সমন্বিত কৃষি ও নৈতিক রাজনীতি জনকল্যাণের ভিত্তি

জনকল্যাণকে উপেক্ষা করে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত লাভের পথে চললে কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। নতুন সরকারের সামনে এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে, খণ্ডিত চিন্তা ও বিচ্ছিন্ন নীতি থেকে বেরিয়ে এসে সমন্বিত কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার প্রতিষ্ঠার এবং নৈতিক রাজনীতির একটি বিশ্বাসযোগ্য দৃষ্টান্ত স্থাপনের। এই পথেই রয়েছে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং মানুষের প্রকৃত কল্যাণ।

ড. রাধেশ্যাম সরকার
ড. রাধেশ্যাম সরকার |নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, তখন জনগণের প্রত্যাশা থাকে যে নির্বাচনী ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তব জীবনে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে। এই প্রত্যাশা কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাক্সক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তা, স্বস্তি ও সামগ্রিক স্থিতিশীলতার সাথে গভীরভাবে যুক্ত। বিশেষ করে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার মতো মৌলিক খাতে এই প্রত্যাশা আরো তীব্র হয়ে ওঠে। কারণ খাদ্য শুধু একটি ভোগ্যপণ্য নয়; এটি মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা এবং সামাজিক স্থিতির ভিত্তি। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমরা দীর্ঘদিন ধরে কৃষিকে একটি খণ্ডিত ও সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবেচনা করে এসেছি।

কৃষি বলতে মূলত ধান, চাল বা গম উৎপাদনকেই বোঝানো হয়েছে, কিন্তু কৃষির সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, বনায়ন, পরিবেশ, নদী ও পানি ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো নীতিনির্ধারণে প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে গেছে। এই উপেক্ষা কৃষিকে একটি সমন্বিত জীবনব্যবস্থা হিসেবে বোঝার পথে বড় বাধা সৃষ্টি করেছে। বাস্তবে কৃষি একটি বিস্তৃত ও আন্তঃসংযুক্ত ব্যবস্থা, যার ভেতরেই খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া নিহিত। এর সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত রয়েছে মানুষের নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যগ্রহণের প্রশ্ন, যা একটি জাতির সামগ্রিক কল্যাণ ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।

খাদ্য কৃষিরই একটি স্বাভাবিক ও অবিচ্ছেদ্য ফল এবং সেই খাদ্য সরাসরি মানুষের ভোগে আসুক কিংবা শিল্পপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রূপান্তরিত হয়ে ভোক্তার কাছে পৌঁছাক, তার শিকড় শেষ পর্যন্ত কৃষিতেই প্রোথিত থাকে। কিন্তু খাদ্য, কৃষি, পরিবেশ ও প্রাণিসম্পদকে একটি সমন্বিত ও পরস্পরনির্ভর ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা না করার কারণে আমাদের নীতিনির্ধারণে দীর্ঘদিন ধরেই গুরুতর কাঠামোগত দুর্বলতা জমে উঠেছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার প্রশ্নে একদিকে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সক্রিয় ভূমিকা নিতে চাইলে অন্যদিকে মান নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি সংস্থাগুলো এটিকে নিজেদের এখতিয়ারে হস্তক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করে, ফলে সহযোগিতার পরিবর্তে প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। একই সাথে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি করে যে বাজার তদারকি তাদের একচ্ছত্র দায়িত্ব, ফলে কেন্দ্রীয় সংস্থার কার্যক্রম প্রায়ই বাধাগ্রস্ত হয়। কৃষি মন্ত্রণালয় আবার উৎপাদনের মধ্যেই নিজেদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ রাখে এবং বাজার ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ কিংবা মূল্য স্থিতিশীলতার প্রশ্নকে প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব হিসেবে পুরোপুরি গ্রহণ করে না। অন্যদিকে বাজার ব্যবস্থাপনা ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের দায় কার্যত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর ঠেলে দেয়া হয়, যারা অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয়, কৃষকের ন্যায্য আয় এবং দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় না এনে স্বল্পমেয়াদি ভোক্তা স্বস্তির লক্ষ্যে আমদানিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই প্রক্রিয়ায় দেশীয় কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, উৎপাদনে অনিশ্চয়তা ও হতাশা তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে কৃষিতে বিনিয়োগের আগ্রহ কমে যায়। ফলস্বরূপ দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পুরো কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়ে, যা একটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতির জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এই প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা বাংলাদেশের গত পাঁচ দশকের একটি স্থায়ী ও গভীর কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। উৎপাদন, জোগান এবং চাহিদার মধ্যে যে স্বাভাবিক ও গতিশীল ভারসাম্য থাকা উচিত, তা আমরা নীতি দ্বন্দ্ব, প্রশাসনিক প্রতিযোগিতা, দায়িত্বের অস্পষ্ট বণ্টন এবং স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। তত্ত্বগতভাবে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে পণ্যের দাম চাহিদা ও জোগানের স্বাভাবিক সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে এই প্রক্রিয়াটি বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বাজারে শক্তিশালী সিন্ডিকেটের উপস্থিতি পণ্যের সরবরাহকে কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, ফলে স্বাভাবিক উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও সঙ্কটের আবহ সৃষ্টি হয় এবং দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। একই সাথে অস্বচ্ছ আমদানি নীতি এবং হঠাৎ করে নেয়া সিদ্ধান্ত বাজারে অনিশ্চয়তার মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়, কারণ কখন আমদানি হবে বা কত পরিমাণে হবে সে বিষয়ে স্পষ্টতা না থাকায় দেশীয় উৎপাদকরা আগাম পরিকল্পনা করতে পারেন না এবং উৎপাদন ও সরবরাহের সুষ্ঠু সমন্বয় নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হন।

গুদামজাতকরণ অনেক সময় স্বাভাবিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে মুনাফালোভী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, যা বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে এবং মূল্যবৃদ্ধিকে আরো ত্বরান্বিত করে। এর সাথে যুক্ত হয় নীতিগত দ্বৈধতা, যেখানে একদিকে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর কথা বলা হয়, অন্যদিকে উৎপাদন মৌসুমেই আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়ে কৃষকের পণ্যের ন্যায্য দাম পাওয়ার পথ রুদ্ধ করা হয়। কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে মূল্য বাড়ানো এবং পরে হঠাৎ আমদানির মাধ্যমে বাজারে ধাক্কা দেয়ার এই দোলাচল দেশীয় কৃষককে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে। কারণ এতে উৎপাদন খরচ ওঠে না, কৃষিতে আস্থাহীনতা বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এই পুরো প্রক্রিয়া একটি সুস্থ, স্থিতিশীল ও কৃষকবান্ধব কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, নতুন সরকার কি এই দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতা, স্বার্থনির্ভর সিদ্ধান্ত ও বাজার বিকৃতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্বচ্ছ, ন্যায্য ও পূর্বানুমেয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে, নাকি আবারও পুরনো পথেই হাঁটবে।

এই প্রেক্ষাপটে শিল্প, বাণিজ্য ও কৃষি এই তিনটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত ও সমান্তরাল ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন ছাড়া কৃষিকে লাভজনক ও টেকসই করা সম্ভব নয়। শিল্প খাতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং মূল্য সংযোজনের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে কৃষক উৎপাদিত পণ্য থেকে আরও বেশি লাভ অর্জন করতে পারেন। বাণিজ্য নীতিতে স্বচ্ছতা এবং পূর্বানুমেয়তা নিশ্চিত করা আবশ্যক, যাতে কৃষক, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তা তিন পক্ষই বাজারে আস্থা স্থাপন করতে পারে। একই সাথে কৃষি নীতিকে কেবল উৎপাদন বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাজার সংযোগ, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, কার্যকর পরিবহন অবকাঠামো এবং মূল্য স্থিতিশীলতার কৌশলের সাথে যুক্ত করতে হবে। এই সমন্বিত ও সমান্তরাল দৃষ্টিভঙ্গিই পারে একদিকে কৃষকের আয় নিশ্চিত করতে এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নকে উৎসাহিত করতে, অন্যদিকে নাগরিকদের জন্য নিরাপদ এবং সহনীয় মূল্যে খাদ্যপ্রাপ্তির পরিবেশ নিশ্চিত করতে।

এই আলোচনায় রাজনীতি ও ব্যবসার পারস্পরিক সম্পর্ক একটি সংবেদনশীল, জটিল কিন্তু অনিবার্য বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। আমাদের বাস্তব জীবনে দেখা যায়, রাজনৈতিক দলের বহু নেতাকর্মী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং কখনো কখনো ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থকে নীতিনির্ধারণের উপরে প্রাধান্য দেন। রাজনীতি যখন ব্যবসার স্বার্থের সাথে অতিরিক্তভাবে মিশে যায়, তখন জনকল্যাণের লক্ষ্য নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা হ্রাস পায়। দীর্ঘমেয়াদে লাভের তাগিদ ধীরে ধীরে নৈতিকতাকে ক্ষয় করে এবং রাষ্ট্রযন্ত্র সাধারণ জনগণের স্বার্থ রক্ষায় দুর্বল হয়ে পড়ে, যার ফলে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ও সমাজে আস্থা কমে যায়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ নিশ্চিত করার জন্য ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে একটি স্পষ্ট, নির্ভরযোগ্য এবং নৈতিক অবস্থান অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জনপ্রতিনিধিরা যেন প্রত্যক্ষ কোনো ব্যবসায়িক স্বার্থে যুক্ত না হন এবং রাষ্ট্রপ্রদত্ত সম্মানী ও সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই তারা তাদের সম্মানজনক জীবনযাপন করতে সক্ষম হন, এই নীতি সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। কারণ একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি তার বেতন এবং সরকারি সুবিধার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন, তবে একইভাবে একজন জনপ্রতিনিধির জন্যও এটি অসম্ভব হওয়ার কথা নয়। এই নৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাজনীতি আরো স্বচ্ছ, দায়িত্বশীল এবং জনগণের কল্যাণমুখী হয়ে উঠতে পারবে।

অবশ্যই ব্যবসা নিজেই কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়। বরং ব্যবসা সমাজের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে। কিন্তু সমস্যা তখনই প্রকট হয়, যখন সীমাহীন লাভের আকাক্সক্ষা সামাজিক দায়বদ্ধতাকে অগ্রাহ্য করে ছাপিয়ে যায়। ব্যবসায়ীদেরও উপলব্ধি করতে হবে, তারা সমাজের প্রতিপক্ষ নয় বরং সমাজের অংশীদার। যুক্তিসঙ্গত লাভ একটি স্বাভাবিক অধিকার, তবে মানুষের ক্ষতি করে, বাজার বিকৃত করে বা সামাজিক কল্যাণবিরোধী পথে সেই লাভ অর্জন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সবশেষে বলা যায়, সরকার ব্যবস্থা, রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং সামাজিক ব্যবস্থা; এই তিনটির মধ্যে একটি অভিন্ন ও স্পষ্ট লক্ষ্য থাকা জরুরি, আর তা হলো জনগণের সর্বোচ্চ কল্যাণ।

জনকল্যাণকে উপেক্ষা করে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত লাভের পথে চললে কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। নতুন সরকারের সামনে এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে, খণ্ডিত চিন্তা ও বিচ্ছিন্ন নীতি থেকে বেরিয়ে এসে সমন্বিত কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার প্রতিষ্ঠার এবং নৈতিক রাজনীতির একটি বিশ্বাসযোগ্য দৃষ্টান্ত স্থাপনের। এই পথেই রয়েছে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং মানুষের প্রকৃত কল্যাণ।

লেখক : সিনিয়র কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন
[email protected]