বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, ‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।’ এর অর্থ, যে যেখানে থাকার উপযুক্ত, তার সেখানে থাকাই শ্রেয়। তা না হলে বিষয়টি শ্রী হারায়। তাই যে যেখানে উপযুক্ত বা মানানসই তাকে সেখানে রাখাই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বাঞ্ছনীয় হলেই যে তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয়, তা হলফ করে বলা মুশকিল। অস্বীকার করার উপায় নেই, আমাদের সমাজ বাস্তবতায় অনেক অবাঞ্ছনীয় বিষয় অনেককে হরদম করতে দেখা যায়। যেমন- সবার সাথে ভদ্র আচরণ করাই স্বাভাবিক। যত বিব্রতকরই হোক না কেন সবসময় শিষ্টাচার বজায় রাখা সমীচীন। ইদানীংকালে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তার ব্যত্যয় ঘটছে।
আমাদের সমাজে ভদ্রতা দিন দিন লোপ পাচ্ছে। শিষ্টাচারও বিদায় নিতে শুরু করেছে। এর সরল মানে, দেশে ভদ্রলোকের আকাল পড়েছে। প্রকৃতপক্ষে ভদ্রতাকে এখন দুর্বলতা ভাবা হয়। অনেকে মনে করেন, দুর্বলরা নিজেদের রক্ষায় ভদ্রতার ঢাল ব্যবহার করে থাকেন।
দেশের মানুষ আগের চেয়ে বুদ্ধিমান হয়েছেন, কথ্য ভাষায় যাকে আমরা সাবালক বলি। তাই তো চার দিকে বালেগের ছড়াছড়ি। এতে ভদ্রতার কার্যকারিতা হারিয়েছে। ফলে বঙ্গসমাজে এখন ভদ্রলোক দুর্লভ। তবু কালে ভদ্রে এমন ভদ্রলোকের দর্শন মেলে বৈকি। তেমন একজন হলেন গত বুধবার নিয়োগ বাতিল হওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। এখন পর্যন্ত তার নীতি পরায়ণতা ও ন্যায়নিষ্ঠতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেননি। খোদ নতুন নিয়োগ পাওয়া গভর্নর মো: মোস্তাকুর রহমানও তার ন্যায়নিষ্ঠার সাফাই গিয়েছেন। সবার সরল স্বীকারোক্তি, তিনি শতভাগ কর্মনিষ্ঠ ও ন্যায়পরায়ণ একজন ব্যক্তি। সেই আহসান এইচ মনসুর শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণের শিকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মজীবনে তার বিদায়বেলা হয়েছে তিক্ত। এ নিয়ে সাংবাদিকরা অর্থমন্ত্রীকে প্রশ্ন করলে তিনি জবাবে বলেন, কিছু বলার নেই।
ভূমিধস বিজয় পেয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করেছে। তবে কে জানত এর সাথে সাথে অর্থ মন্ত্রণালয়ের শিষ্টাচার ও ভদ্রতায় ভূমিধস পতন হবে। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী অমায়িক, ভদ্র ও সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। মিডিয়ায় তার পরিমিত শব্দচয়ন প্রশংসার দাবি রাখে। অবশ্য সেটি আওয়ামী জমানার দুঃশাসনের সময়কালের কথা। তখন কোণঠাসা বিএনপির অমায়িক নেতা ছিলেন আমীর খসরু। তবে এ কথাও ঠিক তিনি ভদ্র হবেন না কেন? তার বাবা মাহমুদুন্নবী চৌধুরী ছিলেন পাকিস্তান আমলে একজন আলোচিত নেতা। বনেদি পরিবার। পারিবারিক উত্তরাধিকার হিসেবেই বিনয় ও ভদ্রতার শিক্ষা পেয়েছেন। কিন্তু ক্ষমতায় গেলে কার্য হাসিলে মাঝে মধ্যে ভদ্রতা পাশে সরিয়ে রাখতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ে তেমন কিছু ঘটেছে কি না তা আমাদের জানা নেই।
নিজের চেয়ে দুর্বলের সাথে আচরণে ভদ্রতা বা শিষ্টাচার অবশিষ্ট থাকে না। ভদ্রতার মুখোশ খসে পড়ে। যেমন দেওয়ালের পুরনো পলেস্তারা খসে পড়ে, ঠিক তেমনি। অর্থাৎ ভদ্রতা, বিনয়, শিষ্টাচার যদি ক্ষমতায় গেলেও বলবৎ থাকে, তা হলে ধরে নিতে হবে ওই ব্যক্তির এসব বিষয় টেকসই। তাই ক্ষমতার নিক্তিতে মেপে নেয়া যায় কার ভদ্রতা-শিষ্টাচার আসল না নকল। রাষ্ট্রচারে নিয়মনীতির অনুসরণ করে ভদ্রতা-শিষ্টাচার প্রদর্শন করতে হয়, এখানে কি গোল বেঁধেছে নতুন অর্থমন্ত্রীর? তার আগের ক্লিন ইমেজ কি খানিকটা প্রশ্নবিদ্ধ হলো? বনেদি পরিবারের ছেলের জন্য এমন কালো দাগ কবে মোচন হবে; বলা মুশকিল। না অমোচনীয় থেকে যাবে- তা ভবিষ্যৎ বলে দেবে।
যে ঘটনা নিয়ে এত কথা, সেই ঘটনার মূল চরিত্র আহসান এইচ মনসুর প্রসঙ্গে ফিরে আসি। ফ্যাসিবাদে বিশ্বাসী, শেখ হাসিনা সাড়ে ১৫ বছরে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের (জনগণের অর্থ) মাত্র ২৮ লাখ কোটি টাকা লোপাট করে বিদেশে পাচার করেছেন। ফলে দেশের অর্থনীতি বিশেষ করে আর্থিক ও ব্যাংক খাত গভীর খাদে নিমজ্জিত হয়। রসাতলে যাওয়া ব্যাংক ও আর্থিক খাত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে টেনে তোলেন আহসান এইচ মনসুর। এটি যে কঠিন ছিল তা ইতোমধ্যে স্বীকৃত। সেই তাকে গভর্নরের পদ থেকে পত্রপাঠ বিদায় করা হয়েছে। এটি যে কারো জন্য সুখকর হয়নি, তা না বলাই ভালো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দঙ্গল কর্মকর্তা কর্মচারী মবোক্র্যাসি করে তার শেষ কর্ম দিবসটিতে ছন্দপতন ঘটিয়েছেন। এমন কর্ম করে তারা যখন তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছিলেন, ঠিক তখনই সোশ্যাল মিডিয়া ও মূলধারার গণমাধ্যমে তাদের তির্যক বাক্যবাণে তুলোধুনা করতে থাকেন অনেকে। নতুন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীও এ থেকে বাদ পড়েননি।
সমস্বরে প্রশ্ন উঠেছে, কেন আহসান এইচ মনসুরকে আগেই জানানো হলো না, তাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে রাখা হবে না। সসম্মানে তাকে বিদায় জানালেই তো হতো। তা না করে শেষ কর্মদিবসের কর্মসম্পাদন করতে গিয়ে সদ্য বিদায়ী গভর্নর সাংবাদিকদের মাধ্যমে জানতে পারেন; তাকে গভর্নর পদে রাখা হবে না। এ ঘটনায় নিন্দুকেরা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মতো ক্লিন ইমেজের রাজনীতিকের ব্যাপারেও ফিশফাশ করতে ছাড়ছেন না।
এ ঘটনায় আমরা মোটেও অবাক হয়নি। এতে বিস্ময়েরও কিছু নেই। আমাদের সমাজে প্রচলিত লোককথা আছে উপকারীকে বাঘে খায়। আরো চালু আছে, উপকার করলে যাকে উপকার করা হলো তার দ্বারা অনিষ্টের জন্য মানসিক প্রস্তুতি থাকা চাই। আমাদের মানসিকতা হলো উপকারকারীর অপকার করা না পর্যন্ত পেটের ভাত হজম হয় না। খাবার হজম না হলে তা তো নির্ঘাত বদহজম হবে। কে চায় বদহজমের মাধ্যমে শারীরিক অসুস্থ ডেকে আনতে। এই মানসিকতা শুধু ব্যক্তিপর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, জাতীয়পর্যায়েও এর চর্চা জারি রয়েছে। তাই তো হাসিনা আমলে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে ভঙ্গুর অবস্থা থেকে তুলে এনে সবল করার প্রতিদান পেলেন তাৎক্ষণিকভাবে আহসান এইচ মনসুর। প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে শিষ্টাচার বহির্ভূতভাবে বিদায়। এ কাজের কাণ্ডারি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন আমাদের নতুন অর্থমন্ত্রী।
মনে রাখা দরকার, আমাদের বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় যোগ্য ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তিদের কদর আগের মতো আর নেই। এ ধরনের মানুষ যেহেতু ঘাড়ত্যাড়া হন, ক্ষমতাসীনরা তাদের এড়িয়ে চলতেই পছন্দ করেন। মুশকিলটা হলো অন্যখানে। যোগ্য-অযোগ্যের ভেদজ্ঞান শাসকের না থাকলে তাকে পস্তাতে হয়। এর অভাবে সঠিক সময়ে ঠিক কাজটি করিয়ে নেয়া যায় না। সঠিক কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন না হলে ব্যক্তি সমাজ রাষ্ট্র ভয়াবহ বিপদে পড়ে। কখনো সেই গ্যারাকল থেকে উঠে আসা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাতে আখেরে পস্তাতে হয়।
বঙ্গদেশে নিকট অতীত থেকে যোগ্যতার কদর কমতে কমতে এখন রীতিমতো তলানিতে। বিপরীতে চাটুকারিতার জয়জয়কার। এসব দেখে শত বছর আগেই বাংলা সাহিত্যের বিদগ্ধ কবি জীবনানন্দ দাশ তার ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ কবিতায় লিখেছেন—
‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,/ যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা;/ যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই, প্রীতি নেই, করুণার আলোড়ন নেই/ পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।/ যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি/ এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়/ মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা/ শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।’
কবি ‘অদ্ভুত আঁধার’ বলে অভিহিত করেছেন, যেখানে মূল্যবোধের চরম বিপর্যয় ঘটেছে। কবিতাটি একটি হতাশাজনক সময়কে চিত্রিত করে, যেখানে সত্য ও সুন্দর উপেক্ষিত এবং মিথ্যা ও অকল্যাণ বিজয়ী। জীবনানন্দ দাশ এ কবিতায় বুঝাতে চেয়েছেন মূল্যবোধহীন আধুনিক সমাজের চরম অবক্ষয় ও নৈতিক সঙ্কটকে। এখানে অন্ধ বা নীতিহীন মানুষই দৃশ্যত ক্ষমতাবান ও পথপ্রদর্শক, অন্য দিকে সৎ ও বিবেকবানরা অবহেলিত। প্রেম, প্রীতি ও মানবিকতার অভাবগ্রস্ত এ পৃথিবীতে মহৎ আদর্শের স্থান ভাগাড়ে। সমাজে যারা নৈতিকভাবে অন্ধ, তারাই ক্ষমতা ভোগ করছেন। নীতিহীন এমন অমানবিক মানুষের পরামর্শ ছাড়া সমাজ-রাষ্ট্র অচল। সেই সাথে যাদের মানুষের প্রতি আস্থা আছে এবং যারা মহৎ সত্য ও শিল্পের চর্চা করেন, তারা সমাজ থেকে নির্বাসিত ও লাঞ্ছিত।
যেহেতু অদ্ভুত আঁধার আমাদের বাস্তবতা; তাই বন্য হওয়াই অনেকে শ্রেয় মনে করছেন। তারা তাদের যাপিত জীবনে বন্যতাই চর্চা করতে আগ্রহী। ফলে ভদ্রতা নম্রতা শিষ্টাচার পরিহার করা উত্তম বিবেচিত তাদের কাছে। এই মানসিকতা ধারণে শনৈ শনৈ উন্নতি। এরাই সরকারের ঘনিষ্ঠজন। তাদের সুবিধার্থে নতুন সরকার একটি প্রকল্প হাতে নিতে পারে। প্রকল্পটির নাম হতে পারে; শিষ্টাচার নির্বাসন প্রকল্প। এখনকার সময়ে শিষ্টাচার থাকা মানে কাঙ্ক্ষিত উন্নতিতে বাধা।
এ বাধা অপসারণে রাষ্ট্রীয় পদে যারা আসিন হবেন- তাদের প্রকল্পে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে। শেখানো হবে কিভাবে শিষ্টাচার ভুলে যাওয়া যায়। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিয়ে শুরু করাই শ্রেয় বলে মনে হয়। তারা সদ্য বিদায়ী গভর্নরের প্রতি শিষ্টাচারবহির্ভূত যে আচরণ প্রদর্শন করেছেন, তাতে তারাই এই প্রকল্পের প্রথম হকদার। তাদের দিয়ে পরীক্ষামূলক; মানে পাইলট প্রজেক্ট নেয়া যেতে পারে। পরবর্তীতে স্থায়ী করার লক্ষ্য পূরণে এগোতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নবনিযুক্ত গভর্নরের প্রতি আমরা এ প্রকল্প চালুর সবিনয় অনুরোধ জানাই। তিনি এই প্রকল্পে অর্থায়ন করে আমাদের বাধিত করবেন। এই প্রত্যাশা রেখে ‘শিষ্টাচার নির্বাসন প্রকল্পের’ অগ্রিম সাফল্য কামনা করে আজকের লেখার ইতি টানছি।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত


