ওয়ালিউল হক
১৯৭০ সালে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে ভূমিধস বিজয় লাভ করে। তারা জাতীয় পরিষদের ১৬২টি আসনের মধ্যে দু’টি বাদে ১৬০টি আসনে জয়লাভ করে। যে দু’টি আসনে বিজয়ী হতে পারেনি সে দু’টি আসনে বিজয়ী হন পিডিপি প্রধান নুরুল আমিন ও চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়।
সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের কথা সবার জানা থাকলেও দলটি কিভাবে এই ভূমিধস বিজয় নিশ্চিত করে তা বেশির ভাগ মানুষেরই জানা নেই। ওই নির্বাচনে কোনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ছিল না। আওয়ামী লীগ এককভাবে নির্বাচনের মাঠ দখল করে নেয়। অন্য কোনো দলকে মাঠে নামতেই দেয়নি। তারা পেশিশক্তি ব্যবহার করে প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য সব দলের মিটিং-মিছিল ভণ্ডুল করে দেয়। নির্বাচনের মাঠে একছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে দলটি জনমনে এমন ধারণার সৃষ্টি করে যে, আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দলেরই নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মতো শক্তি ও সামর্থ্য নেই।
প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মিটিং-মিছিল পণ্ড করা সম্পর্কে লেখক মহিউদ্দিন আহমদ তার ‘জাসদের উত্থান পতন : অস্থির সময়ের রাজনীতি’ বইয়ে লিখেছেন, ‘পরের রোববার ১৮ জানুয়ারি ছিল জামায়াতে ইসলামীর জনসভা। আগেই ছাত্রলীগের সিরাজ গ্রুপের একটা সিদ্ধান্ত ছিল, জামায়াতকে নির্বিঘ্নে সভা করতে দেয়া হবে না। সভা শুরু হলে বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে গগনবিদারী স্লোগান উঠল— ‘জয় বাংলা’। জামায়াতের কর্মীরা সম্ভবত আগে থেকে আঁচ করেছিলেন, সভায় গোলমাল হতে পারে। তারা মঞ্চের নিচে অনেক লাঠিসোটা জমা করে রেখেছিলেন। প্রতিপক্ষও প্রস্তুত হয়ে এসেছিল। এলোপাতাড়ি স্লোগান, চিৎকার ও হই-হুল্লোড়ে সভা পণ্ড হয়ে গেল। পরদিন ইত্তেফাক-এ জনসভার খবর ছাপা হয়েছিল এভাবে : ‘রাজনৈতিক আচরণ-সংক্রান্ত ৬০ নং সামরিক বিধির কতিপয় সুস্পষ্ট বিধান লঙ্ঘন করিয়া প্রকাশ্য জনসভায় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অশালীন ভাষায় যথেচ্ছ আক্রমণ চালাইতে থাকিলে যখন সভায় আপত্তি উত্থাপিত হয়, তখন নিরীহ শ্রোতৃমণ্ডলীর উপর লাঠিসোটা লইয়া জামায়াতে ইসলামীর তথাকথিত স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী ও ক্রুদ্ধ জনতার মধ্যে দুই ঘণ্টাব্যাপী খণ্ডযুদ্ধে চারশজন আহত হইয়া ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে নীত হন।’
পরের রোববার ২৫ জানুয়ারি ছিল পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (পিডিপি) জনসভা। ছাত্রলীগের সিরাজ গ্রুপ আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নুরুল আমিনকে সভা করতে দেয়া হবে না। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের জন্য তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনকে দায়ী করা হতো। এ জন্য তার ওপর মানুষের প্রচণ্ড ক্ষোভ ও ঘৃণা ছিল। নুরুল আমিনের সভাপতিত্বে সভার কাজ শুরু হতে না-হতেই ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে পল্টন ময়দান প্রকম্পিত হলো। কেউ কেউ শেখ মুজিবের ছবিসহ পোস্টার নিয়ে মঞ্চে উঠে পড়লেন। পুরো পরিবেশটাই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ল। একপর্যায়ে পিডিপির নেতারা মঞ্চ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হলেন।
রাজনীতির রহস্যপুরুষ হিসেবে পরিচিত সিরাজুল আলম খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াসের অন্যতম শীর্ষনেতা কাজী আরেফ আহমেদ তার বই ‘বাঙালির জাতীয় রাষ্ট্র’-এ জামায়াতের ওই জনসভা পণ্ড করা প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘‘এ ছাড়া দুই অংশের ঐক্যের উপর জোর সৃষ্টিকারী যেকোনো অনুভূতিশীল পদক্ষেপের উপর আওয়ামী লীগ আঘাত হানতে শুরু করল। জামায়াতে ইসলামীর ১৮ জানুয়ারির জনসভা পণ্ড করা হয়েছিল। কেননা, ওই সভাতে দুই অংশের বন্ধনের প্রশ্নে ইসলামী ঐক্যের উপর জোর দেয়া হয়েছিল। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার বাকি সময়টুকুতেও আওয়ামী লীগ তার এই কৌশলের পুনরাবৃত্তি ঘটাল। দলটি একইভাবে পয়লা ফেব্রুয়ারিতে পিডিপির ঢাকার জনসভা, ২৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের জনসভা ও সৈয়দপুরে ৭ মার্চের জনসভা পণ্ড করে দিল। কুমিল্লায় ১০ মার্চের কনভেনশন মুসলিম লীগের সভা, বরিশালের ১৫ মার্চ এবং ঢাকার ১২ মার্চের জনসভা নষ্ট করে দেয়া হলো। বিভিন্ন রাজনৈতিক গ্রুপ কর্তৃক আয়োজিত আরো কয়েকটি জনসভা পণ্ড করে দেয়া হলো। এ কাজগুলো ‘নিউক্লিয়াস’ ও ‘বিএলএফ’-এর সদস্যরাই ঘটাল।
শেখ মুজিবের প্রতিপক্ষ, যেমন ফজলুল কাদের চৌধুরী, আবদুস সবুর খান, নুরুল আমিন, প্রফেসর গোলাম আযম এবং মৌলভী ফরিদ আহমেদ প্রমুখের কেউই জনতার মঞ্চে থাকা শেখ মুজিবকে চ্যালেঞ্জ করার রাজনৈতিক শক্তি ফিরে পেলেন না।’’ জামায়াতে ইসলামীর (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) আমির অধ্যাপক গোলাম আযম তার জীবনীমূলক গ্রন্থ ‘জীবনে যা দেখলাম’-এর তৃতীয় খণ্ডে ওই জনসভার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। তার লেখা থেকে জানা যায়, আওয়ামী লীগের গুণ্ডারা জনসভা পণ্ড করার জন্য প্রথমে ইটপাটকেল ছোড়ে এবং পরে পুলিশের সহায়তায় ময়দানের ভেতর প্রবেশ করে নেতাকর্মীদের মারধর করে। তাদের হামলায় জামায়াতের দু’জন স্বেচ্ছাসেবক নিহত এবং বিপুলসংখ্যক আহত হয়।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, মহিউদ্দীন আহমদ ও কাজী আরেফ আহমেদের বর্ণনায় নিহতের কোনো উল্লেখ নেই। কারণ তারা নিজেরাও হামলাকারীদের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। এ ছাড়া জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম ছাড়া অন্য কোনো পত্রিকায় ঘটনার সত্যিকার বিবরণ ছাপানো হয়নি। এ বিষয়ে অধ্যাপক গোলাম আযম লেখেন, ‘১৯ জানুয়ারি ঢাকার সব দৈনিক পত্রিকা দেখলাম। একমাত্র দৈনিক সংগ্রামে গতকালের কলঙ্কজনক ঘটনার সঠিক বিবরণ পড়ে কর্মীদের ও সমর্থকদের মনে কিছুটা সান্ত্বনা বোধ হলো। সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ বিবরণ প্রধান কোনো পত্রিকায়ই দেখা গেল না। আওয়ামীদের সমর্থক পত্রিকায় ‘‘বিক্ষুব্ধ জনতার’ আক্রমণে জামায়াতের জনসভা পণ্ড হওয়ার খবর রসিয়ে রসিয়ে বয়ান করা হলো। জামায়াতের বিরুদ্ধে ‘জনতার’ বিজয়ে উল্লাস প্রকাশ করতেও তাদের লজ্জাবোধ হয়নি। এতে যারা রিপোর্টার তাদের রাজনৈতিক পরিচয় স্পষ্ট হয়ে গেল। তারা যে আসলে সাংবাদিক নয় তা-ই প্রমাণিত হলো। কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে পত্রিকায় বিবৃতি দেয়া হয়েছিল কি না মনে পড়ছে না। একমাত্র নেজামে ইসলাম পার্টির মৌলভী ফরিদ আহমদ বিবৃতি দিয়েছিলেন; কিন্তু দৈনিক সংগ্রাম ছাড়া আর কোনো পত্রিকায় তা প্রকাশিত হয়নি। সব রাজনৈতিক দলই আওয়ামী লীগ সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখে। তাই গতকালের ঘটনার পর গুণ্ডামির ভয়ে চুপ থাকতে বাধ্য হওয়ায় কাউকে দোষ দেয়া যায় না।’’
তিনি আরো লেখেন, ‘৬ দফা ও ১১ দফার পক্ষে আন্দোলনরত বামপন্থী কোনো দলই নির্বাচনে সামান্য অনুগ্রহও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পায়নি। আওয়ামী লীগের ক্যাডারের বাইরে নৌকা প্রতীক নিয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ না পেয়ে তারা পৃথকভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার চেষ্টা করেছে। ন্যাপের ভাসানী গ্রুপ ও মুজাফফর গ্রুপ এবং মুসলিম লীগের তিন গ্রুপ প্রার্থী দাঁড় করালেও আওয়ামী লীগের প্রচারাভিযানের দাপটে শেষ পর্যন্ত ঘোষণা দিয়ে তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। একমাত্র জামায়াতে ইসলামী ছাড়া আর কোনো দল ময়দানে দাঁড়িয়ে থাকেনি।’
১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিন ভোটকেন্দ্রের যে হাল ছিল তা নির্বাচন অভিযানের হাল জানার পর সহজেই অনুমান করে নেয়া যায়। ভোটকেন্দ্রে জামায়াতই একমাত্র প্রতিপক্ষ, তা যতই ক্ষুদ্র হোক। জামায়াতের পোলিং এজেন্টদেরকে সর্বত্রই সরিয়ে দেয়ার চেষ্টার কোনো ত্রুটি করা হয়নি। যেখানে জামায়াতের এজেন্ট কোনো রকমে টিকে ছিল সেখানেও তাদের যথেচ্ছাচারের প্রতিবাদ করতে পারেনি। ইয়াহইয়া খানের সামরিক প্রশাসন রাজনৈতিক ময়দানের মতো নির্বাচনী ময়দানেও নিষ্ক্রিয়ই ছিল। যারা জামায়াতকে ভোট দিয়েছেন তারা অতি নীরবে ব্যালট পেপার দাঁড়িপাল্লার বাক্সে রেখে এসেছেন।
এ বিষয়ে আরো একটি ইন্টারেস্টিং তথ্য পাওয়া যায়, মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর লেখা How Pakistan Got Divided বইয়ে। তার ভাষ্যমতে, জনসভায় হামলার ঘটনা ঘটতে দেয়ার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পরোক্ষ ভূমিকা ছিল। ব্রিগেডিয়ার পর্যায়ের ওই বাঙালি কর্মকর্তাটি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের ডেপুটি মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর। মজিদুল হক নামে পরিচিত ওই ভদ্রলোক অবসর গ্রহণের পর বিএনপিতে যোগ দেন এবং প্রেসিডেন্ট জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক



