনতার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন উপজাতি গোষ্ঠী পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি করছে, তখন অসমীয়া জাতীয়তাবাদের গুরুত্বপূর্ণ অনুভূতি হলো, জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী সাংবিধানিক সুরক্ষাসহ ভারতের সুরক্ষিত অংশ হিসেবে থাকার আকাক্সক্ষা।

আসামে অস্থিরতার সম্ভাব্য বৃদ্ধি ভারতের জন্য বড় ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি। দীর্ঘমেয়াদি পরিণতির মধ্যে রয়েছে সশস্ত্র বিদ্রোহের পুনরুত্থান এবং বাংলাদেশের সাথে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি। এই ঝুঁকিগুলো হ্রাসের জন্য দরকার ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ও শক্তিশালী সুরক্ষা ব্যবস্থার। আসামে স্থিতি আনার ব্যর্থতা উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে স্থায়ীভাবে সঙ্ঘাত এবং কৌশলগত নাজুক অঞ্চলে পরিণত করতে পারে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব ও গ্রন্থকার