জুলাই মুছে ফেলা যাবে না

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের এক জীবন্ত ইতিহাস। স্বাধীনতার পর ভারত বাংলাদেশের উপর প্রভাব বিস্তারকারী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। শেখ হাসিনার সময় বাংলাদেশ কার্যত ভারতের একটি ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রে পরিণত হয়। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের মতো প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো শেখ হাসিনার শাসনামলে সর্বাত্মক চেষ্টা চালালেও শাসন পরিবর্তনে দৃশ্যমান অগ্রগতি আনতে পারেনি। তাদের নেতাকর্মীরা নির্যাতনের শিকার হন এবং গণতান্ত্রিক উপায়ে পরিবর্তনের আশা প্রায় ত্যাগ করতে বসেন।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের জুলাই মাসের শুরুতে শিক্ষার্থীরা চাকরিতে কোটাপ্রথা বাতিলের দাবিতে রাজধানীর রাজপথে নেমে আসে। রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলন গণ-আন্দোলনে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের পতন ঘটে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে গিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। পরে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন হয়। যার অ্যাজেন্ডা ছিল সংস্কার, বিচার এবং নির্বাচন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) মাধ্যমে অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয় এবং উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে পরামর্শক্রমে একটি সনদ প্রণয়ন করা হয়, যা ‘জুলাই সনদ’ নামে পরিচিত এবং দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এতে স্বাক্ষর করে। অবশেষে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন হয়।

বিএনপি সরকার গঠন করে। জামায়াত সংসদে বিরোধী দলে পরিণত হয়। নতুন সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে। তবে প্রজ্ঞা ও পরিপক্বতার সাথে এগিয়ে যেতে পারলে সেগুলো অতিক্রম করা সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে ব্যক্তিগত আচরণে কিছু উদাহরণ স্থাপন করেছেন। যেমন— অপ্রয়োজনীয় ট্রাফিক প্রটোকল এড়িয়ে চলা, ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার এবং নিজ খরচে জ্বালানি বহন করা। এগুলো প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত। যুক্তরাজ্যের সংসদীয় গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতা তার দৃষ্টিভঙ্গিকে সমৃদ্ধ করেছে।

তবে তার মন্ত্রিসভার কিছু জ্যেষ্ঠ সদস্য জুলাই সনদ ও জুলাই বিপ্লবের চেতনা নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়ে অপ্রয়োজনীয় আলোচনা সৃষ্টি করছেন। জুলাই বিপ্লবের ভূমিকা এত দ্রুত ভুলে যাওয়া কি উচিত? জনগণের মনে এই প্রশ্ন উঠেছে। বাস্তবতা হলো— জুলাই বিপ্লব না হলে বিএনপি সরকার হতো না। জুলাইয়ের চেতনাকে উপেক্ষা করা প্রজ্ঞার পরিচায়ক নয়। দেশের মানুষ জুলাই সনদের দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চায়। তা না হলে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে, যা সাধারণ মানুষ মোটেও প্রত্যাশা করে না। বাংলাদেশের মানুষ সহজ-সরল হলেও আবেগপ্রবণ; প্রয়োজনে তারা যেকোনো সময় কণ্ঠ উঁচু করতে পারে। তাই সরকারের উচিত কথার চেয়ে কাজে বিশ্বাস করা।

সরকার যদি জনগণের মানসিকতার পরিবর্তন অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়, তবে তারা ভুল করবে এবং জুলাইয়ের চেতনার সমর্থকদের প্রতিরোধের মুখে পড়তে পারে। জাতীয় ঐক্য ছাড়া টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়— নতুন প্রধানমন্ত্রীও বারবার এ কথা বলেছেন। গত ৫০ বছরে একটি রাজনৈতিক দল নিজেদের স্বার্থে বিভাজনের রাজনীতি করেছে, যা জাতির স্বার্থের পরিপন্থী।

বর্তমান সরকার যদি জুলাই বিপ্লবকে যথাযথ গুরুত্ব না দেয়, তবে সমাজে বিভাজন সৃষ্টি হতে পারে। যদি সরকার জুলাইয়ের বীরদের যথাযথ সম্মান না দেয় এবং শহীদ ও ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়— তবে সমাজে বিভক্তি তৈরি হতে পারে। এমনকি সমাজে ‘জুলাইপন্থী’ ও ‘জুলাইবিরোধী’-এই দুই শিবিরের উদ্ভবও অসম্ভব নয়। ফলে দেশ আবারো অস্থিরতা ও বিভ্রান্তির দিকে যেতে পারে। কোনো রাজনৈতিক দলেরই সাম্প্রতিক পরিবর্তনকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ইতিহাস সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু তা মুছে ফেলা যায় না।

লেখক : সম্পাদক, মিলিটারি হিস্ট্রি জার্নাল