মেজর জেনারেল (অব:) রোকন উদ্দিন
ভারতের জম্মু ও কাশ্মির দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বিতর্কিত ও মানবাধিকার-সংবেদনশীল একটি অঞ্চল। এটি ভারতের একমাত্র মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায়, সেখানে নিরাপত্তা নীতির নামে নেয়া বহু পদক্ষেপ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর অসমভাবে প্রভাব ফেলেছে। ২০১৯ সালের আগস্টে ভারতের সরকার সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে কাশ্মিরের বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা প্রত্যাহার করে। এরপর পরিস্থিতি আরো কঠোর ও কেন্দ্র-নিয়ন্ত্রিত হয়ে ওঠে। ভারত সরকার এই পদক্ষেপকে উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও জাতীয় একীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় বলে দাবি করলেও, মানবাধিকার সংগঠন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং স্থানীয় জনগণের বড় অংশ এটিকে রাজনৈতিক অধিকার হরণ ও দমনমূলক শাসনের সূচনা হিসেবে দেখেছে।
কাশ্মির সঙ্কটের শিকড় ১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশের বিভাজনের সময় পর্যন্ত বিস্তৃত। সে সময় মহারাজা হরি সিং ভারতের সাথে যুক্ত হওয়ার দলিলে স্বাক্ষর করার পর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয় এবং অঞ্চলটি বিভক্ত হয়ে যায়। জাতিসঙ্ঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হলেও কাশ্মির সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। ১৯৮৯ সালে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর থেকে কাশ্মির কার্যত একটি সামরিকীকৃত অঞ্চলে পরিণত হয়। এখানে বিদ্রোহী গোষ্ঠী, ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী এবং সাধারণ জনগণ সবাই সহিংসতার শিকার হয়েছে। জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার দফতর এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বছরের পর বছর বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নিখোঁজ, নির্যাতন, গণগ্রেফতার এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতির অভিযোগ তুলে এসেছে।
২০১৯ সালের পর থেকে পরিস্থিতি আরো পরিবর্তিত হয়েছে। বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর জম্মু ও কাশ্মিরকে দু’টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করা হয় এবং প্রশাসন সরাসরি দিল্লির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। একই সময়ে দীর্ঘ ইন্টারনেট ও যোগাযোগ বন্ধ রাখা হয়, যা আধুনিক ইতিহাসের দীর্ঘতম ডিজিটাল অবরোধগুলোর একটি। মানবাধিকার সংস্থাগুলো দাবি করেছে, ইন্টারনেট বন্ধ রাখার ফলে সাংবাদিকতা, আইনগত সহায়তা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য সংগ্রহ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরো বেড়েছে।
গত জানুয়ারিতে কাশ্মিরের সাংবাদিকদের পুলিশ কর্তৃপক্ষের কাছে ‘শান্তি বিঘ্নিত না করার’ মুচলেকা দিতে বলা হয়েছে— যা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ। সাংবাদিক সংগঠনগুলো একে ভয় দেখানো ও স্ব-নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেয়ার কৌশল বলে আখ্যা দিয়েছে। একই সাথে নিরাপত্তা আইনের আওতায় গ্রেফতার ও আটক করা অব্যাহত রয়েছে। ভারতের পাবলিক সেফটি অ্যাক্ট (PSA) ও সন্ত্রাসবিরোধী আইন UAPA-এর অধীনে বহু রাজনৈতিক কর্মী, মানবাধিকারকর্মী ও সাধারণ নাগরিককে দীর্ঘ সময় বিচার ছাড়াই আটক রাখা হয়েছে। শত শত মানুষ বছরের পর বছর এই আইনে আটক রয়েছেন, যা ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের মৌলিক নীতির সাথে সাংঘর্ষিক।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৪ সালে আঞ্চলিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসন ও নিরাপত্তাবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এখনো কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা স্বায়ত্তশাসন পুনর্বহালের দাবি তুললেও কেন্দ্র সরকার তা প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে অনেক কাশ্মিরির কাছে নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা, প্রকৃত স্বশাসনের প্রতিফলন নয়। এই পরিস্থিতিতে ধর্মীয় পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যদিও ভারত সরকার দাবি করে, তাদের নীতিগুলো ধর্মনিরপেক্ষ ও নিরাপত্তাভিত্তিক, বাস্তবে কাশ্মিরের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণই অধিকাংশ বিধিনিষেধ, অভিযান ও প্রশাসনিক কঠোরতার মুখোমুখি হচ্ছে। মসজিদ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও দাতব্য সংস্থার ওপর তদন্ত, ধর্মীয় সমাবেশে বিধিনিষেধ এবং ধর্মীয় নেতাদের ওপর নজরদারি মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিপীড়নের অনুভূতি বাড়িয়েছে।
কাশ্মিরে স্থায়ী শান্তি কেবল নিরাপত্তা ও শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব নয়, কারণ বল প্রয়োগের ওপর দাঁড়ানো স্থিতিশীলতা স্বভাবতই ভঙ্গুর। কাশ্মিরিদের রাজনৈতিক অধিকার, সাংস্কৃতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং মানবিক মর্যাদা কোনো গৌণ বিষয় নয়; বরং এগুলোই টেকসই শান্তির মূল ভিত্তি। এসব অধিকার ধারাবাহিকভাবে সঙ্কুচিত করা হলে সহিংসতা সাময়িকভাবে কমে, কিন্তু জনমনে ক্ষোভ ও বঞ্চনা জমতে থাকে। নির্বিচার গ্রেফতার, বিচারবহির্ভূত দীর্ঘ আটক, স্বাধীন গণমাধ্যম দমন, বারবার ডিজিটাল অবরোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তির সংস্কৃতি এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে আস্থার জায়গায় ভয় এবং সম্মতির জায়গায় নীরবতা বিরাজ করছে।
ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, কাশ্মিরেই নয়, বিশ্বের অন্যান্য সঙ্ঘাতপূর্ণ এলাকাতেও দমননীতি স্বল্পমেয়াদে শান্তি চাপিয়ে দিতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা আরো গভীর বিচ্ছিন্নতা, ক্ষোভ এবং সহিংসতার চক্র সৃষ্টি করে।
সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক হয়েছে, কারণ ভারত সরকার ধর্মীয় জীবনেও চরম নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে। মসজিদে নজরদারি, খুতবা ও ধর্মীয় বক্তব্য পর্যবেক্ষণ, ধর্মীয় সমাবেশে বিধিনিষেধ, মাদরাসার অর্থায়ন ও কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ক্রমেই বেড়েছে। এসব পদ-পদবি কেবল নিরাপত্তার সীমার মধে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক ধর্মচর্চার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ। মসজিদ ও মাদরাসা, যা ঐতিহ্যগতভাবে ইবাদত, শিক্ষা ও সামাজিক সংহতির কেন্দ্র, সেগুলোকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে এবং নিরাপত্তা ঝুঁঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এটি ধর্মীয় স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংগঠিত হওয়ার অধিকারের মতো মৌলিক মানবাধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
কাশ্মিরের মতো মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে এসব নীতি বিশেষভাবে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। মানুষের মধ্যে এই ধারণা জোরদার হচ্ছে যে, পুরো জনগোষ্ঠীকেই সন্দেহের আওতায় আনা হয়েছে। যখন ধর্মীয় স্থান নিয়ন্ত্রিত হয়, ধর্মীয় নেতাদের ওপর নজরদারি বাড়ে এবং ধর্মভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা সীমিত করা হয়, তখন তা সম্প্রীতি বা একীকরণের বার্তা দেয় না; বরং বর্জন ও নিয়ন্ত্রণের বার্তা পৌঁছে দেয়।
কাশ্মিরে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য দমনমূলক শাসন থেকে সরে এসে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা অপরিহার্য। নাগরিক স্বাধীনতা সুরক্ষা, প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা পুনর্গঠন, রাজনৈতিক মতপ্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখানো কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এগুলোই টেকসই শান্তির পূর্বশর্ত।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার দফতর অতীতে কাশ্মির নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে স্বাধীন তদন্ত ও জবাবদিহির আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্ব সংস্থার উচিত নিয়মিত পর্যবেক্ষণ মিশন পাঠানো, মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের জন্য চাপ সৃষ্টি করা। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ রাজনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধ হলেও বেসামরিক সুরক্ষা, মানবাধিকার ও আঞ্চলিক উত্তেজনা হ্রাসের বিষয়ে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে নৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের উচিত ভারতের সাথে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানবাধিকার সূচককে বিবেচনায় নেয়া। একই সাথে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আস্থা বাড়ানোর পদক্ষেপ, সীমান্ত উত্তেজনা হ্রাস এবং সংলাপ আবার শুরু করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব।
দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য কাশ্মিরিদের রাজনৈতিক অধিকার, সাংস্কৃতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। কঠোর দমননীতি দীর্ঘমেয়াদে আরো ক্ষোভ, বিচ্ছিন্নতা ও সহিংসতার বীজ বপন করে। সুতরাং, ভারতের জন্য প্রয়োজন নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা এবং কাশ্মিরিদের প্রকৃত রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও স্বশাসনের পথ উন্মুক্ত করা।
লেখক : নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক



