সংসদ পরিচালনায় ছায়া সরকারের ভূমিকা

ছায়া সরকার কোনো ষড়যন্ত্রমূলক কাঠামো নয়; বরং সংসদীয় গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অঙ্গ। বিরোধী দলের উদ্দেশ্য যদি সরকার পতন না হয়ে জনস্বার্থে নীতিগত সংশোধন ও উন্নয়ন হয়, তবে সরকারের মধ্যেও একটি সহযোগিতামূলক মনোভাব তৈরি করতে হবে। তথ্য আদান-প্রদান, সংসদীয় কমিটিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নীতি আলোচনায় উন্মুক্ততা— এসব বাস্তব রূপদানের ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে। বিরোধী দলেরও উচিত প্রভাবশালী গবেষণাভিত্তিক নীতি বিশ্লেষণ টিম তৈরি করা, তথ্যের যাচাই ও প্রভাব মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, জনসম্পৃক্ত শুনানি এবং সংসদীয় বিতর্কে শালীন ও যুক্তিনির্ভর উপস্থাপন করা

গণতন্ত্রে সমস্যার সমাধানের প্ল্যাটফর্ম হলো জাতীয় সংসদ। কেবল আইন প্রণয়নের স্থান নয়; সংসদ রাজনৈতিক জবাবদিহিতা, নীতিগত বিতর্ক এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র। এখানে সরকারি দল ও বিরোধী দল পরস্পরের তর্ক-বিতর্ক, প্রশ্নোত্তর এবং নীতি-আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থে উত্তম সমাধান খুঁজে বের করে।

এই জায়গায় বর্তমান বিরোধী দল প্রস্তাবিত ‘ছায়া সরকার’ বা শ্যাডো ক্যাবিনেট ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্যসহ উন্নত সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে বিরোধী দল আনুষ্ঠানিকভাবে একটি ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো- সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের বিকল্প বিশ্লেষণ দেয়া। জন-নীতির শক্তি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজন হলে বিকল্প নীতি প্রস্তাব উপস্থাপন করা। এটি কেবল বিরোধিতার রাজনীতি নয়; বরং ‘প্রস্তুত বিকল্প সরকার’ হিসেবে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার কাঠামো। ছায়া সরকার কার্যকর হলে কয়েকটি মৌলিক সুবিধা সৃষ্টি হয়— সরকারের নীতিনির্ধারণে জবাবদিহিতা বাড়ে, সংসদীয় বিতর্ক গঠনমূলক ও তথ্যনির্ভর হয়, বিরোধী দল কেবল প্রতিবাদী শক্তি না হয়ে নীতিগত অংশীদারে পরিণত হয়। ভবিষ্যৎ ক্ষমতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়ে।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায়, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার সঙ্কট, সেখানে কার্যকর ছায়া সরকার রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সঙ্ঘাতমুখী ধারা থেকে নীতিনির্ভর প্রতিযোগিতায় রূপান্তর করতে পারে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্ক প্রায়শই ‘সাপে-নেউলে’ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। নীতিগত বিতর্কের পরিবর্তে অবস্থানগত বিরোধিতা ছিল রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। সরকার কোনো প্রস্তাবে ‘হ্যাঁ’ বললে বিরোধী দলের কৌশলগত অবস্থান হতো ‘না’; আবার বিরোধীদল কোনো প্রস্তাব করলে সরকার তা প্রত্যাখ্যান করত। এর পেছনে নীতিগত বিশ্লেষণ, জনকল্যাণ বা রাষ্ট্রীয় দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রায় অনুপস্থিত ছিল। যেখানে ভাবা হতো- প্রতিপক্ষের সাফল্য মানেই নিজের পরাজয়। ফলে বিরোধী দলের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াত সরকারকে অস্থির রাখা, আর সরকারের মনোভাব হতো বিরোধী দলকে রাজনৈতিক পরিসর বা ‘স্পেস’ না দেয়া। এই সংস্কৃতিতে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা রূপ নিত ব্যক্তিগত আক্রমণ, নিন্দা, কুৎসায়। নীতিনির্ধারণের এই কেন্দ্র, অনেক সময় পরিণত হতো সঙ্ঘাতের প্রতীকী মঞ্চে।

এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে বেরিয়ে আসার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে ২০২৬-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায়। তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার এবং শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধীদলীয় অবস্থান- এই সমীকরণ ঘিরে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। উভয় নেতাই ব্যক্তিজীবনে সংযম, ভদ্রতা ও নৈতিক অবস্থানের উদাহরণ স্থাপন করেছেন। তারেক রহমান ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি। তিনি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সন্তান। অন্যদিকে ডা. শফিকুর রহমান তার বিনয়, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং ব্যক্তিগত সাদামাটা ভাবের জন্য সমর্থকদের কাছে প্রশংসিত।

এক দিকে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের দীর্ঘদিনের রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা; অন্য দিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান সংসদে উচ্চশিক্ষিত আইনপ্রণেতাদের উপস্থিতি। পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির ছয় তরুণ সংসদ সদস্যের বলিষ্ঠ ও সমসাময়িক দৃষ্টিভঙ্গি সংসদকে আরো প্রাণবন্ত ও অংশগ্রহণমূলক করে তুলতে পারে।

তবে এখানে একটি মৌলিক বাস্তবতা অনস্বীকার্য : ব্যক্তিগত গুণাবলি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, টেকসই পরিবর্তন কেবল ব্যক্তিনির্ভর হয় না। প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর শক্তিশালীকরণ এবং রাজনৈতিক প্রণোদনার পুনর্গঠন। নেতাদের সদিচ্ছা যদি প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার মাধ্যমে কাঠামোগত রূপ না পায়, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী ফল আনে না। ছায়া সরকার কি কেবল রাজনৈতিক প্রতীক হয়ে থাকবে, নাকি এটি তথ্যভিত্তিক বিকল্প নীতি প্রস্তাবের মাধ্যমে সংসদীয় সংস্কৃতিকে পরিণত করবে? এর জবাব নির্ভর করবে মূলত দু’টি বিষয়ের উপর-

১. অবকাঠামোগত ভিত্তি ও তার আইনি প্রক্রিয়া। এর ভিত্তি পর্যালোচনা করে সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধিতে সংশোধন এনে ‘স্বীকৃত ছায়া মন্ত্রিসভা’র ধারণা যুক্ত করতে পারলে, বিরোধীদলীয় নেতা কর্তৃক ঘোষিত ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্যদের আনুষ্ঠানিকভাবে স্পিকারের কাছে নিবন্ধন করা যাবে। তখন সংসদীয় প্রশ্নোত্তর পর্বে সংশ্লিষ্ট ছায়া মন্ত্রীকে অগ্রাধিকারমূলক প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি হবে। সেই সাথে আরো দরকার সংসদীয় স্থায়ী কমিটির শক্তি বৃদ্ধি, কমিটির চেয়ারম্যান পদে দলীয় ভারসাম্য নিশ্চিত করা, কমিটি রিপোর্ট বাধ্যতামূলকভাবে সংসদে আলোচনার বিধান, বিশেষজ্ঞ ও নীতি বিশ্লেষকদের অবজারভেশন অন্তর্ভুক্তির সুযোগ।

২. বিরোধী রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন। বাংলাদেশে ছায়া সংসদ বা ছায়া সরকারের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হলো— বিরোধী দলের নেতৃত্বের পরিপক্বতা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং রাষ্ট্রনায়কসুলভ আচরণ।

প্রথমত, বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা— এই ঐতিহাসিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একটি কার্যকর ছায়া সংসদ মানে হলো নীতির সমালোচনা, ব্যক্তির নয়; তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ, আবেগনির্ভর প্রতিক্রিয়া নয়। বিরোধী দলকে প্রমাণ করতে হবে— তারা কেবল ক্ষমতার বিকল্প নয়, নীতির ও বিকল্প।

দ্বিতীয়ত, সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণের বিপরীতে সমান্তরাল নীতি-পর্যালোচনা গড়ে তুলতে হবে। অর্থাৎ বাজেট উপস্থাপন হলে ছায়া অর্থমন্ত্রী বিকল্প বাজেট কাঠামো তুলে ধরবেন; স্বরাষ্ট্রনীতি ঘোষিত হলে ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রদান করবেন; পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হলে তার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে ছায়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিকল্প কৌশল উপস্থাপন করবেন। এভাবে প্রতিটি নীতির শক্তি ও দুর্বলতা জনগণের সামনে স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করা গেলে, জনগণ তুলনামূলক মূল্যায়ন করতে পারবে। এতে দু’টি ফলাফল ঘটতে পারে— ছায়া সংসদের কার্যকারিতা জনগণ সরাসরি প্রত্যক্ষ করবে; সরকারও অনেক ক্ষেত্রে আরো পরিমিত ও তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে। যার ফলে এটি গণতন্ত্রে গঠনমূলক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার পথ পাওয়া যাবে। তৃতীয়ত, বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। যদি প্রতিটি দল আলাদা আলাদা অবস্থান থেকে প্রতিক্রিয়া জানায়, তবে তা বিভক্ত ও দুর্বল বার্তা তৈরি করবে; বরং একটি সমন্বিত ছায়া সংসদের অধীনে দায়িত্ব বণ্টন করে কাজ করলে বিরোধী রাজনীতি অধিক শক্তিশালী ও কার্যকর হতে পারে। এতে নীতিগত ঐকমত্য ও বিশেষায়িত দায়িত্বশীলতা গড়ে উঠবে।

চতুর্থত, সরকারের মনোভাবও এখানে নির্ণায়ক। সরকারকে উপলব্ধি করতে হবে যে, ছায়া সরকার কোনো ষড়যন্ত্রমূলক কাঠামো নয়; বরং সংসদীয় গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অঙ্গ। বিরোধী দলের উদ্দেশ্য যদি সরকার পতন না হয়ে জনস্বার্থে নীতিগত সংশোধন ও উন্নয়ন হয়, তবে সরকারের মধ্যেও একটি সহযোগিতামূলক মনোভাব তৈরি করতে হবে। তথ্য আদান-প্রদান, সংসদীয় কমিটিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নীতি আলোচনায় উন্মুক্ততা— এসব বাস্তব রূপদানের ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে। বিরোধীদলেরও উচিত প্রভাবশালী গবেষণাভিত্তিক নীতি বিশ্লেষণ টিম তৈরি করা, তথ্যের যাচাই ও প্রভাব মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, জনসম্পৃক্ত শুনানি এবং সংসদীয় বিতর্কে শালীন ও যুক্তিনির্ভর উপস্থাপন করা।

সর্বোপরি, ছায়া সরকারের সফলতা নির্ভর করবে দুই পক্ষেরই রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ওপর— বিরোধী দলের গঠনমূলক সমালোচনা এবং সরকারের উদার গ্রহণক্ষমতা। এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটলে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হতে পারে।

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক ও একাডেমিক ডিরেক্টর, সেন্টার ফর গভারনেন্স অ্যান্ড সিভিলাইজেশনাল স্টাডিজ-সিজিসিএস

[email protected]