নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশ আজ উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কট, ঋণের চাপ এবং কর্মসংস্থানের ঘাটতির মতো অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সব ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা। ব্যাংক, অর্থব্যবস্থা, পুঁজিবাজারের অবস্থা খুবই খারাপ। এই পরিস্থিতিতে কঠোর অর্থনৈতিক সংস্কার অপরিহার্য। দুই-তৃতীয়াংশের শক্তি দিয়ে বাজেট ও আইন পাস করা সহজ; কিন্তু অর্থনৈতিক আস্থা পুনর্গঠনে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নৈতিক নেতৃত্ব। পাশাপাশি রয়েছে আইনশৃঙ্খলার মারাত্মক অবনতি, রয়েছে সর্বক্ষেত্রে দলীয়করণ। আরো রয়েছে আধিপত্যবাদের চাপ এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জেরে ভুল করার অবকাশ নেই। অতএব, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিএনপির জন্য বিরল সুযোগ, আবার কঠিন পরীক্ষাও। সামনে পথ সহজ নয়। এটি শেষ পর্যন্ত আশীর্বাদ নাকি বিপদের কারণ হবে, তা নির্ধারিত হবে দলীয় নেতৃত্বের দায়িত্বশীলতা ও দূরদর্শিতার ওপর

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী দল ও মিত্ররা ২১২টি আসন নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। সংখ্যার বিচারে এটি শক্তিশালী গণরায়; কিন্তু ক্ষমতার বিন্যাসের বিচারে নিছক নির্বাচনী ফল নয়, বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাংলাদেশের ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠনের ইতিহাস এই পরীক্ষার বাস্তব উদাহরণ। তখনো সেই অর্জনকে উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার শক্তিশালী ম্যান্ডেট হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন, বিরোধী দলের রাজনৈতিক পরিসর সঙ্কুচিত হওয়া, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক এবং একাধিক নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন আসন বৃদ্ধির মতো বিষয় রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র করে তোলে। সমর্থকরা উন্নয়ন, অবকাঠামো ও ডিজিটাল রূপান্তরের সাফল্য তুলে ধরলেও সমালোচকরা প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের অবক্ষয় ও গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্কোচনের অভিযোগ আনেন। সহিংসতা, প্রাণহানি এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের গভীর সঙ্কট দেখা দেয়। ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ ও রাজনৈতিক অবিশ্বাস শেষ পর্যন্ত তীব্র অস্থিরতায় রূপ নেয়, যার পরিণতিতে গণবিপ্লবে সরকারে পতন ঘটে।

এই প্রেক্ষাপটে এবার জাতীয়তাবাদী জোটের নিরঙ্কুশ বিজয় গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করে। অন্তর্বর্তী শাসনের পর জনগণ এখন স্থিতিশীলতা, আস্থা ও কার্যকর শাসনের প্রত্যাশা করেছে। আবার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পাওয়ায় সংস্কার বাস্তবায়ন, সংবিধান সংশোধনের সম্ভাবনা, ক্ষমতা-কাঠামোর পুনর্বিন্যাস, নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার কিংবা তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি নিয়ে আবার বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই প্রবন্ধে তাই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দ্বৈত চরিত্রসম্ভাবনা ও ঝুঁকি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক দুই ভিন্ন রাজনৈতিক অধ্যায়ের অভিজ্ঞতার আলোকে বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হবে।

দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বের অভিজ্ঞতা দেখায়, নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা নয়; বরং তা প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। ২০১৭-পরবর্তী নেপালে বাম জোটের শক্তিশালী অবস্থান দলীয় বিভাজন ও সাংবিধানিক টানাপোড়েনে ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। বিপরীতে ভারতে ভারতীয় জনতা পার্টি শক্তিশালী ম্যান্ডেট নিয়ে দ্রুত আইন ও নীতি পরিবর্তন ও বাস্তবায়ন করলেও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, সক্রিয় গণমাধ্যম ও আঞ্চলিক রাজনীতির ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করেছে। অন্য দিকে জিম্বাবুয়েতে দীর্ঘকালীন সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধীরে ধীরে একদলীয় আধিপত্যে রূপ নিয়ে অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্কট ডেকে আনে। অবশ্য যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো দেশে শক্তিশালী সাংবিধানিক রীতি ও কমিটি-ব্যবস্থার কারণে এটি গণতান্ত্রিক কাঠামোকে বিপন্ন করে না।

নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা তখনই প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী ম্যান্ডেট হয়ে ওঠে, যখন তা উচ্চ ভোটার উপস্থিতি, অবাধ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনী পরিবেশ এবং নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে অর্জিত হয়। সাম্প্রতিক নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ভোট সুষ্ঠু এবং অবাধ হওয়ার পরেও কিছু আসনে কারসাজি বা কৌশলে পরিবর্তন এবং পরিশেষে ফলাফল ঘোষণার প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যেই বিতর্ক দেখা দিয়েছে। রিটার্নিং অফিসার ও নির্বাচন কমিশনের কেন্দ্রীয় কার্যক্রম নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। ফলাফল কারসাজির অভিযোগ সরাসরি রয়েছে। এ ধরনের তথ্য রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করে এবং নাগরিক আস্থায় শঙ্কা জাগায়।

স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মেরুদণ্ড; তাই এর স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে যেকোনো প্রশ্নই সরকারের ওপর সতর্কতা তৈরি করে। বিশেষ করে, সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরও যখন প্রশাসনিক সিন্ডিকেটের সহযোগিতায় অতিরিক্ত ক্ষমতা অর্জন করার কথা শোনা যায়, তখন এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক ভারসাম্য নিয়ে ভাবনার সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা দেখায়, নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর বিরোধী দলের কার্যকর সমালোচনা প্রায় শূন্যে নেমে যায়। রাজনৈতিক মেরুকরণ বেড়ে যায়, সংসদে বিরোধী কণ্ঠের কার্যকারিতা কমে এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রাস্তায় স্থানান্তরিত হয়। ফলে, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পরিবর্তে বিভাজন বাড়ায়। একপক্ষীয় নীতিনির্ধারণ ক্ষমতার অপব্যবহার বাড়িয়ে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের ক্ষয় ঘটিয়েছে।

মূলত, কার্যকর ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা আইন ও সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ দেয়, সক্রিয় গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ সরকারের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে এবং শক্তিশালী বিরোধী দল সীমিত সংখ্যার মধ্যেও সমালোচনা ও তত্ত্বাবধান করতে সক্ষম হয়। এই উপাদানগুলো থাকলে, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা গণতন্ত্রের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত না করে বরং দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে সহায়ক হয়। দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দুর্বল হলে, বিচারব্যবস্থা ও নির্বাচন ব্যবস্থার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হলে, সংসদীয় কমিটি অকার্যকর হয়ে পড়লে বা বিরোধী রাজনীতি ও গণমাধ্যম সীমাবদ্ধ হলে সংখ্যাগত শক্তি সহজেই জবাবদিহিহীনতার দিকে ঝুঁকতে পারে। তখন ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, মতের বহুমাত্রিকতার সঙ্কোচন এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়।

জাতীয়তাবাদী দল ও তার মিত্ররা সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় ২০০৮ সালের নির্বাচন-পরবর্তী দেড় যুগের ফ্যাসিজম মানুষের মনে পুনর্জাগরিত হচ্ছে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাদেরকে আইন প্রণয়ন, সংবিধান সংশোধন এবং প্রশাসনিক পুনর্গঠনের বিরল ক্ষমতা দিয়েছে; কিন্তু এই ক্ষমতার ব্যবহারই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক গতিপথ। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির সামনে অনেক জটিল ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে আছে।

প্রথমত, বৈধতা ও সংখ্যাগত শক্তির দ্বন্দ্ব অনিবার্যভাবে সামনে আসবে। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের স্বচ্ছতা নিয়ে যে সংশয় দেখা দিয়েছে, তা সরকারকে শুরু থেকেই প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে ঠেলে দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সংবিধান সংশোধন, গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস এবং নীতিগত রূপান্তরের পথ সহজ করলেও যদি কার্যকর সংসদীয় বিতর্ক না থাকে এবং বিরোধী দল সংখ্যায় অপ্রতুল হওয়ায় আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া একপাক্ষিক হয়ে পড়তে পারে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। সেক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির কাঠামো দুর্বল হবে।

তৃতীয়ত, বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বের অবস্থাও নাজুক। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সততা, দেশপ্রেম এবং আপসহীন নেতৃত্বের আদর্শ থেকে বর্তমান নেতৃত্ব অনেকটাই বঞ্চিত। অভিজ্ঞতার ঘাটতি, নেতাদের মধ্যে একনিষ্ঠতা ও সমন্বয়ের অভাব এবং দীর্ঘ সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির দুর্বলতা দলটির কার্যক্রমকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। বাড়তে পারে সাংগঠনিক চাপ। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব ও তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা নিজস্ব সুবিধার জন্য নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিতে পারে। এই পরিস্থিতি দেশের নীতি প্রণয়ন ও প্রশাসনিক স্থিতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

দুর্নীতির বিষয়টি জাতীয়তাবাদী দলের জন্য সবচেয়ে স্পর্শকাতর চ্যালেঞ্জ। ১৯৯০-এর দশকে ক্ষমতায় এসে দলটির শাসনামলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক দুর্নীতির সূচকে শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছেছিল-যা বিশ্বপরিসরে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। পরে দলের কিছু শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ও মামলা রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র করে। সাম্প্রতিক অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের সময় বিভিন্ন পর্যায়ে চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, প্রশাসনিক প্রভাব খাটানো এবং অর্থনৈতিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ ওঠে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এই প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ না করলে তা আরো ব্যাপকতর হতে পারে।

চতুর্থত, তথাকথিত প্রশাসনিক-প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়ে যে রাজনৈতিক ধারণা প্রচলিত রয়েছে, তা বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে এমন কোনো অদৃশ্য শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা থেকে থাকে, তবে তাদের প্রত্যাশা পূরণের চাপ সরকারের ওপর পড়বে। এই চাপ অনুভূত হতে পারে প্রশাসনিক পদায়ন, নীতিগত সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক চুক্তি কিংবা আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে। সরকার তখন জনস্বার্থ ও গোষ্ঠীস্বার্থের দ্বন্দ্বে পড়বে। দুই-তৃতীয়াংশের শক্তি তখন আশীর্বাদের পরিবর্তে বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে, কারণ সেই শক্তি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করলে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক বৈধতা ক্ষুণ্ন হবে।

পঞ্চমত, যদি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে বিচার কাঠামোতে পরিবর্তন, বিচারক নিয়োগ, সাংবিধানিক ব্যাখ্যা বা গুরুত্বপূর্ণ মামলার পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ ওঠে, তবে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়বে। একই সাথে অর্থবল ও পেশিশক্তিনির্ভর রাজনীতি যদি দলীয় কাঠামোর ভেতরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তবে সংসদীয় রাজনীতির মান নেমে যাবে এবং তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক আস্থা কমে যাবে।

ষষ্ঠত, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বিশেষ করে ভারতের সাথে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা— এসব ক্ষেত্রে দ্রুত চুক্তি অনুমোদনের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অপব্যবহার করে সিদ্ধান্ত পর্যাপ্ত সংসদীয় ও জনপর্যালোচনা ছাড়া গৃহীত হয়, তবে সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব মোকাবিলায় স্বচ্ছ ও বহুমাত্রিক কূটনীতি অপরিহার্য। সাম্প্রতিক সময়েও ভারতীয় প্রভাব ও আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। দেশের স্বার্থের বিপরীতে, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি ব্যবহার করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ফ্যাসিজম কায়েমের চেষ্টা হতে পারে। এই চাপ দেশের সার্বভৌমত্ব এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য হুমকি তৈরি করছে।

ইতোমধ্যে দেশের বর্তমান বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবিত বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বিশেষ করে দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ বা উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব- নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এখানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নিম্নকক্ষের প্রভাবকে উচ্চকক্ষেও প্রাধান্য দেয়া হলে দ্বিকক্ষ ব্যবস্থা কার্যত ভারসাম্যের পরিবর্তে একক আধিপত্যের কাঠামোয় পরিণত হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রস্তাবগুলোর মধ্যে কয়েকটিতে বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠবে- দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা কি দলটিকে জোরপূর্বক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দেয়? সাংবিধানিকভাবে হয়তো দেয়; কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তার ফল ভিন্ন হতে পারে। বিরোধী মতামত উপেক্ষা করে সংস্কার বাস্তবায়ন করা হলে তা প্রক্রিয়াগত বৈধতার সঙ্কট তৈরি করবে।

বাংলাদেশ আজ উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কট, ঋণের চাপ এবং কর্মসংস্থানের ঘাটতির মতো অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সব ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা। ব্যাংক, অর্থব্যবস্থা, পুঁজিবাজারের অবস্থা খুবই খারাপ। এই পরিস্থিতিতে কঠোর অর্থনৈতিক সংস্কার অপরিহার্য। দুই-তৃতীয়াংশের শক্তি দিয়ে বাজেট ও আইন পাস করা সহজ; কিন্তু অর্থনৈতিক আস্থা পুনর্গঠনে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নৈতিক নেতৃত্ব। পাশাপাশি রয়েছে আইনশৃঙ্খলার মারাত্মক অবনতি, রয়েছে সর্বক্ষেত্রে দলীয়করণ। আরো রয়েছে আধিপত্যবাদের চাপ এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জেরে ভুল করার অবকাশ নেই।

অতএব, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিএনপির জন্য বিরল সুযোগ, আবার কঠিন পরীক্ষাও। সামনে পথ সহজ নয়। এটি শেষ পর্যন্ত আশীর্বাদ নাকি বিপদের কারণ হবে, তা নির্ধারিত হবে দলীয় নেতৃত্বের দায়িত্বশীলতা ও দূরদর্শিতার ওপর।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]