দালাল আইনের বিচার ও ইতিহাসের পাঠ

১৯৭২ সালের দালাল আইনের বিচার এবং ১৯৭১-এর অপরাধের জন্য পরবর্তী সময়ে পরিচালিত বিচারগুলোর মতো, যেসব বিচার আইনের শাসন বিসর্জন দিয়ে জনতার ইচ্ছা পূরণে পরিচালিত হয়, সেগুলো শেষ পর্যন্ত টেকসই হয় না।

স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে রাষ্ট্রপতি ‘দালাল আইন, ১৯৭২’ (দ্য বাংলাদেশ কোলাবরেটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল) অর্ডার (১৯৭২) জারি করেন। এই আইনের মূল লক্ষ্য ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহায়তাকারীদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা। তবে বছর ঘুরতে না ঘুরতে ১৯৭২ সালের দালাল আইনের অধীনে চলা এই বিচারপ্রক্রিয়া বিতর্কের মুখে পড়ে। দ্রুত এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার এক হাতিয়ারে পরিণত হয়। এ আইনের অধীনে পরিচালিত বিচারগুলো নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে; কারণ এটিই ছিল পরবর্তী সময়ে ১৯৭৩ সালের ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন’-এর অধীনে পরিচালিত বিচারগুলোর প্রত্যক্ষ পূর্বসূরি। এই উভয় আইনের অধীনে যেভাবে মামলা পরিচালনার কাজ সম্পন্ন হয়েছে, তার মধ্যে এক বিস্ময়কর সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য যেকোনো অবিচার রুখতে এ সাদৃশ্যগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা আজ সময়ের দাবি।

দালাল আইনের অধীনে বিপুলসংখ্যক মানুষকে গ্রেফতার ছিল ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রাথমিক লক্ষণ। এ আইনের আওতায় ৩৭ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, অথচ বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হয়েছিল মাত্র দুই হাজার ৮৪২ জনকে। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে ‘ঢাকা ল রিপোর্টস’-এর তৎকালীন সম্পাদক ওবায়দুল হক চৌধুরী এক পর্যবেক্ষণে তুলে ধরেন যে, ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত ‘অপ্রতুল শাস্তি’ নিয়ে জনমনে বিশেষ করে বামপন্থী রাজনীতিকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। তৎকালীন সংবাদপত্রের প্রতিবেদনগুলোতেও সেই চরমপন্থী মনোভাবের প্রতিফলন দেখা যায়। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, ‘বাঙালিরা চোখের বদলে চোখে বিশ্বাস করে’, তাই এখানে কোনো নমনীয়তার সুযোগ নেই (পূর্বদেশ, ১২ আগস্ট ১৯৭২)। তৎকালীন তুখোড় ছাত্রনেতা আ স ম আবদুর রব দাবি করেছিলেন, রাজাকারদের আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগই দেয়া উচিত নয় (পূর্বদেশ, ১৭ আগস্ট ১৯৭২)। এমনকি বেগম মতিয়া চৌধুরীও ঘোষণা করেছিলেন, রাজাকারদের জন্য একমাত্র নীতি হওয়া উচিত মৃত্যুদণ্ড (পূর্বদেশ, ১১ আগস্ট ১৯৭২)। ওবায়দুল হক চৌধুরী লক্ষ করেছিলেন যে, খোদ সরকারি দল আওয়ামী লীগের ভেতরেও ট্রাইব্যুনালের দেয়া সাজা নিয়ে গভীর অসন্তোষ ছিল।

১৯৭২ সালের ট্রাইব্যুনালগুলো অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ে স্বাধীন আদালতের মতো আচরণ করেছিলেন। যেখানে সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাব ছিল সেখানে খালাস দেয়া হয়েছে, আর সাজা নির্ধারণ করা হয়েছিল স্লোগানের ওপর ভিত্তি করে নয়; বরং সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে। কিন্তু যখন জনরোষ তীব্র হতে শুরু করল, ট্রাইব্যুনালগুলো কঠোরতর সাজা প্রদানে একপ্রকার বাধ্য হলেন। তাই বলে জনমত যে কখনো স্থীতিশীল হচ্ছিল এমন নয়। ধীরে ধীরে এই কোলাবরেটরদের বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে দেখা হতে লাগল। যারা একসময় সংক্ষিপ্ত বিচার বা তাৎক্ষণিক মৃত্যুদণ্ডের দাবি তুলেছিলেন, তারা পরে সরকারের বিরুদ্ধে ‘বিরোধী দমনে’র (উইচ হান্টিং) অভিযোগ আনলেন। এমনকি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ নিজেও পরে ১৯৭২ সালের দালাল আইনের অপব্যবহারের সমালোচনা করেন। মওলানা ভাসানী আইনটি সম্পূর্ণ বাতিলের আহ্বান জানান। অবশেষে ১৯৭৩ সালের নভেম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার মধ্য দিয়ে এ বিচারপ্রক্রিয়ার পরিসমাপ্তি ঘটে। এই সাধারণ ক্ষমার আওতায় অপেক্ষাকৃত লঘু অপরাধে অভিযুক্তদের ক্ষমা করা হয়, তবে হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মতো গুরুতর অপরাধে অভিযুক্তদের এই ক্ষমার বাইরে রাখা হয়। তবে যুদ্ধোত্তর ন্যায়বিচার নিয়ে বাংলাদেশের পরীক্ষা-নিরীক্ষার এখানে শেষ হয়নি। এর মধ্যে সংসদ ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন প্রণয়ন করে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তান সশস্ত্রবাহিনীর চিহ্নিত ১৯৫ সদস্যের বিচার। কিন্তু এ বিচার কার্যক্রম আর শুরু হয়নি। ভারত ও পাকিস্তানের সাথে আঞ্চলিক কূটনীতি, যুদ্ধবন্দী বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের প্রশ্নে এসব বিচার জটিল কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশের মধ্যে আটকে যায়। ২০১৩ সালে লেখা এক নিবন্ধে ড. কামাল হোসেন স্বীকার করেন, ওই ১৯৫ জন পাকিস্তানি কর্মকর্তাকে ক্ষমা প্রদানের জন্য বাংলাদেশের ওপর তীব্র আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ ছিল।

সুস্পষ্টভাবে বলতে গেলে, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিচার কিংবা দালাল আইনের অধীনে চলা বিচারগুলো শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে বন্ধ হয়ে যায়নি। এগুলো বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন স্বয়ং শেখ মুজিবুর রহমান। প্রথমটি (পাকিস্তানিদের বিচার) পরিত্যক্ত হয়েছিল আন্তর্জাতিক কূটনীতির বাস্তবতার কারণে, আর দ্বিতীয়টি (দালাল আইনের বিচার) বন্ধ করা হয়েছিল কারণ তা ততদিনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধের বিচারের বিষয়টি কয়েক দশক পর এক ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ফের সামনে আসে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে বামপন্থী দলগুলো এবং আওয়ামী লীগের একটি অংশ নতুন করে এ বিচার শুরুর জোরালো প্রচারণা চালায়। এবার তাদের মূল লক্ষ্য ছিল মানবতাবিরোধী অপরাধের কথা বলে জামায়াত নেতাদের দিকে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় তাদের সেই সুযোগ এনে দেয়। তবে এখানে একটি মৌলিক সমস্যা ছিল, ১৯৭৩ সালের মূল আইনটি কখনো বেসামরিক নাগরিকদের বিচারের জন্য তৈরি করা হয়নি; এটি করা হয়েছিল দখলদার সেনাবাহিনীর সদস্যদের বিচারের উদ্দেশ্যে। এ আইনি বাধা দূর করতে ২০০৯ সালে সংসদ ১৯৭৩ সালের আইনটি সংশোধন করে, যা বেসামরিক ব্যক্তিদের বিচারের পথ প্রশস্ত করে। ২০১০ সালে গঠিত হয় প্রথম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এবারো বামপন্থী আইনজীবী, অ্যাক্টিভিস্ট এবং রাজনীতিবিদরা ছিলেন এ বিচারের প্রধান চালিকাশক্তি।

বহুল আলোচিত ‘স্কাইপ কেলেঙ্কারি’র মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বিচারকদের নিয়োগ দেয়া হয়েছিল, তখন বিচারপতি মো: নিজামুল হক কতটা অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তবে তাদের সেই হতাশা দূর হতে দেখা যায় যখন হাসানুল হক ইনুর মতো বামপন্থী রাজনীতিবিদরা প্রভাব বিস্তারের অবস্থানে চলে আসেন।

১৯৭২ সালে একদল বামপন্থী রাজনীতিবিদ যেভাবে সাক্ষ্য-প্রমাণের তোয়াক্কা না করে দালাল আইনে অভিযুক্তদের কঠোরতম শাস্তির দাবি তুলেছিলেন, চার দশক পর ইতিহাসের ঠিক একই পুনরাবৃত্তি ঘটল। ২০১৩ সালে যখন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হলো, তখন শাহবাগে এক নতুন জনসমাবেশ বা ‘মব’ তৈরি করা হলো, যাদের দাবি ছিল মৃত্যুদণ্ড। এই জনসমাবেশকে সরকার পরোক্ষভাবে উৎসাহ ও সহানুভূতি জুগিয়েছিল। সরকারি পাহারায় তাদের সংগঠিত হওয়া এবং জনসমাগমের জায়গাগুলো দখল করে রাখার সুযোগ করে দেয়া হয়। অবশেষে শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে পরামর্শ দিলেন যে, আদালতের উচিত রাজপথের জন-আকাক্সক্ষার প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা। এর ফল ছিল অনুমেয়। কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলো এবং পর্যায়ক্রমে আরো পাঁচজন বিরোধীদলীয় নেতাকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানো হলো। এভাবে আরো একবার জনতাকে (মব) বিচারিক সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেয়া হলো।

আওয়ামী লীগ শাসনের শেষপ্রান্তে এসে আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচারের এ পুরো প্রকল্পটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ২০১২ সালে যেখানে দু’টি ট্রাইব্যুনাল সচল ছিল, ২০২৫ সালের মধ্যে তা একটিতে নেমে আসে। এমনকি সেই একক ট্রাইব্যুনালটিতেও কাজ চালানোর মতো প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিচারক ছিলেন না। আগের দালাল আইনের ট্রাইব্যুনালগুলোর মতো এই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালটিও ততদিনে দেশে-বিদেশে এক নেতিবাচক ভাবমর্যাদা অর্জন করে ফেলেছিল। উভয় বিচার প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলকে দমনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। তবে এ দুই আমলের বিচারের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য ছিল, ১৯৭২ সালে বিচার বিভাগ অনেক বেশি স্বাধীন ছিল এবং রাজনৈতিক চাপ সত্তে¡ও তখন কাউকে ফাঁসি দেয়া হয়নি। অন্য দিকে বিগত আওয়ামী লীগ আমলের যুদ্ধাপরাধ বিচার চলাকালীন উচ্চ আদালত কেবল পক্ষপাতদুষ্টই ছিলেন না; বরং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ফাঁসি নিশ্চিত করতে আইনেরও পরিবর্তন ঘটানো হয়েছিল।

২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ নেতাদের বিচারের প্রস্তুতি হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আবারো পুনর্গঠন করা হয়েছে। দলটির অনেক সদস্য ও সমর্থককে কোনো সুনির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণ ছাড়া নির্বিচারে গ্রেফতার করা হয়েছে। এটি প্রায় অনিবার্য যে, ট্রাইব্যুনালগুলোর ওপর সাজা নিশ্চিত করতে এবং কঠোর দণ্ড প্রদানের জন্য বড় ধরনের চাপ আসবে। তবে ইতিহাস আমাদের এক স্পষ্ট সতর্কতা দেয়। বিচারপ্রক্রিয়া যদি প্রমাণের বদলে জনদাবিতে পরিচালিত হয় এবং আদালত যদি আবারো রাজপথের উচ্ছৃঙ্খল জনতার (মব) দাবির কাছে নতি স্বীকার করেন, তবে এর পরিণতিও হবে আগেকার মতো।

১৯৭২ সালের দালাল আইনের বিচার এবং ১৯৭১-এর অপরাধের জন্য পরবর্তী সময়ে পরিচালিত বিচারগুলোর মতো, যেসব বিচার আইনের শাসন বিসর্জন দিয়ে জনতার ইচ্ছা পূরণে পরিচালিত হয়, সেগুলো শেষ পর্যন্ত টেকসই হয় না।

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি