বহুল প্রত্যাশিত ঐতিহাসিক জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ গতকাল (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো। গত দেড় দশকে পর পর তিনটি প্রহসনের নির্বাচন দেশের জনগণকে যে গোলকধাঁধায় নিক্ষেপ করেছিল তা থেকে জাতি মুক্তি পেয়েছে। কোটি কোটি ভোটার এবারে মুক্তমনে ভোট দিতে পেরে আনন্দিত হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা প্রথমবারের মতো ভোট দিতে পেরেছে। এটা নাগরিকদের জন্য একটি বিরাট পাওনা। প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস জাতির কাছে তিনটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন : বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। তিনি তিনটি কাজ করে দেখিয়েছেন। নানা মহলের বিরোধিতা সত্ত্বেও ৭৫ শতাংশ ভোটার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে রায় দিয়েছে। এটা প্রফেসর ইউনূসের একটি বিশাল বিজয়। এ জন্য জাতি তাকে স্মরণ করবে। তবে বিজয়ী বিএনপি গণভোটের রায় ও জুলাই জাতীয় সনদ কতটুকু কিভাবে বাস্তবায়ন করবে তা দেখার বিষয়।
ব্যবস্থাপনা দক্ষতার জন্য ধন্যবাদ সিভিল ও মিলিটারি প্রশাসনকে। বারো কোটি পঁচাত্তর লাখ ভোটারের সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ চাট্টিখানি কথা নয়। বিশ্বের কয়েকটি বড় দেশ বাদ দিলে জনসংখ্যার বিচারে এ সংখ্যা অনেক বড়। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা ছিল বেশ প্রশংসনীয়। তারা মাঠপর্যায়ে পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেছে। এর ফলে তাদের ভাবমর্যাদা পুনরুদ্ধার হয়েছে বলে মনে করা যেতে পারে। নির্বাচন কমিশন সার্বিক ব্যবস্থাপনায় যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। তবে ভোটের ফল প্রকাশে তাদের দুর্বলতা অস্বীকার করা যায় না। ফল প্রকাশে ধীরগতি ও অসঙ্গতিপূর্ণ ভোটের সংখ্যা প্রকাশ তাদের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দু’শোর বেশি আসন পেয়ে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জিতেছে। অভিনন্দন বিএনপিকে। অন্য দিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন এগার দলীয় জোট আশির মতো আসন পেয়েছে যা একটি শক্তিশালী বিরোধী দল হওয়ার জন্য কম নয়। বিএনপি শিবিরে আনন্দের জোয়ার বইছে এবং বিরোধী শিবিরে এক ধরনের হতাশা লক্ষ করা যাচ্ছে। কারণ তারাও জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী ছিল। সংসদীয় গণতন্ত্রে নির্বাচন মানে হলো যারা ভোট বেশি পাবে তারা সরকার গঠন করবে। যারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না, তারা বিরোধী দলে বসবে। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের গুরুত্ব কম নয়। ব্রিটেনে তো বিরোধী দলকে ‘রাজার বিরোধী দল’ (অপজিশন অব দ্য কিং) বলা হয়। তবে আমাদের দেশের মতো ভঙ্গুর গণতন্ত্রে সরকার ও সরকারি দলের মানসিকতা হলো বিরোধী দলকে কোণঠাসা করে রাখা। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে জাতীয় ইস্যু নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণকালে বিরোধী দলের সাথে আলোচনা করা উচিত। কারণ, দেশ সবার। বাংলাদেশে এরূপ দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে। পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক দেশগুলো এমনকি প্রতিবেশী ভারতেও জাতীয় সঙ্কটকালে বিরোধী দলকে আস্থায় নেয়া হয়। আমরা আশা করব জুলাই অভ্যুত্থানের ফলে দেশে গণতন্ত্রের যে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে তাতে সরকার ও বিরোধী দল দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে একযোগে কাজ করবে।
এবারের নির্বাচনে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়। নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে দলটির ভোটাররা কোন দলকে ভোট দিয়েছে? এটি একটি বড় প্রশ্ন। জোটে থাকাকালে জামায়াতের ১০-১২ শতাংশ ভোট নিয়ে বিএনপি দারুণ ভালো করত। এবারে জামায়াতের পরিবর্তে আওয়ামী লীগের ২০-২৫ শতাংশ ভোট যদি বিএনপি পেয়ে থাকে তা হলে তাদের জয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক। রাজনৈতিক মহলে যে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল, বিএনপি-আওয়ামী লীগ আঁতাত হয়েছে এবং প্রতিবেশী দেশ তাই চাচ্ছে— সে কথার বাস্তবতা ভারতীয় মিডিয়ার বয়ানেও ইঙ্গিতবাহী। এ ছাড়া জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার ইমেজ তো আছেই। বিএনপির এক শ্রেণীর নেতাকর্মীর বিগত দেড় বছরের চাঁদাবাজি-দখলবাজি দলটির যে ক্ষতি করেছিল তা নিয়ে উৎকণ্ঠা থাকলেও আওয়ামী লীগের সমর্থনে তা উৎরে যেতে সহায়ক হয়েছে। বিপরীত দিকে, জামায়াত ও এনসিপি জুলাই অভ্যুত্থান ধারণ করে ইনসাফের যে বয়ান দিয়েছে তার প্রতি অনেক মানুষ আকৃষ্ট হয়েছে এবং তার ফলে তারাও অনেক ভোট পেয়েছে। কিন্তু বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সম্মিলিত ভোট সব নির্বাচনী এলাকায় কাজে লাগেনি।
আরেকটি বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। সামাজিক গণমাধ্যম থেকে দেখা যায়, প্রায় ৫০টি আসনে জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থীরা মাত্র পাঁচ শ’ থেকে পাঁচ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিএনপি প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়েছেন। তাদের ভাষায় এসব ক্ষেত্রে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হয়ে থাকতে পারে। এখন নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হচ্ছে এরূপ অপবাদ থেকে নিজেদের স্বচ্ছতা প্রমাণ করা। আর যারা অভিযোগকারী তাদের দায়িত্ব নিজেদের অভিযোগের সমর্থনে প্রমাণ হাজির করা। বিশেষ করে এনসিপির নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী ও মাওলানা মামনুল হকের আসনে বিশেষ নজর দেয়া।
এবারে জামায়াত নেতৃত্বাধীন এগারো দলীয় জোটের নির্বাচনী ফল নিয়ে কয়েকটি কথা বলা যেতে পারে। এ জোট এবারে যে জোয়ার সৃষ্টি করেছিল তা ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, নারীসমাজ ও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের মাঝে তারা বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করতে পেরেছে। এবারে জামায়াতের পক্ষে নারীরা যেভাবে রাজপথে নেমে এসেছিল তা দেখার মতো। জামায়াতের সাথে এনসিপি ও কয়েকটি ইসলামী দল থাকায় জনগণের একটি অংশের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছিল, এ জোট ক্ষমতার দৌড়ে কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। জামায়াতের আমিরের সাথে বিদেশী কূটনীতিকদের ঘন ঘন সাক্ষাৎ এবং সমাজের এলিট শ্রেণীর সাথে তাদের সংযোগ ছিল উল্লেখ করার মতো। জামায়াতের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত পলিসি সামিট ও নির্বাচনী মেনিফেস্টো উপস্থাপনায় বেশ আধুনিকতার ছাপ লক্ষ করা গিয়েছিল; যা অনেককে আকৃষ্ট করেছে। জামায়াত-শিবিরের বিশাল সংগঠিত জনশক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের বিজয়ের কারণে তাদের মধ্যে আশাবাদী হওয়ার যৌক্তিকতা ছিল। বিএনপি বলেছিল যে, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে পড়বে না। তাদের কথা সঠিক হলেও জামাত-শিবির ও এনসিপির বিশাল জনশক্তিকে এখনো উপেক্ষা করার কারণ নেই।
এনসিপি-জামায়াত জোট করে এনসিপি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। তাদের শীর্ষ নেতারা পাঁচ-ছয়টি আসনে জয়লাভ করেছেন। নতুন দলটির ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য এটা বেশ ভালো হয়েছে বলে আমার মনে হয়। অন্য দিকে জামায়াতে ইসলামী অতীতের সর্বোচ্চ ১৭-১৮টি আসনের রেকর্ড থেকে ৭০টির মতো আসন পেয়ে বেশ ভালো ফল করেছে বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। সংবাদ সংস্থা রয়টার্স তার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে আভাস দিয়েছিল যে, জামায়াত বেশ ভালো ফল করতে যাচ্ছে। তাদের পূর্বাভাস ঠিক হয়েছে। এবারের নির্বাচনে দলটির প্রাপ্ত ভোটের হার অতীতের দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। চরম নির্যাতন ও জীবনহানির পরেও যেখানে দলটি শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল, সেখানে ফিনিক্স পাখির মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। এখন দেশের প্রধান বিরোধী দল। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সদস্য নিয়ে সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা রাখার সুযোগ পেয়েছে। এটাকে ছোট করে দেখা যায় না। জামায়াত তো অতীতে সরকার গঠন করতে পারেনি বা প্রধান বিরোধী দলেও ছিল না। তৃতীয় স্থান থেকে উঠে এসে দ্বিতীয় স্থানে এসেছে। জনগণ তাদের রায়ের মাধ্যমে সংসদে যথার্থ দায়িত্ব পালনের যে সুযোগ করে দিয়েছে; তা তাদের কাজে লাগানো উচিত। রাজনীতি মানে টিকে থাকা এবং জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করা। বিএনপি বারবার সরকারে ছিল এবং আবার ১৭ বছর পরে সুযোগ পেলো। ১৯৭৫ সালের পর আওয়ামী লীগকেও ২১ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সুতরাং জামায়াতকেও গণতান্ত্রিক পদ্ধতি মেনে আরো পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হবে। একদিক থেকে ভালোই হলো। বিএনপি সরকার নিজেদের দেয়া প্রতিশ্রুতি পালন করে কি না, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে কি না, অর্থনৈতিক সঙ্কট দূর করতে পারে কি না, সংস্কার করে কি না এবং সর্বোপরি জুলাই জাতীয় সনদে প্রদত্ত অঙ্গীকার রক্ষা করে কি না তা পাহারা দেয়ার দায়িত্ব জামায়াত পেলো। সুতরাং যার যার দায়িত্ব তাকে পালন করতে হবে।
জনগণের একটি বড় অংশ তাদের সমর্থন জামায়াতসহ জোট সঙ্গীদের দিয়েছে। এর প্রতি জামায়াতকে শ্রদ্ধা পোষণ করতে হবে। যে সব এলাকায় তাদের প্রার্থীরা জিতেছেন, সে সব এলাকায় যদি সুশাসন ও ইনসাফ কায়েমের দৃষ্টান্ত দেখাতে পারে তা হলে ভোটাররা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবেন। নির্বাচিত হলে তারা যেসব সরকারি সুযোগ-সুবিধা না নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন তা পালন করে দেখাতে হবে। সংসদে একটি কার্যকর ও শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে জামায়তকে অনেক পরিশ্রম করতে হবে। তাদের ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ ও বিশেষজ্ঞ টিম গঠন করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সত্যিকার বিরোধী দলের ভূমিকা পালনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
এবারের নির্বাচনে আরো কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। চরমোনাইয়ের ইসলামী আন্দোলনের ভরাডুবি হয়েছে। তারা ১১ দলীয় জোটে ছিল। কিন্তু নিজেদের অহমিকার জন্য বেরিয়ে গিয়েছিল। তারা মাত্র একটি আসন পেয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, তারা জামায়াতের সাথে থাকলে আরো কিছু আসন হয়তো পেতো এবং জামায়াতও লাভবান হতো। কারো কারো মতে, ইসলামী আন্দোলন জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় জামায়াতের খুব ক্ষতি হয়নি। তবে ভবিষ্যতে ইসলামী আন্দোলন রাজনীতির মাঠে অবিশ্বস্ত দল হিসেবে যে দুর্নাম কুড়িয়েছে তা থেকে সহজে বের হতে পারবে না। দুই খেলাফত মজলিস একটি করে আসন পেয়েছে। তবে মামুনুল হক জয় পেলে রাজনীতিতে মূল্য যোগ হতো। সবচেয়ে মজার হলো, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম জামায়াত জোটের সাথে না থেকে বিএনপি জোটে গিয়ে তাদের ভরাডুবি হয়েছে। দলটি আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে কি না সন্দেহ। আলেম-ওলামাদের কয়েকটি অংশ জামায়াতকে ভোট দেয়ার বিরুদ্ধে ফতোয়া দিয়েছিল। তাদের এরূপ ফতোয়ার আক্রমণ থেকে জামায়াত ঐতিহাসিক কারণে কোনো দিন এড়াতে পারবে বলে মনে হয় না। তবে নির্বাচনে জনগণের মন জয় করতে পারলে এসব ফতোয়া খুব একটা গুরুত্ব পাবে বলে মনে হয় না।
দেশের সামনে যে সব চ্যালেঞ্জ নতুন সরকারকে মোকাবেলা করতে হবে সেটা এখন মুখ্য বিষয়। দেশের আইনশৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক সমস্যা দূরীকরণ, নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণ, জুলাই ঘাতকদের বিচার অব্যাহত রাখা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিএনপি সরকার কতটা সাফল্য দেখাতে পারবে তা দেখার জন্য জাতি অপেক্ষা করছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভারতবিরোধী যে মনোভাব জেগে উঠেছে, এর বিপরীতে নতুন সরকার কোন নীতি অনুসরণ করে তাও তারা অতন্দ্র প্রহরীর মতো পাহারা দেবে— এটা এক রকম নিশ্চিত।
লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব



