প্রশাসক নিয়োগ, স্থানীয় সরকারে আস্থার সঙ্কট

প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। সরকারকে তাই সতর্ক হতে হবে। নির্বাচনের পথরেখা দিতে হবে। সময়সীমা ঘোষণা করতে হবে। প্রশাসকদের ক্ষমতা সীমিত করতে হবে। এতে আস্থা ফিরবে। গণতন্ত্রে আস্থা সবচেয়ে বড় শক্তি। আস্থার ঘাটতি হলে নির্বাচন অর্থহীন হয়ে পড়ে। স্থানীয় সরকার সেই আস্থার ভিত্তি। এ ভিত্তি শক্ত করতে হলে নির্বাচন অপরিহার্য। প্রশাসক নয়, জনপ্রতিনিধি স্থায়ী সমাধান। এখন সিদ্ধান্ত সরকারের। প্রশাসন নাকি নির্বাচন— কোনটি অগ্রাধিকার পাবে? তিন মাস পর উত্তর মিলবে। ততদিন পর্যন্ত প্রশ্ন থাকবে। সন্দেহ থাকবে। রাজনীতি উত্তপ্ত থাকবে

স্থানীয় সরকার প্রশ্নে দেশের রাজনীতি আবার উত্তপ্ত। সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এরপরই শুরু হয় বিতর্ক। বিরোধী দল বলছে, এটি নির্বাচনের আগে মাঠ দখলের চেষ্টা। সরকার বলছে, এটি সাময়িক ব্যবস্থা, নির্বাচন আসছে। এ দুই বক্তব্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আস্থার সঙ্কট। আর সেই সঙ্কটের কেন্দ্রবিন্দু-স্থানীয় সরকার।

বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার কেবল প্রশাসনিক কাঠামো নয়। এটি গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ। গ্রামের মানুষের প্রথম দরজা। শহরের নাগরিক সেবার কেন্দ্র। এ জায়গায় দীর্ঘদিন নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকলে প্রশাসন স্থবির হয়। জবাবদিহির ব্যবস্থা দুর্বল হয়। ক্ষমতার ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। বর্তমানে সেটাই ঘটেছে।

জুলাই বিপ্লবের পর ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সাথে সাথে স্থানীয় প্রশাসনে শূন্যতা তৈরি হয়। সিটি করপোরেশন থেকে ইউনিয়ন পরিষদ— সবখানে অচলাবস্থা। কেউ গ্রেফতার। কেউ আত্মগোপনে। ফলে নির্বাচিত কাঠামো ভেঙে পড়ে। এ শূন্যতা পূরণে অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসক নিয়োগ দেয়। সেটি ছিল জরুরি ব্যবস্থা। কিন্তু জরুরি ব্যবস্থা দীর্ঘ হলে তা সমস্যায় পরিণত হয়।

দেড় বছর ধরে প্রশাসকনির্ভর স্থানীয় সরকার চলছে। এতে প্রশাসন সচল থাকলেও গণতান্ত্রিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে। মানুষের অংশগ্রহণ কমেছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে ওপর থেকে।

নিচের স্তরে প্রতিনিধিত্ব কমেছে। এখন নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব ছিল দ্রুত নির্বাচন দেয়া। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, নতুন করে দলীয় নেতাদের প্রশাসক করা হচ্ছে। এখানেই বিতর্কের সূত্রপাত। ১১টি সিটি করপোরেশন। ৪২টি জেলা পরিষদ। দলীয় রাজনীতির সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা দায়িত্ব পেয়েছেন। এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে, যারা জাতীয় নির্বাচনে পরাজিত হরেছেন। বিরোধী দল বলছে, এটি বিনা নির্বাচনে দলীয় লোকদের পুনর্বাসন। তারা এটিকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা বলছেন। তাদের অভিযোগ, নির্বাচনের আগে প্রশাসনিক কাঠামো দখল করা হচ্ছে। এর ফলে নির্বাচন প্রভাবিত হতে পারে। সরকারি দল অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, এটি প্রশাসন সচল রাখতে সাময়িক ব্যবস্থা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ একটি গণমাধ্যমকে যে কথা বলেছেন, তাতে এ বিতর্ককে আরো স্পষ্ট করে। তার মতে— দ্রুত নির্বাচন না হলে সরকারের জনপ্রিয়তা কমবে। তিনি আরো বলেন, স্থানীয় সরকারে দলীয়করণ জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক। তার এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জুলাই আন্দোলনের অন্যতম দাবি ছিল দলীয় নিয়ন্ত্রণ কমানো। প্রশাসনে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা। এখন প্রশাসক নিয়োগের ঘটনায় সেই প্রতিশ্রুতি প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় স্থানীয় সরকারকে বলা হয় ‘স্কুল অব ডেমোক্র্যাসি’। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক আলেক্সি দ্য টকভিল বলেছিলেন, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়া স্বাধীনতার চেতনা টেকে না। কারণ গণতন্ত্র নিচ থেকে গড়ে ওঠে। ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া যায় না। এ তত্ত্ব বাংলাদেশের বাস্তবতায় আরো প্রাসঙ্গিক। এখানে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা— সব গণতন্ত্রের ভিত্তি।

আরেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডাল গণতন্ত্রের মূল শর্ত হিসেবে অংশগ্রহণ ও প্রতিযোগিতার কথা বলেছেন। নির্বাচন ছাড়া এ দুই শর্ত পূরণ হয় না। প্রশাসক নিয়োগ অংশগ্রহণ কমায়। প্রতিযোগিতা রুদ্ধ করে। এতে গণতন্ত্রের মান কমে যায়। এই তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাই বর্তমান বিতর্ককে ব্যাখ্যা করে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের অভিমত, প্রশাসক নিয়োগ অবৈধ নয়। কিন্তু নির্বাচিত প্রতিনিধি ও মনোনীত ব্যক্তি এক নয়। এখানে মূল পার্থক্য। নির্বাচিত প্রতিনিধির দায় থাকে ভোটারের কাছে। প্রশাসকের দায় থাকে নিয়োগদাতার কাছে। এ দায়বদ্ধতার পার্থক্য প্রশাসনের চরিত্র বদলে দেয়। এতে জবাবদিহি দুর্বল হয়।

এখানেই বিরোধী দলগুলোর আশঙ্কা। তাদের মতে, প্রশাসকরা নির্বাচনের আগে প্রশাসনিক প্রভাব তৈরি করতে পারেন। স্থানীয়পর্যায়ে রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে যেতে পারে। সরকারি সুবিধা বণ্টনে পক্ষপাত হতে পারে। ফলে নির্বাচনের মাঠ সমান থাকবে না। এ সন্দেহ থেকে তাদের সমালোচনা। সংসদের বিরোধী দলীয় উপনেতা ডা: সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, দলীয় ব্যক্তিদের বসানো হলে আস্থার সঙ্কট তৈরি হবে। এ মন্তব্য রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে প্রশাসনিক প্রভাব নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও অতীতে এমন অভিযোগ উঠেছে। ফলে নতুন করে নিয়োগ সন্দেহ বাড়িয়েছে।

তবে সরকারের যুক্তিও একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। সরকার বলছে, প্রশাসন সচল রাখা জরুরি ছিল। নির্বাচনের আগে কিছু সময় প্রয়োজন। তিন মাস সময় নিতে চায় সরকার। প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। তারপর উপজেলা ও পৌরসভা। জেলা পরিষদ পরে। এ পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন, এ সময়ের মধ্যে প্রশাসকরা কী ভূমিকা নেবেন?

রাজনৈতিক তাত্ত্বিক স্যামুয়েল পি হান্টিংটন বলেছিলেন, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে অস্থিরতা বাড়ে। বাংলাদেশে এখন তা-ই দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় সরকার কাঠামো দুর্বল। প্রতিনিধিত্ব নেই। প্রশাসনিক নিয়োগ বাড়ছে। ফলে রাজনৈতিক সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। আরেক তাত্ত্বিক হুয়ান জে. লিন্জ সতর্ক করেছিলেন, গণতন্ত্রে বৈধতার সঙ্কট তৈরি হলে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়। বর্তমান বিতর্ক সেই বৈধতা প্রশ্নকে সামনে এনেছে। প্রশাসক নিয়োগ আইনসম্মত হলেও রাজনৈতিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এটি সরকারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

এখানে একটি বাস্তবতা মনে রাখতে হবে। বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার শুধু প্রশাসনিক ইউনিট নয়। এটি রাজনৈতিক শক্তির ঘাঁটি। ভোটের প্রস্তুতির ক্ষেত্র। দলীয় সংগঠন শক্ত করার জায়গা। এ কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সব সময় রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। এখন যখন প্রশাসকরা দলীয়, তখন সন্দেহ আরো বাড়ে। তবে সমাধানও স্পষ্ট। দ্রুত নির্বাচন। স্বচ্ছ সময়সূচি। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা। প্রশাসকদের নিরপেক্ষ ভূমিকা— এই চারটি বিষয় নিশ্চিত করলে বিতর্ক কমবে। নচেৎ সন্দেহ বাড়বে বৈ কমবে না।

সরকার বলছে, তিন মাস সময় লাগবে। এ সময়সীমা বাস্তবায়নই এখন পরীক্ষা। যদি সময়মতো নির্বাচন হয়, বিতর্ক থামবে। না হলে বিরোধীদের অভিযোগ শক্ত হবে। সেই সাথে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়বে। আস্থার সঙ্কট গভীর হবে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক বার্তা। সরকার কতটা গণতান্ত্রিক— তার পরীক্ষা। জুলাই আন্দোলনের পর মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে। তারা পরিবর্তন চায়। দলীয় নিয়ন্ত্রণ কমাতে চায়। স্বচ্ছ নির্বাচন চায়।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। সরকারকে তাই সতর্ক হতে হবে। নির্বাচনের পথরেখা দিতে হবে। সময়সীমা ঘোষণা করতে হবে। প্রশাসকদের ক্ষমতা সীমিত করতে হবে। এতে আস্থা ফিরবে। গণতন্ত্রে আস্থা সবচেয়ে বড় শক্তি। আস্থার ঘাটতি হলে নির্বাচন অর্থহীন হয়ে পড়ে। স্থানীয় সরকার সেই আস্থার ভিত্তি। এ ভিত্তি শক্ত করতে হলে নির্বাচন অপরিহার্য। প্রশাসক নয়, জনপ্রতিনিধি স্থায়ী সমাধান। এখন সিদ্ধান্ত সরকারের। প্রশাসন নাকি নির্বাচন— কোনটি অগ্রাধিকার পাবে? তিন মাস পর উত্তর মিলবে। ততদিন পর্যন্ত প্রশ্ন থাকবে। সন্দেহ থাকবে। রাজনীতি উত্তপ্ত থাকবে।

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন