ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরাইল বর্বরতার নিকৃষ্টতম নজির চলমান যুদ্ধ। তৃতীয় সপ্তাহে গড়ানো এ যুদ্ধের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বেই পড়েছে। সামরিক স্থাপনা ও বেসামরিক জনগোষ্ঠী উভয়কেই লক্ষ্য করে ক্রমাগত বোমা বর্ষণ করা সত্ত্বেও ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে নোয়ানো যায়নি। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করা হয়েছে। তার পরও অপ্রত্যাশিত আক্রমণে মার্কিন অহঙ্কার গুঁড়িয়ে দিয়ে মার্কিন ইহুদি প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে ইরান।
ইরানে আয়াতুল্লাহ খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ করা হয়েছে। ফলে এর মাধ্যমে ইরানে সরকার ও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, যার বাবা-মা, স্ত্রী, বোন ও ছেলে আমেরিকা ও ইসরাইলের হাতে নিহত হয়েছেন, তিনি ট্রাম্পের ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করবেন তা অকল্পনীয়। তার বাবার শাহাদতের ফলে মোজতবা খামেনির প্রতি জনসমর্থন বেড়েছে, লাখ লাখ মানুষ তেহরান ও ইরানের বিভিন্ন শহরের রাস্তায় রাস্তায় তাদের নতুন নেতার নির্বাচন উদযাপন করেছেন। চলমান মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনে নিজেদের জীবনের তোয়াক্কা না করেই তারা নতুন নেতাকে স্বাগত জানাতে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন।
ইরান একজন নতুন নেতা নির্বাচিত করেছে। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় তাদের বিমান হামলা তীব্র করেছে। ইরানের তেল স্থাপনায় ইসরাইলি হামলা দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ক্ষতি করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এমনকি নতুন সর্বোচ্চ নেতার নির্বাচনকে স্বাগত জানাতে ইরানি জনগণের পদচারণায় ইরানের রাস্তাগুলো যখন লোকে-লোকারণ্য হয়ে ওঠে; তখনই তেহরানের বাইরে একটি প্রধান তেল ডিপোতে ইসরাইলি যুদ্ধবিমান বোমাবর্ষণ করে। ফলে তেল ডেপুটি আগুনে জ্বলতে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধানের মতে, ইরানের তেল স্থাপনাগুলো দূষিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে গুরুতর স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কারণ এতে, খাদ্য পানি দূষিত হয়ে পড়বে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক লোক ও চিকিৎসাধীন ব্যক্তিরা ঝুঁকিতে পড়বে।
আমেরিকা ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করেছে বলে মনে হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে ট্রাম্প দাবি করেন ইরানের সাথে যুদ্ধ ‘খুব শিগগিরই’ শেষ হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটি একটি সময় নির্ধারণ করবে। এটি একজন বেপরোয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং তার ইসরাইলি মিত্রের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করে।
ট্রাম্প একটি ‘স্বল্পমেয়াদি’ যুদ্ধের প্রতিশ্রুতি দিলেও সঙ্ঘাত শিগগির বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, আমেরিকার জন্য পরিস্থিতি থেকে নিজেকে মুক্ত করা তত চ্যালেঞ্জিং হবে।
আমেরিকান প্রেসিডেন্টের স্থল হামলা চালানোর জন্য সেনা মোতায়েনের যেকোনো প্রচেষ্টার পরিণতি ভালো হবে না। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় অত্যধিক হবে, বিশেষ করে আমেরিকার উপসাগরীয় মিত্রদের জন্যও খারাপ পরিণতি বয়ে আনবে। সঙ্ঘাতের কারণে ইতোমধ্যেই তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। উপসাগরীয় দেশগুলো জেনে হোক বা না জেনে, মার্কিন-ইসরাইলি এজেন্ডার অংশ হয়ে উঠেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ফলে কিছু তেল ও গ্যাস সুবিধা বন্ধ হয়ে গেছে। ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টের মাধ্যমে পানি সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়েছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, শেখ নেতাদের জন্য তাদের অঞ্চলের ওপর সার্বভৌমত্ব ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। যুদ্ধ এ অঞ্চলকে বিশৃঙ্খলার মধ্যে নিমজ্জিত করেছে এবং তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ট্রাম্প সম্প্রতি তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে এক বার্তায় ঘোষণা করেছেন, ‘স্বল্পমেয়াদি তেলের দাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বনিরাপত্তা ও শান্তির জন্য খুবই সামান্য মূল্য’। তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক হুমকির শেষ হলে জ্বালানির দাম দ্রুত হ্রাস পাবে। এ ধরনের অহঙ্কার আমেরিকার মিত্রদেরও হতবাক করেছে।
এ দিকে ট্রাম্পের সহযোগীদের ইরানের সাথে সঙ্ঘাত নিয়ে ক্রমবর্ধমান বাগাড়ম্বর থেকে বোঝা যায়, মার্কিন প্রশাসন সামরিক আক্রমণকে ধর্ম বিশ্বাসভিত্তিক বার্তার সাথে একীভূত করতে চাইছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ইরানের সাথে যুদ্ধ সম্পর্কে তার বক্তব্যে ধারাবাহিকভাবে ধর্মীয় পরিভাষা ব্যবহার করেন।
‘পবিত্র নরকের’ মতো বাক্যগুলো একটি সঙ্ঘাতমূলক ইরাননীতির প্রতি বৃহত্তর ইভাঞ্জেলিক খ্রিষ্টান সমর্থনের ইঙ্গিত বহন করে। সিনেটর এ যুদ্ধকে সভ্যতার সঙ্ঘাত হিসেবেও চিহ্নিত করেছেন। এই বাগাড়ম্বর আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে একটি ধর্মীয় ন্যায্যতা প্রদানের উদ্দেশ্যে তৈরি করা, যা একটি বিপজ্জনক পদক্ষেপ। এটি ট্রাম্পের অবৈধ ও অজনপ্রিয় যুদ্ধকে ন্যায্যতা দেয়ার বেপরোয়া মনোভাব প্রকাশ করে।
মার্কিন-ইরান সঙ্ঘাত ট্রাম্পের তথাকথিত শান্তি বোর্ড সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনে বোর্ড অব পিসের (বিওপি) শীর্ষ সম্মেলনের কয়েক দিন পরই শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী ইসরাইলের সহযোগিতায় আমেরিকা ইরানে যুদ্ধ শুরু করে। এটি স্পষ্ট যে, যুদ্ধ পরিকল্পনা আগেই প্রস্তুত করা হয়েছিল, এমনকি সদস্যরা গাজার জন্য যুদ্ধোত্তর পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করার সময় এই যুদ্ধ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়।
এটি সমগ্র উদ্যোগের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করে এবং এ ধারণাই আরো জোরদার করে যে, সংস্থাটি ট্রাম্পের সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডার জন্য একটি ফ্রন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যুদ্ধ ইতোমধ্যেই গাজা শান্তি পরিকল্পনাকে পেছনে ঠেলে দিয়েছে। বিতর্কিত কাঠামো থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান এই গ্রুপে যোগদানকারী প্রথম দেশগুলোর মধ্যে ছিল। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে একটি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ট্রাম্প কর্তৃক প্রবর্তিত বোর্ডের সনদে গাজার কথা উল্লেখই করা হয়নি।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন, বোর্ডের ম্যান্ডেট মূলত জাতিসঙ্ঘ কর্তৃক ঐতিহ্যগতভাবে পালন করা ভূমিকা গ্রহণ করে। এ উদ্যোগটি মার্কিন প্রেসিডেন্টের মস্তিষ্ক প্রসূত; যিনি নিজেকে বিশ্বব্যবস্থার একমাত্র মধ্যস্থকারী হিসেবে দেখেন। ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধ বিওপি গঠনের পেছনের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যগুলো উন্মোচিত করে দিয়েছে। পাকিস্তান ও অন্যান্য সদস্য দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো তারা কি জেনে শুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শুরু করা সঙ্ঘাতের অংশ হবে?
গত বছর ধরে পাকিস্তান ট্রাম্পকে তোষামোদ করে, এমনকি যুদ্ধবাজকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে আমেরিকার সাথে তার সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করার চেষ্টা করেছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক একটি নিবন্ধের শিরোনাম ছিল : পাকিস্তান ট্রাম্পের প্রশংসা করেছে। তখন তার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ অঞ্চলের সঙ্ঘাতের মধ্যে দেশটি যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে, সে দিকে লক্ষ রেখে এ মন্তব্যটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি দায়িত্ব গ্রহণ করেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কঠোর আলটিমেটাম দিয়েছেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব মার্কিন ঘাঁটি প্রত্যাহার, ইরানের ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানকে ৫০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। দাবি না মানলে কী করবেন তারও হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে। ইরান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন খাত মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। পর্যটন শিল্প প্রতিদিন হারাচ্ছে গড়ে ৬০ কোটি ডলার। নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ হচ্ছে ইরান যে এভাবে পাল্টা আঘাত করার ক্ষমতা রাখে, ট্রাম্প প্রশাসন তা কল্পনাও করতে পারেনি। এ দিকে দুই সপ্তাহ ধরে আমেরিকা ও ইসরাইলের টানা বোমা হামলার পরও ইরান সরকার পতনের ঝুঁকিতে নেই বলে মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্টে জানানো হয়েছে। হোয়াইট হাউজের একটি গোপন নথিও এ উত্তেজনার মধ্যে ফাঁস হয়েছে; যা ওয়াশিংটন পোস্ট প্রকাশ করেছে। নথিতে বলা হয়েছে, ইরান এখনো মার্কিন বাহিনীর ওপর দীর্ঘসময় ধরে হামলা চালাতে সক্ষম।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ৩০ দিনের আলটিমেটামের পর পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে? চীন আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন-ইসরাইল সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ করে কূটনৈতিক সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে। রাশিয়াও পৃথকভাবে ইরানের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, ইরান ইতোমধ্যেই হয়তো পারমাণবিক সক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ট্রাম্প তার অপরিণামদর্শী খেলা কি এবার বন্ধ করবেন? নাকি বিশ্বকে আরো লণ্ডভণ্ড করবেন; হয়তো কিছু দিনের মধ্যেই তা স্পষ্ট হবে।
লেখক : সহসভাপতি, বিএফইউজে, যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



