নির্বাচন ২৬ প্রত্যাশা ও শঙ্কা

দেশের ভবিষ্যৎ চিত্রণে জুলাই ঘোষণার আলোকে রাষ্ট্রসংস্কারের মাধ্যমে দেশের নতুন যাত্রাপথে প্রয়োজন এই কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট সবার নিরপেক্ষতা, দায়িত্বানুভূতি ও দেশপ্রেম। নইলে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। দেশ আরেকটি প্রহসনমূলক নির্বাচনের ফাঁদে আটকে যেতে পারে।

অধ্যাপক ডা: শাহ মো: বুলবুল ইসলাম
অধ্যাপক ডা: শাহ মো: বুলবুল ইসলাম |নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

গণতন্ত্র তার নির্বাসন যাত্রা কাটিয়ে সামনে উপস্থিত। আর মাত্র ক’দিন পরই সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সরকারি প্রচার-প্রচারণা, জাতীয় নেতাদের তেজোদ্দীপ্ত বক্তব্য-বিবৃতি, টকশোতে নতুন নতুন আঁতেলদের বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনা শুনে মনে হচ্ছেÑ আসলেই গণতন্ত্র এসে গেছে। বাসন্তি রঙ শাড়ি পরে শিমুল-পলাশ আর কৃষ্ণচূড়ার সাথে বসন্তে আসছে নির্বাচন। দেশের জনগোষ্ঠীর শতকরা একশ’জনই চান নির্বাচন হোক। রাজনৈতিক নেতারা নিঃসন্দেহে নির্বাচন চান। নির্বাচন চায় সরকার, চায় আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো। সবাই এখন নির্বাচনমুখী। গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে, চায়ের দোকানে একটিই আলোচ্য- নির্বাচন। এই নির্বাচন নিয়ে দেশবাসীর প্রত্যাশার অন্ত নেই। এর আগের ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪-এ পাতানো ভোট, ভোটারবিহীন ভোট, ডামি ভোট, রাতের ভোট- এসব দেখে জনগণ যখন ভোটের প্রতি বীতশ্রদ্ধ, আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে রাজনীতির প্রতি, নির্বাচনের প্রতি- সেই প্রেক্ষাপটে ২৬-এর নির্বাচন সবাইকে আশান্বিত করেছে। দেশবাসী আর জাল ভোট, ডামি ভোট, রাতের ভোট দেখতে রাজি নয়। তারা ভোটের মাঠে দুর্নীতিবাজ, অর্থপাচারকারী, ঋণখেলাপিদের কালো টাকার খেলা আর দেখতে চায় না। তারা তাদের অধিকারের সঠিক প্রয়োগে উৎখাত করতে চায়, দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, মস্তান আর অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি। জাতি এবার নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রে ইনসাফ এবং শহীদ আবু সাঈদ ও হাদির স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখতে চায়।

এতে মুখ্য ভূমিকায় রয়েছে নতুন চার কোটি তরুণ ভোটার, যারা জীবনে প্রথমবার ভোট দেবেন; রয়েছে অতীতে বারবার বঞ্চিত হওয়া ভোটাররা। তাদের চোখে-মুখে জুলাই সনদের স্বপ্ন। দেশকে এগিয়ে নেয়ার স্বপ্ন। তারা এই নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের স্বপ্নের বাস্তব রূপায়ণ চায়। তবুও সুরভঙ্গের মতো মাঝে মাঝেই জাতীয় নেতারা উৎকণ্ঠা প্রকাশ করছেন, নির্বাচন হবে তো? হলে কতটুকু শান্তিপূর্ণ হবে? নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এ ধরনের সন্দেহ পোষণ করা জাতিকে আশঙ্কিত করে। অবশ্য সার্বিক পরিস্থিতি এ ধরনের নেতিবাচক চিন্তার অবকাশ তৈরি করে বৈকি!

সরকার ইতিহাসের সেরা নির্বাচন উপহার দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর এর প্রধান নিয়ামক হচ্ছে সবপর্যায়ে, সব দলের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি। দুঃখজনক হলেও সত্য, এটি সঠিকভাবে প্রতিপালিত হচ্ছে না। বিশেষ করে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতার ব্যাপারে বারবার মাঠপর্যায় থেকে অভিযোগ উঠছে। একটি দলের পক্ষ নেয়ার।

আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ক্ষেত্রেও এ ধরনের অভিযোগ পুরনো। সেনাবাহিনী তারেক রহমানের নিরাপত্তার ব্যাপারে যে ভূমিকা পালন করেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। অন্যান্য দলীয় প্রধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের দৃষ্টান্ত ইতিহাস সৃষ্টি করবে নিঃসন্দেহে। নতুবা নির্বাচন প্রভাবিত হতে বাধ্য। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা যারা নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন বা করবেন, তারা পক্ষপাতমূলক আচরণ করলে তা ইতিহাসের সেরা নির্বাচনের বিপরীতটিই হওয়ার আশঙ্কা। বিভিন্ন জায়গায় প্রার্থিতা বাছাইয়ে বড় ধরনের বৈষম্য দেখা গেছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়ার কথা শোনা যায়নি। নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে লক্ষণীয় হলো- জুলাই সনদের আলোকে রাষ্ট্রসংস্কারের ক্ষেত্রে অদ্ভুত নীরবতা। দু-একটি দল ছাড়া অন্যরা নির্বাচন নিয়ে যত মাথা ঘামাচ্ছেন, জুলাই সনদ নিয়ে ততোধিক নীরব। এটি জুলাই আন্দোলনের প্রতি একধরনের অবিশ্বস্ততা। এটি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সঙ্ঘাত সৃষ্টি করতে পারে। সরকারিভাবেও এ ব্যাপারে জোরালো কোনো প্রচার-প্রচারণা অনুপস্থিত। প্রতিটি ইলেকট্র্রনিক মিডিয়ায় বাধ্যতামূলকভাবে এ ব্যাপারে প্রচারের ব্যবস্থা পরিস্থিতির উন্নয়নে সহায়ক হবে। নির্বাচনে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। দল-মত নির্বিশেষে সব দলই এ ব্যাপারে প্রশাসনকে বারবার সতর্ক করলেও অবস্থার দৃশ্যমান উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। চব্বিশের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে ব্যর্থতা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। শহীদ ওসমান হাদির খুনিকে ধরার ব্যর্থতাও তাদের কাঁধে।

ক’দিন আগে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ‘দেশে বেআইনি অস্ত্রের কদর বাড়ছে’ শিরোনামের খবর নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলার ব্যাপারে সবাইকে কমবেশি চিন্তিত করেছে। দেশের ভবিষ্যৎ চিত্রণে জুলাই ঘোষণার আলোকে রাষ্ট্রসংস্কারের মাধ্যমে দেশের নতুন যাত্রাপথে প্রয়োজন এই কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট সবার নিরপেক্ষতা, দায়িত্বানুভূতি ও দেশপ্রেম। নইলে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। দেশ আরেকটি প্রহসনমূলক নির্বাচনের ফাঁদে আটকে যেতে পারে।

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ
[email protected]