আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

বাংলা ভাষা চর্চা যেন এখন শুধু ফেব্রুয়ারি মাসকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমরা বাংলা ভাষাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করে থাকি; কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাস শেষে সারা বছর যেন তা বেমালুম ভুলে যাই। শুদ্ধভাবে ভাষা চর্চার জন্য, ভাষা বিষয়ে গবেষণা করার জন্য আমাদের আরো অনেক বেশি আন্তরিক হওয়া উচিত

ভাষা মানুষের জীবনে অতি মূল্যবান সম্পদ। কয়েক সহস্র ভাষার মধ্যে বাংলা একটি অন্যতম প্রধান ভাষা। নিজস্ব সমৃদ্ধ শব্দভাণ্ডার থাকার পরও যুগে যুগে নানা ভাষা থেকে প্রয়োজনীয় শব্দ-সম্ভার নিয়ে বাংলা ভাষা উৎকর্ষ লাভ করেছে। মাতৃভাষা সমাসবদ্ধ পদ। বাংলা ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস। আভিধানিক অর্থ স্বদেশের ভাষা। ভাষা খেলা করে জিবের ডগায়। ঘোষিত হয় গলার মধ্য দিয়ে। প্রাণ লাভ করে ফুসফুসে আর এর উৎসমূল মানুষের মন। প্রতিটি শিশুর জন্য মায়ের দুধ যেমন পুষ্টিকর, তেমনি প্রতিটি মানুষের জীবনের উন্নতির জন্য মাতৃভাষা পুষ্টিকর। ভাষা যেকোনো জাতির মেধার অনন্য লালন ক্ষেত্র।

মাতৃভাষাকে অবলম্বন করেই গড়ে উঠেছে প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্বের সব মানুষের এক মৌলিক সম্পদ হচ্ছে তার মাতৃভাষা। একমাত্র মাতৃভাষার মাধ্যমেই মানুষ তার মনের ভাবকে পরিপূর্ণ প্রকাশ করতে পারে। আমাদের মাতৃভাষার জন্য ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বুকের তাজা রক্ত দিয়ে তরুণরা আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাই এই দিনটিকে বিশ্ববাসী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

ভাষাবিজ্ঞানীদের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে জানা যায়, ভাষার জন্ম হয়েছিল আজ থেকে প্রায় পাঁচ লাখ বছর আগে। বর্তমানে পৃথিবীতে ছয় ৭০০-এর অধিক ভাষা প্রচলিত আছে। বর্তমান শতকেই সবচেয়ে বেশি ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি এক সপ্তাহে একটি করে ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

বাঙালির জাতীয় চেতনা সুসংহত করা, বাঙালি সংস্কৃতির স্বকীয়তা শনাক্ত করা, সর্বোপরি বাঙালির আত্মপরিচয় অনুসন্ধানে কৌতূহলী করে তোলা— এসবই তো একুশের কাছ থেকে পাওয়া। এর সাথে জড়িয়ে আছে বাঙালির গৌরব ও বেদনার ইতিহাস।

সভ্য মানুষের কাছে মাতৃভাষা হলো দ্বিতীয় মা। যে কোনো জাতির আত্মপরিচয়ের মধ্যে তার মাতৃভাষা খুবই মূল্যবান। একটি দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হচ্ছে ভাষা। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে ভাষা হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী কার্যকর মাধ্যম। মাতৃভাষার প্রচলন শুধু ভাষাগত বৈচিত্র্য, বহুভাষাভিত্তিক শিক্ষাকেই উৎসাহিত করবে না, তা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অনুধাবন ও উন্নয়নের ক্ষেত্রেও অবদান রাখবে। প্রতিটি মাতৃভাষাকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়া, বিশেষ করে দুর্বল ও জীর্ণ মাতৃভাষাগুলোকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা এবং দুর্বল বলে কোনো ভাষার ওপর প্রভুত্ব আরোপের অপচেষ্টা না করাই হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য। প্রত্যেক ভাষাভাষী মানুষ এ দিনে নিজের মাতৃভাষাকে যেমন ভালোবাসবে তেমন অন্য জাতির মাতৃভাষাকেও মর্যাদা দেবে। পৃথিবীর সব মানুষের মাতৃভাষাকে সম্মান জানানোর দিন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় বাংলাদেশে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, আর্ন্তজাতিক যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা রীতিমতো প্রান্তিক ভাষায় পরিণত হয়েছে। অথচ কথা ছিল, অন্যান্য ভাষা থেকে বাংলায় ভাষান্তর করে মানুষের পাঠ উপযোগী করে তোলা হবে সব বই। প্রথম দিকে সে উদ্যোগ চোখেও পড়ে। পরেবর্তী সময়ে তা ঝিমিয়ে পড়ে। বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার পেছনে যে উদ্দেশ্য ছিল, সেটিও আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।

দুই যুগের অধিককাল আগে জাতিসঙ্ঘ কর্তৃক একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি লাভ করে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সত্ত্বেও সমাজ-রাষ্ট্রের সর্বপর্যায়ে বাংলা ভাষার প্রচলন ও ব্যবহারে আমরা পুরোপুরি সফল হতে পারিনি। এখনো অফিস, আদালত, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যায় বিদেশী ভাষার ব্যবহার। আমরা জাতি হিসেবে আবেগতাড়িত হয়ে সবই আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জন করতে পারি; কিন্তু এর সুফল পুরোপুরি ভোগ করতে যেন এতটা আগ্রহ বোধ করি না।

দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক সর্বস্তরে মাতৃভাষা ব্যবহারের বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। তারপরও আমরা তা ব্যবহারে সর্বজনীন হতে পারছি না। বাংলাভাষা চর্চা যেন এখন শুধু ফেব্রুয়ারি মাসকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমরা বাংলাভাষাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করে থাকি; কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাস শেষে সারা বছর যেন তা বেমালুম ভুলে যাই। শুদ্ধভাবে ভাষা চর্চার জন্য, ভাষা বিষয়ে গবেষণা করার জন্য আমাদের আরো অনেক বেশি আন্তরিক হওয়া উচিত।

মাতৃভাষার চর্চা ও বিকাশের জন্য প্রত্যেকের ব্যক্তিগত উপলব্ধিকে শাণিত করতে হবে, পরিভাষা-অভিধানসহ সম্ভাব্য সব উপকরণ সহজলভ্য করার মাধ্যমে ভাষাচর্চার পরিবেশ তৈরি করতে হবে এবং বিজাতীয় মনমানসিকতা থেকে বিনা প্রয়োজনে বিদেশী ভাষা ব্যবহারের চেষ্টাকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। যদি সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু না হয় তবে একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।

কবি, লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, দার্শনিক তথা কলম কারিগররা মাতৃভাষায় তাদের সুনিপুণ লেখনির আঁচড়ে কাব্য, সাহিত্য ও বিভিন্ন মতবাদ রচনা করেছেন এবং যথাযথ সম্মানও পেয়েছেন। বাংলা সাহিত্যের প্রাণপুরুষ মাইকেল মধুসূদন দত্ত মাতৃভাষা ছেড়ে ইংরেজিতে সাহিত্য রচনা করতে যেয়ে ব্যর্থ মনোরথে ফিরে এসে পুনরায় বাংলা ভাষায় কলম ধরে সফলকাম হয়েছিলেন।

ভাষা আন্দোলনের অর্জন সমুন্নত রাখতে নারী-পুরুষ, তরুণ-যুবক তথা সব বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধভাবে সচেষ্ট থাকতে হবে। আমাদের অবিরাম সংগ্রাম করে যেতে হবে। পৃথিবীতে মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার জন্য আত্মাহুতি দেয়ার ঘটনা বিরল। বাংলা ও বাঙালির ভাষাগত ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে হবে আমাদের। এর মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনে প্রাণ উৎসর্গকারীদের প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শন করা সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করি।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও সহযোগী অধ্যাপক, শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ, শেরপুর।