ইরানের কৌশলগত অবস্থান কেবলই রাজনৈতিক-সামরিক অবস্থান নয়। এ অবস্থান সুসংবদ্ধ তাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে। এখানে বিপ্লবী রাষ্ট্রতত্ত্ব, আদর্শিক বৈরিতা, আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক-রাজনীতি এবং অসম যুদ্ধকৌশল মিলিয়ে একটি সমন্বিত স্ট্র্যাটেজিক ইডিওলোজিক্যাল ডকট্রিন নির্মাণ করেছে।
দেশটির প্রতিরোধ-চিন্তার গভীরে কাজ করে এক দার্শনিক কাঠামো। রাজনৈতিক ভাষ্যের চেয়ে তা অনেক উচ্চতর। কারণ এতে আছে ইতিহাস, সার্বভৌমত্ব ও মানব-অস্তিত্বের অর্থ নিয়ে একটি সমন্বিত ভাবনা। এখানে দর্শন বাস্তব রাজনীতিকে ব্যাখ্যা করে, আর রাজনীতি দর্শনের ধারাবাহিক প্রকাশ হয়ে ওঠে। ইরানের বিপ্লবী চেতনায় প্রতিরোধ কেবল নিরাপত্তা-নীতির ফল নয়; এটি ইতিহাসের পাঠ, ঈমানের দায়িত্ব এবং আত্মত্যাগের অস্তিত্ববাদী উপলব্ধির সমষ্টি।
প্রথমত, ইরানের বিপ্লবী ভাষ্যে ইতিহাস নিছক ঘটনাপুঞ্জ নয়; এটি ‘ইস্তেকবার’ ও ‘ইস্তেদ‘আফ’-এর সংঘর্ষের ধারাবাহিকতা। ‘ইস্তেকবার’ বলতে বোঝানো হয় সেসব শক্তিকে, যারা অহঙ্কার, আধিপত্য ও দমননীতির মাধ্যমে বিশ্বব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। আর ‘ইস্তেদ‘আফ’ সেসব জনগোষ্ঠীকে বোঝায়, যারা নিপীড়নের শিকার। এ ধারণা কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি একটি ধর্মীয়-রাজনৈতিক ডায়ালেকটিক। আল কুরআনে নিপীড়িতদের উত্তরণ ও জালিম শক্তির পতনের যে চক্রাকার বর্ণনা আছে— ইরানের বিপ্লবী দর্শন তাকে আধুনিক ভূরাজনীতির সাথে যুক্ত করে। ফলে ইতিহাস হয়ে ওঠে নৈতিক সংগ্রামের ক্ষেত্র। এখানে নিরপেক্ষতা বলে কিছু নেই। ইতিহাসের প্রতিটি মুহূর্তে মানুষকে একটি পক্ষে দাঁড়াতে হয়। প্রতিরোধ মানে তখন কেবল কৌশলগত প্রতিক্রিয়া নয়; বরং ইতিহাসের সঠিক পক্ষে অবস্থান নেয়া। এই চিন্তা বিপ্লব-উত্তর রাষ্ট্রবয়ানে গভীরভাবে প্রোথিত, বিশেষত আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনির বক্তৃতা ও লেখায় এর ছাপ স্পষ্ট।
দ্বিতীয়ত, ইরানের সার্বভৌমত্বের ধারণা এক মেটাফিজিক্যাল অর্থ ধারণ করে। আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সার্বভৌমত্ব মূলত আইনি ও রাজনৈতিক স্বীকৃতির বিষয়। রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব রাখবে। কিন্তু ইরানের রাষ্ট্রচিন্তায় সার্বভৌমত্ব কেবল আইনি অধিকার নয়; এটি ঈমানি আমানত। জনগণ ও ভূখণ্ডের রক্ষণাবেক্ষণ কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বিষয়। ফলে বিদেশী আধিপত্য, সামরিক ঘাঁটি বা রাজনৈতিক প্রভাবকে তারা কেবল কূটনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখে না। সার্বভৌমত্বের এই মেটাফিজিক্স রাষ্ট্রকে একটি নৈতিক সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। যেখানে স্বাধীনতা রক্ষা মানে কেবল রাজনৈতিক নিরাপত্তা নয়, বরং ঈমানের অখণ্ডতা রক্ষা। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রতিরোধ ধর্মীয় কর্তব্য; কারণ অন্যথায় তা হবে আমানতের খেয়ানত।
তৃতীয়ত, শহীদতত্ত্ব ও অস্তিত্ববাদ ইরানের দর্শনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। কারবালার স্মৃতি বিশেষত হুসাইন ইবনে আলীর রা: শাহাদত একধরনের redemptive suffering-এর ধারণা সৃষ্টি করে। এখানে কষ্ট ও ত্যাগ ইতিহাসকে শুদ্ধ করে, অন্যায়ের মুখোশ খুলে দেয় এবং সত্য উন্মোচন করে। এ ভাবনায় মৃত্যু চূড়ান্ত পরাজয় নয়; বরং তা এক সাক্ষ্য। সত্যের পক্ষে অবিচল থাকার প্রমাণ। ফলে ক্ষয়ক্ষতি, অর্থনৈতিক চাপ বা সামরিক আঘাতকে কেবল বাস্তব ক্ষতি হিসেবে দেখা হয় না; বরং তা এক বৃহত্তর আধ্যাত্মিক অর্থ বহন করে। এই অস্তিত্ববাদী উপলব্ধি কাজ করে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় স্তরে।
এ তিনটি স্তর মিলে ইরানের প্রতিরোধ-দর্শনকে একটি স্বতন্ত্র রূপ দেয়। এখানে রাজনীতি নিছক ক্ষমতার খেলা নয়; এটি নৈতিক দায়িত্বের ক্ষেত্র।
আজকের ইরানের রাষ্ট্রচিন্তার মূলভিত্তি গড়ে ওঠে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনি প্রণীত ওয়ালাইয়াতুল ফকিহ তত্ত্বের ওপর। এ ধারণা অনুসারে ইমামের অনুপস্থিতিতে একজন যোগ্য ফকিহ বা আলিম রাষ্ট্রের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করবেন। কিন্তু এটি নিছক একটি ফিকহি কাঠামো নয়; এটি একটি বিপ্লবী রাষ্ট্রদর্শন। এখানে রাষ্ট্র কেবল প্রশাসনিক সত্তা নয়; বরং এটি ঈমানের রক্ষাকবচ, নৈতিক আদর্শের প্রহরী এবং ইতিহাসে ন্যায় প্রতিষ্ঠার যন্ত্র। ফলে রাষ্ট্রের ধারণা এখানে ধর্মীয় দায়িত্বের সাথে মিশে যায়। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কেবল সীমান্ত রক্ষা বা অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়; বরং ‘হক’-এর প্রতিষ্ঠা ও ‘বাতিল’ প্রতিরোধের প্রকল্প।
এ প্রেক্ষাপটে ইরানের বিপ্লবী ভাষ্যে আমেরিকা, ইসরাইল, ন্যাটো ও তাদের সঙ্গীরা ইস্তেকবারি বা বৈশ্বিক আধিপত্যবাদী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত। ইরানি বিপ্লবের ভাষায়, মুসলিম বিশ্ব ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর ওপর যে রাজনৈতিক-সামরিক চাপ বিদ্যমান, তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের নৈতিক কর্তব্য। এর ফলে প্রতিরোধ কোনো সামরিক নীতি থাকে না; বরং বিরতিহীন দায়িত্বে পরিণত হয়।
ইরান নির্মাণ করে একটি বহুস্তরীয় নেটওয়ার্ক; যা এক্সিস অব রেজিসটেন্স নামে পরিচিত। এই অক্ষের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস ও ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ প্রভৃতি শক্তি। এই নেটওয়ার্ক কেবল সামরিক জোট নয়। এটি এক আদর্শিক ও কৌশলগত সম্প্রসারণ। ইরান নিজের ভূখণ্ডের বাইরে প্রভাববলয় সৃষ্টি করে; যাতে সঙ্ঘাত সীমান্তে আবদ্ধ না থাকে। এর ফলে প্রতিপক্ষকে একাধিক ফ্রন্টে হিসাব করতে হয়। লেবানন, গাজা, ইয়েমেন, সিরিয়া; প্রতিটি ক্ষেত্র হয়ে ওঠে সম্ভাব্য চাপের কেন্দ্র। আমেরিকা-ইসরাইলের রক্তাক্ত হাতে শুরু হওয়া চলমান যুদ্ধে ইরান তার গভীর ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রজ্ঞাকে প্রয়োগ করছে। পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে সে চাপের ক্ষেত্র বানিয়েছে। ইসরাইল তো বটেই, আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব তার মিসাইল বৃষ্টিতে কাঁপছে। এর মধ্য দিয়ে গোটা বিশ্বের অর্থনীতিকে ধাক্কা দিচ্ছে এবং এ অঞ্চলে আমেরিকার উপস্থিতিকে গুরুতর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
এ কৌশলকে বলা যায় deterrence through depth অর্থাৎ প্রতিরোধের গভীরতা তৈরি করা। আঞ্চলিক বিস্তৃত পরিসরে চাপ সৃষ্টি করা; যাতে শত্রুপক্ষের সামরিক পরিকল্পনা জটিল হয়ে ওঠে। একটি ক্ষুদ্র আঘাতও বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা তৈরি করে। ফলে যুদ্ধের খরচ অনিশ্চিত ও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ইরানের জন্য এটি একটি ভারসাম্য রক্ষার পদ্ধতি।
এখানেই আসে অসম যুদ্ধের প্রশ্ন। প্রযুক্তিগত ও সামরিক শক্তিতে আমেরিকা ও ইসরাইল এগিয়ে। তাদের বিমানবাহিনী, স্যাটেলাইট নজরদারি, সাইবার সক্ষমতা অত্যন্ত উন্নত। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই ইরান ভিন্ন পথ নেয়। তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, ড্রোন প্রযুক্তি, নৌ-গেরিলা কৌশল ও সাইবার সক্ষমতা বাড়ায়। বিশেষত পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত লিভারেজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখানে অস্থিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে।
এটি মূলত একটি কস্ট ইম্পোজিশন স্ট্র্যাটেজি; অর্থাৎ প্রতিপক্ষের জন্য যুদ্ধের মূল্য এত বেশি করে তোলা, যাতে আক্রমণ অকার্যকর বা অযৌক্তিক হয়ে ওঠে। যদি আক্রমণের ফল হয় আঞ্চলিক অগ্নিগোলক, জ্বালানি বাজারে ধাক্কা এবং বহু-ফ্রন্টে অনিশ্চয়তা তবে বৃহৎ শক্তি দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধ টেনে নিতে পারবে না। এ কৌশল বাস্তববাদী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্বের deterrence ধারণার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। কিন্তু এর আদর্শিক ভিত্তি একে আলাদা মাত্রা দেয়।
ইরানের প্রতিরোধ-চিন্তার নৈতিক ভিত্তি বোঝার জন্য তার স্মৃতি-রাজনীতি, ধর্মতাত্ত্বিক উত্তরাধিকার এবং ন্যায়-অন্যায়ের ভাষ্যকে বুঝতে হয়। এখানে যুদ্ধ কোনো নিছক কৌশলগত হিসাব নয়। যুদ্ধ এক নৈতিক বয়ান, যেখানে ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও ন্যায়ের ধারণা পরস্পর মিশে আছে। এই নৈতিক কাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে শাহাদতের আদর্শ, আত্মরক্ষার ন্যায্যতা ও নিপীড়িতের পক্ষে অবস্থান নেয়ার এক ট্রান্সন্যাশনাল দায়িত্ববোধ।
শিয়া ঐতিহ্যে কারবালার ঘটনা একটি স্থায়ী নৈতিক মাপকাঠি। ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে কারবালার প্রান্তরে হুসাইন ইবনে আলী রা:-এর শাহাদত কেবল একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি নয়। এ হচ্ছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চূড়ান্ত প্রতীক। এখানে সংখ্যায় অল্প, সামরিকভাবে দুর্বল হলেও হুসাইনের অনুসারীরা সত্যের পক্ষে অবিচল থাকে। যদিও সে জানে যে তার পরিণতি মৃত্যু। এই বয়ানে পরাজয়ও নৈতিক বিজয়। কারণ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ন্যায় অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে। এ ধারণা আধুনিক ইরানের রাজনৈতিক ভাষ্যেও প্রবাহিত। যুদ্ধ তখন জয়-পরাজয়ের সমীকরণে সীমিত থাকে না। তা হয়ে ওঠে হক বনাম বাতিলের নৈতিক যুদ্ধ।
এ প্রেক্ষাপটে ইরান নিজেকে ডিফেন্সিভ রেজিস্টেন্সের ধারক হিসেবে উপস্থাপন করে। তার যুক্তি হলো— যদি কোনো সাম্রাজ্যবাদ অঞ্চলজুড়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং মিত্র রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করে, তবে প্রতিরোধ আত্মরক্ষার অংশ। ইসরাইলের দখলনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তৃত আমেরিকার সামরিক উপস্থিতিকে তারা একটি কাঠামোগত আগ্রাসন হিসেবে চিহ্নিত করে। ফলে তাদের অবস্থান হলো, ইরানের যুদ্ধ আগ্রাসনের সূচনা নয়, বরং আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়া। এবারের যুদ্ধেও তা ঘটেছে। ইরান অপেক্ষা করেছে। আমেরিকা-ইসরাইল আলোচনার মাঝপথে কাপুরুষোচিত হামলা করে ইমাম খামেনিসহ নেতৃবৃন্দকে শহীদ করেছে। তার পর ইরানের পাল্টা আক্রমণ নৈতিকভাবে বৈধ প্রতিরোধ, প্রতিরক্ষা।
এখানে পাশ্চাত্যের জাস্ট ওয়ার থিউরির সাথে ইসলামী নীতির একটি সাযুজ্য খুঁজে নেয়া হয়। যুদ্ধের জন্য ন্যায্য কারণ অর্থাৎ আত্মরক্ষা বা নিপীড়ন প্রতিরোধ একটি মৌলিক শর্ত। বৈধ কর্তৃত্ব বা রাষ্ট্র বা স্বীকৃত নেতৃত্বের অনুমোদন যুদ্ধকে বিশৃঙ্খল সহিংসতা থেকে পৃথক করে। আর আত্মরক্ষা বা নিজের ভূখণ্ড, জনগণ ও বিশ্বাস রক্ষার দায়িত্ব এখানে নৈতিক অনুমোদনের ভিত্তি। ইরানের দৃষ্টিতে, যদি এ তিনটি শর্ত পূরণ হয়, তবে পাল্টা আক্রমণ নৈতিকভাবে সঙ্গত। একে যতদূর নিতে হয়, সে নিয়ে যাবে। ফলে ইরানের যুদ্ধকে আক্রমণাত্মক সম্প্রসারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম হিসেবে সে হাজির।
কিন্তু এই নৈতিকতার আরেকটি স্তর রয়েছে। তা হলো নিপীড়িত ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর পক্ষে অবস্থান। ইরানের বিপ্লবী আদর্শে রাষ্ট্র কেবল নিজের নাগরিকের জন্য নয়; বরং বিশ্বব্যাপী নিপীড়িত মানুষের পক্ষে কথা বলার দায় বহন করে। ফিলিস্তিন প্রশ্নে তাদের অবস্থানকে তারা জাতীয় স্বার্থের বাইরে এক নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরে। এভাবে প্রতিরোধ কেবল সীমান্তসংক্রান্ত নয়; এটি এক ট্রান্সন্যাশনাল নৈতিক প্রকল্প হয়ে ওঠে। এই নৈতিক কাঠামো ইরানের রাজনৈতিক বয়ানে একধরনের অস্তিত্ববাদী মাত্রা যোগ করে। যদি অন্যায়কে মেনে নেয়া হয়, তবে তার নতিজা কেবল ভূখণ্ড হারানো নয়; বরং একই সাথে নৈতিক আত্মসমর্পণ। এ বয়ান জনগণের মধ্যে আত্মত্যাগের সংস্কৃতি ও ধৈর্যের মানসিকতা গড়ে তোলে।
অবশ্য এই নৈতিক ভাষ্য নিয়ে বিতর্কও আছে। সমালোচকরা বলেন, নৈতিকতার ভাষা কখনো রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আড়াল করতে পারে, কিংবা দীর্ঘস্থায়ী সঙ্ঘাতকে বৈধতা দিতে পারে। কিন্তু ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে, এ নৈতিক কাঠামোই তাদের প্রতিরোধ-নীতির প্রাণশক্তি।
অতএব, ইরানের প্রতিরোধ-দর্শনকে কেবল সামরিক নীতির আলোকে বিচার করলে তার অন্তর্নিহিত সত্তাকে বুঝতে পারব না। এই প্রতিরোধ দর্শন প্রবল শক্তিকে ধারণ করে। তবে নিছক শক্তির হিসাবের বাইরে সে এক নৈতিক-ঐতিহাসিক অবস্থান। এখানে রাষ্ট্র কোনো নিছক প্রশাসনিক কাঠামো নয়; এটি এক আমানত।
এই দর্শনে রাষ্ট্র, ধর্ম ও ইতিহাস আলাদা বিষয় নয়। তারা একই নৈতিক স্থাপত্যের অংশ। প্রতিরোধ তাই শেষ পর্যন্ত এক আধ্যাত্মিক ঘোষণা, ক্ষমতার সামনে নত না হওয়ার সঙ্কল্প, পরাজয়ের মধ্যেও মর্যাদা রক্ষার সাধনা এবং সময়ের প্রবাহে ন্যায়কে চিরঞ্জীব রাখার প্রয়াস।
প্রতিরোধ এখানে কেবল কৌশল নয়। প্রতিরোধ হচ্ছে মানবমর্যাদার সিগনেচার, ঈমানের ঘোষণা এবং ইতিহাসে নিজের অবস্থান নির্ধারণের ইশতেহার।
লেখক : কবি, গবেষক



