মদিনায় ঈদুল ফিতর

সৌদিরা ঈদের সময় বিদেশেও পাড়ি জমান। তাদের প্রথম পছন্দ হলো দুবাই। দুবাই ছাড়া ওমানেও বেড়াতে যান। যারা দেশে থাকেন তারা ঈদের নামাজের পরপরই ঘর ছেড়ে পার্কে যান, সেখানে মিলিত হন। সমুদ্র সৈকত, মল ও খাবারের দোকানে প্রচুর ভিড় হয়। জেদ্দায় সৌদি-অসৌদি, মুসলিম অমুসলিম সবাই এই ঈদে যার যার সুবিধা সুযোগ অনুযায়ী ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। তবে অনেক দোকান বন্ধও থাকে। কর্মচারীদের ছুটি দেয়া হয়। তারা দু-একদিন ছুটি ভোগ করেন। যারা যেভাবে পারেন আনন্দ করেন

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। সে বছর রমজান উপলক্ষে এক মাস ধরে মদিনায় থেকেছি। সেখানে আমার এক ফুফাতো ভাই ব্যবসা করেন। কুবা রাস্তায় এক দোতলা বাড়িতে থাকেন। বাসা থেকে মসজিদে নববীতে হেঁটে যেতে ২০ মিনিট লাগে। রাস্তায় দাঁড়ালে প্রায়ই প্রাইভেট গাড়ি থামে, তারা চার-পাঁচ রিয়াল নেয়। অনেকে টাকা নেন না। আরবিতে বলেন, দোয়া করবেন।

দেখতে দেখতে রমজান শেষ হলো। পরের দিন ঈদ। আমার ছোট ভাই বলল, রাত ২টার মধ্যে যেন অজু গোসল সেরে প্রস্তুতি নিয়ে মসজিদে চলে যাই। শুনে বেশ অবাক হই। আমরা দেশে সকাল ৭-৮টার দিকে ঈদগাহে যাই। এখানে রাত ২টায় যাওয়ার অর্থ কি? বললাম, দেখা যাক। মনে মনে ভাবি, ফজরের নামাজের সময় আগেভাগে যাওয়া যাবে।

আত্মীয়ের তাগিদে তাহাজ্জুদ নামাজ শেষ করে গোসল সারি। তারপর ফজরের নামাজের অনেক আগে মসজিদে যাই। অবাক করার বিষয়, মসজিদের কাছাকাছি যেতেই প্রচণ্ড ভিড়। এখনো ফজরের আজান হয়নি অথচ মানুষের ঢল। এই সময়ে দেখি কয়েকজন আতর সুগন্ধি বিলাচ্ছে, কেউ ধরে আছে খেজুর! যেন সওয়াব কামানোর প্রতিযোগিতা। এটি আমার ভালো লাগে। আগেও এমন ঘটনা দেখেছি। মসজিদে নববীতে বসে দোয়া-দরুদ পড়ছি, অচেনা কোনো জিয়ারতকারী, ভিনদেশী তসবিহ দিয়ে যায়, কেউ আতর দিয়ে যায়। কোকাকোলাজাতীয় পানীয় তো হরহামেশাই দিচ্ছে। জমজম পানির ছোট বোতল দেয়। কর্তৃপক্ষও গাড়িতে করে জমজমের পানি বিলি করে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন ভাষায় লেখা কিতাব, বই পুস্তক বিলি করা হয়।

আমরা অনেক চেষ্টা করে মসজিদে নববীর বাইরের চত্ব¡রে যাই। সেখানে বসার জায়গা নেই। অগত্যা দুই কাতারের মাঝে বসলাম যা অশোভনীয়। এই কাতারগুলো ইমামের নামাজে দাঁড়ানোর অনেক সামনে। মসজিদে নববীর যে স্থানে ইমাম দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ান সে স্থানের সামনের মাঠে আমাদের অবস্থান। ইমামের সামনে দাঁড়ালে নামাজ হয় না। সেটি ইংরেজিতে বড় করে সাইনবোর্ডে লাগানো আছে। আমাদের কোথাও যাওয়ার রাস্তা নেই, উপায় নেই। যেসব কাতার হয়েছে সবই ইমামের সামনে। ইমামের পেছনে লাখ লাখ মানুষ। যাওয়ার উপায় নেই। পরে দেখি আমাদের সামনে আরো লোক জড়ো হচ্ছে। আরো কাতার হচ্ছে। ভেতরে মানুষ বসার মতো জায়গা নেই। হাজার হাজার লোকের সমাগম। এই কাতার মসজিদে নববীর চত্বর শেষ করে দক্ষিণ দিকে, কাবার দিকে রাস্তা অতিক্রম করল। শরিয়ত অনুযায়ী এদের কারো নামাজ হওয়ার কথা নয়। ছোট ভাই বলল, মসজিদে নববীর দোতলায় জায়গা খালি আছে, ওখানে গেলে ভালো হবে। হাত দিয়ে দেখাল, ওই সিঁড়ি দিয়ে উপরে যাওয়া যায়। আমি রাজি হই না। আল্লাহর রাসূল সা: যে মাটিতে শুয়ে আছেন তার উপরে নামাজ পড়া আমার কাছে কেমন অশোভন মনে হলো। যদিও শত শত লোক সেখানে নামাজ পড়বে।

ভাই বলল, মদিনার চারপাশ থেকে লোকজন এশার নামাজের পর এখানে ছুটে আসেন, এরা ঈদের নামাজ পড়ে বাড়ি যান। তখনই বুঝলাম কেন আমাকে রাত ২টায় মসজিদে আসতে বলা হয়েছিল।

এক হিসাবে জানা গেল, ওই ঈদের নামাজে পাঁচ থেকে ১০ লাখ লোকের জামাত হয়েছিল।

আমাদের কোনো উপায় ছিল না। বের হওয়া অসম্ভব। আমরা অগত্যা ইমামের সামনেই অবস্থান নিলাম। ওই সময় সবাই উচ্চস্বরে সুর করে পড়ছেন, ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ। আল্লাহু আকবার কাবিরা, ওয়ালহামদু লিল্লাহি কাছিরা, ওয়া সুবহানাল্লাহি বুকরাতাঁও ওয়াছিলা। ওয়া সাল্লাল্লাহু আলা সাঈদিনা মুহাম্মদ, ওয়া আলা আলিহি ওয়াসাল্লিহি ওয়া সাল্লাম তাসলিমান কাছিরা’। মসজিদে নববীর দোতলা থেকেও লাউড স্পিকারে এই দোয়া ভেসে আসছে। খুবই শ্রুতিমধুর। নামাজ শুরু হওয়ার আগে সারাক্ষণ মধুর সুরে এই দোয়াই পড়া হয়।

যথাসময়ে ফজরের নামাজ শুরু হলো। নামাজের পর সবাই বসে আছেন। সূর্য উঠল আর সাথে সাথে ঘোষণা হলো— ঈদের সালাত শুরু হবে।

নামাজের পর খুতবা হলো। তারপর সবাই উঠে রওনা দিলো। আমাদের দেশের মতো কোনো মুনাজাত নেই। কোলাকুলি কদমবুচি— এসব নেই। নামাজের পর আমরা সচরাচর দেশে কোলাকুলি করি, পড়শি ও আত্মীয়দের বাসায় যাই। সেমাই মিষ্টান্ন খাই, পোলাও কোরমা এসব চলে। কোলাকুলি না থাকলেও সৌদিদের খাওয়া দাওয়া এক বিশাল ব্যাপার। আমরা মদিনা শরিফের চত্বর থেকে আস্তে আস্তে বের হয়ে একটি সাধারণ হোটেলে গেলাম। সাধারণ খাবার খেলাম, বলা যায় ব্রেকফাস্ট। বাসায় ফিরে দেখি সবাই ঘুমাচ্ছে। দোকান বন্ধ, ছুটি তাই ঘুমাচ্ছে। কোথায়ইবা যাবে! আত্মীয়স্বজন সব তো দেশে। গাড়ি নিয়ে বেড়ানো যায়। কিন্তু সেদিন তারাও বিশ্রাম নিচ্ছে। গাড়ি পাওয়া গেল না। তাই কোথাও বেড়ানো হয়নি। আমিও ঘুম দিলাম। সেদিন ঈদের সেমাই-পোলাও-ফিরনি ক্ষীর খাওয়া হয়নি। রেস্তোরাঁয় রুটি আর উটের গোশত খেয়েছি।

ঈদের দিন সৌদি আরবে নামাজ শেষে মানুষের জীবনযাপন বেশ প্রাণবন্ত ও ঐতিহ্যপূর্ণ হয়। ঈদের নামাজ শেষে লোকজন একে অপরকে আলিঙ্গন করে শুভেচ্ছা জানায়। পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের সাথে একত্রিত হয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে। তাদের সমাজে ঈদিয়াহ রেওয়াজ রয়েছে। ঈদিয়াহ মানে উপহার/টাকা— এসব দেয়া। শিশুরা বড়দের কাছ থেকে ঈদিয়াহ পায়। এটি শিশুদের জন্য ঈদের অন্যতম আনন্দ। ঈদের দিন সৌদিরা ঐতিহ্যবাহী খাবার খায়। খেজুর, মিষ্টি, কফি এবং বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিবেশন করা হয়। অনেক পরিবার বিশেষ ভোজের আয়োজন করে। মেয়েরা হাতে মেহেদি লাগায়। ধনী আরবরা ঈদের আগে জাকাতুল ফিতর দেয়। সৌদি আরবে ঈদ উপলক্ষে সামাজিক উৎসব হয়। শহর ও গ্রামে বাজার, মেলা এবং বিনোদনমূলক আয়োজন থাকে। শিশুদের জন্য খেলাধুলা ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা হয়। সৌদি আরবে ঈদ সাধারণত তিন দিন ধরে চলে, আর এই সময় মানুষ সামাজিক মিলন এবং আনন্দে ভরপুর জীবনযাপন করে।

ঈদ উপলক্ষে আমি পরদিন জেদ্দায় যাই। জেদ্দায় ঈদের সংস্কৃতি সৌদি আরবের অন্যান্য শহরের মতো হলেও কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। জেদ্দায় ঈদের সময় শহর প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। রেস্টুরেন্টগুলো বিশেষ ঈদ মেনু দেয়, আর বাজারে ঈদে পৃথক বেচাকেনার বুথ করা হয়। সমুদ্রতীরবর্তী এলাকা ঈদের রাতে আতশবাজির মহড়া হয়। সে মহড়া কয়েক রাত দিন ধরে চলে। শিশুদের জন্য খেলাধুলা ও বিনোদনের আয়োজন থাকে। সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় বসার ব্যবস্থা আছে। চাদর বিছিয়েও খাওয়াদাওয়া করা যায়। ছেলেদের খেলার উপকরণ বেশি। চারচাকার গাড়িগুলো ছোটদের চাইতে বড়রাই বেশি চালায়। কিছু কালো রঙের মানুষ খুব জোরে চার চাকার গাড়ি চালায়। মনে হয় এখনই কোনো এক্সিডেন্ট করবে। হাফপ্যান্ট পরায় সতরের কারণে এদের অনেকে পছন্দ করেন না। জেদ্দার পুরনো শহরে ঈদের আল-বালাদ অনুষ্ঠান হয়, যেখানে স্থানীয়রা ও পর্যটকরা মিলিত হয়ে উৎসব উপভোগ করে। জেদ্দায় ঈদ শুধু ধর্মীয় আচার নয়; বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবও।

অনেকেই জেদ্দায় রমজান উৎসবে বেড়াতে যান। কেননা, এই দিনে নানা উপহার ও নতুন কাপড় পিতা-মাতা তাদের দেন। তাই শিশুদের পোশাক বিক্রি করে এমন প্রতিষ্ঠান রমজানে রাতদিন প্রচুর ব্যবসায় করে। এটি সৌদি সমাজের বহু পুরনো রীতি ও ঐতিহ্য, সবার জন্য নতুন কাপড়। ক্রেতারা তারাবিহ নামাজ পড়ে শপিংমলে হাজির হন। সারারাত খোলা থাকে বড় শপিংমল। জেদ্দায় রাতে শপিংমলগুলো দেখার মতো। সৌদিরা মূলত কেনাকাটা করেন সপরিবারে। মহিলারা বোরকা পরে দল বেঁধে কাপড় ও গয়নার দোকানে কেনাকাটা করতে যান।

তারাবিহ নামাজের পর যখন মসজিদে নববী থেকে হেঁটে কুবা মসজিদ রোডের বাসায় ফিরতাম তখনো মহিলাদের ছোট ছোট দল দেখা যেত। ফার্নিচারের দোকানগুলোও রমজানে রমরমা ব্যবসায় করে। বহু পরিবার পুরনো আসবাবপত্র পাল্টে ফেলে। অটোর বাজারও রমরমা থাকে। নতুন মডেলের নতুন সুবিধার গাড়ি কেনে বহু পরিবার। দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন ঈদের কেনাকাটার জন্য জেদ্দায় আসেন। অনেকে কম দামের জন্য কসর আল হাকামের পাবলিক মার্কেটে যান। সৌদিতে ঈদের এক সপ্তাহ আগেই বেতনভাতা দিয়ে দেয়া হয়। এটিই নিয়ম।

সৌদি আরবে জাঁকজমকের সাথে ঈদুল ফিতর উদযাপনের সরকারি নির্দেশনা থাকে। নানান ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান, ক্রীড়ানুষ্ঠান, থিয়েটার— এসব ঈদুল ফিতরের অনুষ্ঠানে স্থান পায়। রিয়াদ মিউনিসিপ্যালিটি উৎসবের আয়োজন করে। সৌদিরা ভোজসভার আয়োজন করে। মহিলা ও শিশুদের জন্যও বিবিধ আয়োজন থাকে। অনুষ্ঠানগুলো বলতে গেলে মহিলারাই পরিচালনা করে। মিউনিসিপ্যাল কর্তৃপক্ষ লজিস্টিক সহায়তা দেয়। রাজধানীতে উৎসব শুরু হয়ে প্রতিটি ডিস্ট্রিক্টে পৌঁছে। অনুষ্ঠানে শিশুদের জন্য অনুষ্ঠান থাকে যা বৈকালিক নামাজের পর সাধারণত শুরু হয়। যেসব পরিবার নতুন নতুন জিনিস বানাতে পারে তেমন ৪০টি বাছাই করা পরিবার তাদের প্রোডাক্ট প্রদর্শন করার সুযোগ পায়। মাজমা প্যালেস স্কোয়ারে প্রকাণ্ড স্ক্রিনে জনপ্রিয় লোকজ পেইন্টিং প্রদর্শিত হয়।

সৌদিরা ঈদের সময় বিদেশেও পাড়ি জমান। তাদের প্রথম পছন্দ হলো দুবাই। দুবাই ছাড়া ওমানেও বেড়াতে যান। যারা দেশে থাকেন তারা ঈদের নামাজের পরপরই ঘর ছেড়ে পার্কে যান, সেখানে মিলিত হন। সমুদ্র সৈকত, মল ও খাবারের দোকানে প্রচুর ভিড় হয়। জেদ্দায় সৌদি-অসৌদি, মুসলিম অমুসলিম সবাই এই ঈদে যার যার সুবিধা সুযোগ অনুযায়ী ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। তবে অনেক দোকান বন্ধও থাকে। কর্মচারীদের ছুটি দেয়া হয়। তারা দু-একদিন ছুটি ভোগ করেন। যারা যেভাবে পারেন আনন্দ করেন।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ও গ্রন্থকার