বাংলাদেশে জাকাত ব্যবস্থাপনা দীর্ঘ দিন ধরেই একধরনের অবহেলিত বিষয় হিসেবে থেকে গেছে, যদিও এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের একটি। প্রতি বছর কোটি কোটি মুসলমান তাদের ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে জাকাত দেন; কিন্তু একটি সমন্বিত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাবে এই বিপুল অর্থের সম্ভাবনা বিচ্ছিন্নভাবে ব্যয় হয় এবং এর প্রকৃত সামাজিক প্রভাব অনেকাংশেই সীমিত থেকে যায়। এই প্রেক্ষাপটে এটি উৎসাহব্যঞ্জক যে, নতুন প্রধানমন্ত্রী জাকাতকে দারিদ্র্য দূরীকরণের একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিষয়ে ব্যক্তিগত আগ্রহ দেখিয়েছেন। সম্প্রতি দেশের কয়েকটি বেসরকারি জাকাত ফাউন্ডেশনের সাথে আলোচনা করেছেন তিনি। এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। যদি এটি কেবল আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপে রূপ নেয়, তবে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
ইসলামের পাঁচ মূল স্তম্ভের একটি হলো জাকাত। অর্থাৎ— এটি কোনো ঐচ্ছিক দান নয়; বরং বাধ্যতামূলক ধর্মীয় দায়িত্ব। ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী, যে মুসলমান নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, যাকে নিসাব বলা হয়— তাকে বছরে একবার তার সঞ্চিত সম্পদের প্রায় ২.৫ শতাংশ জাকাত হিসেবে দিতে হয়। ‘জাকাত’ শব্দের অর্থ পবিত্র করা, পরিশুদ্ধ হওয়া। ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে জাকাত সম্পদকে পবিত্র করে এবং সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে। দরিদ্র, অভাবগ্রস্ত, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি ও সামাজিকভাবে দুর্বল অন্যান্য শ্রেণীকে জাকাত বিতরণ করতে হয়।
বিশ্বে প্রতি বছর শত বিলিয়ন ডলারের জাকাত বিতরণ হয়। উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই অর্থ যদি সুশৃঙ্খলভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায়, তবে তা দারিদ্র্য দূরীকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এমনকি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও এখন ইসলামী সামাজিক অর্থায়ন- বিশেষ করে জাকাতকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের একটি সম্ভাবনাময় উপায় হিসেবে বিবেচনা করছে।
বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, তৈরী পোশাক শিল্পের বিস্তার, প্রবাসী আয় এবং বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ফলে লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার উপরে উঠে এসেছে। তবুও দারিদ্র্য এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। দেশের একটি বড় অংশের মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে এবং সামান্য অর্থনৈতিক ধাক্কা, যেমন— মূল্যস্ফীতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কর্মসংস্থানের সঙ্কট তাদের আবার দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
এই বাস্তবতায় জাকাত হতে পারে একটি শক্তিশালী সম্পূরক ব্যবস্থা। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে জাকাতের সম্ভাব্য পরিমাণ ৯ থেকে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩ থেকে ৪ শতাংশের সমান। এই বিশাল অর্থ যদি সুশৃঙ্খলভাবে সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা করা যায়, তবে তা দারিদ্র্য দূরীকরণে একটি শক্তিশালী জাতীয় তহবিলে পরিণত হতে পারে। কিন্তু মূল সমস্যা হলো জাকাত বিতরণের বর্তমান পদ্ধতি। বাংলাদেশে বেশির ভাগ মানুষ ব্যক্তিগতভাবে জাকাত দেন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী বা স্থানীয় দরিদ্র মানুষের মধ্যে। বিশেষ করে রমজান মাসে এ ধরনের বিতরণ বেশি দেখা যায়। এটি অবশ্যই মানুষের ধর্মীয় দায়বদ্ধতা ও মানবিকতার পরিচয় বহন করে; কিন্তু এই বিচ্ছিন্ন বিতরণ পদ্ধতির ফলে জাকাতের প্রকৃত সামাজিক প্রভাব সীমিত হয়ে যায়। অনেক দরিদ্র পরিবার সামান্য অর্থ বা খাদ্যসহায়তা পায়, যা তাদের সাময়িকভাবে সাহায্য করে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তাদের দারিদ্র্য থেকে বের করে আনতে পারে না।
যদি জাকাতকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায়, তবে এটি দারিদ্র্য দূরীকরণের একটি শক্তিশালী উন্নয়নমূলক হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, জাকাতের অর্থ ব্যবহার করে দরিদ্র পরিবারকে ক্ষুদ্র ব্যবসার মূলধন দেয়া যেতে পারে, কৃষকদের কৃষি উপকরণ সরবরাহ করা যেতে পারে, দক্ষ শ্রমিকদের জন্য যন্ত্রপাতি কেনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যুবকদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ মানুষকে কেবল সহায়তা দেয় না; বরং তাদের আত্মনির্ভরশীল হতে সাহায্য করে। জাকাত সমাজের দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে পারে। বিধবা নারী, এতিম শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য নিয়মিত সহায়তা কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। একই সাথে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য বৃত্তি, স্কুল-সামগ্রী এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি। স্বাস্থ্য খাতেও জাকাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দরিদ্র পরিবারের অনেকেই চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে আরো গভীর দারিদ্র্যে পতিত হয়। জাকাতের অর্থ ব্যবহার করে হাসপাতাল, স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি এবং দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা সহায়তা দেয়া যেতে পারে। কিছু মুসলিম দেশে জাকাতকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যবস্থাপনা করে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। মালয়েশিয়ায় রাষ্ট্র পরিচালিত জাকাত প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি বছর বিপুল অর্থ সংগ্রহ করে এবং তা আবাসন, শিক্ষা, ব্যবসায় সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যয় করে। পাকিস্তানেও জাকাত ব্যবস্থাপনা আংশিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। এসব উদাহরণ দেখায় যে, সুশাসন ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে জাকাত একটি শক্তিশালী সামাজিক নীতির অংশ হতে পারে।
বাংলাদেশে জাকাতের সম্ভাবনাকে বাস্তবায়ন করতে হলে একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো প্রয়োজন। একটি জাতীয় জাকাত কর্তৃপক্ষ বা সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান গঠন করা যেতে পারে, যা বেসরকারি জাকাত ফাউন্ডেশন, ইসলামী সংস্থা এবং সামাজিক কল্যাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সমন্বয় করে কাজ করবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যেতে পারে। একই সাথে শক্তিশালী জবাবদিহি ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে জনগণের আস্থা বজায় থাকে। সচেতনতা বৃদ্ধিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মানুষ ইতোমধ্যে উদারভাবে জাকাত দেন। যদি তারা বুঝতে পারেন, সংগঠিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই অর্থ বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তন আনতে পারে, তবে অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে জাকাত দিতে আগ্রহী হবেন। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক উদ্যোগ একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
একটি সুশৃঙ্খল জাকাত ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নিয়মিত ও কাঠামোবদ্ধ সহায়তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এতে করে তারা শুধু সাময়িক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকবে না; বরং ধীরে ধীরে আত্মনির্ভরশীলতার পথে এগিয়ে যেতে পারবে। উদাহরণস্বরূপ, জাকাতের অর্থ যদি উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ করা হয়, যেমন— ক্ষুদ্র ব্যবসায়, কৃষি, কারিগরি প্রশিক্ষণ বা উদ্যোক্তা উন্নয়ন, তবে তা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, আয় বৃদ্ধি করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্যের চক্র ভাঙতে সহায়তা করবে।
অর্থাৎ— জাকাত তখন ‘সহায়তা’ থেকে ‘ক্ষমতায়ন’-এর একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠবে। এছাড়া, জাকাতের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সামাজিক বৈষম্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সমাজের এক অংশে যখন সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয় এবং অন্য অংশ বঞ্চিত থাকে, তখন সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। জাকাত সেই বৈষম্য কমিয়ে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে পারে, যা সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে সহায়ক। এটি সমাজে পারস্পরিক দায়বদ্ধতা ও সহমর্মিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলে, যেখানে সচ্ছল ব্যক্তি দরিদ্র মানুষের কল্যাণে অবদান রাখে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক



