বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ। স্বাধীনতার আগে এটি পাকিস্তানের প্রদেশ ছিল। ষাটের দশকের শেষ এবং সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে বাংলাদেশের বার্ষিক খাদ্যঘাটতি ছিল ২৫ থেকে ৪০ লাখ টন। তখন পূর্ব-পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। বর্তমানে যে পরিমাণ ভূমি ধান উৎপাদনসহ কৃষিকাজে ব্যবহৃত হয়, ষাটের দশকের শেষ দিকে এবং সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে তা এখনকার চেয়ে ২০-৩০ শতাংশ বেশি ছিল। সত্তরের দশকে আমাদের ধান উৎপাদনের পরিমাণ ছিল এক কোটি টনের কাছাকাছি। বর্তমানে ধান উৎপাদনের জমির পরিমাণ সঙ্কুচিত হলেও উৎপাদন দাঁড়িয়েছে প্রায় চার কোটি টন। এই বাড়তি উৎপাদনের পেছনে মূল অবদান বাংলার কৃষককুলের। বর্তমানে বাংলাদেশে উৎপন্ন ধান দিয়েই দেশের প্রধান খাদ্যের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৯৮ শতাংশ বাঙালি, ২ শতাংশ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। এরূপ সমজাতীয়তা পৃথিবীর খুব কম রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। বাংলাদেশী ৯৮ শতাংশ লোকের মুখের ভাষা বাংলা। অবশিষ্ট ২ শতাংশ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কারো কারো নিজস্ব ভাষা থাকলেও তা বাংলার মতো সমৃদ্ধ নয়। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্যরা বাংলায় কথা বলতে পারে।
পাকিস্তান শাসনামলের শেষ দিকে মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মাথাপিছু আয় পাকিস্তানের চেয়ে কম ছিল। আজ উভয় দেশ উন্নত এবং উভয় দেশের মাথাপিছু আয় পাকিস্তান ও বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি। এর পেছনে মূল যে কারণ তা হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে উভয় দেশে কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে বেশি অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিনিময় হয়েছে এবং তা দেশ দু’টিকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। স্বাধীনতার সময়ের চেয়ে আজ মাথাপিছু আয় ৩০ গুণেরও বেশি। স্বাধীনতার পর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যতটুকু উন্নয়ন হয়েছে, এর চেয়ে অধিক উন্নয়ন সম্ভব ছিল যদি দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকত।
স্বাধীনতার পর নব্বই সাল পর্যন্ত চারটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়; কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে এর কোনোটিই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। স্বাধীনতার পর থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সংবিধানে উল্লিখিত তাদের জাতীয়তা বাঙালি নয়— এ প্রশ্নে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ ধরে এবং অঞ্চলটিকে অস্থিতিশীল করে তোলে। বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে চাকমারা সর্বাধিক পরিমাণে সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এ যুদ্ধে তারা অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, আশ্রয় ও অর্থ— এ চারটি বিষয়ে ভারতের সাহায্য লাভ করে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ১৯৯৮ সালে শান্তিচুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে পাহাড়িরা অস্ত্র সমর্পণ করলেও তিনটি পার্বত্য জেলার রাজনৈতিক বিরোধের সম্পূর্ণ সমাধান হয়েছে এমনটা বলা যাবে না। এখনো পাহাড়িদের বিভিন্ন সশস্ত্র দল নিজেদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বে লিপ্ত এবং বাঙালি ও আমাদের শৃঙ্খলাবাহিনীর সাথে মাঝে মধ্যে বিক্ষিপ্ত লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে। পুরো পার্বত্য চট্টগ্রাম একদা মূল্যবান বৃক্ষে পরিপূর্ণ ছিল। সন্ত্রাসী নির্মূলের নামে আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকাংশ পাহাড় বৃক্ষশূন্য করা হয়েছে। পাহাড় বৃক্ষশূন করে সন্ত্রাস নির্মূলের চেয়ে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলোর স্বার্থ যে অধিক সংরক্ষিত হয়েছে সেটি আজ কারো বুঝতে বাকি নেই। পুরো পাবর্ত্য চট্টগ্রাম খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ এবং ধারণা করা হয়, সেখানে তেল ও গ্যাসের ভালো মজুদ রয়েছে; কিন্তু পাহাড়িদের বিদ্রোহী কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে সমাধান করতে না পারায় তেল ও গ্যাস আহরণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এখনো ভারত বিদ্রোহীদের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা সমস্যা সম্পূর্ণরূপে সমাধানের অন্তরায়।
গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বাংলাদেশ যুদ্ধ করে স্বাধীন হলেও দেশে এখনো গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। নব্বই-পরবর্তী বাংলাদেশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ— এ দু’টি দল প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দু’টি দলের পরস্পরের ওপর আস্থা নেই। যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার পরিবর্তনের একমাত্র মাধ্যম হলো অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন। আমাদের দেশে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয় না— এ অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যাপক গণ-আন্দোলন ও ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়; কিন্তু সে ব্যবস্থাটিও নির্বাচন-পরবর্তী দেখা গেছে, বিজিত দলকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। দেশের তখনকার প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে আস্থায় না নিয়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অবসান নতুনভাবে যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্ম দিয়েছে, তার অবসান করা না গেলে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে চারটি শ্রেণী অনন্য অবদান রেখে চলেছেন এগুলো হলো, কৃষক, পোশাকশ্রমিক, বিদেশে কর্মরত শ্রমিক এবং বেসরকারি শিল্পোদ্যোক্তা। কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে খাদ্য উৎপাদনে সফলতা এসেছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ করে তাতে সবচেয়ে বেশি অবদান তৈরী পোশাকশিল্পের। এ শিল্পটি দারিদ্র্যবিমোচন, কর্মসংস্থান ও নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে; কিন্তু এ শিল্পে কর্মরত শ্রমিকরা যে বেতনভাতাদি পান, তা সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়। অর্থনীতিতে তাদের বিপুল অবদানের বিষয়টি বিবেচনায় তাদের জন্য সরকারের কিছু করণীয় নিশ্চয়ই আছে।
তৈরী পোশাকশিল্পের মালিকদের সরকার বিভিন্ন হারে প্রণোদনা দেয়। এ প্রণোদনা প্রাপ্তিতে শ্রমিকদের অবদান থাকা সত্ত্বেও প্রণোদনার সম্পূর্ণ টাকা মালিকরা ভোগ করেন। প্রণোদনার একটি অংশ শ্রমিকদের জন্য নির্ধারণ করে দেয়া গেলে তাদের দুঃখ-দুর্দশা কিছুটা হলেও লাঘব হবে।
প্রবাসে কর্মরত শ্রমিকরা প্রতি বছর যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাচ্ছেন তাতে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার ক্রমান্বয়ে স্ফীত হচ্ছে। প্রবাসে কর্মরত শ্রমিকরা ব্যাংকের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠালে যে বিনিময় হার পান, হুন্ডির মাধ্যমে পাঠালে ডলার-প্রতি দুই থেকে পাঁচ টাকা বেশি পান। বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠানো অর্থের জন্য ডলার-প্রতি যদিও সরকার থেকে শতকরা আড়াই টাকা প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে, এতদসত্ত্বেও হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠানো সম্পূর্ণ রোধ করা যায়নি। বিদেশে কর্মরত শ্রমিকরা যখন সেখানে কায়ক্লেশে জীবন অতিবাহিত করে উপার্জনের ৯০ শতাংশ দেশে পাঠাচ্ছেন তখন দেখা যায়, আমাদের দেশের একশ্রেণীর রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সামরিক-বেসামরিক আমলা অবৈধ পথে বিভিন্ন দেশে মুদ্রা পাঠানোর মাধ্যমে সেখানে বাড়ি, ফ্ল্যাট, ভূমি প্রভৃতি ক্রয়ের মাধ্যমে স্থায়ী আবাস গড়ার কাজে লিপ্ত রয়েছেন। এভাবে সম্প্রতি এক বছরে ১০ হাজার কোটি টাকার অধিক পাচার হয়েছে। এ ধরনের পাচার রোধ না করা গেলে তা অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
আমাদের বিভিন্ন বেসরকারি উদ্যোক্তা তৈরী পোশাক শিল্পসহ অন্যান্য শিল্পে যে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সাথে তা তুলনা করলে দেখা যায়, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের যে সহযোগিতা পাওয়ার কথা ছিল, তা একেবারেই অপ্রতুল। এর পরও এসব উদ্যোক্তা অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে আজ সফলতা পেয়েছেন। এ ধরনের সফল শিল্পোদ্যোক্তা যদি সরকারের কাছ থেকে যথাযথ সহযোগিতা পান, সে ক্ষেত্রে আমরা তাদের কাছ থেকে আরো অধিক বিনিয়োগ আশা করতে পারি।
যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো। উভয় ক্ষেত্রে আমরা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায় থেকে অনেক দূরে রয়েছি। বিশেষত আমাদের যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও বন্দর ব্যবস্থাপনায় এখনো অনেক সমস্যা রয়েছে। গত প্রায় এক দশক ধরে আমাদের প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে ৭-এর মধ্যে ওঠানামা করছে। সরকারের পক্ষ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল; কিন্তু আগামী এক দশক যদি আমাদের প্রবৃদ্ধির হার এক অঙ্ক অর্থাৎ ৬ থেকে ৭-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, সে ক্ষেত্রে আমরা হয়তো স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হবো, তবে প্রকৃত অর্থে মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে পৌঁছতে পারব না। আমাদের প্রবৃদ্ধির পথে প্রধান অন্তরায় রাজনৈতিক স্থিতির অভাব। এ কারণে বিগত সময়ে দফায় দফায় লাগাতার হরতাল ও অবরোধের সম্মুখীন হয়ে আমরা বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েছি। সুতরাং দেশকে রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল করতে হলে অন্ততপক্ষে নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক পক্ষগুলোকে সমঝোতায় আসতে হবে।
বাংলাদেশের যে জনসম্পদ রয়েছে পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে তা নেই। দরকার জনসম্পদ কাজে লাগানো। সত্য বটে, এটিকে কাজে লাগানো গেলে এবং দেশ রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল হলে প্রবৃদ্ধির হার দুই অঙ্কে পৌঁছানো কঠিন নয়। প্রবৃদ্ধি হলো একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির প্রধান সূচক। বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের আরো কিছু দেশ সম্ভাবনাময়; কিন্তু এ দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে উপমহাদেশের একটি এবং পশ্চিমা বিশ্বের একটি বড় দেশের হস্তক্ষেপের কারণে সম্ভাবনাময় ছোট দেশগুলো রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল হতে পারেনি। এ ধরনের হস্তক্ষেপ যে প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে কাজ করবে, এ সত্য সবাইকে অনুধাবন করতে হবে।
লেখক : সাবেক জজ এবং সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক



