মো: বদরুল মিল্লাত ইবনে হান্নান
১৯৭৩ সালে জেদ্দায় ওআইসি সম্মেলনে আন্তর্জাতিক ইসলামী অর্থসংস্থা গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন এবং ১৯৭৪ সালে আইডিবি চার্টার হয়। ওআইসির সদস্য ও আইডিবির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ এই চার্টারে স্বাক্ষর করে। ১৯৮২ সালে আইডিবির প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে এবং ১৯৮৩ সালের ১৩ মার্চ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম শরিয়াহ ব্যাংক হিসেবে নিবন্ধিত হয়। ১৯৮৩ সালের ৩০ মার্চ দেশী-বিদেশী উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামী ব্যাংক যাত্রা শুরু করে।
মূল দর্শন
ইসলামী ব্যাংকিং কেবল আর্থিক লেনদেন নয়; বরং এটি ‘মাকাসিদ-আল-শরিয়াহ’ বা জনকল্যাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ওআইসির সংজ্ঞা অনুযায়ী, এটি এমন এক ব্যবস্থা যেখানে সুদ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতের দিনে কেবল সেই ব্যক্তির মতো দাঁড়াবে শয়তানের স্পর্শ যাকে পাগল করে দিয়েছে। তা এ জন্য যে, তারা বলে, ব্যবসায় তো সুদের মতোই। অথচ আল্লাহ কেনাবেচা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।’ (সূরা বাকারা-২৭৫)
কেবল ইসলাম ধর্মেই নয়, খ্রিষ্টান, ইহুদি এবং হিন্দু ধর্মেও সুদ পাপ হিসেবে গণ্য। বাইবেলের পুরনো নিয়মের ‘লুক’ (৬ : ৩৫) অংশে বলা হয়েছে, ‘প্রতিদানের আশা না করে ঋণ দাও’। প্রাচীন চার্চের আইনে সুদ পাপ হিসেবে গণ্য হতো। ইহুদিদের তোরাহ বা ওল্ড টেস্টামেন্টের ‘এক্সোডাস’ (২২ : ২৫) এবং ‘লেভিটিকাস’ (২৫ : ৩৬-৩৭) অধ্যায়ে নিজ জাতির ভাইদের কাছ থেকে সুদ গ্রহণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। হিন্দুদের প্রাচীন বৈদিক শাস্ত্র ও ‘মনুস্মৃতি’তে উচ্চ হারে সুদ গ্রহণ বা কুসিদবৃত্তিকে নিকৃষ্ট ও পাপের কাজ বলা হয়েছে। বৌদ্ধ দর্শনেও শোষণের ওপর ভিত্তি করে অর্থ উপার্জন ‘সঠিক জীবিকা’র পরিপন্থী হিসেবে দেখা হয়।
ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূল বৈশিষ্ট্য হলো, ‘আল-গুনমু বিল-গুরমি’ অর্থাৎ মুনাফা হবে ক্ষতির ঝুঁকি ভাগ করে নেয়ার বিনিময়ে।
আমানত ও বিনিয়োগ : বাংলাদেশে ব্যাংকিং সেক্টরে মোট আমানত প্রায় ২১.৩৪ ট্রিলিয়ন টাকা। যেখানে ইসলামিক ব্যাংকগুলোর আমানতের পরিমাণ ৪.৭৪ ট্রিলিয়ন। মার্চ ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের আমানত প্রায় ১.৮৬ ট্রিলিয়ন টাকা। দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতের মোট আমানতের প্রায় ৩৯ শতাংশ এককভাবে এই ব্যাংক ধারণ করে।
শাখা নেটওয়ার্ক : ৪০০ শাখা এবং ২৭৬ উপশাখা ও প্রায় দুই হাজার ৮০০ এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে এর বিস্তৃতি অন্য যেকোনো ব্যাংকের চেয়ে বেশি।
তারল্য ব্যবস্থাপনা : পুরো ব্যাংকিং খাত যখন ডলার সঙ্কটে ভুগছে, তখন ইসলামী ব্যাংক তার বিশাল রেমিট্যান্স চ্যানেলের কারণে তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থানে আছে।
রেমিট্যান্স বিপ্লব : বর্তমানে দুই কোটি প্রবাসীর প্রায় ৫০ লাখ প্রবাসী এই ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ দেশে পাঠান। প্রবাসীদের আস্থার প্রধান কারণ, দ্রুত সেবা এবং বিশ্বস্ততা।
স্মার্ট ব্যাংকিংয়ের নতুন দিগন্ত
বর্তমান বাজার বিশ্লেষণ এবং ২০২৬ সালের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ২০৩০ সাল নাগাদ ইসলামী ব্যাংকিং খাতের যে পরিবর্তনের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে, তার মূল ভিত্তি হবে তিনটি স্তম্ভ : প্রযুক্তি, নৈতিক বিনিয়োগ ও ডাটা ইকোনমি।
১. হাইপার-পার্সোনালাইজড ফিনটেক সেবা : ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ‘সেলফিন’ একটি সাধারণ অ্যাপ থেকে ‘ফিনটেক লিডার’-এ রূপান্তরিত হবে।
পূর্বাভাস : ২০৩০ সালের মধ্যে ব্যাংকের ৮০ শতাংশ লেনদেন শাখামুক্ত হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এ আইয়ের ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রাহকের বিনিয়োগ চাহিদা আগাম শনাক্ত করা সম্ভব হবে, যা ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বিনিয়োগ পদ্ধতি দ্রুততর করবে।
২. এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ও শিল্পায়ন : ২০২৬ সালে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের ফলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ বাড়বে।
ডেটা পয়েন্ট : ২০২৬-৩০ মেয়াদে ব্যাংকটি তার বিনিয়োগের পোর্টফোলিওতে হাই-টেক ম্যানুফ্যাকচারিং ও রফতানিযোগ্য বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদনের জন্য বিশেষ ‘শরিয়াহ বন্ড’ বা সুকুক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
৩. গ্রিন সুকুক ও সাসটেইনেবিলিটি : বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় ব্যাংকটি তাদের ‘গ্রিন ফাইন্যান্স’ মডেল আরো শক্তিশালী করবে।
৪. ক্যাশলেস গ্রামীণ অর্থনীতি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি-
ফোরকাস্টিং : ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের মোট জনসংখ্যার অন্তত এক-পঞ্চমাংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইসলামী ব্যাংকের ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের সাথে যুক্ত থাকবে। এতে প্রান্তিক মানুষের আয় বাড়বে এবং জিডিপিতে ব্যাংকের অবদান আরো বৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে।
৫. ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা : বৈশ্বিক আর্থিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ তারল্যসঙ্কট মোকাবেলায় ইসলামী ব্যাংক ‘সিস্টেমিক ইম্পর্টেন্স’ বা অতি-গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংক হিসেবে নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ব্যাংকটি একটি ‘সেন্ট্রাল রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ইউনিট’ গড়ে তুলবে যা প্রযুক্তির সমন্বয়ে প্রতিটি বিনিয়োগের রিয়েল-টাইম তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।
জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি
গত চার দশকের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় ইসলামী ব্যাংক কেবল আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়; বরং শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের ‘ইনকিউবেটর’ হিসেবে কাজ করেছে। সামষ্টিক অর্থনীতিতে এর অবদানের কয়েকটি প্রধান দিক এমন :
১. জিডিপিতে শক্তিশালী হিস্যা : দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ইসলামী ব্যাংকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদানের পারসেন্টেজ জানা না গেলও, অনুমেয় যে, এর অবদান যেকোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেক বেশি।
বর্তমানে দেশের মোট পোশাক রফতানির উল্লেখযোগ্য অংশ এই ব্যাংকের বিনিয়োগকৃত প্রকল্পের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। মোট আমদানির প্রায় ১৩ শতাংশ এবং রফতানি বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ এককভাবে এই ব্যাংক পরিচালনা করছে।
২. বিশাল কর্মসংস্থান সৃষ্টি : ব্যাংকটির অর্থায়নে পরিচালিত হাজারো শিল্প-কারখানা, স্পিনিং মিল এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৮৫ লাখ থেকে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এসএমই খাতে এর বিনিয়োগ কয়েক লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে স্বাবলম্বী করেছে।
৩. পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প : ইসলামী ব্যাংকের ‘পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প’ বা আরডিএস বিশ্বের বৃহত্তম ক্ষুদ্রঋণ মডেলগুলোর একটি। বর্তমানে দেশের প্রায় ৩৪ হাজার গ্রামের ১৬ লাখের বেশি প্রান্তিক মানুষ এই প্রকল্পের সুবিধাভোগী, যাদের ৯৪ শতাংশই নারী। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে হাঁস-মুরগি পালন, কুটির শিল্প এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায় প্রসারের ফলে গ্রামীণ দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে নিচ থেকে উপরের দিকে প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করছে।
রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিস্থাপকতা
বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসলামী ব্যাংককে বিভিন্ন সময়ে পালাবদলের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মালিকানাগত পরিবর্তন ও পর্ষদ পুনর্গঠন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা থাকলেও, ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এতটাই শক্তিশালী যে, কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা সাময়িক রাজনৈতিক প্রভাব এর জনভিত্তি টলাতে পারেনি। আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সিগুলোর মানদণ্ড এবং শরিয়াহ কমপ্লায়েন্সের কঠোর অনুসরণের ফলে এর অভ্যন্তরীণ অপারেশনাল প্রক্রিয়া যেকোনো ব্যক্তিনির্ভর প্রভাবের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। গ্রাহকের আমানতের নিরাপত্তা ও তারল্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে এ ব্যাংক সবসময়ই বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘প্রম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন’ ও নিবিড় তদারকির মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে। এমনকি সঙ্কটের মুহূর্তেও ব্যাংকটির ‘রিয়েল ইকোনমি’ ভিত্তিক বিনিয়োগ নীতি ও বিশাল গ্রাহক নেটওয়ার্ক একে অন্য সব প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি স্থিতিস্থাপকতা দিয়েছে। ফলে বাহ্যিক পরিবর্তনের ঢেউ ব্যাংকটির করপোরেট সুশাসনে প্রভাব ফেলার চেষ্টা করলেও এর ‘সিস্টেমিক স্ট্যাবিলিটি’ ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করে চলেছে। জনসাধারণের দৃঢ়বিশ্বাস ও জাতীয় অর্থনীতিতে এর গভীর সংশ্লিষ্টতাই ইসলামী ব্যাংককে যেকোনো ধরনের নেতিবাচক রাজনৈতিক প্রভাব থেকে সুরক্ষা দেয়।
লেখক : ব্যাংকার, অর্থনীতি বিশ্লেষক


