পয়লা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ আমাদের লোকজ উৎসব। গ্রামীণ অর্থনীতিতে ‘হালখাতা’র মাধ্যমে এর শুরু। বাংলাদেশ বা সুবে বাঙলায় বাংলা সন চালুর আগে থেকেই তারিখ বা বর্ষগণনার বিভিন্ন রীতি ছিল। ৯৬৩ হিজরিতে সম্রাট আকবর সিংহাসনে আরোহণ করেন। ওই সময় থেকে হিজরি চান্দ্র সনকে ফসলি সনে রূপান্তরের মাধ্যমে ফসলি সন বা বাংলা সন গণনা ধরা হয়। তবে অবিভক্ত বাংলায় সাল গণনার ইতিহাস অনেক প্রাচীন।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, খ্রিষ্টের জন্মেরও তিন হাজার বছর আগে থেকে উপমহাদেশে সন গণনা চালু ছিল। সেই যুগকেই এখানে কলির যুগ বলে হিসাব করা হতো। উপমহাদেশের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন ধরনের সন গণনা রীতি চালু ছিল। ১০২৮ সালে আল বিরুনির লেখা কিতাবুল হিন্দ বা ভারততত্ত্ব বইয়ে এই অঞ্চলে প্রায় ৬০টি বর্ষগণনার রীতি চালু ছিল বলে উল্লেখ আছে। বাংলা সনের সাথে হিজরি সালকে চান্দ্রবর্ষ থেকে সৌরবর্ষে রূপান্তরের ক্ষেত্রে ইরানে অগ্নি-উপাসকদের সাবানি বর্ষেরও সমন্বয় করা হয়েছে। তখন উপমহাদেশে শ্রী হর্ষ অব্দ চালু ছিল মথুরা ও কনৌজ অঞ্চলে। বিক্রমাদিত্যের অব্দ চালু ছিল দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে। আর্যাবর্তের পর বহিরাগত শূদ্র বংশের এক রাজা শকাব্দ চালু করেছিলেন। শক রাজার পতন ঘটান বিক্রমাদিত্য। শকাব্দের ২৪১ বছর পর বলভি নগরের রাজা বলভ অব্দ চালু করেন। মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুযায়ী কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতেন; কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে কৃষকদের অসময়ে খাজনা দিতে হতো। তাই খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা আনতে সম্রাটের আদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজী হিজরি সালের ওপর ভিত্তি করে ফসলি সন চালু করেন। ১৫৮৪ সালের ১০ বা ১১ মার্চ থেকে এই সন গণনা রীতি চালু হলেও এই গণনাপদ্ধতি কার্যকর ধরা হয় সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহণের তারিখ অর্থাৎ ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর থেকে। শুরুতে ফসলি সন নামে চালু হলেও পরে তা ‘বঙ্গাব্দ’ এবং আরো পরে ‘বাংলা সন’ হিসেবেই পরিগণিত হয়।
মুঘল জমানায় রাজভাষা ছিল ফারসি। ইরানের নওরোজ উৎসবের আদলেই এখানে বর্ষবরণের আবহ তৈরি হয়। বাংলা সন আকবরের সিংহাসনে আরোহণের বছর থেকে ধরা হলেও এর মাস গণনা হয় ইরানি নওরোজ বা সাবানি বর্ষের মার্গশির্ষ বা অগ্রহায়ণ থেকে। ১৫৮৪ সালে আকবরের নবরত্ন সভার বাইরের এক জ্যোতির্বিদ আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজী হিজরি সালকে ভিত্তি করে সৌরবর্ষে রূপান্তর করে ফসলি সনের পত্তন ঘটান। তখন থেকে শুরু হওয়া এই সন গণনারীতি কোনোমতেই বাংলা সাল ছিল না। এই সাল কেবল বাংলা অঞ্চলের জন্য প্রবর্তিত হয়নি। সম্রাট আকবর জাতিসত্তা বা বোধবিশ্বাসের দিক থেকেও বাঙালি ছিলেন না। বিভিন্ন শাসক তাদের সিংহাসনে আরোহণ ও শাসনকালকে মহিমান্বিত করতে সন গণনা রীতি চালু করেন। শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ সুবে বাঙলার শাসক হওয়ার পর নিজেকে শাহ-ই-বাঙালা ঘোষণা দেন। এর পর থেকেই মূলত বাঙালা অঞ্চল স্বতন্ত্র ভূখণ্ড বা রাষ্ট্রিক পরিকাঠামো পায়।
বাবু কালিশঙ্কর সেন ও মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলামের গবেষণায় জানা গেছে, বাংলাদেশেও প্রায় ৩০টি সন গণনা পদ্ধতি চালু ছিল। বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠী ও রাজা-বাদশাহদের আমল এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার ভিত্তিতেই এসব সন গণনারীতি প্রবর্তিত হয়েছিল। ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের ঘটনার স্মারক হিসেবে একটি সন গণনার রীতি চালু হয়, যা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে ‘সরাইল সন’ হিসেবে এখনো আছে। চট্টগ্রাম ও বার্মার আরাকানে ‘মঘি সন’ ছিল। কুমিল্লা ও ত্রিপুরায় ‘ত্রিপুরা অব্দ’, রাজশাহী এলাকায় ‘বাঘা সন’ চালু ছিল। এ ছাড়া এখনো পার্বত্য নৃ-গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ‘বৈসুক’, ‘সাংগ্রাই’ ও ‘বিজু’ তিন বর্ষবরণ রীতি চালু আছে। এই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর তিনটি উৎসবকে বলা হয় ‘বৈসাবি’। এ ছাড়াও হিজরি সন, বাংলা সন ও গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার তো আছেই।
হিজরি সন ছাড়া অন্যান্য সন গণনা রীতি সৌরবর্ষভিত্তিক হলেও এর সবগুলোর নববর্ষ একই দিনে হয় না। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার সৌরবর্ষ হলেও বাংলা সৌরবর্ষ বা বাংলা সনের প্রথম দিন গ্রেগরিয়ান কালেন্ডার অনুযায়ী একই দিনে পড়ছে না। এ বিষয়টি নিষ্পত্তি করতেই বাংলাদেশে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং পশ্চিমবঙ্গে ড. মেঘনাদ সাহার নেতৃত্বে দু’টি কমিটি কাজ করে। ১৯৮৮ সালে বাংলা একাডেমি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর গবেষণা ও অধিকতর সংস্কারের প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতি বছর ইংরেজি সালের ১৪ এপ্রিল বাংলা নবর্বষ পালন হচ্ছে। সৌরবর্ষ হিসেবে নববর্ষ বৈশাখের প্রথম দিনের প্রত্যুষের সূর্যোদয় থেকে শুরু হওয়ার কথা; কিন্তু গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সাথে সমন্বয় করায় ১৩ এপ্রিল মধ্যরাতের পর থেকেই শুরু করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে মেঘনাদ সাহার সনাতন রীতি অনুযায়ী এক দিন পর, অর্থাৎ ১৫ এপ্রিল নবর্বষ পালন করা হয়। লোকনাথ পঞ্জিকার এই রীতি অনুযায়ী বাংলাদেশেও সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী অনেক ব্যবসায়ী ১৫ এপ্রিল হালখাতা করে।
উপমহাদেশে যতরকম বর্ষগণনার রীতি ও উৎসব আছে, সবগুলোতেই ধর্মীয় চেতনা মিশে আছে। সনাতনধর্মীরা চৈত্রের শেষ দিনে হিন্দুশাস্ত্র ও লোকাচার অনুযায়ী পুণ্যস্নান, দান, ব্রত, উপবাস পালনকে পুণ্যজনক মনে করে। চড়ক গাজন উৎসব করে। একইভাবে ধর্মাচারের অংশ হিসেবেই ত্রিপুরারা বৈসুক, মারমারা সাংগ্রাই এবং চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যারা বিজু উৎসব করে। বনদেবতা গরয়ার কৃপালাভের জন্যই তারা এসব আচার পালন করে। বছরের শেষদিনে পুষ্পভাসান দেয়। পরদিন নববর্ষের প্রথম দিনে জলকেলি বা পানি ছিটিয়ে সাংবাৎসরিক সজল, সজীব মঙ্গল কামনা করে। এ ছাড়াও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর রাজারা তাদের রাজস্ব আদায়ের জন্যই রাজপুণ্যাহ করে।
হিজরি সনের ভিত্তিতেই বাংলা সনের বিকাশ হওয়ায় মুসলমানরা এই সন গণনা রীতিকে কখনোই তাদের ধর্মবিশ্বাসের বৈরী মনে করেনি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল জয়ের পর বিভিন্ন দেশ সফরে গিয়ে নিউ ইয়ার সেলিব্রেশন, বিশেষত ইরানে নওরোজ পালনের বিষয়ে অভিভূত হন। এর প্রভাবে তিনি শান্তি নিকেতনে ঋতু উৎসব পালন করতে থাকেন। তবে রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাত কুমার লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথ বাংলা ১৩১৩ সনের ৪ মাঘ শ্রী পঞ্চমীর দিন (১৮ জানুয়ারি, ১৯০৭) শান্তি নিকেতনে ঋতু উৎসব চালু করেন।
১৯৪৭ সালে ভারতভাগের পর পাকিস্তান গঠন হলে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করায় বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে স্বতন্ত্র ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার উন্মেষ ঘটে। ১৯৬৭ সালে শান্তি নিকেতনে শিক্ষিত সম্প্রদায়ের প্রচেষ্টায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’ রমনা উদ্যানের অশ্বত্থতলায় বর্ষবরণে সাংস্কৃতিক উৎসব পালন করে।
সনাতনধর্মীদের বারো মাসে তেরো পার্বণের সাথে পাল্লা দিতে মুসলমানরা তাদের দুই ঈদের বাইরেও পারস্যের সাংস্কৃতিক প্রভাবে ফারসি নাম দিয়ে শবেবরাত, ফাতেহায়ে ইয়াজদাহম পালন শুরু করে। এসব বিবেচনায় যারা চার্বাক বা সেক্যুলার হিসেবে নিজেদের সংগঠিত করতে চাইত, তাদের জন্য তেমন কোনো উৎসব ছিল না। তাই বাংলাবর্ষবরণ উৎসবকে অসাম্প্রদায়িক, সর্বজনীন আখ্যা দিতে সেক্যুলার ও বাম গোষ্ঠীগুলো মরিয়া হয়ে ওঠে।
১৯৮৯ সালের আগে বাংলা বর্ষবরণে কোনো শোভাযাত্রা ছিল না। আশির দশকের শেষভাগে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের প্রভাব তুঙ্গে ওঠে। তখন চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে প্রথমবারের মতো ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ বের হয়। তখন স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে পটুয়া কামরুল হাসানের আঁকা ‘দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে’ ব্যঙ্গাত্মক ছবি নিয়ে পোস্টার বের হয়। সংস্কৃতি কর্মীদের মধ্যে স্বৈরাচারের প্রতি ঘৃণা প্রবল হতে থাকে। নববর্ষের দিনে বিভিন্ন মুখোশের আদলে ঘৃণা প্রকাশের কৌশল বেছে নেয়া হয়। পরে সেক্যুলাররা এই বর্ষবরণের শোভাযাত্রাকে সনাতনধর্মীদের চড়ক শোভাযাত্রার আদলে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’কে মঙ্গল শোভাযাত্রা হিসেবে চালু করে। চড়ক বা গাজন উৎসবের মতোই বিভিন্ন পশু-পাখি ও দেবতার বাহনের মতো উপকরণ ব্যবহার করে। যে কারণে পশ্চিমবঙ্গের বাংলা পত্রিকাগুলো ঢাকায় চারুকলা শিক্ষার্থীদের নববর্ষের আয়োজনকে ‘অষ্টমির একডালিয়া’ হিসেবে তুলে ধরেছে।
কমিউনিজমের ব্যর্থতায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে পুঁজিবাদী গোষ্ঠীগুলো তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে ক্রমবর্ধিষ্ণু আদর্শ ইসলামকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে। এর অংশ হিসেবে আনন্দ শোভাযাত্রাকে রূপ দেয়া হয় মাঙ্গলিক শোভাযাত্রায়। এতে বিভিন্ন মুখোশ ও সর্পফণায় চাঁদ-তারা এঁকে মুসলিম বিদ্বেষ উসকে দেয়া হয়। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের তৎকালীন খতিব মাওলানা উবায়দুল হকসহ শীর্ষস্থানীয় আলেমরা বাংলা নববর্ষ উৎসবকে ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবহার না করতে সোচ্চার হন। এর আগেও এই দেশে সনাতনধর্মীরা চৈত্রসংক্রান্তি পালন করেছেন, পয়লা বৈশাখে হালখাতাও হয়েছে। তখন আলেম সমাজ বিষয়টিকে ব্যবসায়ীদের বাকি টাকা আদায় ও গ্রামীণ লোকজ উৎসব হিসেবেই গণ্য করেছেন; কিন্তু যখনই বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানকে সেক্যুলারবাদীরা পরিকল্পিতভাবে ইসলামের বিরুদ্ধে টুলস ও ইভেন্ট হিসেবে ব্যবহার করেছে তখনই হাক্কানি আলেমদের বক্তব্য দিতে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নবী সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে তাদেরই দলভুক্ত।’
বর্ষ গণনার রীতি তো মূলত সময় গণনারই হিসাব। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ জাল্লা ওয়া শানহু নিজেই সময়ের কসম উল্লেখ করেছেন। এ নিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ সূরা নাজিল করেছেন। সূরা আসর-এ বলেছেন, ‘সময়ের শপথ। নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত; কিন্তু তারা ব্যতীত যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্য ও ধৈর্যের তাগিদ দেয়।’ রাসূলে করিম সা: বলেছেন, ‘ধ্বংস তার জন্য, যার আজকের দিনটি গতকালের চেয়ে উত্তম হলো না।’ তাই বর্ষ পরিক্রমার এই সময়ে আল্লাহ তায়ালার কাছে আমাদের ঐকান্তিক প্রার্থনা, হে চিরদিবসের রাজা, আমাদের অতিক্রান্ত সময়ের সব পাপ ও মালিন্য তুমি ক্ষমা করে দাও। আসন্ন সময়কে আমাদের জন্য তোমার করুণাধারায় সমৃদ্ধ করো। আমরা তো তোমার জন্যই আর তোমার কাছেই ফিরে যাবো। হে উদয়-অস্তের মালিক তোমার ধরিত্রী থেকে বিদায়ের আগেই তোমার হেদায়েত আমাদের নসিব করো এবং মৃত্যুর পরও সফলকামদের তালিকাভুক্ত করো।



