জ্বালানি সঙ্কট ও ক্লাস ব্যবস্থাপনা

সামগ্রিক বিবেচনায় দেখা যায়, তিন দিন ক্লাসের প্রস্তাব তথা অনলাইনে ক্লাসের প্রস্তাব বাস্তবসম্মত নয়। করোনাকালে এ ধরনের অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে যা বাস্তব, তা ক্লাস তথা শিক্ষা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সেই ধস এখনো স্কুল ও কলেজে অনুভূত হচ্ছে। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের ফলে ছাত্রদের যে ক্লাস-বিমুখতা তথা ভিন্নতর কালচারের সৃষ্টি হয়েছে, তা অব্যাহত ক্লাস তথা শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত উপস্থিতির সহায়ক নয়

বৈশ্বিক ও জাতীয় সঙ্কটে সরকারকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হয়। তা হতে পারে যুদ্ধ, মহামারী বা অন্য কোনো কারণে। ইরানের ওপর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও ইসরাইলি ইহুদিবাদ যে একতরফা যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে, তাতে গোটা বিশ্ব কমবেশি প্রভাবিত। বাংলাদেশের ওপরও যুদ্ধের মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। তেলের পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখে সঙ্কটের গভীরতা বোঝা যায়। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, রেমিট্যান্স এবং বিমান পরিবহনের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশ খুব স্বাভাবিকভাবেই মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের ওপর প্রায় শতভাগ নির্ভরশীল। যুদ্ধ অবস্থা বিশেষত জ্বালানি তেলের জ্বালামুখ হরমুজ প্রণালী বিপজ্জনক হয়ে ওঠায় বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। সরকার বারবার নিশ্চিত করছে, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ঘাটতি পূরণে সরকার বিকল্প চেষ্টা করছে, গণমাধ্যমে সে খবর এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশী জনচরিত্রের অতিমাত্রিক হায়-হুতাশের কারণে যে যার মতো যত পারে জ্বালানি সংগ্রহ করছে। জ্বালানি তেল ব্যবসায়ীরা দেশের এই সঙ্কটকে তাদের আরো মুনাফা অর্জনের মওকা হিসাবে নিয়েছে। কতিপয় তেলের পাম্পে জ্বালানি মজুদের প্রমাণ মিলেছে। রোজার সময় যেমন ব্যবসায়ীদের লোভের জিহ্বা লম্বা হয়, তেমনি এই জ্বালানি সঙ্কটের সময়ও তার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। যা হোক সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে বিবিধ ব্যবস্থা গ্রহণ তথা কৃচ্ছ্রতা সাধনের মাধ্যমে সঙ্কটের মোকাবেলা করছে।

জ্বালানি সঙ্কটের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস হ্রাস তথা সঙ্কুচিত করার মাধ্যমে জ্বালানি সঙ্কটের মোকাবেলা করার কথা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এতে জানা যায়, জ্বালানি সঙ্কটের কারণে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ও তিন দিন সশরীরে পাঠদানের ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় চিন্তাভাবনা করছে। বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয় বাদে মহানগর এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিন দিন অনলাইন এবং তিন দিন সশরীরে পাঠদানের প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, এক দিন অনলাইনে ক্লাস হলে পরদিন সশরীরে ক্লাস নেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনা। এখন প্রধানমন্ত্রীর সাথে পরামর্শ করে বা মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনা করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে ।

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সশরীর ক্লাসের পাশাপাশি অনলাইন ক্লাস চালুর বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে বলে জানিয়েছিলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিষয়টি আলোচিত হওয়ার কথা ছিল। এ কলাম লেখা পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানা যায়নি। এর মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষক, শিক্ষা বোর্ড ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে মতবিনিময় সভায় বিষয়টি আলোচিত হয়। সভায় আপাতত সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস নেয়ার প্রস্তাব ওঠে। তার মধ্যে চার দিন অনলাইন ও তিন দিন সশরীরে ক্লাস থাকবে। অনলাইনে ক্লাস হলেও শিক্ষকরা সশরীরে উপস্থিত থেকে পাঠদান করবেন। ব্যবহারিক ক্লাস হবে সশরীরে। মতবিনিময় সভার আগে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন সাংবাদিকদের জানান, অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম উৎসাহিত করার বিষয়ে তারা আলোচনা করেছেন। যেহেতু বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সঙ্কট রয়েছে, তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। মন্ত্রী বলেন, ‘কেউ জানে না কতদিন এ সঙ্কট চলবে, সে কারণে তারা ভাবছেন দেশের স্কুল ব্যবস্থাকে অনলাইন ও সশরীর এই মিশ্র পদ্ধতিতে আনা। পবিত্র রমজান উপলক্ষে ছুটি এবং বিভিন্ন আন্দোলন মিলিয়ে নির্ধারিত কিছু ক্লাস হয়নি। এ জন্য এখন সপ্তাহে ছয় দিন স্কুলে ক্লাস হচ্ছে। জ্বালানি সঙ্কট তাদের বিকল্প চিন্তা করতে বাধ্য করছে। শিক্ষামন্ত্রী আরো বলেন, তারা জরিপ করে দেখেছেন, ৫৫ শতাংশ অংশীজন চাইছেন অনলাইনে যেতে; কিন্তু পুরোপুরি অনলাইনে গেলে অসামাজিক হয়ে যাবে কি না, সেটিও তারা ভাবছেন। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অনুষ্ঠেয় মন্ত্রিসভায় তারা প্রস্তাব দেবেন। সেখানে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত আসবে। উল্লেখ্য, পবিত্র রমজান, ঈদুল ফিতরসহ বিভিন্ন উপলক্ষে প্রায় ৪০ দিনের ছুটির পর গত রোববার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে। এর মধ্যে জ্বালানি সঙ্কটে পড়েছে দেশ। সে কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আংশিক অনলাইন পাঠদান চালুর কথা হচ্ছে।

এর আগে করোনাকালে ২০২০ সালের ১৭ মাস দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। প্রায় দেড় বছর বন্ধ থাকার সময় বিকল্প হিসেবে অনলাইন ও টেলিভিশনে ক্লাস চালু করা হয়। তবে কার্যত এই উদ্যোগ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এখন আবার এ ধরনের প্রস্তাবনা শিক্ষাব্যবস্থা ও ক্লাস কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে বলে শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা মনে করেন। গত বুধবার বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের এক প্রতিনিধিত্বশীল সভা প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত হয়। এ সভায় ঢাকা শহরের অন্তত ১২ জন প্রধান শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। অভিভাবকদের উপস্থিতিও লক্ষ করা যায়। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকও এতে অংশগ্রহণ করেন। তারা তিন দিন অনলাইনে ক্লাস নেয়ার বিষয়টি অবাস্তব বলে বর্ণনা করেন। তারা যুক্তি দেন, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক কাঠামোতে সব শ্রেণীর মানুষের কাছে প্রযুক্তি তথা মোবাইল ফোন বা কম্পিউটার সহজলভ্য নয়। দেশের অধিকাংশ মানুষ গরিব। শহর কিংবা গ্রাম একই অবস্থার শিকার। মন্ত্রণালয় যে গ্রামের কথা বিবেচনা করেননি, এতে তাদের ধন্যবাদ। তবে আজকালকার গ্রাম আর গ্রাম নেই, এ কথা মনে রেখে ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় শুধু শহরের কথা বিবেচনায় আনছেন। কোনটি শহর আর কোনটি শহর নয়, তা নিয়েও বিতর্ক দেখা দেবে। যে হারে পৌরসভা বেড়েছে তাতে দেশের অধিকাংশ এলাকাই তার আওতাধীন হবে। প্রযুক্তিনির্ভর অনলাইন ক্লাস উন্নত দেশে সম্ভব, এ দেশে নয়। প্রযুক্তিনির্ভর যে শিক্ষা ও সংস্কৃতি ওসব দেশে আছে, সেই কালচার বা অভ্যাস আমাদের নেই। বিশ্ববিদ্যালয় তথা উচ্চতর শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশে আংশিক হলেও অনলাইন ক্লাস চালু আছে। করোনাকাল থেকে শুরু হয়ে আজও তা চালু আছে। একজন শিক্ষক হিসেবে অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর নয়। ছাত্ররা অনলাইনের ক্লাসে খুবই কম উপস্থিত থাকে। তারা নামকাওয়াস্তে বা দায়সারা গোছের উপস্থিতির মাধ্যমে শিক্ষককে প্রতারিত করে। উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে স্কুল-কলেজের ক্ষেত্রে কী অবস্থা হবে সহজেই বোধগম্য। যে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য অনলাইনের সুপারিশ, সেখানে স্কুলে শিক্ষকদের তো ছয় দিনই উপস্থিত থাকতে হবে। সে ক্ষেত্রে জ্বালানি সাশ্রয়ের চেষ্টা তেমন ফলদায়ক হবে না।

এ ক্ষেত্রে শিক্ষাবিদদের প্রস্তাবনাও মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের অনুকূল নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত পরামর্শক কমিটির সদস্য মুহাম্মদ মাহবুব মোর্শেদ পত্রিকান্তরে মন্তব্য করেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সশরীর ক্লাসের বিকল্প গড়ে ওঠেনি। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সঙ্কটের বাস্তবতায় বিকল্প পদ্ধতির দিকে যেতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে অনলাইন ও সশরীর মিলিয়ে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। কিন্তু এমন ব্যবস্থায় দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকতে পারে। তাই তাদের জন্য এলাকাভিত্তিক বিশেষ ব্যবস্থা বা বিকল্প ব্যবস্থার বিষয়টি পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। তার মতে, এ উদ্যোগ শুরুর আগেই একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, সবার জন্য সাধারণ নির্দেশিকা প্রণয়ন করতে হবে।

সামগ্রিক বিবেচনায় দেখা যায়, তিন দিন ক্লাসের প্রস্তাব তথা অনলাইনে ক্লাসের প্রস্তাব বাস্তবসম্মত নয়। করোনাকালে এ ধরনের অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে যা বাস্তব, তা ক্লাস তথা শিক্ষা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সেই ধস এখনো স্কুল ও কলেজে অনুভূত হচ্ছে। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের ফলে ছাত্রদের যে ক্লাস-বিমুখতা তথা ভিন্নতর কালচারের সৃষ্টি হয়েছে, তা অব্যাহত ক্লাস তথা শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত উপস্থিতির সহায়ক নয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৭ মাসে ছাত্রদের ক্লাসে তথা অবিরাম পাঠক্রমে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য কোনো চিন্তাভাবনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। বিএনপি সরকারের জন্য দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, তাদেরকে প্রাথমিকভাবেই বড় ধরনের শিক্ষা-সঙ্কট মোকাবেলা করতে হচ্ছে। বাংলাদেশের কালচারে তিন দিন ক্লাস না হলে সাত দিনই ক্লাস না হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

বাস্তব চিন্তা করলে যে সাশ্রয়ের কথা চিন্তা করে অনলাইনের কথা এসেছে, আসলে তা তেমন ফলপ্রসূ হবে না বলেই শিক্ষাবিদদের অভিমত। এই কলামটি প্রকাশের আগেই ক্যাবিনেটে বিষয়টি আলোচিত হওয়ার কথা। সিদ্ধান্ত যা-ই হোক না কেন, জনমত অনলাইনের বিপক্ষে। এ বিষয়টি Second Thought-এর অপেক্ষা রাখে।

লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]