শিক্ষাজীবনের শুরুতে শিশুর হাতে থাকার কথা রঙিন পাঠ্যবই। আর মনে থাকার কথা অজানাকে জানার অপার কৌতূহল; কিন্তু আমাদের দেশে শিশুদের শৈশব বারবার পিষ্ট হচ্ছে ‘ভর্তিযুদ্ধ’ নামের এক অসম ও অযৌক্তিক প্রতিযোগিতার জাঁতাকলে।
সম্প্রতি জানা গেছে, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিক স্তরে আবার ভর্তিপরীক্ষা চালুর পরিকল্পনা নিচ্ছে সরকার। লটারির পরিবর্তে সেই পুরনো পরীক্ষাপদ্ধতি ফিরে এলে তা হবে শিশুর জন্য অমানবিক পদক্ষেপ। শিক্ষা কেবল তথ্য মুখস্থ করা নয়; বরং এটি শিশুর সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের পথ। সেই পথে শুরুতে যদি আমরা কাঁটাতার বসিয়ে দিই, তবে আগামীর মেধা অঙ্কুরে বিনষ্ট হওয়ার শঙ্কা থেকে যাবে।
একটি অমানবিক প্রতিযোগিতার আখ্যান
বাংলাদেশের বাস্তবতায় ‘ভর্তিযুদ্ধ’ শব্দটি এখন আর কেবল রূপক নয়, নিষ্ঠুর সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। একটি পাঁচ বা ছয় বছরের শিশু, যার সবে চার পাশ চেনার কথা, তাকে আমরা ঠেলে দিচ্ছি অঘোষিত মল্লযুদ্ধে। নামী স্কুলে ভর্তির এ ইঁদুর দৌড়ে অংশ নিতে গিয়ে শিশুদের শৈশব থেকে হারিয়ে যাচ্ছে খেলাধুলা, গল্প আর স্বতঃস্ফূর্ততা। ভোরে ঘুম থেকে উঠিয়ে তাকে কোচিংয়ে নেয়া, স্কুল শেষে আবার প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে দৌড়ানো— এ চক্রে পড়ে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ রুদ্ধ হচ্ছে।
এ পদ্ধতি কতটা অমানবিক তার প্রমাণ মেলে যখন দেখি অভিভাবক সন্তানকে ‘শ্রেষ্ঠ’ প্রমাণ করতে হন্যে হয়ে উঠছেন। শিশুর জন্য সেটি আর আনন্দের উৎস থাকে না; হয়ে ওঠে পরিবারের সামাজিক মর্যাদার লড়াই। লটারিপদ্ধতি চালুর আগে আমরা দেখেছি কিভাবে হাজার হাজার শিশু একটি নির্দিষ্ট আসনের জন্য লড়ত। যারা টিকত না, তারা তো বটেই, যারা টিকত তারাও একধরনের যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বড় হতো। এ ব্যবস্থা শুধু শিক্ষা নয়, মানবিকতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সাংবিধানিক অধিকার বনাম ভর্তিবৈষম্য
প্রতিটি শিশুর শিক্ষার অধিকার কেবল সাংবিধানিক নয়, তার মৌলিক মানবাধিকার। বাংলাদেশের সংবিধানে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হওয়ার কথা ছিল প্রতিটি এলাকার প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন করা, যাতে সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়াতে অভিভাবককে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াতে না হয়। কিন্তু সেই কাঠামোগত ও গুণগত উন্নয়ন নিশ্চিত না করে গুটিকয় ‘নামী’ প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের একটি অসম যুদ্ধের মুখে ফেলে দেয়া কোনোভাবে কাম্য নয়। এ পদ্ধতি প্রমাণ করে, আমরা শিক্ষার সর্বজনীনতা নিশ্চিত করতে পারিনি; বরং একটি প্রতিযোগিতার পণ্যে রূপান্তরিত করেছি।
উন্নত বিশ্বের শিক্ষা : প্রতিযোগিতা নয়, সুযোগই প্রাধান্য
আমরা যখন শিশুদের শৈশবকে পরীক্ষার টেবিলে ঠেলে দিচ্ছি, তখন উন্নত বিশ্বের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফিনল্যান্ড বা জাপানের মতো দেশ আজ কেন শিক্ষায় শ্রেষ্ঠ? ফিনল্যান্ডের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে প্রাথমিক স্তরে প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষা নেই। সেখানে পাড়ার স্কুলে পড়া বাধ্যতামূলক। প্রতিটি স্কুলের মান সেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমান পর্যায়ে রাখা হয়, ফলে কোনো নির্দিষ্ট স্কুলের জন্য অভিভাবকদের চোখের পানি ফেলতে হয় না। ফিনল্যান্ডের শিক্ষাদর্শনে পরীক্ষার চাপ কমিয়ে শিশুর আনন্দের ওপর জোর দেয়া হয়।
অন্য দিকে জাপানে শিশুদের ১০ বছর বয়স পর্যন্ত কোনো কঠোর পরীক্ষায় বসতে হয় না। সেখানে শিক্ষার মূল লক্ষ্য মেধা যাচাই নয়; বরং শিশুর চরিত্র গঠন এবং সামাজিক শিষ্টাচার শেখানো। বিশ্বাস করা হয়, শিশুকে প্রতিযোগিতার বদলে সহযোগিতার শিক্ষা দেয়াই প্রধান কাজ। অথচ আমরা উল্টো পথে হেঁটে শিশুর শৈশব বিষিয়ে তুলছি।
শিশুর মনস্তত্ত্বে আঘাত ও দীর্ঘমেয়াদি ট্রমা
ভর্তিপরীক্ষা আসলে মেধা যাচাইয়ের নামে শিশুর ওপর প্রাতিষ্ঠানিক মানসিক নির্যাতন চাপিয়ে দেয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুনের পর্যবেক্ষণ এ ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত কোনোভাবে ভর্তিপরীক্ষা নেয়া যাবে না। ভর্তিপরীক্ষা মানে শিশুকে ‘ট্যাগ’ (তকমা) দেয়া যে, সে পারে না। এভাবে শিশুকে ট্রমার (মানসিক আঘাত) মধ্যে ফেলা উচিত নয়।’
বিশ্বখ্যাত মনস্তত্ত্ববিদ এরিক এরিকসন তার চাইল্ডগুড অ্যান্ড সোসাইটি (পৃষ্ঠা ২৫২, ১৯৫০ সংস্করণ) বইয়ে উল্লেখ করেছেন, শৈশবের সূচনালগ্নে শিশু যদি নিজের সক্ষমতা নিয়ে লজ্জিত হয় বা নিজেকে অযোগ্য মনে করে, তবে তার আত্মবিশ্বাস সারা জীবনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি পাঁচ বা ছয় বছরের শিশু যখন তথাকথিত ভর্তিপরীক্ষায় ‘ফেল’ করে, তখন সে অবচেতন মনে নিজেকে অন্যদের চেয়ে নিচু ভাবতে শুরু করে। তার মধ্যে জন্ম নেয় ‘হীনম্মন্যতা’।
আমেরিকার সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (এপিএ) মনিটর অন সাইকোলোজি ম্যাগাজিনের এক নিবন্ধে (ভলিউম-৪২, সংখ্যা-৮, ২০১১) গবেষক জেনিফার আবরাহাম দেখিয়েছেন, অল্প বয়সে উচ্চমাত্রার প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা শিশুদের মধ্যে ‘টেস্ট অ্যাংজাইটি’ বা পরীক্ষাভীতি তৈরি করে। এ ভীতি পরবর্তী জীবনে তাদের সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং স্বাভাবিক চিন্তা করার শক্তি কমিয়ে দেয়।
কোচিং বাণিজ্যের পুনরুত্থান
অভিজ্ঞতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, ভর্তিপরীক্ষা মানে পাড়ায় পাড়ায় কোচিং সেন্টারের রমরমা ব্যবসায় আর শিক্ষকদের প্রাইভেট পড়ানোর দৌরাত্ম্য। লটারি পদ্ধতি চালু হওয়ার প্রধান কারণ ছিল ভর্তিবাণিজ্যের সিন্ডিকেট ভাঙা। সাধারণ ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার দুয়ার উন্মুক্ত করা। ভর্তিপরীক্ষা আবার চালু হলে সচ্ছল পরিবারের সন্তানরা কোচিং সেন্টারের সুবিধা নিয়ে এগিয়ে যাবে, আর বঞ্চিত হবে মেধাবী; কিন্তু দরিদ্র পরিবারের শিশুরা।
দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা সংস্কারের পথনকশা : একটি প্রস্তাব
ভর্তিপরীক্ষার মতো সাময়িক ও ক্ষতিকর দাওয়াই না খুঁজে সরকারকে টেকসই ও বৈপ্লবিক পরিকল্পনা নিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ঢেলে সাজাতে নিচের পদক্ষেপগুলো হতে পারে কার্যকর রোডম্যাপ—
১. স্কুল ম্যাপিং ও মান-সমতা নিশ্চিতকরণ : প্রতিটি উপজেলা এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে ‘পাইলট স্কুল’ প্রজেক্টের মাধ্যমে সব সরকারি স্কুলের অবকাঠামো ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ সমান পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। যখন অভিভাবক জানবেন, বাড়ির পাশের স্কুলটিও ঢাকার নামী স্কুলের সমান মানসম্পন্ন, তখন তারা ভর্তিযুদ্ধের পথে পা বাড়াবেন না।
২. শিক্ষকদের আকর্ষণীয় বেতনভাতা : প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের বেতনকাঠামো ও সামাজিক মর্যাদা জাপানের মতো সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে। মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে না পারলে কোনো পদ্ধতি সফল হবে না।
৩. ডিজিটাল রিসোর্স শেয়ারিং : আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাজধানীর নামী স্কুলের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ের স্কুলে পৌঁছে দিতে হবে। এতে শিক্ষার মানের যে ভৌগোলিক বৈষম্য রয়েছে তা ঘুচে যাবে।
৪. জাতীয় কারিকুলামের একক মানদণ্ড : ইংরেজি মাধ্যম, মাদরাসা ও সাধারণ শিক্ষার মধ্যে বিদ্যমান পাহাড়সম বৈষম্য কমিয়ে একটি অভিন্ন, সৃজনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কারিকুলাম বাস্তবায়ন করতে হবে। যেখানে পরীক্ষার চেয়ে ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে।
৫. লটারি পদ্ধতির আধুনিকায়ন : পরীক্ষা নয়; বরং লটারি পদ্ধতির ত্রুটি দূর করে একে স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। এলাকাভিত্তিক কোটা-পদ্ধতি কড়াকড়িভাবে বাস্তবায়ন করলে ভর্তিযুদ্ধের উন্মাদনা কমবে।
৬. সামাজিক সচেতনতা ও কাউন্সেলিং : অভিভাবকদের মধ্যে এ সচেতনতা তৈরি করতে হবে যে, নামী স্কুল মেধার একমাত্র মাপকাঠি নয়। এ জন্য নিয়মিত অভিভাবক সভা ও মিডিয়া ক্যাম্পেইন প্রয়োজন।
ভবিষ্যতের দায়বদ্ধতা
ভর্তিপরীক্ষা চালুর আলোচনা শিক্ষাক্ষেত্রের পুরনো ক্ষতগুলো আবার জাগিয়ে তুলবে। লটারি পদ্ধতি শতভাগ নিখুঁত না হলেও এটি অন্তত শিক্ষাব্যবস্থায় একটি সাম্য বজায় রেখেছিল। শিশুদের ওপর থেকে আকাশছোঁয়া চাপের বোঝা নামিয়ে এনেছিল। অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতার জোয়াল না চাপিয়ে শিশুদের শৈশব মুক্ত রাখা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
ভর্তিযুদ্ধ মানে শুধু একটি আসনে উত্তীর্ণ হওয়া নয়, এটি হাজার হাজার শিশুকে শৈশবে ‘অযোগ্য’ হিসেবে বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়া। এ মানসিক নির্যাতন বন্ধ না করলে আমরা একটি বিভক্ত ও হতাশাবাদী সমাজ পাবো। সরকারের উচিত হবে এমন চিন্তা থেকে সরে এসে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা সংস্কারে নজর দেয়া।
লেখক : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক



