‘এই সংবিধান হলো আওয়ামী লীগের ইশতেহার’

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সাথে গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দেয়। জনগণ যেহেতু রাষ্ট্রের মৌলিক বিষয় সম্পর্কে মতামত দেয়ার চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ, সেহেতু তাদের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কোনো নৈতিক ও আইনগত অধিকার কারো নেই।

(তৃতীয় ও শেষ কিস্তি)

শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকার দেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়। জনগণের বিরুদ্ধে অপরিসীম মানবতাবিরোধী ও গণতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ড করে, যা বিশ্ববাসীকে হতবাক করে। এ সময়ের স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের মন্তব্যে। জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কমিশনের ৫৮তম অধিবেশনে জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনবিষয়ক তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদন উত্থাপনের সময় বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি বিগত সরকারের কর্মকর্তা, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং তৎকালীন সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট সহিংস গ্রুপগুলো পদ্ধতিগতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। এর মধ্যে ছিল শত শত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্বিচার আটক ও গ্রেফতার, নির্যাতন এবং নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতা। রাজনৈতিক নেতারা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জ্ঞাতসারে এবং নির্দেশনায় বিক্ষোভ দমন করে বিগত সরকারকে ক্ষমতায় রাখার উদ্দেশ্যেই এসব করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় বিক্ষোভকারী ও তাদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।’

একটি সরকার যখন নাগরিকদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ করে, তখন সেটি আর জনগণের সরকার থাকে না। জাতিসঙ্ঘের প্রতিবেদনের পরে এ বিষয়ে আর কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণের দরকার পড়ে না। এ প্রতিবেদনে জুলাই-আগস্টের আগের ১৬ বছরে সরকারের অপরাধের চিত্র তুলে ধরা হয়নি। যেমন, গুম-খুনের ঘটনা। গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রধান বিচারপতি মইনুল ইসলাম বলেন, ‘দেশে গত ১৫-১৬ বছরে গুমের প্রতিটি ঘটনা শেখ হাসিনার নির্দেশেই ঘটেছে।’ আরো গুরুত্বপূর্ণ কিছু নৃশংসতার বিষয়টিও কারো নজর এড়ায়নি। যেমন শাপলা চত্বরে আলেম-ওলামাদের হত্যা, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তিদাবিতে আন্দোলনরত কয়েক শ’ লোক হত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের নামে বিরোধীদলীয় নেতাদের হত্যা। শেখ হাসিনার সরকার বিচার বিভাগকে ধ্বংস করে, নির্বাচনব্যবস্থাকে প্রহসনে পরিণত করে, সংবিধানকে দলীয় মেনিফেস্টোতে পরিণত করে। এক কথায়, বাংলাদেশ সুশাসনের পরিবর্তে একটি নিষ্ঠুর ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সুতরাং জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের পর ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের সংস্কার করে একটি গণতান্ত্রিক রিপাবলিক গঠনই জনগণের সামষ্টিক অভিপ্রায়।

রাষ্ট্র সংস্কার ভাবনা
শেখ হাসিনার সরকার যেভাবে দেশটিকে ধ্বংসের কিনারায় রেখে গেছে তার মেরামত ও সংস্কার অনিবার্য প্রয়োজন। প্রথমেই আসে বিদ্যমান সংবিধানের আওতায় এক ব্যক্তি এবং একটি দল ও তার সরকার যেভাবে ফ্যাসিবাদী চরিত্র ধারণ করেছিল তা বন্ধ করা। এ জন্য প্রয়োজন সংবিধান সংশোধন বা পুনর্লিখন।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। ৭ অক্টোবর ২০২৪ সরকার ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করে। জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়ার জন্য ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করে। কমিশন তার দায়িত্বের অংশ হিসেবে ঐকমত্যের মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সংবলিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ প্রণয়ন করে।

মোট ৩৫টি রাজনৈতিক দল ও জোট তাদের মতামত কমিশনের কাছে পাঠায়, অনেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণও যোগ করে। প্রথম পর্যায়ের আলোচনা শেষ করে কমিশন অগ্রাধিকার ও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় মোট ১৮টি বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দ্বিতীয় দফা আলোচনায় মিলিত হয়। এই প্রক্রিয়ার ফলস্বরূপ ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ কয়েকটি ভিন্নমতসহ সর্বসম্মতভাবে প্রণীত হয়। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরা সনদে স্বাক্ষর করেন।

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে অঙ্গীকার
স্বাক্ষতির জুলাই জাতীয় সনদে তারা নিম্নোক্ত অঙ্গীকার ঘোষণা করেন :

‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রকাশিত জনগণের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে আমরা নিম্নস্বাক্ষরকারীরা এই মর্মে অঙ্গীকার ও ঘোষণা করছি যে—

জনগণের অধিকার ফিরে পাওয়া এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে হাজারো মানুষের জীবন ও রক্তদান এবং অগণিত মানুষের সীমাহীন ক্ষয়ক্ষতি ও ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত সুযোগ এবং তৎপ্রেক্ষিতে জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রণীত ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত নতুন রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করব।

যেহেতু জনগণ এই রাষ্ট্রের মালিক, তাদের অভিপ্রায়ই সর্বোচ্চ আইন এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণত জনগণের অভিপ্রায় প্রতিফলিত হয় রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে, সেহেতু রাজনৈতিক দল ও জোটসমূহ সম্মিলিতভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে জনগণের অভিপ্রায়ের সুস্পষ্ট অভিব্যক্তি হিসাবে জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫ প্রণয়ন করেছি বিধায় এই সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে সংবিধানে তফসিল হিসেবে বা যথোপযুক্তভাবে সংযুক্ত করব।

জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কোনো আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করব না, উপরন্তু ওই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করব।

গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণের দীর্ঘ ১৬ বছরের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম এবং বিশেষত ২০২৪ সালের অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে সাংবিধানিক তথা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করব।

গণ-অভ্যুত্থানপূর্ব ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানকালে সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ডের বিচার, শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান ও শহীদ পরিবারসমূহকে যথোপযুক্ত সহায়তা প্রদান এবং আহতদের সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করব।

‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’-এ বাংলাদেশের সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তথা সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশি ব্যবস্থা ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা সংস্কারের বিষয়ে যেসব সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান এবং বিদ্যমান আইনসমূহের প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন, পরিমার্জন বা নতুন আইন প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়ন বা বিদ্যমান বিধি ও প্রবিধির পরিবর্তন বা সংশোধন করব।

জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫-এর ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত যেসব সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য সেগুলো কোনো প্রকার কালক্ষেপণ না করেই দ্রুততম সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করবে।

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া
ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ বিবেচনা করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১৩ নভেম্বর ২০২৫ জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ জারি করে। আদেশে বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫-এ গণভোটের প্রশ্নটি পেশ করা হয়েছে, যা নিম্নরূপ : আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?—

‘ক. নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে।

খ. আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হইবে এবং সংবিধান সংশোধনী করিতে হইলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে।

গ. সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিরোধী দল হইতে ডিপুটি স্পিকার ও কয়েকটি সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হইয়াছে— সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকিবে।

ঘ. জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হইবে।’

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫-এ উল্লিখিত প্রশ্নটিতে ৩০টি বিষয় রাজনৈতিক দলগুলোর যে ঐকমত্য হয়েছিল তা বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছে। তবে অবশিষ্ট ১৮টি বিষয়ে যে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে তার মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। যেমন— উচ্চকক্ষ গঠন, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে স্বাধীন কমিশন কর্তৃক গঠনের জন্য ঐকমত্য কমিশন যে সুপারিশ করেছে তার সাথে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল। তা সত্ত্বেও গণভোটের প্রশ্নে তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অপর দিকে, কম গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ের সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করার কথা বলা হয়েছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, ‘নোট অব ডিসেন্ট’ সত্ত্বেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গণভোটে প্রশ্ন ছিল এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে যে দলই ক্ষমতায় যাক তা মানতে বাধ্য থাকবে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সাথে গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দেয়। জনগণ যেহেতু রাষ্ট্রের মৌলিক বিষয় সম্পর্কে মতামত দেয়ার চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ, সেহেতু তাদের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কোনো নৈতিক ও আইনগত অধিকার কারো নেই।

লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব

[email protected]