জাতীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ঢাকার রাজপথে তত চোখে পড়ছে একধরনের বিস্ময়কর নিরুত্তাপ ভাব। ভোটারদের একটি বড় অংশের মধ্যে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলেও বাস্তবে তাতে তেমন কোনো অর্থবহ পরিবর্তন আসবে না। অধিকাংশ আসনে মূল লড়াই সীমাবদ্ধ থাকছে বিএনপি-সমর্থিত এবং জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীদের মধ্যে। অথচ খুব অল্প সময় আগেও এ দুই দল একই বিরোধী শিবিরে ছিল এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ফলে জনগণ তাদের প্রকৃত ‘বিকল্প’ ভাবার চেয়ে ‘স্বাভাবিক মিত্র’ হিসেবে দেখছে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিও এ ধারণাকে পোক্ত করে। ২০০১ সালে তারা জোট সরকার গঠন করেছিল। আবার ১৯৯৬ সালে জামায়াত বিএনপি থেকে আলাদা হয়ে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ভরাডুবি ঘটায়। ফলস্বরূপ, ভোটারদের সামনে কোনো প্রকৃত রাজনৈতিক বিকল্প নেই। এবারের লড়াই কেবল বিএনপি এবং বিএনপির একসময়ের মিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
প্রার্থীদের ব্যক্তিগত ভাবমর্যাদাও ভোটারদের মনে কোনো প্রকার আস্থার সঞ্চার করতে পারছে না। ঢাকার সাধারণ ভোটারদের কাছে ব্যালট পেপারের এ বিকল্পগুলো এক হতাশাজনক অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি মাত্র : এক দিকে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী– যাদের গায়ে দুর্নীতির পুরনো তকমা লেগে আছে; অন্য দিকে জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থী– যাদের অনভিজ্ঞতা ও অযোগ্যতার অভিযোগ ওঠে। রাতের টকশোগুলোতে কান পাতলে একই অভিযোগের প্রতিধ্বনি শোনা যায়।
বিএনপি সর্বশেষ ক্ষমতায় থাকাকালে দুর্নীতিতে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছিল– এ অভিযোগ নতুন নয়, আর অনেকের আশঙ্কা, তাদের প্রার্থীরা আবারো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যক্তিগত লাভের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। অন্য দিকে জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীরা প্রায়ই প্রশাসনিক অনভিজ্ঞতার পরিচয় দিচ্ছেন। সেই সাথে এমন সব গগনচুম্বী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, যা পূরণ করা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। গত দেড় দশকে দুই দল দক্ষ, সৎ ও গ্রহণযোগ্য নতুন নেতৃত্ব তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ভোটারদের সামনে কার্যত কোনো আশাব্যঞ্জক বিকল্প থাকছে না।
নির্বাচন নিয়ে উদ্দীপনা কমে যাওয়ার নেপথ্যে আরো একটি বড় কারণ বিদ্যমান। মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় দেখা গেছে, উভয় প্রধান রাজনৈতিক দল এমন অনেক প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে, যারা কেবল দ্বৈত নাগরিকই নন; বরং জীবনের একটি দীর্ঘ সময় বিদেশে অতিবাহিত করেছেন। অনেক প্রার্থী হলফনামায় তথ্য গোপন করে নিজেদের বিদেশী নাগরিকত্ব অস্বীকার করেছেন– এ ধরনের অসততা জনমনে আস্থার পরিবর্তে কেবল তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। এটি সাধারণ মানুষের সেই শঙ্কাকে উসকে দিচ্ছে যে, আমরা কি তবে গত ১৫ বছরের দুর্নীতিবাজ ও জবাবদিহিহীন রাজনীতিকদের সরিয়ে একই ধরনের অন্য এক গোষ্ঠীকে স্থলাভিষিক্ত করছি? এর চেয়েও বড় উৎকণ্ঠা হলো– যারা দশকের পর দশক বিদেশে আয়েশি জীবন কাটিয়েছেন, বিগত ১৫ বছরে বাংলাদেশের মানুষের প্রাত্যহিক সংগ্রাম, হাহাকার আর আকাক্সক্ষাকে অনুধাবন করার সক্ষমতা তাদের কতটুকু আছে?
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি হলো ঋণখেলাপি কিছু সংসদ সদস্য প্রার্থীর আইনকে পাশ কাটানোর চেষ্টা। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, কোনো ঋণখেলাপি জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন না। বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিতভাবে ঋণখেলাপিদের একটি সরকারি তালিকা প্রস্তুত করে, যা সাধারণভাবে সিআইবি তালিকা নামে পরিচিত। যেসব প্রার্থীর নাম এ তালিকায় থাকে, তারা আইনগতভাবে অযোগ্য বলে বিবেচিত হন। নিয়মটি সহজ ও বহুল পরিচিত। কিন্তু ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ সময়ের ঠিক আগের দিনগুলোতে বহু ঋণখেলাপি প্রার্থী আদালতে ছুটে যান। তাদের লক্ষ্য ঋণ পরিশোধ করা নয়; বরং বাংলাদেশ ব্যাংক যেন ঋণখেলাপিদের তালিকায় তাদের নাম প্রকাশ করতে না পারে, সে জন্য অস্থায়ী আদালতের স্থগিতাদেশ নেয়া। কাগজ-কলমে নিজেদের ‘পরিষ্কার’ দেখানো ছিল তাদের উদ্দেশ্য, বাস্তবে তারা ঋণখেলাপিই থেকে গেছেন।
এই কৌশল আরো উদ্বেগজনক, কারণ সুপ্রিম কোর্ট একাধিকবার স্পষ্টভাবে বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের খেলাপি তালিকাকে চ্যালেঞ্জ করে দেওয়ানি মামলা দায়ের করা যায় না। এত পরিষ্কার আইনি অবস্থানের পরও এসব প্রার্থী মামলা করেছেন এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে উচ্চ আদালত থেকে স্বল্পমেয়াদি স্থগিতাদেশ পেয়েছেন। তবে এসব আদেশ কেবল নাম প্রকাশ স্থগিত করেছে; ঋণ পরিশোধ না হওয়ায় তাদের খেলাপি অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।
ঋণখেলাপিদের আইনি কারসাজির বিষয়টি যখন আপিল বিভাগে পৌঁছায়, তখন সেই স্থগিতাদেশগুলো দ্রুত খারিজ করে দেয়া হয়। ফলে প্রার্থীদের নাম পুনরায় খেলাপি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় এবং বেশ কয়েকজনকে নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো– নির্বাচনী সময়সূচি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হওয়ায় প্রতিটি মনোনয়নপত্র যথাযথভাবে চ্যালেঞ্জ করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়নি। এ সময়ের সঙ্কটের সুযোগ নিয়ে কিছু ঋণখেলাপি প্রার্থী এখনো নির্বাচনের মাঠে টিকে আছেন। এই প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত অযোগ্য ঘোষিত হবেন কি না, তা এখন নির্ধারিত হবে নির্বাচন-পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায়। এর ফল অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। কারণ যদি এ ধরনের ব্যক্তিরা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে যান, তবে তারা নিজেদের আসন রক্ষা করতে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রভাব ব্যবহার করবেন। একই সাথে আইনি লড়াই অনির্দিষ্টকাল দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করবেন– এ আশঙ্কা অমূলক নয়।
ভোটের দিনটি আসলে কতটা অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে, তা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ ক্রমে ঘনীভূত হচ্ছে। বিশেষ করে ভোটকেন্দ্রগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে আস্থার এক বড় ধরনের ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। ভোটারদের শঙ্কা– ভীতি প্রদর্শন বা সহিংসতা ঠেকাতে পুলিশ হয়তো যথেষ্ট কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না। এ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এখন সেনাবাহিনীর ওপর; তারা মনে করছেন একমাত্র সেনাবাহিনীই পারে ভোটের মাঠে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে। তবে সেখানেও কিছু মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা রয়ে গেছে। র্যাবের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) চলমান বিচারপ্রক্রিয়া সশস্ত্রবাহিনীর মনোবলে একধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সামগ্রিকভাবে এ বিষয়গুলো জনমনে গভীর সংশয় তৈরি করেছে, নির্বাচনী পরিবেশ আদৌ ভোটারদের কোনো ভয় বা চাপ ছাড়াই মুক্তভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ করে দিতে পারবে কি না এমন ভাবনা থেকে।
সর্বোপরি, একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সত্য এই যে, এবারের নির্বাচনে দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর কার্যকরভাবে রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। আওয়ামী লীগকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রাখায় মোট ভোটারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ থেকে এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত জনগণ কার্যত ভোটাধিকারবঞ্চিত হয়েছেন। এটি সত্য যে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের নৃশংসতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের স্মৃতি এখনো মানুষের মনে দগদগে ঘা হয়ে রয়েছে। এ ছাড়া অনেক অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো চলমান। ফলে দলটিকে নির্বাচনে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে জনমনে তীব্র অনীহা রয়েছে; কিন্তু নির্বাচনের মূল নির্যাস হলো পছন্দের স্বাধীনতা। আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি বাদ দেয়ায় তাদের ঐতিহ্যগত সমর্থকদের সামনে কোনো প্রকৃত রাজনৈতিক বিকল্প অবশিষ্ট থাকেনি। তাৎক্ষণিকভাবে এ প্রতিনিধিত্বহীনতা হয়তো কোনো অস্থিরতা তৈরি করবে না; কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এটি নির্বাচনের নৈতিক ও আইনি বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলার সুযোগ করে দেবে। সমাজের এতবড় একটি অংশকে প্রতিনিধিত্বের বাইরে রেখে আয়োজিত কোনো নির্বাচন ভবিষ্যতে সমালোচনার ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকতে পারে না, স্বল্প মেয়াদে সেই বর্জন যত যুক্তিসঙ্গত মনে হোক না কেন।
আজও স্মৃতিতে অমলিন ১৯৯১ সালের সেই নির্বাচন– দীর্ঘ সামরিক শাসনের জাঁতাকল থেকে মুক্ত হয়ে এক নতুন দিগন্তের পথে বাংলাদেশের সেই প্রথম যাত্রা। তখন মনে হয়েছিল, আমরা বুঝি দীর্ঘ অন্ধকার সুড়ঙ্গ পেরিয়ে আলোর মুখ দেখলাম। দীর্ঘ দেড় দশকের দুঃশাসন আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের রক্তাক্ত অধ্যায়ের পর ২০২৬ সালের নির্বাচনে সেই আশাবাদ আরো কয়েক গুণ বেশি হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু আজ চার দিকে কেবল এক বিবর্ণ নিস্পৃহতা। ভোটের ব্যালট কোনো অর্থবহ পরিবর্তন আনবে– এমন বিশ্বাস আজ জনমনে অনুপস্থিত। এ ব্যর্থতার দায়ভার সরাসরি অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর বর্তায়। সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বকে নির্বাচনী মাঠে তুলে আনার যে অপরিহার্য সংস্কার প্রয়োজন ছিল, তা করতে এ সরকার ব্যর্থ হয়েছে। অধ্যাপক ইউনূস ব্যক্তিগতভাবে সৎ হতে পারেন; কিন্তু তার মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ পদে ঠাঁই পাওয়া কিছু প্রশ্নবিদ্ধ ও উচ্চাভিলাষী সদস্য সেই সংস্কারের ম্যান্ডেট ধূলিসাৎ করে দিয়েছেন। উৎসবের আলো হয়তো রাজনৈতিক মঞ্চগুলো আলোকিত করবে; কিন্তু আমজনতার ধূসর জনপদে আজও সেই একঘেয়ে নিস্পৃহতার ছায়া। সাধারণ মানুষের কাছে এ নির্বাচন কেবল এক পালাবদলের আনুষ্ঠানিকতা, যাপিত জীবনের কোনো অর্থবহ পরিবর্তন নয়।
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি



