আর্থিক দুর্নীতি— শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে ঘুষ, টেন্ডারবাজি কিংবা অর্থ আত্মসাৎ। কিন্তু বাস্তবে দুর্নীতি কেবল অর্থের লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি নৈতিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় অবক্ষয়ের বহুমাত্রিক রূপ। ইসলামী ঐতিহ্যে একটি হাদিসে বলা হয়েছে— ‘ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা উভয়ই জাহান্নামি।’ অর্থাৎ দুর্নীতি শুধু আইনভঙ্গ নয়, এটি নৈতিকতারও চরম অবমাননা।
আমাদের সমাজে দুর্নীতিকে প্রায়ই সঙ্কীর্ণভাবে দেখা হয়— যেন ঘুষ নিলেই দুর্নীতি, না নিলেই সৎ। অথচ বাস্তবতা অনেক বিস্তৃত। ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ, সুযোগের অপচয়— সবই দুর্নীতির অংশ। এমনকি কোনো যোগ্য ব্যক্তিকে বঞ্চিত করে অযোগ্যকে সুযোগ দেয়া— এটিও একধরনের দুর্নীতি, যার প্রভাব অর্থনৈতিক দুর্নীতির চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় দুর্নীতির সবচেয়ে বেশি অভিযোগ শোনা যায় কাস্টমস, আয়কর, পুলিশ, প্রশাসন ও শিক্ষা খাতে। কিন্তু এটি কেবল নির্দিষ্ট কিছু দফতরের সমস্যা নয়; বরং একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। একসময় কোনো কোনো অফিসে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে বিবেচিত হতেন, আর সৎ কর্মকর্তারা ব্যতিক্রম। এই মানসিকতাই সবচেয়ে ভয়াবহ।
দুর্নীতির ভাষাও সময়ের সাথে বদলেছে। সরাসরি ‘ঘুষ’ শব্দটি আজ অনেক ক্ষেত্রে অপ্রিয়। তার বদলে এসেছে ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং’, ‘স্পিড মানি’, ‘উপহার’ ইত্যাদি শব্দ। মরহুম অর্থমন্ত্রী এ এম এ মুহিত একবার বলেছিলেন, ঘুষকে অনেকে ‘স্পিড মানি’ বলে— অর্থাৎ কাজ দ্রুত করানোর মূল্য। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একটি রাষ্ট্রে স্বাভাবিক কাজ করতে যদি অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়, তবে সেটি কি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা, নাকি ন্যায়বিচারের অবক্ষয়?
দুর্নীতির আরেকটি ভয়ঙ্কর দিক হলো— এটি নিজেই একটি চক্র তৈরি করে। একজন ঘুষ দিলে অন্যজনও দিতে বাধ্য হয়। একজন কর্মকর্তা ঘুষ নিলে অন্যজনও তা বৈধ মনে করে। ফলে দুর্নীতি একটি ‘স্বাভাবিক প্রক্রিয়া’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই চক্র ভাঙা না গেলে কোনো আইন বা অভিযানই স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে। কোনো ভূমি অফিসে গেলে ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং’-এর কথা বলা হয়, যা মূলত ঘুষের আরেক নাম। আবার কেউ কেউ মনে করেন, সামান্য ঘুষ দিলে বড় কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু এই ‘সামান্য’ দুর্নীতিই একসময় বড় দুর্নীতির ভিত্তি তৈরি করে।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার এবং বিরোধী দল উভয় পক্ষ থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হচ্ছে। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঘোষণা দিয়েছেন— দুর্নীতির সাথে কোনো আপস করা হবে না। একইভাবে বিরোধী দলের নেতা ডা: শফিকুর রহমানও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের কথা বলেছেন।
সরকার ইতোমধ্যে কিছু জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ নিয়েছে— যেমন খাল খনন কর্মসূচি, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ এবং ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা। এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক; কিন্তু প্রশ্ন হলো এই কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নের সময় দুর্নীতি কতটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে? অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ভালো উদ্যোগও দুর্নীতির কারণে ব্যর্থ হতে পারে।
এখানেই আসে রাজনৈতিক সদিচ্ছার গুরুত্ব। শুধু ঘোষণা দিলেই হবে না; বাস্তবে কঠোর নজরদারি, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান যদি নির্বাচনী বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে না; বরং জনগণের আস্থা আরো কমে যাবে।
দুর্নীতি শুধু অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না; এটি রাষ্ট্রের ভিত্তিকেও দুর্বল করে। যখন মানুষ দেখে যে সৎ পথে চললে সুযোগ কম, আর অসৎ পথে চললে সুবিধা বেশি— তখন সমাজে নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটে। তরুণ প্রজন্ম হতাশ হয়ে পড়ে। তারা বিশ্বাস হারায় যে পরিশ্রম ও সততার মাধ্যমে সফল হওয়া সম্ভব।
তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে কেবল প্রশাসনিক বা আইনি ইস্যু হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি নৈতিক আন্দোলন হতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন— সব জায়গা থেকে সততা ও নৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, আর্থিক দুর্নীতি শুধু টাকা লেনদেনের বিষয় নয়; এটি একটি সামগ্রিক সঙ্কট। রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তির নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এই দুর্নীতি। বর্তমান সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই যদি সত্যিকার অর্থে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তবে পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেই পরিবর্তন নির্ভর করবে কথার ওপর নয়, কাজের ওপর।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এক দিনে সম্ভব নয়; কিন্তু সদিচ্ছা, কঠোর প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতার সমন্বয় ঘটলে, এই দীর্ঘ দিনের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়াও অসম্ভব নয়। হ
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক


