পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রের জনগণ ও ক্ষমতাসীন সরকারের অবস্থান অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে সবসময় শান্তির সপক্ষে হয়ে থাকে। একটি দেশের জনগণ ও সরকারের অবস্থান যখন শান্তির সপক্ষে হয়, তখন তা দেশে স্থিতিশীলতা দিতে সমর্থ হয়। যেকোনো দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য স্থিতিশীলতা একান্ত আবশ্যক। একই রাজনৈতিক দল যখন ক্ষমতাসীন, তখন দেখা যায় শান্তির পক্ষে আবার যখন বিরোধী দলে; তখন দেখা যায় বিশৃঙ্খলার পক্ষে।
পৃথিবীর যেসব রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা অনুসৃত হয় সেসব রাষ্ট্রে নির্বাচনে বিজয়ী দল সরকার পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করে। এসব দেশে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে জনমানুষের সমর্থন মুখ্য বিবেচ্য। আবার পৃথিবীর এমন কিছু শক্তিধর রাষ্ট্র রয়েছে যারা নিজ দেশে জনমতের প্রতিফলনে গণতান্ত্রিক শাসনের অনুসারী। তবে পরদেশের ক্ষেত্রে এর ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ— যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানি, ইতালি প্রভৃতি অভ্যন্তরীণভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং এসব রাষ্ট্রে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের সব নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোটাধিকারপ্রাপ্ত দল বা ব্যক্তি নির্বাচিত হয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। কিন্তু পররাষ্ট্রের ক্ষেত্রে দেখা যায়, এসব রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক নীতির সাথে আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক নীতি তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিলাষের কাছে পরাভূত। যেমন মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্র সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব-আমিরাত, কাতার প্রভৃতিতে রাজতান্ত্রিক শাসন বিদ্যমান। এসব দেশের জনমানুষ রাজতন্ত্রের সপক্ষে নাকি বিপক্ষে এ প্রশ্নে কখনো তাদের মতামত ব্যক্ত করতে দেয়া হয়নি। এসব দেশে রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখার পেছনে শক্তি জুগিয়ে চলছে পাশ্চাত্যের ভিন্নধর্মী মতাদর্শের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো। এসব রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য রাজতন্ত্র টিকিয়ে রেখে তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষা।
নব্বইয়ের দশকের প্রথমার্ধে ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বাধীন যে একনায়কতান্ত্রিক সরকার ছিল তা উৎখাতে সম্মিলিতভাবে কাজ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো। সাদ্দামের উত্থান মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়। সাদ্দামের উৎখাতে যুদ্ধ পরিচালনায় যে অর্থ ব্যয় হয়েছিল তার জোগানদাতা ছিল মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো।
গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মিসরের হোসনি মোবারক সরকারের পতন হলে সে দেশের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ইসলামিক ব্রাদারহুড সমর্থিত প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসি প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হন। কিন্তু মুরসির বিজয়কে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ইসরাইল নিজেদের অবৈধ কার্যকলাপে হানিকর বিবেচনায় মেনে নিতে পারেনি। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলনে নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও মুরসির ক্ষমতাচ্যুতির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে সহায়তা করেছিল ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক রাজ্যগুলো। মিসরের প্রেসিডেন্ট পদে মুরসির নির্বাচন সে দেশে গণতন্ত্র ও ইসলামী শাসন উভয়ের বিজয় হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় তা মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে গণতন্ত্রের জাগরণের উন্মেষ ঘটানোর সূচনা করেছিল। কিন্তু সে সূচনা রাজতন্ত্রের অস্তিত্বের জন্য ভীতি হিসেবে দেখা দেয়ায় তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো দিয়ে তা প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই বিনষ্ট করে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো ইরাক, মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র, মিসর, তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ইসরাইল প্রভৃতির ক্ষেত্রে যে নীতি অনুসরণ করে, তা তাদের নিজ দেশে অনুসৃত গণতান্ত্রিক নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের এ নীতি গণতন্ত্রের মাপকাঠিতে সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেয়ার শামিল।
আমাদের উপমহাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্র ভারত। স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারত কেন্দ্র ও রাজ্যের সাধারণ ও স্থানীয় নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলনে সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত দল ও ব্যক্তিকে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার ব্যাপারে সচেষ্ট থেকেছে। শুরু থেকে ভারত কেন্দ্র ও রাজ্যে গণতন্ত্র অনুশীলনে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন না হওয়ায় সে দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। ভারতের জনগণ অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সে দেশে একমাত্র সরকার পরিবর্তনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। দীর্ঘদিন ধরে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতি আস্থাশীল থাকায় ভারতে নির্বাচনে আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণার আগেই যখন একটি দলের বিজয়ী হওয়ার চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখন দেখা যায় বিজিত দলের প্রধান পরাজয় স্বীকার করে বিজয়ী দলের প্রধানকে শুধু অভিনন্দন জানান না; বরং সরকার পরিচালনায় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
স্বাধীনতা লাভ-পরবর্তী ভারতে কংগ্রেস এক নাগাড়ে ৩০ বছর ক্ষমতাসীন ছিল। এরপর কখনো কংগ্রেস কখনোবা বিজেপি আবার কখনোবা উভয় দলের সমর্থন নিয়ে তৃতীয় কোনো দল কেন্দ্রে সরকার পরিচালনা করেছে। ভারতে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন থাকার ব্যাপারে কংগ্রেসের সময়কালের তুলনায় অন্য যেকোনো দলের সময়কাল অনেক কম। ভারতে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে যেভাবে প্রভাব খাটায়, অন্যান্য ক্ষমতাসীন দলকে সেভাবে প্রভাব খাটাতে দেখা যায় না। ভারতে যখনই কংগ্রেস দল ক্ষমতাসীন ছিল তখন দেখা গেছে, উপমহাদেশের অন্যান্য দেশে ক্ষমতার পটপরিবর্তনে জনমতের প্রতিফলনের চেয়ে তারা নিজেদের আকাঙ্ক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। কথাটি অনস্বীকার্য, উপমহাদেশের অন্যান্য দেশে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত হস্তক্ষেপ না করলে এসব দেশের স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন হতো না।
১৯৮৬, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে বাংলাদেশে তৃতীয়, নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন ভারতে কংগ্রেস ক্ষমতাসীন ছিল। তৃতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন সামরিক শাসক এরশাদ ক্ষমতাসীন ছিলেন। তার সামরিক শাসনকে বৈধতা দিতে সে নির্বাচনে এরশাদের দল জাতীয় পার্টি-জাপার সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া অত্যাবশ্যক ছিল। সে সময়কার প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনটি বর্জনের মুখে এটির গ্রহণযোগ্যতা বিষয়ে দেশবাসী যখন সন্ধিহান হয়ে ওঠে, ঠিক তখন নির্বাচনের আগ মুহূর্তে দেখা গেল, আওয়ামী লীগ প্রধান তার স্বউক্তি ‘এরশাদের অধীন যে দল নির্বাচনে যাবে সে দল হবে জাতীয় বেইমান’ হতে আচমকা ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে বিএনপিকে বিপাকে ফেলে দেন। সে সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কংগ্রেস দলীয় রাজীব গান্ধী। আওয়ামী লীগকে সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও বিজয়ের ব্যাপারে সে সময় রাজীব গান্ধী আশ্বস্ত করলেও পরক্ষণে দেখা গেল, তিনি তার অবস্থান হতে সরে আসেন। সে নির্বাচনটিতে ঠিকই জনমতের প্রকৃত প্রতিফলনে আওয়ামী লীগ বেশি আসনে বিজয়ী হয়েছিল। কিন্তু প্রায় ১০০টি আসনের ফল ঘোষণার পর যখন দেখা গেল, এরশাদের দল জাপা নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে তখন চিরায়ত নিয়ম ভঙ্গ করে নির্বাচন কমিশন হতে যে ফল ঘোষণা করা হচ্ছিল তা স্থগিত করে ঘোষণার দায়িত্ব দেয়া হয় সেনা সদর দফতরকে। সে সময় এরশাদের আস্থাভাজন সেনা কর্মকর্তারা ফল পাল্টিয়ে জাপাকে বেশি আসনে বিজয়ী দেখান। আর আওয়ামী লীগকে দেয়া হয় একশতেরও কম আসন। সে সময় ভারতের কংগ্রেস দলের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ার কারণে এরশাদের পক্ষে কারচুপি করে বিজয় অর্জন সম্ভব হয়েছিল। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ কংগ্রেসের আস্থাশীল দল হওয়া সত্ত্বেও তৃতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন ভূ-রাজনৈতিক কারণে এরশাদ ও তার দল জাপা ভারতের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য ছিল। তাই জনমত পক্ষে থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের বিজয় নস্যাৎ হওয়ার ক্ষেত্রে ভারত নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার গণ্যে এরশাদের দলকে বিজয়ী দেখানোর ব্যাপারে নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছে।
২০০৮ সালে বাংলাদেশে নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন ভারতে কংগ্রেস ক্ষমতাসীন ছিল। নির্বাচনটিতে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগোরিষ্ঠতা পায়। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ভাগ্যে জোটে মাত্র ৩০টি আসন। যদিও প্রদত্ত ভোটের ৩৩ শতাংশ ভোট দলটি পেয়েছিল। নির্বাচনটিতে যে হারে ভোট পড়েছিল এর এক মাসের ব্যবধানে যে উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল; তাতে ভোট পড়ার হার আগেকার চেয়ে অর্ধেকে নেমে আসে। পৃথিবীর সব দেশে জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে স্থানীয় নির্বাচনে ভোট পড়ার হার বেশি হয়। কিন্তু নবম সংসদ নির্বাচন এবং তদঅব্যবহিত পর উপজেলা নির্বাচনের সাথে ভোট পড়ার হারের ব্যাপক ব্যবধানের কারণে যে বিতর্কের জন্ম হয়, তার সন্তোষজনক জবাব আজও পাওয়া যায়নি।
নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন যে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতাসীন ছিল তা ভারতের আশীর্বাদপুষ্ট ছিল। সেই সাথে ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ে ভারতে কংগ্রেস সরকার যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, এ প্রশ্নে এই দেশের বেশির ভাগ রাজনৈতিক বিশ্লেষক দ্বিমত পোষণ করেন না।
নবম সংসদ নির্বাচনের মতো দশম সংসদ নির্বাচনের সময়ও ভারতে কংগ্রেস ক্ষমতাসীন ছিল। নির্বাচনটি তৃতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের বর্জনে পড়ে। এমন অবস্থায় ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ বিমানযোগে ঝটিকা সফরে ঢাকায় এসে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার ব্যাপারে এরশাদকে সম্মত করাতে সমর্থ হন। দশম সংসদ নির্বাচনে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের জন্য উন্মুক্ত ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৩টির প্রার্থীরা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। অবশিষ্ট যে ১৪৭টি আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাতে ভোট পড়ার হার ছিল ৫ শতাংশের কম। কিন্তু সরকারের আজ্ঞাবহ ও মেরুদণ্ডহীন নির্বাচন কমিশন ভোটগ্রহণপর্ব সমাপ্ত হওয়ার ৪৮ ঘণ্টা পর জনগণকে হতবাক ও বিস্মিত করে ঘোষণা করে যে, ভোট পড়ার হার ৪২ শতাংশ। এ বিষয়ে দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই যে, এরশাদের অংশগ্রহণ ব্যতীত দশম সংসদ নির্বাচন বৈধ হতো না। এ নির্বাচনে এরশাদের অংশগ্রহণের ব্যাপারে ভূমিকা রেখেছে ভারত।
একাদশ সংসদ নির্বাচনে দিনের ভোট আনুষ্ঠানিক ভোটগ্রহণের নির্ধারিত তারিখের পূর্ববর্তী রাতে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দলীয় নেতাকর্মীদের সহায়তায় সম্পন্ন করা হয়। তাই যেকোনো মানদণ্ডে এটিকে কোনোভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন বলার অবকাশ নেই। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ঠিক করে দেন দলীয় ও বিরোধীদলীয় প্রার্থী কে হবেন এবং কাকে নির্বাচনে বিজয়ী করা হবে। বস্তুত তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এমন তিনটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন ও প্রহসনমূলক নির্বাচনের আয়োজন করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির দাবি— দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে না, এটিকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জনআকাঙ্ক্ষার বিপরীতে আওয়ামী লীগের তথাকথিত বিজয় হলেও তা যে গৌরবের ছিল না; সেটি দেশের সবাই উপলব্ধি করতে পেরেছেন। এ নির্বাচন তিনটির মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কপালে যে কলঙ্কের তিলক লেগেছে তা সহজে মুছার নয়।
সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণপর্ব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলেও ফল প্রকাশে কোনো কোনো মহল থেকে অভিযোগ করা হয় কিছু ক্ষেত্রে কূটকৌশলে পরাজিতকে বিজয়ী এবং বিজয়ীকে পরাজিত করার প্রয়াস নেয়া হয়েছে। বড় দু’টি দলের মধ্যে প্রদত্ত ভোটের ব্যবধান স্বল্প হলেও আসনপ্রাপ্তির দিক থেকে দেখা যায় ব্যাপক ফারাক।
বাংলাদেশে স্বাধীনতা-পরবর্তী দেখা গেছে, কখনো ক্ষমতাসীন দলের প্রতি বিরোধী দল আস্থাশীল ছিল না। এর পেছনে যেসব কারণ রয়েছে, তার মূলে হলো ক্ষমতাসীন দলের অধীন যতগুলো নির্বাচন হয়েছে এর প্রতিটিতে প্রধান বিরোধী দল পরাভূত হয়েছে। এ অবস্থা হতে উত্তরণে আমাদের দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার সূচনা করা হলেও এর অধীন দু’টি নির্বাচন অনুষ্ঠান-পরবর্তী ব্যবস্থাটি আর কার্যকর থাকেনি। তা ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও দেখা গেছে, বিজীত দলের কাছে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।
বাংলাদেশে মেয়াদ অবসান বা মেয়াদ অবসান ব্যতীত কোন ধরনের সরকারের অধীন এবং কী পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে— প্রশ্নটি সুরাহা না হওয়ায় প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেখা যায়, জনঅসন্তোষ তীব্র আকার ধারণ করে। নির্বাচন বিষয়ে এ জনঅসন্তোষে আজ আমাদের স্থিতিশীলতা বিপন্ন, যা মারাত্মকভাবে উন্নতি ও সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের সরকারি দল যেমন ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় শান্তির সপক্ষে ও বিশৃঙ্খলার বিপক্ষে। ঠিক তেমন বিরোধী দলে থাকাবস্থায়ও তাদের শান্তির সপক্ষে ও বিশৃঙ্খলার বিপক্ষে থাকতে হবে। এটি নিশ্চিত করতে হলে সর্বাগ্রে যেটি প্রয়োজন তা হলো— নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে এমন এক সরকারব্যবস্থার উদ্ভাবন এবং নির্বাচনে পদ্ধতি হিসেবে এমন এক পদ্ধতি অনুসরণ, যা জনমতের প্রকৃত প্রতিফলনে দেশের সামগ্রিক জনসাধারণের সমর্থনের ভিত্তিতে সরকার পরিবর্তনের পথ দেখাবে। এ লক্ষ্যে উপনীত হতে আমাদের রাজনীতিবিদরা নিজেদের দেশপ্রেম ও আত্মসম্মানের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে যদি দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন, সেক্ষেত্রে কোনো বৈদেশিক শক্তি আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মাথা ঘামিয়ে ফলদায়ক কিছু পাবে না। তাই পৃথিবীর শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যেমন শান্তির সপক্ষে বিশৃঙ্খলার বিপক্ষে, আমাদেরও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য অবশ্যই অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে শান্তির সপক্ষে আর বিশৃঙ্খলার বিপক্ষে থাকতে হবে।
লেখক : সাবেক জজ এবং সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক



