চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ রেল করিডোর

মিয়ানমারের জন্য এটি ট্রানজিট রাজস্ব, স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগও তৈরি করবে। সুতরাং মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তির মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এই রেল করিডোরের জন্য ভারতের সাথে সম্পর্ককে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যে রাখা জরুরি। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য নিয়মাবলী এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার চাপও দেখা দিতে পারে। তাই বাংলাদেশকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করতে হবে, যাতে ভারত ও চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ঠিক থাকে

ড. মো: মিজানুর রহমান
ড. মো: মিজানুর রহমান |নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

বাংলাদেশের চারপাশেই ভারত। এর ফলে অর্থনীতি, শিল্পায়ন, আমদানি-রফতানি এবং ট্রানজিট নেটওয়ার্কের বড় অংশই ভারতীয় ভূখণ্ডের ওপর নির্ভরশীল। একই সাথে দেশের কৌশলগত স্বাধীনতা এবং আঞ্চলিক নেতৃত্ব গঠনের সম্ভাবনাও সীমিত হয়েছে। বিশেষ করে নেপাল ও ভুটান থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে পৌঁছতে বাংলাদেশকে ভারতের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যা বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বিলম্ব ও অতিরিক্ত খরচ সৃষ্টি করে।

এই পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক সীমান্ত সংযোগ ও আন্তর্জাতিক ট্রানজিট নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে। সেই প্রেক্ষাপটে প্রস্তাবিত চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ (সিএমবি) রেল করিডোর যুগান্তকারী উদ্যোগ হতে পারে। এটি এখনো আলোচনার পর্যায়ে। তবে বাস্তবায়ন হলে এটি কেবল একটি রেলপথ নয়; বরং আঞ্চলিক বাণিজ্য, শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন এবং কৌশলগত অবস্থান পুনর্গঠনের শক্তিশালী হাতিয়ার হবে।

প্রস্তাবিত এই রেল করিডোরের উদ্দেশ্যে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য ও সংযোগ বাড়ানো। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য, চীনের ইউনান প্রদেশকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের বঙ্গোপসাগরীয় বন্দরগুলোর সাথে যুক্ত করা। এটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (BRI) অংশ, যা আঞ্চলিক সীমান্ত সংযোগ ও আধুনিক পরিবহন-ব্যবস্থার চাহিদা পূরণ করবে। বর্তমানে সম্ভাব্য রুট নির্ধারণ, প্রযুক্তিগত সমীক্ষা এবং অর্থায়ন চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে চীনের ইউনান অঞ্চল চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বন্দরের সাথে সরাসরি রেল সংযোগ পাবে, যা বাংলাদেশের শিল্পায়ন, পণ্য পরিবহন এবং বিনিয়োগে নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের মোট ট্রানজিট বাণিজ্যের প্রায় ৫০ শতাংশই ভারতের ওপর নির্ভরশীল। সিএমবি রেল করিডোর চালু হলে এই নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নীতিতে আরো স্বাধীনতা পাবে। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বার্ষিক গড়ে ১৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৪ সালে ৪৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। রেল করিডোর চালু হলে এই বাণিজ্য ৬০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। একই সাথে বাংলাদেশের রফতানি বাজার ৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ১২-১৩ বিলিয়ন ডলারে সম্প্রসারণ হতে পারে। আমদানি ব্যয় কমতে পারে সাত থেকে আট বিলিয়ন ডলার।

অন্য দিকে, প্রকল্প চালু হলে দেশের জিডিপিতে অতিরিক্ত দেড় থেকে দুই শতাংশ প্রবৃদ্ধি যোগ হতে পারে। শিল্পায়ন, উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান এবং বন্দর ব্যবহারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।

রেল করিডোরের মাধ্যমে বাংলাদেশের ট্রানজিট খরচ প্রায় ২০ শতাংশ কমতে পারে এবং পরিবহন সময় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কমে যেতে পারে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২০২৭ সালের মধ্যে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছার সম্ভাবনা রয়েছে, যা দেশের জিডিপি ও শিল্পায়নে দেড় থেকে দুই শতাংশ বৃদ্ধি আনতে পারে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, লজিস্টিক হাব এবং নতুন শিল্পাঞ্চলের উন্নয়ন কর্মসংস্থান বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও ঢাকা অঞ্চলে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং লজিস্টিক হাব গড়ে উঠবে, যার ফলে পঞ্চান্ন হাজার থেকে ষাট হাজার নতুন কর্মসংস্থান হতে পারে। উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় কমে দেশের উৎপাদনশীলতা ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। পাশাপাশি মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকায় ব্যবসায়িক সুযোগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও আঞ্চলিক বাণিজ্য আরো গতি পাবে। তবে মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রোহিঙ্গা সঙ্কট প্রকল্পের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যা বাংলাদেশকে কৌশলগতভাবে সমাধান করতে হবে।

এ ছাড়া, এই রেল করিডোর বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বাধীনতা শক্তিশালী করবে। ভারতের ওপর নির্ভরতা কমে বাংলাদেশ আঞ্চলিক রাজনীতি ও বাণিজ্য নীতি স্বাধীনভাবে পরিচালনা করতে পারবে। চীনের জন্য এটি মালাক্কা দুর্বলতা (Malacca Dilemma) এড়ানো এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সরাসরি বাণিজ্য পথ স্থাপনের কৌশলগত উদ্যোগ। বর্তমানে চীনের বাণিজ্য ও জ্বালানি আমদানির বড় অংশ মালাক্কার মাধ্যমে যায়, যা কখনো ভারত ও মার্কিন নীতির দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়। রেল করিডোর এই ঝুঁকি কমিয়ে চীনের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং বহুপক্ষীয় বাণিজ্য স্থিতিশীল করতে সহায়ক হবে।

এই রেল করিডোর কেবল অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়, আঞ্চলিক ট্রানজিট হাব হিসেবে দেশের অবস্থান শক্তিশালী করারও সুযোগ দেবে। মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সীমান্ত সঙ্ঘাত ও রোহিঙ্গা সঙ্কট কার্যকারিতায় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই বহুপক্ষীয় কূটনীতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং মিয়ানমারের সাথে স্থিতিশীল দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অপরিহার্য। এই রেল করিডোরের কার্যক্রম অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক প্রভাব বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকেও নতুন মাত্রা দিতে পারে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে এবং বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান চীন, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একটি কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তর করতে পারে।

চীন এই করিডোরকে মালাক্কা দুর্বলতা কমানোর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সরাসরি বাণিজ্য পথ স্থাপনের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, যা ভারতীয় মহাসাগর অঞ্চলে চীনের প্রভাব বাড়াতে সাহায্য করবে।

চীনের কৌশলগত স্বার্থ এবং বাংলাদেশের সুযোগগুলো পরিপূরক। চীনের বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্পায়ন এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে অবস্থান শক্তিশালী করবে। একই সাথে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও কৌশলগত ক্ষমতা বাড়বে। তবে ঋণ ও বিনিয়োগের যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না হলে অর্থনৈতিক নির্ভরতা বাড়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।

ভারতের জন্য রেল করিডোর একটি কৌশলগত উদ্বেগ। এটি বঙ্গোপসাগরের তীর এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে চীনের সরাসরি প্রভাব বাড়াতে পারে, যা ভারতের সমুদ্রপথ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ। ভারত কূটনৈতিক চাপ, সীমান্ত-নিরাপত্তা নীতি এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে চীনের উপস্থিতি সীমিত করার চেষ্টা করতে পারে। তবে ভারতের চাপ বাংলাদেশকে বহুপক্ষীয় নীতি গ্রহণ ও স্বাধীন নীতিগত অবস্থান বজায় রাখতে উৎসাহিত করতে পারে।

প্রস্তাবিত রেল করিডোরের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরাসরি থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতির সাথে বাণিজ্যিক ও ট্রানজিট সংযোগ করতে পারবে। আর নেপাল ও ভুটানের জন্যও এটি ভারতীয় ভূখণ্ড এড়িয়ে সমুদ্রবন্দরে পৌঁছার বিকল্প পথ তৈরি করবে।

একই সাথে বিআরআই-তে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য সার্ক, বিমস্টেক ও আরসিইপি-এর মতো আঞ্চলিক কাঠামোর সাথে সম্পর্ক সুদৃঢ় করবে।

সঠিক নীতি, স্থিতিশীল কূটনীতি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুফল নিশ্চিত করতে পারবে।

রেল করিডোর যেমন আঞ্চলিক সংহতি ও অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়াবে, তেমনি নতুন ঝুঁকি এবং নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জও তৈরি করে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা, মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কার্যক্রম রেল লিঙ্কের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে। রোহিঙ্গা সঙ্কট এবং আরাকান অঞ্চলের সশস্ত্র সঙ্ঘাতের প্রভাব পড়তে পারে। তবে মিয়ানমারের জন্য এটি ট্রানজিট রাজস্ব, স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগও তৈরি করবে। সুতরাং মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তির মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এই রেল করিডোরের জন্য ভারতের সাথে সম্পর্ককে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যে রাখা জরুরি। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য নিয়মাবলী এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার চাপও দেখা দিতে পারে। তাই বাংলাদেশকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করতে হবে, যাতে ভারত ও চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ঠিক থাকে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]