দীর্ঘ দেড় যুগ পর ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে প্রায় ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে দেশে অনুষ্ঠিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন এই নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সূচনা করেছে। সংসদীয় স্বৈরাচার থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন নিঃসন্দেহে জনগণের প্রত্যাশা ও সংগ্রামের ফসল।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি সরকার গঠন করেছে এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসেছে। কিছু আসনে ভোট গণনায় কারচুপির অভিযোগ উঠলেও বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে সহজ-সরলভাবে প্রধান বিরোধী দলের দায়িত্ব গ্রহণের বার্তা রাজনীতিতে এক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
এ দেশের প্রায় চার কোটি তরুণ কেবল আওয়ামী লীগ শাসনকাল দেখেই বড় হয়েছে। তাদের কাছে প্রধানমন্ত্রী মানেই ছিলেন শেখ হাসিনা। দীর্ঘ সময়ের একচ্ছত্র শাসনের অভিজ্ঞতা তাদের মনে প্রশ্ন ও প্রতিবাদের জন্ম দেয়। সেই প্রতিবাদ রক্তঝরা আন্দোলনে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারের অবসান ঘটে। তারই ধারাবাহিকতায় ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে নির্বাসিত জীবন থেকে ফিরে এসে তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা রাজনৈতিক ইতিহাসে এক চমকপ্রদ অধ্যায়।
প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমানের কিছু নৈতিক পদক্ষেপ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার, নিজ খরচে জ্বালানি বহন, প্রটোকলের নিরাপত্তা বহর ছোট করা নির্বাচন-পরবর্তী বিরোধী নেতাদের বাসায় সৌজন্য সাক্ষাৎ ইতিবাচক বার্তা দেয়।
আশাব্যঞ্জক নানা ঘটনার মাঝেও শপথ গ্রহণের দিনই রাজনীতিতে দেখা দেয় এক নতুন জটিলতা। সংবিধান সংস্কার বা গণপরিষদের শপথ ও গণভোটের ফল মূল্যায়ন প্রসঙ্গে ঐকমত্যের ঘাটতি রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। জামায়াত-এনসিপি জোট প্রথমে দ্বিধায় থাকলেও পরে শপথ গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে, বিএনপি সাংবিধানিক যুক্তি তুলে ধরে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের শপথ থেকে আপাতত সরে দাঁড়িয়েছে। যদিও তারা বলছে, যেসব বিষয়ে ঐকমত্য আছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করবে তবুও ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ও উচ্চকক্ষ গঠন পদ্ধতি নিয়ে রয়েছে অস্পষ্টতা ও অনীহা।
ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে সঙ্কটের আশঙ্কা
জুলাই কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, এটি মানুষের বাকস্বাধীনতা, ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের পুনর্জন্মের প্রতীক। তাই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অস্পষ্টতা বা গড়িমসি যদি রাজনৈতিক অবিশ্বাস তৈরি করে, তবে তা সঙ্কট থেকে সঙ্ঘাতে রূপ নিতে পারে। এ সঙ্কট এড়ানো অসম্ভব নয়। সরকারি দল যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহঙ্কারে একগুঁয়ে আচরণ না করে এবং বিরোধী দল যদি গঠনমূলক সমালোচনার পথ বেছে নেয়, তবে ঐকমত্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। কারণ জুলাই কারো একক সম্পদ নয়, এটি জনগণের রক্ত, সংগ্রাম ও প্রত্যাশার ফসল।
সুতরাং হঠকারিতা নয়, প্রয়োজন সংলাপ ও সহমতের রাজনীতি। নচেৎ যে জুলাই জাতিকে মুক্তির স্বাদ দিয়েছে, সেই জুলাই-পরবর্তী রাজনীতিই আবার অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে দেশকে।
তবে দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, দমন-পীড়ন ও অনিশ্চয়তার পর দেশে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনেকের কাছেই নতুন আশার দ্বার খুলে দিয়েছে। যে বাস্তবতায় সরকারি দল ও বিরোধী দল উভয়ই অতীতের শাসনামলে নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার ছিল, সেই প্রেক্ষাপটে বর্তমান সংসদকে আমরা মাজলুমদের সংসদ হিসেবে গণ্য করতেই পারি। প্রশ্ন হলো— এই পরিচয় কি কেবল আবেগের, নাকি এটি ভবিষ্যৎ রাজনীতির চরিত্র নির্ধারণ করবে?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, ক্ষমতার পালাবদল সবসময় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনে না। যদি নতুন ক্ষমতাসীনরা পুরনো সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি করেন, তবে জনগণের আশা আবারো হতাশায় রূপ নেবে। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা বিশেষত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যখন রাষ্ট্র ও রাজনীতির ভেতর সংলাপের পথ রুদ্ধ হয়, তখন রাজপথ রক্তাক্ত হয়। সেই ইতিহাস আর ফিরে আসুক, এটি কোনো নাগরিকই চান না।
একটি সভ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে; কিন্তু তা কখনোই সহিংসতার রূপ নেবে না। সংসদ যদি সত্যিই নিপীড়িতদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়, তবে তাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও কার্যকর বিরোধী রাজনীতির চর্চা নিশ্চিত করা। একই সাথে ন্যায়বিচারের প্রশ্নও সামনে আসে। যেকোনো নির্যাতন, গুম, হত্যা বা অবিচারের বিচার নিশ্চিত করতে হবে দল-মত নির্বিশেষে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি কেবল নতুন অন্যায়ের জন্ম দেয়।
এই সংসদ যদি সত্যিই মজলুমদের সংসদ হয়, তবে তাদের দায়িত্ব হবে দুস্থ, অসহায় ও নিপীড়িত জনগণের পাশে দাঁড়ানো। অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাস্তব সংস্কার— এসবেই প্রমাণ মিলবে তাদের অঙ্গীকারের। কেবল বক্তৃতা নয়, বাস্তব নীতি ও প্রয়োগই নির্ধারণ করবে এই সংসদের মর্যাদা। সেই সাথে খেটে খাওয়া মানুষের জন্য সরকারের চিন্তার জগৎ প্রসারিত করতে হবে। আজকের প্রত্যাশা স্পষ্ট নতুন সংসদ হবে প্রাণবন্ত, বিতর্কসমৃদ্ধ, প্রতিহিংসামুক্ত ও গতিশীল। ক্ষমতার অহঙ্কার নয়; জনগণের প্রতি থাকবে দায়বদ্ধতা। যদি এই প্রত্যাশা পূরণ হয়, তবে ত্রয়োদশ সংসদ সত্যিই ইতিহাসে স্থান করে নেবে একটি পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে। আর যদি ব্যর্থ হয়, তবে জনগণের স্মৃতি ও বিচার একদিন তার জবাব দেবে। ইতিহাসের আদালতে তার বিচার হবেই।
জনগণের প্রবল আকাঙ্ক্ষা আবার যেন ‘অশান্ত জুলাই’ ফিরে না আসে, আর যেন রাজপথে তাজা রক্ত না ঝরে, কোনো মায়ের কোল খালি না হয়। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আরেকটি প্রত্যাশা— প্রিয় হাদি ভাইয়ের হত্যার বিচার হোক। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠিত হতে পারে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, স্বাধীনতার প্রায় ৫৫ বছর অতিবাহিত করেও দেশের সংবিধান, বিচারব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক হয়, মানবাধিকার রক্ষার জন্য এখনো রাস্তায় নামতে হয়।



