ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে। আজ মঙ্গলবার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা এবং নতুন সরকারের মন্ত্রিসভা শপথ নেবে।
বিচ্ছিন্ন কিছু সহিংসতা আর কয়েকটি দুঃখজনক মৃত্যুর ঘটনা ছাড়া এবারের নির্বাচন ছিল শান্তিপূর্ণ। ফল অনুযায়ী, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন (২১২ আসন) পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। অন্যদিকে জামায়াত-এনসিপির ১১ দলীয় জোট ৭৭টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে। ইসলামী আন্দোলন ও কয়েকজন স্বতন্ত্রসহ কিছু ছোট দলও সংসদে আসছে। অর্থাৎ ক্ষমতার লড়াইয়ে বিএনপি স্পষ্টত বিজয়ী, আর জামায়াত সংখ্যার হিসাবে উল্লেখযোগ্য অর্জন করেও রাজনৈতিক অর্থে পরাজিত। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর নানাজন নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করছেন।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পরপর যেমনটি ধারণা করা হয়েছিল; বিএনপি ঠিক তেমনি বিজয় পেয়েছে। তবে এ কথাও ঠিক, চব্বিশের ৫ আগস্টের পর মনে করা হয়েছিল— রাজনীতির মাঠে বিএনপির কোনো শক্ত প্রতিপক্ষ থাকবে না। সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। জামায়াত-এনসিপি নেতৃত্বাধীন জোট যে ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছিল, তা সার্বিক ফলে স্পষ্ট।
বিএনপি জোটের বিপরীতে জামায়াত জোট দেশের দু-একটি বাদে ইসলামী ঘরানার সব দলকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। শুধু তাই নয়, জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া তরুণদের নিয়ে গঠিত দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিকে জোটশরিক করে। এতে তরুণ ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই বাড়ে। যার কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হয় বিএনপি।
নির্বাচনের আগে জামায়াত জোট নিজেদের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুকূল আবহ তৈরিতে সক্ষম হয়। ফলাফল ঘোষণার পর সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ হতাশ হয়েছেন জামায়াতের নির্বাচনী ফলে। জামায়াত জোট শত আসনের কম পাওয়ায় অনেকে আশাহত।
বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোট এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছে। সঙ্গত কারণে দলটির ভোট কোন দিকে বেশি পড়েছে সেদিকে দৃষ্টি ফেরানো প্রয়োজন। রাজনৈতিক সব বিবেচনায় নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বেশির ভাগ আওয়ামী ভোট বিএনপির পক্ষে পড়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে জামায়াতের প্রবল উপস্থিতির কারণে আওয়ামী নেতাকর্মী-সমর্থকের কাছে রাজনৈতিক শত্রু হিসেবে চিহ্নিত ইসলামপন্থীরা। এ ছাড়া দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষ করে হিন্দু জনগোষ্ঠী ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে তারা জামায়াতের চেয়ে বিএনপির প্রতি বেশি আগ্রহী হবেন, এটি বুঝতে রাজনৈতিক বিশ্লেষক হতে হয় না। লক্ষণ হিসেবে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করাই যথেষ্ট। যেমন— সুনামগঞ্জের দিরাই-শাল্লা আসনে জামায়াত প্রার্থী আলোচিত আইনজীবী শিশির মনিরের পরাজয়। এলাকাটি হিন্দু অধ্যুষিত। খুলনায় এক আসনে সগোত্রীয় জামায়াত প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দীর পরাজয়ও একটি নির্দেশক। আওয়ামী লীগের দুর্গ খ্যাত গোপালগঞ্জের তিনটি আসনেই জামায়াত প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোট বলে দেয়— হিন্দু ও আওয়ামী ভোটাররা কাকে ভোট দিয়েছেন। তিনটি আসনে ভোটের দিক থেকে জামায়াত প্রার্থীরা তৃতীয়।
খুলনা বিভাগে বিএনপির বিপর্যয়ের কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে সুজনের খুলনা জেলার সাধারণ সম্পাদক কুদরত-ই খুদার বিশ্লেষণ— ‘খুলনা বিভাগে জামায়াতের দাপটের পেছনে তাদের সাংগঠনিক শক্তিমত্তার পাশাপাশি বিএনপির প্রার্থী নির্বাচন, তৃণমূলের সাথে সমন্বয়হীনতা ও সাংগঠনিক দুর্বলতা ভূমিকা রেখেছে। আওয়ামী লীগের ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল— এমন আসনগুলোতে জামায়াত বেশি সুবিধা পেয়েছে। (প্রথম আলো, রোববার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, মুদ্রণ সংস্করণ)
বাস্তবে আওয়ামীসহ হিন্দু ভোটাররা দলবেঁধে বিএনপি প্রার্থীদের ভোট না দিলে সারা দেশে দলটির এই বিপুল জয় সম্ভব হতো কিনা সন্দেহ।
অতীতের হিসাব থেকে যদি ধরে নেয়া হয়, সাড়ে ১৫ বছরের অপকর্মে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা কমে ন্যূনতম ২০ শতাংশে নেমেছে, অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসে বিএনপি নেতাকর্মীদের তৃণমূলে বেপরোয়া চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও আধিপত্য বিস্তারে দলটির জনপ্রিয়তা যে কিছুটা কমছে, তা সহজে অনুমেয়। কিন্তু বিএনপির প্রাপ্ত ভোট প্রায় ৫০ শতাংশ। এতে বুঝতে অসুবিধা হয় না, আওয়ামী ভোট বিএনপির বাক্সে পড়েছে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, আওয়ামী লীগের সাথে বিএনপির এই গাটছড়া বাঁধার পেছনে কোন জাদু কাজ করেছে। এ কাজে অনুঘটকের কাজটিই বা কে করল? এ প্রশ্নের জবাব পেতে আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, প্রতিবেশী ভারতের ভূমিকা। ভারত আওয়ামী লীগের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে এদেশে দিল্লির স্বার্থ ষোলোআনা উসুল করছিল। এবারের নির্বাচনে যেহেতু আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত; তাই চির বৈরী ইসলামপন্থীদের বিপরীতে বিএনপি ছিল ভারতের বিকল্পহীন পছন্দ। এ দৃষ্টিকোণে বিচার করলে ভারতীয় প্রভাব বলয়ের আনুকূল্য বিএনপির ঝুড়িতে যাওয়াই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে ভারতে পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনাসহ অপরাপর নেতাদেরকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা বুঝাতে সক্ষম হয়, বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় মন্দের ভালো বিএনপি। ফলে পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগ নেতারা নির্বাচনে ভূমিকা রেখেছেন। তবে বিএনপি বিনা শর্তে এ সমর্থন পেয়েছে; এমন কথা হলফ করে বলা যাবে না।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আপাতত নির্বাসিত আওয়ামী লীগকে ধীরে ধীরে পুনর্বাসনের একটি শর্ত এতে থাকা স্বাভাবিক। এর নমুনা আমরা দেখি, নির্বাচনের ঠিক পরের দিন গত শুক্রবার পঞ্চগড়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে আওয়ামী লীগের একটি কার্যালয় বিএনপির স্থানীয় নেতার নেতৃত্বে খুলে দেয়া। খুলনাতেও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে। এ দু’টি ঘটনা ছোট হলেও জাতীয় রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তাবাহী। কারণ, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। তৃণমূল আওয়ামী নেতাকর্মীদের তাতে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়ে তাদের পুনর্বাসনের কাজ এগিয়ে নেয়া হতে পারে।
এক্ষেত্রে বিএনপি চেয়ারম্যান ও দেশের ভাবি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকার প্রণিধানযোগ্য। সাক্ষাৎকারের এক জায়গায় তিনি বলেছেন, জনগণ চাইলে শেখ হাসিনার সন্তানরাও রাজনীতিতে ফিরতে পারেন। কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, তার এ কথার অর্থ— দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ সহসাই ফিরতে পারে। ফলে যারা আওয়ামী লীগের সমর্থন আদায়ে বিএনপির কোনো গোপন সমঝোতার কথা বলছেন, তা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়ার অবকাশ কই!
নির্বাচনে জামায়াতের অর্জন
সত্যিই কি জামায়াত নির্বাচনে খারাপ করেছে? নির্বাচনে প্রাপ্ত ফলে জামায়াতের লাভ-ক্ষতির প্রকৃত অবস্থানের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ দরকার। অতীতের নির্বাচনী ফল থেকে স্পষ্ট, এবারে জামায়াত খারাপ করেনি। জামায়াত একানব্বইতে মোট প্রদত্ত ভোটের ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ পায়। আর ১৯৯৬ সালে ৩০০ আসনে এককভাবে অংশ নিয়ে প্রদত্ত ভোটের ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ পায়। অর্থাৎ দলটির সর্বোচ্চ প্রাপ্ত ভোট ১২ শতাংশের একটু বেশি। এবার সেই হার বেড়ে ৩১ দশমিক ৭৬-এ পৌঁছেছে। অর্থাৎ জামায়াতের প্রাপ্ত ভোট বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ।
জামায়াতের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল-পরবর্তী জামায়াতের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হতে পারে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দলটির সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি ফেরানো যেতে পারে। এক্ষেত্রে একানব্বই থেকে জামায়াতের নির্বাচনী ইতিহাস আমলে নেবো আমরা। একানব্বইয়ে ১৮টি আসনে জয়ী হয় দলটি। ১৯৯৬ সালে ৩০০ আসনে এককভাবে অংশ নিয়ে তিনটি আসনে বিজয়ী হয়। ২০০১ সালে বিএনপির জোটসঙ্গী হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ১৭টি আসনে জয় পায়। ২০০৮ সালে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে আসন পায় মাত্র দু’টি। এই চারটি নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে— জামায়াত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে নিজের রাজনৈতিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ ভালো করেছে। দলটি প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এমন নির্বাচনী ফলের পেছনে জামায়াতের দীর্ঘমেয়াদি কর্মকৗশল ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তার সাংগঠনিক সক্ষমতা কাজ করেছে। পাশাপাশি দলটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, প্রশাসন, সিভিল-মিলিটারি আমলাতন্ত্র, ব্যাংক, আর্থিক খাতসহ রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ইকোসিস্টেমে নিজেদের ভিত্তি শক্তিশালী করতে পেরেছে। ফলে দেশের শহুরে শিক্ষিত শ্রেণীর একটি বড় অংশ এবার জামায়াতকে ভোট দিয়েছে। সেই সাথে রাজনীতি সচেতন শ্রমজীবী, খেটে খাওয়া মানুষ ব্যাপক হারে জামায়াতের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। নারী ভোটাররাও বেশ আগ্রহ নিয়ে ভোট দিয়েছেন। একই সাথে সেক্যুলার রাজনীতি ধারাবাহিকভাবে দেশের জনপ্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় ‘বিকল্প’ হিসেবে নিজেদের উপস্থাপনের সুযোগ পেয়েছে জামায়াত।
অতএব, টেকসই ভিত্তির ওপর বিকশিত জামায়াতের এ নির্বাচনী উত্থান সাময়িক কোনো বিষয় নয়। এ অর্জন পরবর্তী সময়ে কতটা বিকশিত হবে, তা দেখার বিষয়। নতুন সরকার কিভাবে দায়িত্ব পালন করে, কতটা সফল হয় এবং তার সুবিধা জনগণ কখন, কতটা ও কিভাবে পাবে, এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকার এসব ক্ষেত্রে সফল হতে না পারলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াত ভবিষ্যতে আরো শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পাবে।
আরেকটি বিষয় অস্বীকার করা খুব কঠিন। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের নতুন বাস্তবতায় এবার নির্বাচন থেকে ছিটকে পড়েছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ। ফলে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা মূলত বিএনপি বনাম জামায়াত-এনসিপি— এই দুই বাইনারিতে গিয়ে ঠেকেছে। এমন পরিস্থিতিতে জামায়াতের সামনে ছিল দুই ধরনের সুযোগ : সংখ্যার দিক থেকে সর্বোচ্চ অর্জন, আর রাজনৈতিকভাবে মধ্যম ভোটারদের আশ্বস্ত করা যে, তারা একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প। প্রথমটি জামায়াত করতে পারলেও দ্বিতীয়টিতে দুর্বলতা স্পষ্ট।
সংসদীয় পদ্ধতিতে বিরোধী দলের ভূমিকা
সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় বিরোধী দল পরোক্ষভাবে সরকারের অংশ। সংসদের দু’টি অংশ— ট্রেজারি বেঞ্চ বা সরকারি দল এবং অপজিশন বা বিরোধী দল। অর্থাৎ সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় সরকারি দল এবং বিরোধী দল যৌথভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নেয়। এটি সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সৌন্দর্য। সংসদীয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার ব্রিটেনে এই মডেল পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ করা হলেও বাংলাদেশে এর ব্যত্যয় ঘটেছে। ফলে এদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র খুব ভঙ্গুর। বিশেষ করে পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে সাড়ে ১৫ বছর দেশে গণতন্ত্র ছিল নির্বাসিত। ত্রয়োদশ নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা আবার নতুন করে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় হাঁটতে শুরু করছি।
দেশের এক রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে জামায়াত প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হলো। যখন রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে বিরোধী দল হিসেবে। সংসদে যদি তথ্য-উপাত্ত দিয়ে যুক্তিসঙ্গতভাবে সরকারের যৌক্তিক সমালোচনা করে নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারে জামায়াত; তা হলে জনসমর্থন বাড়বে। দ্বিতীয়ত— নাগরিকদের যৌক্তিক দাবি-দাওয়া নিয়ে বিভিন্ন ইস্যুতে রাজপথে কর্মসূচি দিয়ে সরব থাকা। রাজপথে জনঘনিষ্ঠ কর্মসূচি দিলে সাধারণ মানুষ তাতে যে শামিল হবে, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
আগামী দিনে রাজনীতির সম্ভাব্য চিত্র
সত্যি সত্যি যদি বিএনপি আগামী দিনে আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয় এবং ভারতের ব্যাপারে নমনীয়তা প্রদর্শন করে তাহলে দলটির রাজনৈতিক আদর্শে বদল আনতে হবে।
বিএনপির দর্শন— বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ এবং ইসলামী মূল্যবোধ ধারণ ও লালন। এ থেকে সরে গিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ভারতপ্রীতি আঁকড়ে ধরলে আখেরে দলটির প্রকৃত সমর্থকদের হারানোর ঝুঁকি থাকবে। এমনটি হলে, মুসলিম জাতিসত্তার রাজনীতির ঝাণ্ডা জামায়াত জোটের হাতে চলে যেতে পারে। কেন এমন কথা বলছি? রাজনৈতিক সাহিত্যের জনপ্রিয় লেখক মহিউদ্দিন আহমেদের লেখার একটি উদ্ধৃতি দিতে চাই।
মহিউদ্দিন আহমেদ তার ‘বিএনপি : সময়-অসময়’ বইতে লিখেছেন— ‘বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে হঠাৎ এসে পড়লেও এর প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল আগেই।’ (পৃষ্ঠা-১৫) সেই প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় নানা ঘটনা ও প্রবণতার মধ্যে জন্ম নিয়েছিল এক ধরনের গোষ্ঠীগত মনস্তত্ত্ব, যা ধীরে ধীরে ডালপালা মেলতে থাকে এবং এক সময় তার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে। বিএনপির জন্ম ও উত্থানকে বুঝতে হলে তাই আমাদের ফিরে যেতে হবে একাত্তরের আগুনঝরা দিনগুলোতে।’ (পৃষ্ঠা-১৫)
এই বইয়ের অন্য এক জায়গায় লেখক মহিউদ্দিন লিখেছেন— ‘১৭ এপ্রিল ডালিম, মতি ও নূর গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ঢোকেন। ২০ এপ্রিল তারা হাজির হন দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অফিসে। তারা তিনজনই হচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার জন্য পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা সেনাকর্মকর্তাদের মধ্যে প্রথম। দিল্লিতে তাদের অভিজ্ঞতা ছিল তিক্ত। প্রথমে তাদের মেজর জেনারেল সুজন সিং উবানের হাওলায় দেয়া হয়। ভারতীয় গোয়েন্দারা চারদিন ধরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। উবান তাদের বললেন, বাংলাদেশ সরকারের উঁচু পর্যায়ের একটা দল শিগগিরই দিল্লিø আসবে এবং তাদের তিনজনকে ওই দলের জিম্মায় ছেড়ে দেয়া হবে। কয়েক দিনের মধ্যেই বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোশতাক আহমদ এবং সামরিক বাহিনীর প্রধান কর্নেল এম এ জি ওসমানী আসেন। তাজউদ্দীন তাদের বলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ হয়েছে, আরো দুই সপ্তাহ দিল্লিতে থাকতে হবে। এই সময়ে ভারতীয় কয়েকটি সংস্থা তাদের মুক্তিযুদ্ধ সম্বন্ধে ধারণা দেবে এবং তাদের বিশেষ দায়িত্ব দেয়া হবে। এটা শুনে তাদের মনে হলো, ‘এটা একটা ষড়যন্ত্র এবং বাংলাদেশ সরকার চলছে ভারতের নির্দেশে, ভারত এই মুক্তিযুদ্ধ সম্বন্ধে তার নিজস্ব ধারণা তাদের গেলাতে চায় এবং বাংলাদেশকে একটি তাঁবেদার রাষ্ট্র বানাতে চায়।’ (পৃষ্ঠা : ২০-২১)
মহিউদ্দিন আহমদের উপরোল্লিখিত কথাগুলো থেকে স্পষ্ট, বিএনপির জন্ম মূলত ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান থেকে। তাই দলটি যদি জন্মক্ষণের রাজনৈতিক অবস্থানে বদল আনার চেষ্টা করে, তাহলে আধিপত্যবাদবিরোধী এদেশের মানুষের কাছে বিএনপির প্রাসঙ্গিকতা সম্ভবত থাকবে না। তখন আধিপত্যবাদবিরোধী বিপুল জনগোষ্ঠী বিএনপি থেকে মুখ ফিরিয়ে এমন দলের প্রতি আস্থা রাখবেন, যে দলের আদর্শ তাদের রাজনৈতিক চেতনার সাথে যায়। এক্ষেত্রে দেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষের কাছে জামায়াতই হতে পারে সবচেয়ে সঠিক বিকল্প। তাই বলা যায়, আগামী দিনে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন এবং ভারতের প্রতি নতুন সরকারের মনোভাবের ওপর নির্ভর করবে এদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপ্রকৃতি।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



