জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯ সালে প্রণীত হয়। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯ রহিতক্রমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রবর্তন করে।
অধ্যাদেশ জারি বিষয়ে আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩ দফা (১) এ যে বিধান রয়েছে তাতে বলা হয়েছে- সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় অথবা এর অধিবেশনকাল ছাড়া কোনো সময়ে রাষ্ট্রপতির কাছে আশু ব্যবস্থা গ্রহণে প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রয়েছে বলে সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হলে তিনি উক্ত পরিস্থিতিতে যেরূপ প্রয়োজনীয় বলে মনে করবেন, সেরূপ অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করতে পারবেন এবং জারি হওয়ার সময় হতে অনুরূপভাবে প্রণীত অধ্যাদেশ সংসদের আইনের মতো ক্ষমতাসম্পন্ন হবে; এ দফাটিতে শর্তাংশ জুড়ে বলা হয়েছে— এ দফার অধীন কোনো অধ্যাদেশে এমন কোনো বিধান করা হবে না, (ক) যা এ সংবিধানের অধীন সংসদের আইনের দ্বারা আইনসঙ্গতভাবে করা যায় না; (খ) যাতে এ সংবিধানের কোনো বিধান পরিবর্তিত বা রহিত হয়ে যায়; অথবা (গ) যার দ্বারা পূর্বে প্রণীত কোনো অধ্যাদেশের যেকোনো বিধানকে অব্যাহতভাবে বলবৎ করা যায়।
অনুচ্ছেদটির দফা (২) এ বলা হয়েছে- এ অনুচ্ছেদের (১) দফার অধীন প্রণীত কোনো অধ্যাদেশ জারি হওয়ার পর অনুষ্ঠিত সংসদের প্রথম বৈঠকে তা উপস্থাপিত হবে এবং ইত:পূর্বে বাতিল না হয়ে থাকলে অধ্যাদেশটি অনুরূপভাবে উপস্থাপনের পর ৩০ দিন অতিবাহিত হলে কিংবা অনুরূপ মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পূর্বে তা অনুমোদন করে সংসদে প্রস্তাব গৃহীত হলে অধ্যাদেশটির কার্যকরতা লোপ পাবে।
কমিশন গঠন বিষয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯ এ বলা ছিল— চেয়ারম্যান ও অনধিক ৬ জন সদস্য সমন্বয়ে কমিশন গঠিত হবে। কমিশনের চেয়ারম্যান ও একজন সদস্য সার্বক্ষণিক হবেন এবং অন্যান্য সদস্যরা অবৈতনিক হবেন। কমিশনের সদস্যগণের মধ্যে কমপক্ষে একজন নারী এবং একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর (এথনিক) সদস্য হতে হবে। চেয়ারম্যান কমিশনের প্রধান নির্বাহী হবেন।
প্রণীত অধ্যাদেশটিতে কমিশন গঠন বিষয়ে বলা হয়েছে— চেয়ারপারসন ও চারজন কমিশনার সমন্বয়ে কমিশন গঠিত হবে। কমিশনের চেয়ারপারসন ও চারজন কমিশনার সার্বক্ষণিক হবেন। কমিশনারদের মধ্যে কমপক্ষে একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সদস্য হবেন। কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হতে হবে। এ ছাড়া কমিশনারদের মধ্যে কমপক্ষে দুইজন নারী হবেন। চেয়ারপারসন কমিশনের প্রধান নির্বাহী হবেন।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ উভয়টিতে বলা আছে রাষ্ট্রপতি, বাছাই কমিটির সুপারিশক্রমে, কমিশনের চেয়ারপারসন ও কমিশনারদের নিয়োগ করবেন। আইনটিতে শর্ত যুক্ত করে বলা ছিল— কোনো ব্যক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান বা সদস্যপদে নিয়োগ লাভের বা অধিষ্ঠিত থাকবার যোগ্য হবেন না; যদি তিনি ৩৫ বছরের কম এবং ৭০ বছরের বেশি বয়স্ক হন। অধ্যাদেশটিতে বয়সবিষয়ক কোনো সীমারেখা না দেয়া থাকায় ধারণা করা যায়, ২৫ বছর বয়সের ঊর্ধ্বে প্রয়োজনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন যেকোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি বাছাই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে কমিশনের চেয়ারপারসন বা কমিশনার পদে নিয়োগ দিতে পারেন।
আইনটিতে বাছাই কমিটি গঠনবিষয়ক যে বিধান ছিল তাতে বলা ছিল— চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগের লক্ষ্যে সুপারিশ প্রদানে ৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি বাছাই কমিটি গঠিত হবে, যথা— (ক) জাতীয় সংসদের স্পিকার, যিনি এর সভাপতি হবেন; (খ) আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী; (গ) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী; (ঘ) চেয়ারম্যান, আইন কমিশন; (ঙ) মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ; (চ) জাতীয় সংসদের স্পিকারের মনোনীত দু’জন সংসদ-সদস্য, যাদের মধ্যে একজন সরকারদলীয় এবং অন্যজন বিরোধীদলীয় হবেন। বাছাই কমিটি প্রতিটি পদের বিপরীতে দু’জন ব্যক্তির নাম রাষ্ট্রপতি বরাবর সুপারিশ করবেন।
অন্য দিকে অধ্যাদেশটিতে আইনটির ন্যায় ৭ সদস্যবিশিষ্ট বাছাই কমিটির কথা বলা হলেও এর গঠন প্রক্রিয়ায় ভিন্নতা রয়েছে, যথা— (ক) প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারক, যিনি এর সভাপতি হবেন; (খ) মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ; (গ) জাতীয় সংসদের দু’জন সংসদ-সদস্য, যাদের মধ্যে একজন সরকারি দল এবং অন্যজন বিরোধী দল মনোনীত হবেন; (ঘ) বাংলাদেশের স্বীকৃত কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ও মানবাধিকার বিষয়ে গবেষণার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন অধ্যাপক, যিনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের মনোনীত হবেন; (ঙ) মানবাধিকার সংরক্ষণ বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন নাগরিক প্রতিনিধি, যিনি রাষ্ট্রপতির মনোনীত হবেন; (চ) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি বা তদকর্তৃক মনোনীত মানবাধিকার বিষয়ে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন সাংবাদিক প্রতিনিধি এবং (ছ) ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্য হতে তাদের অধিকার রক্ষায় কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন প্রতিনিধি, যিনি রাষ্ট্রপতির মনোনীত হবেন। চেয়ারপারসন বা কমিশনারের প্রতিটি পদের বিপরীতে বাছাই কমিটি একজন প্রার্থীর নামসহ একটি তালিকা রাষ্ট্রপতির বরাবরে সুপারিশ করবেন।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯ এ বাছাই কমিটির সভাপতি হিসেবে জাতীয় সংসদের স্পিকারের উল্লেখ রয়েছে। অন্য দিকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ এ বাছাই কমিটির প্রধান হিসেবে প্রধান বিচারপতি মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারকের কথা বলা হয়েছে। বাছাই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারক বিষয়ে সংবিধানের যে বিধান তা হলো— তারা কেবল নিজ বিভাগে আসন গ্রহণ করবেন। একজন বিচারক কেবল বিচারকার্য পরিচালনায় আসন গ্রহণ করতে পারেন। সুতরাং বাছাই কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সাংবিধানিক পদধারী একজন কর্মরত বিচারককে বিচার কার্যবহির্ভূত কোনো দায়িত্ব দেয়া হলে তা সংবিধান সম্মত কি না এমন প্রশ্নের উদয় হয়। তা ছাড়া নিয়োগ বিষয়ে উচ্চাদালতে মামলা দায়ের হলে ভ্রাতৃপ্রতিম সহকর্মীদের সিদ্ধান্ত ভ্রাতৃপ্রতিম বিচারক বিচারকার্য পরিচালনাকালীন কোনোরূপ বিব্রতবোধ ছাড়া দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট এমন নিশ্চিয়তা আছে কি। অন্য বিষয়টি হলো সুপ্রিম কোর্টের যে উপদেষ্টামূলক এখতিয়ার রয়েছে এতদবিষয়ে রাষ্ট্রপতি আপিল বিভাগের মতামত চাইলে সে ক্ষেত্রেও তা সহকর্মী ভ্রাতৃপ্রতিম বিচারক বা প্রধান বিচারপতির জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। যদিও রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া এরূপ মতামত যাচনায় ক্ষমতাপ্রাপ্ত নন।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯ এ বাছাই কমিটি প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে দু’জন ব্যক্তির নাম সুপারিশ আকারে রাষ্ট্রপতি বরাবর প্রেরণ করতে পারত। পক্ষান্তরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ এ প্রতিটি পদের বিপরীতে একজন প্রার্থীর নামসহ একটি তালিকা সুপারিশ আকারে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রেরণের কথা বলা হয়েছে।
আমাদের সংবিধানে সুস্পষ্টরূপে উল্লেখ রয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তার অন্য সব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করবেন। সুতরাং বাছাই কমিটির সুপারিশে অধ্যাদেশ অনুযায়ী একজন ব্যক্তির নাম থাকলে এবং সে ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ভিন্নতর হলে রাষ্ট্রপতি তখন কী করবেন; এমন প্রশ্ন দেখা দেয়। এখানে উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতিকে যেকোনো আইনে ক্ষমতার্পণ করা হলেও তার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা অতিক্রমের কোনো সুযোগ নেই। এমতাবস্থায়, বাস্তবতা হলো সুপারিশ পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর আকাঙ্ক্ষাতে রাষ্ট্রপতি তার কার্য সমাধা করবেন।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ উভয়টিতে বাছাই কমিটির কথা বলা হয়েছে। আইন ও অধ্যাদেশের বাছাই কমিটির কাজের পরিধি এক ও অভিন্ন হলেও বাছাই ও অনুসন্ধানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বাছাই কমিটির সদস্যরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংগঠন বা ব্যক্তি হতে প্রাপ্ত নাম বাছাই করে সুপারিশ প্রণয়ন করেন। অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে কমিটির সদস্যরা নিজস্ব বিবেক, বুদ্ধি ও চিন্তার প্রয়োগে অনুসন্ধানের মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তি খুঁজে বের করার চেষ্টায় রত থাকেন। আর তাই বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিবেক, বুদ্ধি ও চিন্তার প্রয়োগের সুযোগ অবারিত নয়।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ এর বাছাই কমিটি যথাক্রমে ৭ ও ৮ সদস্য সমন্বয়ে গঠিত। উভয় বাছাই কমিটিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও দু’জন সংসদ সদস্য যার একজন সরকারি দল ও অন্যজন বিরোধী দল মনোনীত এ বিষয়ে মিল রয়েছে, যদিও অন্যান্য সদস্যের ক্ষেত্রে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯ সংসদ প্রণীত। এর বিপরীতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব হস্তান্তরের কিছুকাল আগে প্রণয়ন করে। রাষ্ট্রপতিকে অধ্যাদেশ প্রণয়নের ক্ষমতা দেয়া হলেও তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া তা কার্যকর করতে পারেন না। আলোচ্য ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শানুযায়ী তিনি অধ্যাদেশটি প্রণয়ন করেছেন। এখন দেখার বিষয় প্রথম বৈঠকের তারিখ হতে ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ এটি অনুমোদন দেয় কি না। অনুমোদিত হলে বলা যায় ভালো আইনের বিপরীতে মন্দ অধ্যাদেশ আর অনুমোদিত না হলে ভালো আইন তার স্বমহিমায় ভাস্বর।
লেখক : সাবেক জজ এবং সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক


