বাংলা অভিধানে ‘হলফ’ শব্দের অর্থ ‘সত্য বলার শপথ’। কাছাকাছি শব্দ ‘সত্যনামা’। নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের সম্পর্কে শপথ করে সত্য তথ্য প্রকাশ করেন, সেটিই হলফনামা। হলফনামা একটি ছোটখাটো আমলনামা। নির্বাচনী হলফনামা দিয়ে রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের একটি গড়পড়তা ধারণা মিলতে পারত। বাস্তবতা হয় ভিন্ন। গৎবাঁধা মনগড়া চাতুরীর চর্চাই হয়। সরকার বা কোনো কর্তৃপক্ষের জবরদস্তি না করে প্রার্থীর নিজেই নিজের সম্পদের হিসাব দেয়া এক অর্থে সম্মানের। সেই সম্মান মর্যাদা বেশির ভাগ প্রার্থী রাখেন না।
প্রার্থীরা যে বার্ষিক আয়ের অঙ্কটা হলফনামায় উল্লেখ করেন, সেটি হয়তো তাদের বৈধ আয়। অবৈধ আয়ের কথা উল্লেখ করা যেহেতু আইনসিদ্ধ নয়, ফলে তারা এটি গোপন করেন। কিছু প্রার্থী হয়তো তাদের প্রকৃত আয়ের কথা হলফনামায় উল্লেখ করেন। হলফনামায় প্রার্থীদের নাম ও বিস্তারিত পরিচয়, পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, মামলার বিবরণ (যদি থাকে), আয়ের উৎস, সম্পত্তি ও দায়ের বিবরণী, প্রতিনিধিত্বের ইতিহাস (আগে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে থাকলে তার বিবরণ), ঋণসংক্রান্ত তথ্য, আয়করসংক্রান্ত তথ্য দিতে হয়। সেই আলোকে তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ২০২৫-২৬ করবর্ষে আয়কর রিটার্নে দেখানো আয়ের পরিমাণ ছয় লাখ ৭৬ হাজার ৩৫৩ টাকা। মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় এক কোটি ৯৭ লাখ টাকা। আর তার স্ত্রী জুবাইদা রহমানের সম্পদের পরিমাণ এক কোটি পাঁচ লাখ ৩০ হাজার টাকা। হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, বগুড়া-৬ এবং ঢাকা-১৭ আসন থেকে প্রার্থী হতে মনোনয়ন জমা দেয়া তারেক রহমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা উচ্চ মাধ্যমিক বা এইচএসসি পাস। তিন লাখ ৪৫ হাজার টাকা মূল্যের অকৃষি জমি রয়েছে তার নামে। এ ছাড়া একটি উপহার পাওয়া জমি, যার আর্থিক মূল্য অজানা বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন তারেক রহমান। মোট ৭৭টি মামলার তথ্যও দিয়েছেন তারেক রহমান।
বিএনপির মনোনয়নপত্র জমা দেয়া প্রার্থীদের হলফনামায় পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, কোটিপতি ২২৩ জন, যা বিএনপির মোট প্রার্থীর ৮৩ শতাংশ। বিশ্লেষণে প্রার্থীর পেশার বৈচিত্র্যও দেখা গেছে। পেশার দিক থেকে সর্বোচ্চ ১৭০ জন ব্যবসায়ী রয়েছেন। এ ছাড়া আইনজীবী ২৯, প্রকৌশলী ২৪, শিক্ষক ২০, চিকিৎসক ১১ এবং কৃষিজীবী চারজন। এ ছাড়া গৃহিণী বা অন্য পেশায় আছেন এমন প্রার্থীর সংখ্যা দু’জন। একমাত্র বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান হলফনামায় পেশা হিসেবে রাজনীতিবিদ উল্লেখ করেছেন।
ঢাকা-১৫ সংসদীয় আসনে জামায়াত প্রার্থী ডা: মো: শফিকুর রহমানের শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘরে সর্বোচ্চ ডিগ্রি এমবিবিএস এবং পেশায় চিকিৎসক। তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ প্রায় দেড় কোটি টাকা। তার কোনো ঋণ নেই। সবশেষ করবর্ষে আয় তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা। একটি গাড়ি এবং ১০ ভরি স্বর্ণের উল্লেখ রয়েছে হলফনামায়। অধিগ্রহণকালে যার মূল্য পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ২১৭ শতক কৃষিজমি যার আর্থিক মূল্য প্রায় আঠারো কোটি টাকা, ১৩ শতক অকৃষি জমি যার আর্থিক মূল্য দুই কোটি ৫৪ লাখ টাকা এবং ২৭ লাখ টাকা মূল্যের একটি ডুপ্লেক্স বাড়ির উল্লেখ রয়েছে শফিকুর রহমানের হলফনামায়। মোট ৩৪টি মামলার তথ্যও উল্লেখ করেছেন জামায়াতের আমির।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে মনোনয়নপত্রের সাথে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্যাবলির সমন্বয়ে একটি করে হলফনামা জমা দেয়ার বিধান চালু হয়। এর জন্য গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে সংশোধনী আনা হয়। সংশোধিত আইন মোতাবেক গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ১২(৩বি) অনুচ্ছেদ অনুসারে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব প্রার্থীকে মনোনয়নপত্রের সাথে হলফনামার মাধ্যমে ১০টি তথ্য এবং কোনো কোনো তথ্যের স্বপক্ষে কাগজপত্র দাখিল করতে হয়। আইন অনুযায়ী, মনোনয়নপত্রের সাথে হলফনামার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যাবলি ভোটারদের মধ্যে প্রচারের ব্যবস্থা করতে হয়।
আইনে রয়েছে মিথ্যা তথ্য দিলে শাস্তির বিধান। অথচ এখানে রিল্যাক্স। খুব কম ক্ষেত্রেই হলফনামায় ভুল, মিথ্যা বা তথ্য গোপনের শাস্তি হয়েছে। হলফনামায় যেসব সম্পদের হিসাব দিতে হয়, তার সংজ্ঞা অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত ও পুরনো। এতে দেশে-বিদেশে রাখা সম্পদ, বেনামী সম্পত্তি, আত্মীয়স্বজন বা সহযোগীদের নামে রাখা সম্পদ রাখার সুযোগ অবারিত। দীর্ঘ দিন ধরে বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি প্রশ্নের মুখে পড়লেও তা বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে রূপ নেয় না। ক্ষমতায় থাকাবস্থায় সম্পদ বাড়াকে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘রাজনৈতিক বাস্তবতা’ হিসেবে মেনে নেয়ার সংস্কৃতি আরো বেগবান হয়। নির্বাচন কমিশনের কাজ বলতে গেলে তা গ্রহণ করা। সত্য-মিথ্যা জানার দিকে যায় না। সেই সামর্থ্যও তাদের নেই। তাদের হাতে তদন্তকারী সংস্থা, ফরেনসিক অডিট বা স্বতন্ত্র আর্থিক অনুসন্ধানের ক্ষমতা সীমিত। তাই হলফনামা ইসি এবং প্রার্থী উভয়ের কাছে কেবলই একটি আনুষ্ঠানিকতার বিষয়। এ হলফনামা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলেও সাধারণ ভোটারের পক্ষে সেসব তথ্য বিশ্লেষণ, যাচাই ও তুলনা করা বাস্তবসম্মত নয়। আর গণমাধ্যমের কাছে তা নিয়ে দিনকয়েক সংবাদ হয়।
কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে সারা পৃথিবীতেই রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের গড়পড়তা ধারণা নেতিবাচক। মানুষ মনে করে, রাজনীতিবিদরা যা বলেন, তার বড় অংশই মিথ্যা, চাপাবাজি, কথার ফুলঝুরি, প্রতিশ্রুতির বেলুন। বিশেষ করে নির্বাচনের সময় ভোট পাওয়ার জন্য তারা যা বলেন, যেসব প্রতিশ্রুতি দেন, ভোটে জয়ের পরে তার অধিকাংশই ভুলে যান। আবার তারা নিজেদের উপার্জন সম্পর্কে যেসব তথ্য প্রকাশ করেন, সেখানেও থাকে নানা ফাঁকিবাজি এবং হাস্যকর অবিশ্বাস্য সব অঙ্ক। তবে সব রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে এমন ধারণা সঠিক নয়। অনেক রাজনৈতিক দল এসব ক্ষেত্রে সততার পরিচয়ও দিয়েছে।
মনোনয়নপত্রের সাথে হলফনামা দেয়ার এই বিধানটি নির্বাচনী আইনে যুক্ত হয় মূলত একটি বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ২০০৫ সালের ২৪ মে হাইকোর্ট একটি যুগান্তকারী রায় দেন। আদালত রায়ে বলেন, ভোটারদের তথ্য জানার অধিকার সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার’ একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০০৫ সালে হাইকোর্ট এই নির্দেশনা দিলেও তৎকালীন নির্বাচন কমিশন তা কার্যকর করতে গড়িমসি করে। পরে ২০০৭-২০০৮ সালে তত্ত¡াবধায়ক সরকারের আমলে এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বধানী নির্বাচন কমিশন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করে মনোনয়নপত্রের সাথে হলফনামা জমা দেয়া বাধ্যতামূলক করে। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল, জনগণ যাদেরকে ভোট দিচ্ছে, তাদের ব্যাপারে আগেই সম্যক ধারণা লাভ। শুধু ব্যক্তির পরিচয়, পারিবারিক ঐতিহ্য কিংবা দলীয় প্রতীকের ওপর নির্ভর করে যাতে ভোটাররা কাউকে ভোট না দেন; বরং ভোট দেয়ার আগে যাতে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, জীবনাচরণ, উপার্জনের স্বচ্ছতা ইত্যাদি বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা লাভ করতে পারে, সে জন্য হলফনামার এই বিধান করা হয়। বাস্তবে ১০টি তথ্যের মধ্যে আয়ের উৎস এবং বার্ষিক আয় সম্পর্কে অধিকাংশ প্রার্থীই যে সত্য তথ্য দেন না। ওপেন সিক্রেটে তথ্য গোপন করেন। এর পেছনে কাঠামোগত দুর্বলতা, আইনি ফাঁকফোকর, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা সব মিলিয়ে একাধিক কারণ কাজ করে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী এবার, দেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল রয়েছে ৫৯টি। এর মধ্যে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ৫১টি রাজনৈতিক দল। তাতে ৩০০ আসনে দুই হাজার ৫৮২টি মনোনয়নপত্র দাখিল হয়েছে। প্রার্থীদের জন্মতারিখ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আয়ের উৎস, সম্পদের বিবরণ ও মামলার তথ্যসহ হলফনামা দাখিল বাধ্যতামূলক। এসব তথ্য অসত্য প্রমাণিত হলে মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এমনকি কেউ যদি হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দেন, তার বিরুদ্ধে ‘কাউন্টার এফিডেভিট’ দেয়ারও বিধান রয়েছে। অথচ প্রার্থীদের হলফনামায় থাকা তথ্য নির্বাচন কমিশন সঠিকভাবে যাচাই করে না, অতীতে এমন অভিযোগ থাকলেও এবার এখান থেকে বেরিয়ে আসার কথা জানিয়েছিল নির্বাচন কমিশন; কিন্তু এখন পর্যন্ত তা হয়নি।
নির্বাচন কমিশনে নেতাদের সম্পদের হলফনামা একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক ধারণা; কিন্তু প্রকৃত চিত্র না আসার কারণ ব্যক্তিগত অসততা যতটা নয়, তার চেয়েও বেশি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। সম্পদের হলফনামা গণতন্ত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ নথি না হয়ে কেবল আরেকটি আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র হয়েই থেকে যাবে। আর তাই নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের হলফনামা দেয়ার প্রক্রিয়াটিকে আনুষ্ঠানিক না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক করা গেলে তা ইতিবাচক হতো।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট



