স্বাধীনতার হিসাব-নিকাশ

স্বাধীনতার হিসাব-নিকাশ কেবল অতীতের সাফল্য ও ব্যর্থতার তালিকা নয়; এটি বর্তমানের দায়বদ্ধতা এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনার আয়না। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী হলেও প্রতিষ্ঠান টেকসই; আর ব্যক্তি নেতৃত্বের ঊর্ধ্বে গিয়ে ন্যায়, জবাবদিহি ও আইনের শাসনই রাষ্ট্রকে স্থিতিশীলতা দেয়। এই বাস্তবতায় স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ নতুনভাবে অনুধাবন করা জরুরি— এটি কেবল ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব নয়, বরং নাগরিকের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং অংশগ্রহণমূলক শাসনের নিশ্চয়তা। উন্নয়নের পরিসংখ্যান, অবকাঠামোগত অগ্রগতি কিংবা রাজনৈতিক স্লোগানের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নির্ধারিত হয় তার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, নৈতিক ভিত্তি এবং জনগণের আস্থার ওপর

রাষ্ট্রের জন্ম কখনোই কেবল একটি ঘোষণার মাধ্যমে সম্পন্ন হয় না; বরং এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, সামাজিক রূপান্তর এবং মানসিক মুক্তির সম্মিলিত পরিণতি। Frantz Fanon Zvi The Wretched of the Earth-এ উপনিবেশ-উত্তর সমাজের মুক্তিকে ব্যাখ্যা করেছেন এক ধরনের মানসিক ও কাঠামোগত পুনর্জাগরণ হিসেবে, যেখানে স্বাধীনতা মানে কেবল শাসকের পরিবর্তন নয়, বরং শাসনের প্রকৃতি ও মানুষের আত্মপরিচয়ের পুনর্নির্মাণ। একইভাবে Ernest Gellner যুক্তি দেন, জাতীয়তাবাদ মূলত আধুনিকতার ফল; এটি রাষ্ট্রকে একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ঐক্যের কাঠামোতে আবদ্ধ করার প্রচেষ্টা, যা অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

এই তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৭১ সাল শুধু একটি বিজয়ের বছর নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ার সূচনা। মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষার বাস্তব রূপ দিলেও, সেই অর্জন টেকসই রাষ্ট্রে রূপান্তর করা ছিল কঠিন ও জটিলতর কাজ। যুদ্ধোত্তর বাস্তবতায় একটি বিধ্বস্ত অর্থনীতি, দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সঙ্কট- সবমিলিয়ে রাষ্ট্রকে এক অনিশ্চিত পথে এগিয়ে যেতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে Barrington Moore Jr.-এর বিখ্যাত উক্তি- No bourgeoisie, no democracy- একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণাত্মক কাঠামো প্রদান করে। অর্থাৎ, গণতন্ত্রের বিকাশ কেবল রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির ওপর নির্ভর করে না; বরং এটি সামাজিক শ্রেণী, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও রাজনৈতিক মর্যাদার সংগ্রামকে রাষ্ট্রিক রূপ দেয়। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশকে একই সাথে পুনর্গঠন, শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। সংবিধান প্রণয়ন, প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস, অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ছিল প্রধান অগ্রাধিকার। এই পর্যায়ে নেতৃত্ব দেন শেখ মুজিবুর রহমান। তার শাসনামলে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভিত্তি নির্মাণ, পুনর্বাসন কর্মসূচি, জাতীয়করণ নীতি এবং কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে নবীন রাষ্ট্রকে কাঠামোগত ভিত্তি দেয়ার চেষ্টা করার বদলে— নির্বাচনে কারসাজি, দমন, শোষণ ও দাম্ভিকতা প্রদর্শনের মাধ্যমে ম্যাকিয়াভেলি নীতি অবলম্বন করেন। ফলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় সার্বিক ক্ষমতা সার্বিকভাবেই রাষ্ট্রগঠনের পথ জটিল করে তোলে। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

১৯৭৫-পরবর্তী অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রক্ষমতার পুনর্বিন্যাস ঘটে এবং নতুন নেতৃত্বের আবির্ভাব হয়। এ সময়ে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় উঠে আসেন জিয়াউর রহমান। তার শাসনামলে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরায় চালুর উদ্যোগ বিশেষভাবে আলোচিত। গ্রামীণ উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর নীতি তার সময়কার অর্থনৈতিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ দিক। রপ্তানিমুখী শিল্প, প্রবাসী আয়ের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং উদ্যোক্তা বিকাশে নীতিগত সহায়তা অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনে।

পররাষ্ট্রনীতিতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানী Samuel P. Huntington তার Political Order in Changing Societies গ্রন্থে দেখিয়েছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে রাজনৈতিক শৃঙ্খলা উন্নয়নের পূর্বশর্ত। এই তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে জিয়াউর রহমানের সময়কালকে অনেক বিশ্লেষক রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা পুনর্গঠনের পর্ব হিসেবে মূল্যায়ন করেন। একই সাথে দলীয় রাজনীতির পুনরুজ্জীবন ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে ভূমিকা রাখে।

রাষ্ট্রনায়কের হত্যাকাণ্ড যেকোনো দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর বাংলাদেশ নেতৃত্ব-সঙ্কট, ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়। সামরিক প্রভাব ও বেসামরিক রাজনীতির দ্বন্দ্ব রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব ফেলে। এই সময় গণতান্ত্রিক শক্তির পুনর্গঠন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং নির্বাচনী বৈধতা প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন সামনে আসে।

নব্বইয়ের দশকের গণ-আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করে। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেন খালেদা জিয়া। তার রাজনৈতিক সক্রিয়তা, জোটভিত্তিক আন্দোলন এবং জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি সামরিক শাসনের অবসান ত্বরান্বিত করে। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ।

পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করে। এই সময় অর্থনৈতিক উদারীকরণ, বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ, যোগাযোগ ও জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষাব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, রফতানি বহুমুখীকরণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতা বৃদ্ধির নীতি প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে— এমন মূল্যায়ন অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় পাওয়া যায়। স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ ও বাজারভিত্তিক সংস্কার নীতিও আলোচনায় আসে। এক কথায় বেগম জিয়া উত্তরাধিকার সূত্রে নেতৃত্বের সাথে সাথে শহীদ জিয়ার আদর্শও ধারণ করেছেন এবং বাস্তবায়নের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার পালাবদল স্বাভাবিক। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এ সময় ঠিক যেন শেখ মুজিবের ম্যাকিয়াভেলি নীতির ওপরই ভর করেছিল শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকার। শুধু ক্ষমতার জন্য গুম, খুন, ভয়-ভীতি, জেল-জুলুমের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটায় তারা। বিরোধী শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করতে আজকের প্রধানমন্ত্রী এবং তার মা-বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে চিরতরে নিঃশেষ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন তিনি। এ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচনের একটিতেও জনগণ ভোট দিতে পারেনি। ’১৪ ও ’২৪ এর নির্বাচনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না আর ২০১৮ এর নির্বাচনেও আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে বিপুল কারচুপি করে তারা। জনগণ এই নির্বাচনের নাম দিয়েছিল নিশিথ রাতের নির্বাচন। বড় অবকাঠামো প্রকল্প, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং ডিজিটালায়নের নামে দুর্নীতির পাশাপাশি নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস, রাজনৈতিক সহনশীলতার কবর রচনা, মানবাধিকার বিলুপ্তকরণ ও সুশাসনের নামে দুঃশাসনই তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার মূল হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।

এসব কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের মাঝামাঝি দেশব্যাপী বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনাগুলো রাজনৈতিক সঙ্কট গভীর করে। শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিও উপেক্ষা করে ক্ষমতার দম্ভ দেখাতে শুরু করে আওয়ামী সরকার। অবশেষে দেশ থেকে পলায়নের মাধ্যমে পতন ঘটে আরেক স্বৈরাচারী সরকারের।

সঙ্কট নিরসনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাচনব্যবস্থায় আস্থা পুনর্গঠন, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক সংলাপ জোরদারের লক্ষ্য সামনে আনে। এ সময়ে জাতীয় ঐকমত্য গঠনের উদ্দেশ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনসহ একাধিক কমিশন গঠন করা হয়; তাদের সুপারিশে নির্বাচন পরিচালনা কাঠামো শক্তিশালীকরণ, মানবাধিকার সুরক্ষা, বিচারিক স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। অন্তর্বর্তীকালীন সময়কালেও বিগত স্বৈরাচারী সরকারের দেশের বাইরে থেকে দেশকে অস্থিতিশীল করার প্রয়াস লক্ষণীয় ছিল। বারবার শেখ হাসিনা দেশে অবস্থিত নেতাকর্মীদের উসকে দেয়ার চেষ্টা করেন সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে। যার প্রতিক্রিয়ায় সাধারণ ছাত্রজনতা স্বৈরাচারের শেষ আশ্রয়স্থলটুকু অবশিষ্ট না রাখার এবং ধ্বংস করে দেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুনরায় বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। বিএনপি প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনে জয়লাভের পরপরই বিরোধীদলীয় নেতার বাসায় গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এ ছাড়াও বিরোধীদলীয় ইফতার অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য দিয়ে নজর কারেন দেশের সাধারণ মানুষের।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে দলীয় অসংখ্য নেতাকর্মীকে শৃঙ্খলা ভঙের অভিযোগে বহিষ্কার করেন। অতিরিক্ত ব্যানার-পোস্টার অপসারণের নির্দেশ দেন। নির্বাচনে জয়লাভের পরেও আমরা দেখতে পেয়েছি সেই আগের রূপ। এ ছাড়াও কর্মসংস্থান, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার-এসব অগ্রাধিকার জনআলোচনায় স্থান পাচ্ছে। এতসব ভালো থাকা সত্ত্বেও কিছু বিষয়ে বিতর্কও লক্ষণীয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে ব্যবসায়ীর নিয়োগ এবং প্রশাসনিক পদে দলীয় সমর্থকদের নিয়োগ। সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে নির্বাচন না করে প্রশাসক বসানো। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় উপাচার্য নিয়োগ ও শিক্ষা নীতিতে অনিয়ম। হাইকমিশনার ও রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহার নিয়ে অপেশাদারির অভিযোগ। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করা এবং অধ্যাদেশের ধারাবাহিকতায় অনিশ্চয়তা। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটরের অপসারণ। সামাজিক নিরাপত্তা ও শিক্ষানীতিতে কিছু পদক্ষেপ হলেও নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতায় প্রশ্ন। আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে রাজনীতি করার সুযোগ পাবে কি না এবং রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা ইত্যাদির মতো বিষয়গুলো ব্যাপকভাবে বিতর্কিত।

এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের নেতৃত্ব, দলীয় পুনর্গঠন কৌশল এবং নীতিগত অগ্রাধিকারের প্রশ্ন রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। প্রশাসনিক দক্ষতা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা বিতর্ক উত্থাপিত হচ্ছে এবং নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক— এসব মানদণ্ডে বর্তমান সময়ের মূল্যায়ন করা হচ্ছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনসমর্থন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি-দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য বিবেচিত।

অর্থনীতিবিদ Amartya Sen তার Development as Freedom গ্রন্থে উন্নয়নকে দেখিয়েছেন মানুষের সক্ষমতা ও স্বাধীনতার সম্প্রসারণ হিসেবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রের সাফল্য কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে নয়; বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবাধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতায় প্রতিফলিত হয়। বাংলাদেশের ৫৫ বছরের অভিজ্ঞতা দেখায়, রাষ্ট্রের ও নীতির ধারাবাহিকতা সবসময় এক নয়; কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হলে পরিবর্তনের মধ্যেও স্থিতি বজায় থাকে।

স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময়ে বাংলাদেশ যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থা থেকে রাষ্ট্রীয় কাঠামো নির্মাণ, রাজনৈতিক রূপান্তর, গণ-আন্দোলন ও নীতিগত পালাবদলের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে। এই যাত্রায় বিভিন্ন নেতৃত্ব, দল ও সামাজিক শক্তির ভূমিকা ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। অর্জনের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট- আর সেই কারণেই ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তায় প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি, রাজনৈতিক সহনশীলতা, আইনের শাসন ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে বাংলাদেশের সামনে তাই মূল প্রশ্ন, কিভাবে উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও ন্যায়ভিত্তিক শাসনের সমন্বয় করে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি অধিক স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র নির্মাণ করা যায়।

শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার হিসাব-নিকাশ কেবল অতীতের সাফল্য ও ব্যর্থতার তালিকা নয়; এটি বর্তমানের দায়বদ্ধতা এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনার আয়না। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী হলেও প্রতিষ্ঠান টেকসই; আর ব্যক্তি নেতৃত্বের ঊর্ধ্বে গিয়ে ন্যায়, জবাবদিহি ও আইনের শাসনই রাষ্ট্রকে স্থিতিশীলতা দেয়। এই বাস্তবতায় স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ নতুনভাবে অনুধাবন করা জরুরি— এটি কেবল ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব নয়, বরং নাগরিকের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং অংশগ্রহণমূলক শাসনের নিশ্চয়তা। উন্নয়নের পরিসংখ্যান, অবকাঠামোগত অগ্রগতি কিংবা রাজনৈতিক স্লোগানের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নির্ধারিত হয় তার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, নৈতিক ভিত্তি এবং জনগণের আস্থার ওপর।

সুতরাং স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে এক গভীর আত্মসমালোচনার প্রশ্ন উত্থাপন করে— রাষ্ট্র কি সত্যিই নাগরিকের কল্যাণে নিবেদিত একটি কাঠামোতে রূপ নিতে পেরেছে, নাকি নাগরিকই ধীরে ধীরে ক্ষমতার প্রয়োজনে ব্যবহৃত একটি উপাদানে পরিণত হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের মধ্যেই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের গতিপথ নির্ধারিত হবে।

লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়